বেদে সংশয় ও নাস্তিক্য — শেষ পর্ব

সুকুমারী ভট্টাচার্য

 

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

 

সর্বত্রই প্রশ্ন, সংশয়, নিরীশ্বরবাদ, অজ্ঞেয়বাদ ও নাস্তিক্য সমাজবিধায়কদের উষ্মার উদ্রেক করেছে। কেন? কারণ তাঁরা ভেবেচিন্তে যে-ব্যাখ্যা দিয়েছেন জীবনের, বিশ্ববিধানের, প্রকৃতির, মানবদেহের এবং যে-বিধান দিয়েছেন মানুষের সম্ভাব্য বিপদ-আপদের থেকে মুক্তির জন্যে, যে-পন্থার নির্দেশ দিয়েছেন প্রকৃতিকে নিজের অনুকূলে এনে সুস্থ, সুখী, দীর্ঘজীবন লাভ করার জন্য, মানুষের সংশয় স্পষ্ট উচ্চারিত হলে সে-বিধানের ভিত টলে যায়। পরবর্তীকালে, যখন সমাজে যজ্ঞানুষ্ঠান চললেও বহু মানুষের মনে যজ্ঞ সমন্ধে অনীহা দেখা দিয়েছে তখন সমাজে তৎকালীন শাস্ত্রকাররা অন্য কিছু তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছেন। সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের পক্ষে এই নতুন তত্ত্বগুলি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। দেখতে পাচ্ছি রাজা, রাজন্য, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ, জিজ্ঞাসু ব্রহ্মচারী ও অন্যান্য কিছু ব্রহ্মসন্ধানী ব্যক্তিই এই নতুন তত্ত্বগুলি সম্বন্ধে আগ্রহী। এই কালপর্বে সংশয় উচ্চারণ করেছেন এঁরাই, সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এঁরাই, তবে প্রায়ই প্রশ্নের সঙ্গে সমাধানের কোনও সঙ্গতি থাকেনি। প্রশ্নকর্তারা কখনও-বা ব্যক্তিগত প্রশ্ন ছাড়াও জনমানসে সঞ্চরমাণ অন্য প্রশ্নও উচ্চারণ করেছেন। এঁদের মধ্যে সমাজের বঞ্চিত শ্রমিকরাও আছেন, তাঁরা নিজেরা যে-প্রশ্ন করলে ওপরমহলে উত্তর দেওয়ার কোনও তাগিদ থাকত না, সেই প্রশ্নই কখনও কখনও অন্যান্য মনীষীরা করেছেন। যেমন নচিকেতা। উত্তর বা সমাধান বহু ক্ষেত্রেই ক্ষেত্রেই সমাজের সুবিধাভোগী, বিত্তবান শ্রেণির স্বার্থের অনুকূলে; যেমন জন্মান্তরবাদ। যে-মানুষ দুঃখে, অভাবে, অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে ইহজীবন যাপন করে গেল, তার পক্ষে জন্মান্তর তো অভিশাপ। যতই তাকে বোঝানো হোক, এ জন্মে শাস্ত্র-অনুমোদিত ধর্মাচরণ করলে পরজন্মে সুখী জীবন পাওয়া যাবেই। তবু তার এ সংশয় ঘোচে না যে, পরজন্ম এ জন্মেরই পুনরাবৃত্তি হতে পারে, এবং সে-সম্ভাবনা তার পক্ষে ভয়াবহ আতঙ্কের। তা ছাড়া পরজন্মের অস্তিত্বটা তো সংশয়িত। এদের হয়ে কেউ কেউ বলেছেন, ‘এ-জন্ম থেকে পরজন্মে যাওয়ার কোনও পথ নেই’, কিংবা ‘মৃত্যুর পরে কোনও চেতনা থাকে না’। এ সব সংশয় সমাজের বিধায়কদের পক্ষে অত্যন্ত অস্বস্তিকর এবং অপমানকর: তাঁরা যে-বিধান ও যে-সমাধান দিয়েছেন, সংশয়ী তা মেনে নিচ্ছে না, অতএব সে পাপী।  সমাজের প্রত্যন্ত দেশে তখন বহু নামে যজ্ঞবিরোধী, বেদবিরোধী নানা প্রস্থানের উদয় হয়েছে, তারা বেদ ও যজ্ঞ বাদ দিয়েও দিব্যি আছে। যেহেতু যজ্ঞকারীদের তারা উপেক্ষা করেছে, তাই সমাজও তাদের নিন্দা করেছে।

লোকায়ত সংশয়

তখনকার সমাজে বোধহয় সবচেয়ে বড় নিন্দাসূচক শব্দই ছিল ‘নাস্তিক’। নাস্তিক বেদ স্বীকার করে না, পরলোক ও পুনর্জন্ম স্বীকার করে না এবং কেউ কেউ আত্মাও স্বীকার করে না। এই শেষোক্তরা চার্বাকপন্থী, এরা বলত, ‘ন স্বর্গো নাপবর্গো বা নৈবাত্মা পারলৌকিকঃ’। অর্থাৎ স্বর্গ নেই, মোক্ষ নেই এবং পরলোকে আত্মা নেই। উপনিষদে ক্ষীণভাবে মোক্ষের কথা বলা আছে, কিন্তু স্বর্গ আত্মা এবং পরলোকের কথা সংহিতা, ব্রাহ্মণ ও উপনিষদে আছে; অতএব বেদের কিছু মৌলিক তত্ত্বকে এরা অস্বীকার করল। যারা এসবে বিশ্বাস করে, তাদের সম্বন্ধে এরা বলল, তারা ‘বুদ্ধিপৌরুষহীন’; অর্থাৎ তারা নির্বুদ্ধি এবং নিষ্পৌরুষ অর্থাৎ কাপুরুষ। কাপুরুষ বা নির্বুদ্ধি কেন? কারণ তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে না বলেই শাস্ত্রকাররা জীবন সম্বন্ধে যা তাদের বুঝিয়েছেন তাই তারা মেনে নিয়েছে। শুধু চার্বাক নয়, বার্হস্পত্য, জৈন, বৌদ্ধ এবং আজীবিকরাও বেদের বহু মৌলিক তত্ত্বকে সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে নিজস্ব মতামত উপস্থাপিত করেছেন। যজ্ঞের উপযোগিতা এঁরা কেউই মানেননি, এবং বেদ মূলত যজ্ঞনির্ভর। মুণ্ডক উপনিষদেই একবার মাত্র স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা হয়েছে যে যজ্ঞগুলি অদৃঢ় নৌকো, পারে নিয়ে যাওয়ার শক্তি তাদের নেই। এছাড়া পুরো জ্ঞানকাণ্ডে কিন্তু ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে, সমাজে যজ্ঞ চলছে এবং চলবে। তারই মধ্যে এক বিরুদ্ধ শক্তি নানা নামে, নানা প্রস্থানে চিহ্নিত হয়ে সমাজে বিদ্যমান। কৌতুকের বিষয় হল, অবৈদিক প্রস্থানগুলিতে পরবর্তী সাহিত্যে সাধারণভাবে লোকায়ত বলা হয়েছে। লোকায়ত শব্দের অভিধানগত অর্থ ‘লোকে আয়ত’ অর্থাৎ যা সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিব্যাপ্ত। যজ্ঞের পরে ফলের অপ্রাপ্তি যজ্ঞযুগে সংশয়ের সবচেয়ে বড় ভিত্তি রচনা করেছিল। তারই সঙ্গে সঙ্গে চক্ষুষ্মান অভিজ্ঞতা যখন তার অন্তর্নিহিত ন্যায়ের বোধের বিপরীত হয়, যখন সে দেখে দুর্জনের প্রতিপত্তি বাড়ছে, সজ্জন দু’বেলা অন্নসংস্থান করতে পারছে না, যে-মানুষ বিবেকবান, সৎ-কর্মচারী, সে নিরন্তর দুঃখই পাচ্ছে, তখন তার জীবন ও ন্যায়বিচার সম্বন্ধে এবং পূর্বতন ‘ঋত’র বোধের সম্বন্ধে অন্তর্নিহিত প্রত্যাশা গুরুতর ধাক্কা খায়; দেখা দেয় সংশয়। লোকায়ত চার্বাকমত যজ্ঞ, আত্মা, দেবদেবী, স্বর্গনরক, পরলোক ও জন্মান্তর স্বীকার করে না, বেদের প্রামাণ্যতা স্বীকার করে না। এই মত ও বিশ্বাস লোকে আয়ত বা সমাজে গণমানসে বিস্তৃত ছিল?

এটা স্বীকার করলে বোঝা যায়, শাস্ত্র লোকায়ত মত সম্বন্ধে কেন এত অসহিষ্ণু, কেন চার্বাককে মহাভারত-এ (ও পরে বেণীসংহার নাটকেও) রাক্ষস বলা হয়েছে। দুর্যোধনের বন্ধু বলা হয়েছে। কেন ‘ধার্মিক’ ব্রাহ্মণেরা তাকে তাড়া করে বধ করে। লোকায়তিক চার্বাক তা হলে সেই সব কথাই বলেছেন যা জনসাধারণের মনে সন্দেহের আকারে ছিল; তাঁর ভাষায় তা প্রত্যয়ের রূপে প্রকাশিত হল। বোঝা যায় কেন পরস্পরবিরোধী দর্শনপ্রস্থানও (যেমন মীমাংসা, যার অপর নাম পূর্বমীমাংসা এবং বেদান্ত যার প্রতিশব্দ উত্তরমীমাংসা) এবং সবকটি দর্শনগ্রন্থই চার্বাক মত আগে খণ্ডন করে পরে নিজ মত প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর থেকে সূচিত হয় যে, চার্বাক মত আসলে শুধু জনপ্রিয়ই ছিল না; সমাজে এ মতের বহু অনুগামী ছিল, তাই প্রয়োজন হয়েছিল সে মতকে খণ্ডন করার — যাতে তার প্রসার রোধ করা যায়। মানুষ যখন তার অভিজ্ঞতায় ও মননে স্বর্গনরক, দেবদেবী, আত্মা, পরলোকের অস্তিত্বের কোনও নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ না পেয়ে সন্দিগ্ধ হয়, তখন বেদে নির্দেশিত তত্ত্বগুলিতে সে আর বিশ্বাস রাখতে পারে না। তখনই তার ওপরে নেমে আসে শাস্ত্রকারদের অজস্র কটুবাক্য এবং অভিসম্পাত। জনসাধারণ্যে যখন এ সব সন্দেহ — যার অন্তিম রূপটি হল নাস্তিক্য — প্রসার লাভ করেছিল তখন তাকে ‘লোকায়ত’ বলে গাল দেওয়া ছাড়া শাস্ত্রকারদের গত্যন্তর ছিল না। লোকে, লোকমানসে এর বিস্তার ছিল বলেই লোকায়তের সম্বন্ধে আতঙ্কটি এত বাস্তব, এবং তাই এত অসহিষ্ণুতা।

মহাভারত-এর শান্তিপর্বে একটি উপাখ্যানে পড়ি:

এক ধনী রথে চড়ে যাচ্ছিলেন, পথে এক ব্রাহ্মণ চাপা পড়েন; ব্রাহ্মণটি আত্মহত্যা করতে উদ্যত হলে এক শৃগাল তাঁকে নিবৃত্ত করে বলে যে, ‘আত্মহত্যা নাস্তিকোচিত কাজ, এটা করা ঠিক নয়। গতজন্মে সে নিজে নিরর্থক আন্বীক্ষিকী ও তর্কবিদ্যায় অনুরক্ত ছিল, হৈতুক অর্থাৎ যুক্তি দিয়ে সবকিছুর হেতু নির্ণয় করতে চেষ্টা করত, বেদনিন্দুক ও নাস্তিক ছিল, তাই এ জন্মে শৃগাল হয়েছে।”

এখানে লক্ষণীয় তর্ক, আন্বীক্ষিকী (যুক্তিবিদ্যা) ও নাস্তিকতা এক নিশ্বাসে উচ্চারিত; এগুলি গর্হিত পাপ, যার ফলে বক্তার শৃগালজন্ম হয়েছে। এখানে পুরোহিততন্ত্রের ও শাস্ত্রকারদের উষ্মা যুক্তিবাদের ওপরে — বেদের নিন্দা, নাস্তিকতা, হেতুবাদিত্বের ওপরে। অর্থাৎ পরিষ্কার দুটি বিকল্প; একদিকে বেদের প্রামাণ্য স্বীকার করে শাস্ত্রকার পুরোহিতদের নির্দেশ মতো যজ্ঞ করা, দেবদেবী, আত্মা, পরলোক, স্বর্গনরক, জন্মান্তরে চোখ বুজে বিশ্বাস করা; অন্যদিকে এসব সম্বন্ধে মনে সন্দেহের উদয় হলে যুক্তিতর্ক দিয়ে ব্যাপারটা যুক্তিগ্রাহ্য কি না, অর্থাৎ বিশ্বসনীয় কি না বুঝে দেখার চেষ্টা করা এবং যদি যুক্তিতর্কে তার যাথার্থ্য সম্বন্ধে নিশ্চয়তা না মেলে, তবে খোলাখুলি তাকে স্বীকার করা এবং বিশ্বাসের বদলে সংশয় পোষণ করা। শৃগালের উপ্যাখ্যানে উল্লিখিত পাপগুলি একই গোত্রের অর্থাৎ চোখ বুজে আপ্তবাক্যে বিশ্বাস না করে সাধারণ বুদ্ধি, যুক্তি, তর্ক, হেতুবিদ্যা (অর্থাৎ কোনও ব্যাপারে কার্যকারণ সম্বন্ধের খোঁজ করা) এ সবের ওপর ভরসা রাখা। এতে সমাজপতিদের এত উষ্মা কেন? বেদনিন্দুক, হৈতুক, তর্কাশ্রয়ী মানুষ বেদের প্রামাণ্যতা স্বীকার না করে তার নিজস্ব চিন্তা যুক্তিতর্কের ওপর ভরসা করে চললে শাস্ত্রকাররা সমাজের সংহতির জন্য যে ছকটা তৈরি করেছেন সেটা ঝরে পড়বে। এই অবাধ্যতা তো আধ্যাত্মিক স্তরে একটা প্রতিস্পর্ধা এবং জাগতিক স্তরে অসহযোগ, সমাজের ওপরতলার লোকের আধিপত্য ও কর্তৃত্ব অস্বীকার করা। পৃথিবীতে কোনও সময়ে কোনও সমাজের অধিকর্তারা সাধারণ লোকের আনুগত্যের এই অভাবকে স্বীকার করেননি, উপেক্ষাও করেননি। এখানেও তাই হুমকি, অভিশাপ, পরজন্মে হীন অস্তিত্বের ভয় দেখানো।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রতে তাই সাংখ্য, যোগ ও আন্বীক্ষিকীকে একই পর্যায়ের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মনুতে আন্বীক্ষিকীকে পরিহার করা হয়েছে; দণ্ডনীতি, অর্থনীতি, ত্রয়ী (বেদচর্চা) ও বার্তাকে (কৃষি, ইত্যাদি) স্বীকার করা হয়েছে। শংকরাচার্য মনুকে বারবার উদ্ধৃত করেন এবং সবচেয়ে প্রামাণ্য ধর্মাশাস্ত্র বলে প্রয়োজনীয় শাস্ত্র হিসেবে স্বীকার করেন। মনুই প্রাচীন ভারতের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের নিরিখ নির্মাণ করেছেন। এবং মনুতে যুক্তিতর্ক দিয়ে বুঝবার শাস্ত্রগুলিকে পরিহার করা হয়েছে। যুক্তির চর্চা না থাকলে সমাজে আপ্তবাক্য, বেদ ও ধর্মশাস্ত্রের অনুজ্ঞাই চূড়ান্তভাবে প্রামাণ্য বলে স্বীকৃত হবে, অপর পক্ষে যুক্তিতর্ক ও তৎসংশ্লিষ্ট কোনও বিদ্যা বা শাস্ত্রকে স্বীকার করলেই সমূহ বিপদ। তখন মানুষ নিজের দেহমন, বহিঃপ্রকৃতি, বিশ্বাচরাচর, যজ্ঞ, এ সবের সমর্থন যখন যুক্তির মধ্যে পায় না এবং সন্দিহান হয়ে ওঠে, এবং প্রকাশ্যে সে সংশয় যখন ঘোষণা করে, তখন সে বৈপ্লবিক সন্দেহ সংক্রামক হয়ে যায়। অন্য লোকের মনে যদি বীজাকারেও কোনও সংশয় চাপা থাকে তখন প্রকাশ্যে অপরের ঘোষিত সংশয়ে সে আপন সন্দেহের সমর্থন পায়; এমনই করে বিস্তার লাভ করে অবিশ্বাস, ফলে সমাজপতিদের সযত্ননির্মিত সংহতি বিপন্ন হয়। ‘বেদের বক্তব্য সম্পর্কে শাস্ত্রকারদের যথার্থ আগ্রহ নেই। তার পরিবর্তে তাদের উৎসাহ বেদকে একটি রাষ্ট্রনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখায় — যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরলোক ও দেবতার ভয় দেখিয়ে জনসাধারণকে সার্থকভাবে বশীভূত রাখা যায়; অতএব তাঁরা সদর্পে ঘোষণা করতে পারেন যে, বেদেই সর্বোত্তম প্রজা বিধৃত আছে।” [“…the lawgivers are not really interested in the actual contents of the Veda. What they are interested instead in is the Veda as a political instrument which can be effective used to keep the people under control with the fear of the other world and gods etc which, because they boldly proclaim as a supreme wisdom supposed to be contained in the Veda.’ — Chatterjee. p.180]। কাজেই ব্যাপক সংশয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা বিপন্ন হতে পারে বলেই বেদের প্রামাণ্যতা প্রতিষ্ঠা করা এত জরুরি, এবং পৃথিবীর সমস্ত ধর্মগ্রন্থ সম্বন্ধেই এ কথা প্রযোজ্য। সন্দেহ প্রতিষ্ঠিত সামাজিক সংহতিকে বিপর্যস্ত করতে পারে বলেই সন্দেহ সম্পর্কে সমাজপতিদের সদাজাগ্রত আশঙ্কা এবং উদগ্র রোষ।

গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজব্যবস্থা ও তার ধর্মাচরণ ভেঙে গেলে নতুন একটি সমাজের গঠনের সূচনাকালে রচয়িতারা বেদের ব্রাহ্মণসাহিত্যে যজ্ঞের সংখ্যা, অনুপুঙ্খ, ব্যাপ্তি, ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপৃত হয়ে পড়লেন; আশঙ্কা ওই একই, সামাজিক সংহতি পাছে নষ্ট হয়! যুক্তির বেশি প্রয়োগ ঘটলে আপ্তবাক্য প্রামাণ্যতা হারায়, সংশয়ের সংখ্যা, গভীরতা ও ব্যাপ্তি বাড়ে। তা বলে সমাজপতিরা কি যুক্তির কোনও ভূমিকাই স্বীকার করেননি? করেছিলেন বই-কি, শাস্ত্রবাক্য যে অভ্রান্ত, মান্য এবং চূড়ান্তভাবে প্রামাণ্য, এইটে প্রমাণ করার জন্য সুদীর্ঘকাল ধরে ব্রাহ্মণসাহিত্য, দর্শনপ্রস্থানগুলি, টীকা, ভাষ্য, ধর্মশাস্ত্র ও নিবন্ধ রচনা হয়েছে। এবং শুধু ভারতবর্ষে নয়, খ্রিস্টান, ইসলাম ও অন্যান্য সমস্ত ধর্মের ক্ষেত্রেই এ ব্যাপারটা একইভাবে ঘটেছে।

এত আয়োজন সত্ত্বেও যদি সংশয়ী বলে, “তোমরা যা বলছ তা আমার বিশ্বাস হয় না, কে দেখেছে দেবতাদের উৎপত্তি, কে বলেছে যজ্ঞে ফল হয়, কেন মানতে যাব যা দেখতে পাইনে, বুদ্ধিতে যুক্তিতে যার কোনও হদিস মেলে না তাঁকে?” এ তো সর্বনাশ সমাজের পক্ষে। কাজেই নাস্তিক, বেদনিন্দুক, ইহলোকবাদী, লোকায়তিক ভূতবাদ, সাংখ্য, প্রধানবাদ, পরমাণুবাদ ও ন্যায় — এদের যারা স্বীকৃত করে তারা এবং এদের ভিনদেশি বিকল্পরা সর্বদেশের শাস্ত্রে ধিক্কৃত। কিন্তু মুশকিল হল “যদি ভারতীয় দর্শনে কোনও কিছু সার্থকভাবে প্রাগ্রসর বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে থাকে তবে তা হল লোকায়ত মত, অর্থাৎ (সেই মত যা বলে) চেতনা, যাকে সাধারণত আত্মা বা মনের বিশিষ্ট লক্ষণ বলা হয়, তা কেবলমাত্র বস্তু থেকেই উদ্ভূত।” [“…if there is anything in traditional Indian philosophy that has successfully stood the test of advanced scientific knowledge, it is the proposition of the Loka-yatas viz that consciousness — ordainly understood as the differential of the spirit of the soul — is only a product of matter.” — Chatterjee, op. cit. p. 610]। এই মত ছিল লোকায়ত। লোকে তা জানত যে আত্মা বলে কোনও কিছুকে দেখা যায় না, অতএব সেটা আছে কি না, মৃত্যুর পর থাকবে কি না এ বিষয়ে তো স্বাভাবিকভাবেই লোকের সন্দেহ হবে। চার্বাক যেমন বলেন, শাক থেকে সুরা হয়, অথচ শাকে সুরার কোনও গুণই নেই; রাসায়নিক প্রক্রিয়াতেই বস্তুর এমন গুণগত, আকৃতিগত, প্রকৃতিগত পরিবর্তন হয়; কাজেই শরীরের বিশিষ্ট ধরনের অবয়বসংস্থান ঘটলে আপনিই তার থেকে চেতনার উদ্ভব হয়। যেমন চুন সাদা, হলুদ হলদে রঙের, অথচ এ দু’টি মেশালে লাল রঙ হয়, অথচ লাল রঙ হলুদেও ছিল না, চুনেও ছিল না। রাসায়নিক প্রক্রিয়াতেই উপাদানে অবিদ্যমান গুণ বা লক্ষণ পরিণত পদার্থে উদ্ভূত হয়। তেমনই করে মানুষের শরীরের ইন্দ্রিয়ের বিশেষ ধরনের সমাবেশ ঘটলে, ইন্দ্রিয়গুলিতে অনুপস্থিত নতুন ব্যাপার, চেতনার উদয় হয়, এই চেতনাতে আছে মনন, ইচ্ছা ও অনুভব। এর বাইরে চেতনার কোনও প্রকাশ লোকায়ত দর্শন মানেনি। এই দিয়েই মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলির ব্যাখ্যা হয়, হয় না শুধু মরণোত্তর আত্মার। সাধারণ মানুষের সে আত্মার কোনও প্রয়োজনই নেই, এবং যেহেতু ইন্দ্রিয়গুলির কাছে তার কোনও প্রমাণ মেলে না, চিন্তায় কল্পনায় কেউ কেউ তাকে শাস্ত্রকারদের নির্দেশিত রূপে অবধারণ হয়তো করতে পারেন, কিন্তু অধিকাংশ সাধারণ মানুষের এমন আত্মার কোনও প্রয়োজনও নেই এবং দেহবিনির্মুক্ত এই অবস্তুকে তারা সম্যকরূপে ধারণাও করতে পারে না, চায়ও না। অতএব একটি লোকায়ত অনাস্থা বৈদিক সমাজে ব্যাপকভাবেই ছিল।

বিশ্বাসের পরম্পরা

অনাস্থা কীসে? আগেই দেখেছি, বেদের প্রামাণ্যতায়, দেবদেবী, স্বর্গনরক, পরলোক, আত্মা ও জন্মান্তরে। অনাস্থা নেতিবাচক; কিন্তু আস্থা বা বিশ্বাস যে সাধারণ মানুষের এসব তত্ত্বে কোনও দিন ছিল, তারও তো কোনও প্রমাণ নেই। সেই ঋগ্বেদের আদিপর্বের ঋষিমণ্ডলগুলি (২-৭) থেকেই তো বহু অনাস্থার প্রকাশ রয়েছে। তাহলে সর্বজনীন বা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস কোনও দিন ছিল তা প্রমাণ করা যাবে না, বরং যেটা স্বতঃসিদ্ধ সেটা হল, কিছু মানুষ সর্বদেশে সর্বকালে বিশ্বাস না করে বাঁচতে পারে না; তাঁদেরকে সমাজপতি ও শাস্ত্রকাররা যা বিশ্বাস করতে বলত তারা তাই বিশ্বাস করত। সম্ভবত এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, তাই সমাজে সংহতি রক্ষিত হত, যজ্ঞক্রিয়া সম্পাদিত হত, বিশেষ কোনও বৈপ্লবিক চিন্তা প্রশ্রয় পেত না। এরা সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও আপনিই প্রমাণিত হয় যে, সমাজে সংখ্যালঘু মানুষ অন্য রকম ছিল, তাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করার দরকারই বোধ করত না; তাদের মননে ও আচরণে এ সব সম্বন্ধে একটা সহজাত ও ঔদাসীন্য ও অনীহাই ছিল। চিরকালই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের সম্বন্ধেই এ কথা প্রযোজ্য। এদের মধ্যে অধিকাংশই হয়তো সক্রিয়ভাবে যজ্ঞক্রিয়ায় যোগ দিত। কিন্তু সে-ব্যাপারে বিশ্বাসের বদলে যা তাদের প্রণোদিত করত, তা দীর্ঘকালের ঐতিহ্য থেকে সঞ্জাত একটা জড়, অসচেতন অভ্যাস যেমনটি আজও অধিকাংশ পুজোআচ্চার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সত্য। আর সর্বদেশে সর্বকালে যা সত্য তা হল সমাজে স্বল্পসংখ্যক কিছু মানুষ ছিল যারা বিশ্বাস করতে চাইত, কিন্তু পারত না। এদের চিত্তবৃত্তি অতিশয় জাগ্রত ছিল, তাই যুক্তিতে মননে যাকে সিদ্ধ করতে পারত না তা বিশ্বাসও করতে পারত না। এদের সাধ্য ছিল না মননের সাক্ষ্যের বিরুদ্ধে শুধু চিরাচরিত, ঐতিহ্যগত আপ্তবাক্য বলেই কোনও কিছুর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও সেই অনুসারে আচরণ, অর্থাৎ সচেতনভাবে, স্বেচ্ছায়, সক্রিয়ভাবে যজ্ঞকর্মে অংশগ্রহণ করার।

আর্যদের যজ্ঞনির্ভর সমাজের বাইরে তখনই ছিল বৃহৎ প্রাগার্য গোষ্ঠী, যাদের ধর্মবিশ্বাস এবং আচরণ ও অনুষ্ঠান অবশ্যই ভিন্ন ছিল। বেদ এদের মধ্যে কাউকে তুচ্ছ করে ‘যতি’ বলেছে এবং খবর দিয়েছে যে দেবশ্রেষ্ঠ ইন্দ্র যতিদের সালাবৃকদের (wolf-hounds?) কাছে সমর্পণ করেছেন। আবার কোনও কোনও অবৈদিক, সম্ভবত প্রাগার্য গোষ্ঠীর সম্বন্ধে তাচ্ছিল্য ভরে বলা হয়েছে যে, তারা শিশ্নদেব, অর্থাৎ হয়তো একান্তভাবে যৌনতাপরায়ণ অথবা লিঙ্গপূজক। এ ছাড়াও নানা রকমের মতবাদ অবশ্যই ছিল কারণ যজুর্বেদের ‘শিবসংকল্পসূত্র’ কিংবা অথর্ববেদের বহু সূক্তে উল্লেখ পাই ‘যাদের বিশ্বাস ও আচরণ ভিন্ন’। তাই নানা মত ও পথ তখনই সমাজে সহাবস্থান করত, যদিও সম্ভবত, অধিকাংশের না হলেও মুখ্য অংশের ধর্মাচরণ ছিল যজ্ঞকেন্দ্রিক। কিন্তু সমাজের মানুব যারা কৌতূহলী, স্বাধীনচেতা, নিজের গোষ্ঠীর বিশ্বাস ও আচরণে অতৃপ্ত তারা সেই অনুসন্ধিৎসা বা নানা ধরনের মত, পথ ও আচরণের যাচাই করত। সমাজে প্রচলিত আপ্তবাক্যনির্ভর ধর্মাচরণে এরা অসহিষ্ণু। এরা সন্দেহ প্রকাশ করত কথায় এরং সম্ভবত আচরণেও। প্রথাসিদ্ধ ধর্মাচরণকে নিয়ে এরা কখনও ব্যঙ্গকৌতুক করেছে, কখনও-বা জিজ্ঞাসু ব্রহ্মচারীর মতো অধিক বিদ্বান বা মনস্বীর কাছে আপন সংশয় ব্যক্ত করে সমাধানের সন্ধান চেয়েছে। তৎকালীন ইতিহাস ও সাহিত্য থেকে যেটা প্রতিপন্ন হয় তা হল, একটি প্রধান মত ও বহুজন-আচরিত একটি ধর্মপন্থা থাকা সত্ত্বেও তখনই সমাজে বহু বিশ্বাসের আকল্প চালু ছিল, এবং কালের গতিতে এ সব আকল্প বহু ধর্ম ও দর্শনপ্রস্থানের আকারে নানা বিকল্পের রূপে প্রতিভাত হচ্ছিল। ফলে চোখ বুঝে বেদরচয়িতাদের বিশ্বাস মেনে নেওয়ার মতো মানসিকতা অনেকেরই ছিল না। প্রতিবাদী বা অবিশ্বাসীকে সব দেশেই চিরকাল সমাজের শক্তিমান গোষ্ঠী অবজ্ঞা করেছে। বাইবেল-এ বারবার বলা হয়েছে, ‘মূঢ় মনে মনে বলছে ঈশ্বর নেই’ [‘The fool  hath said in his heart, there is no god psalms.’ 14.1, 53.1, etal]। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে নাস্তিকের পরিণাম খুব যন্ত্রণাময় একটি নরক ‘হাবিয়া দোজখ’-এ। ভারতবর্ষেও বারবারই বলা হয়েছে নাস্তিক, চার্বাকপন্থী, লোকায়ত, বার্হস্পত্যপন্থী, ইত্যাদি মানুষের পরিণতি শোচনীয়। সমাজের শৃঙ্খলা, যজ্ঞনিষ্ঠ ধর্মবোধে যাদের অন্তরাত্মা শান্তি পায়নি, তারা সৃষ্টিতে, বিশ্বচরাচরে এবং সমাজে কার‍্যকারণ সম্পর্ক খুঁজেছে কিন্তু পায়নি — শাস্ত্রে তাদের প্রতি অতি পুরুষ অভিশাপবাণী উচ্চারিত হয়েছে। তারা প্রকাশ্যে প্রতিরোধী, অন্তরে প্রচ্ছন্ন বিপ্লবী। শাস্ত্রকর্তারা যে-শৃঙ্খলা রচনা করেছেন, তাদের কাছে সেটা শৃঙ্খল বলে প্রতিভাত হয়েছে, কারণ তার মধ্যে কার্যকারণ পরম্পরার শৃঙ্খলা নেই। এই কার্যকারণের সন্ধান করে যে যুক্তি-প্রস্থান, তা-ই পরবর্তীকালে আন্বীক্ষিকী-তর্কশাস্ত্র বলে অভিহিত হয়েছে এবং এগুলির চর্চাকে শাপশাপান্ত করা হয়েছে।

ধর্মবিশ্বাসের উদ্ভব নিয়ে পণ্ডিতেরা মোটামুটি একমত যে, এর উৎসে আছে ভয় ও বিস্ময়। বিশ্বচরাচরে পূর্বাভাস ছাড়াই বহু বিপদ আসে, ঝড়, বজ্রপাত, খরা, বন্যা, অভাব, অনাহার, ঈতি (শস্যের ক্ষতিকারী ঘটনা), শোক, মৃত্যু, বিচ্ছেদ ইত্যাদি। এ ছাড়াও ছিল হিংস্র শ্বাপদ ও শক্তিমান অত্যাচারী গোষ্ঠী এবং বহু আকস্মিক দুর্বিপাক। এগুলির ওপরে মানুষের হাত ছিল না তাই ভয় জাগত প্রাণে। সে-ভয় থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্যই মুখ্যত সর্বজ্ঞ, সর্বব্যাপী, সর্বশক্তিমান দেবতার কল্পনা। এছাড়া ছিল বিস্ময়: ঋতুর নিয়মিত আবর্তন, প্রকৃতির শোভা ও বিস্তার, সূর্য চন্দ্র নক্ষত্র, গিরিনদীসমুদ্রের উদার সৌন্দর্য, আকাশের ব্যাপ্তি, মানবদেহের শোভা — কে এসব সৃষ্টি করল? যে-ই করে থাকুক সে মহান, শক্তিমান, মঙ্গলময়, শ্রীময় — অতএব নমস্য। এখানে কার্যকারণবোধের কোনও ব্যাপারই নেই; আছে শুধু পৃথিবী ও মানুষের শোভায়, মহিমায় মানুষের মুগ্ধতা। ভয় জাগে মানুষের নিয়ন্ত্রণক্ষমতার বাইরের ঘটনা থেকে — যে-অশুভ ভয়ঙ্কর, ক্ষতিকর শক্তি বিশ্বে, জীবনে ও সমাজে বিদ্যমান, যার কাছে প্রতিনিয়ত পরাজিত হচ্ছে মানুষের সীমিত ক্ষমতা। স্বভাবতই সে-সম্বন্ধে মানুষের মনে প্রবল ত্রাসের সৃষ্টি হয়। এখানেও কার্যকারণ সম্পর্ক মানুষের বোধের সম্পূর্ণ বাইরে থাকে। কেন কী হয়, মানুষ ভেবে পায় না। শাস্ত্রকার সমাধান জুগিয়ে দেন দেবমণ্ডলী নির্মাণ করে; জীবনের সমস্ত বিপদ-বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যে তাঁদের শরণাপন্ন হবার যথাবিহিত উপায় নির্দেশ করে। সে-উপায় যজ্ঞ। কেমন করে করতে হবে সে-বিষয়েও তাঁরা বিস্তারিত নির্দেশ দেন। কিন্তু সমস্ত বোধের ও বিশ্বাসের জগৎটি নির্মিত হয় কার্যকারণ পরম্পরাকে পরিহার করে। যতক্ষণ এইসব নিয়ে জীবনের অবাঞ্ছিত অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ বাস্তবে এবং/বা কল্পনায় নিস্তার পায়, ততক্ষণ সবই ঠিকঠাক চলে। কিন্তু যখনই কারও মনে প্রশ্ন আসে, দেবতারা যে আছেন তার প্রমাণ কী? যজ্ঞে যে ইষ্টফল পাওয়া যায় তা যখন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলছে না তখন তারই বা প্রমাণ কী? যজ্ঞ যে প্রণালীতে অনুষ্ঠিত হয় সেটা যে যথার্থ, অর্থাৎ দেবতাদের প্রীতিজনক, তার প্রমাণ কোথায়? এই অবস্থায় মানুষ না জেনে খোঁজ করে কার্যকারণ সম্পর্কের, এবং এইটিকেই পৃথিবীর সর্বত্রই চিরদিনই অত্যন্ত আপত্তিজনক এবং সমাজের পক্ষে নাশকতামূলক আচরণ বলে মনে করা হয়েছে।

যজ্ঞ এবং বিশ্বাসের আকল্পের অনুপুঙ্খ নিয়ে সন্দেহ থেকে আরম্ভ করে সমস্ত বিশ্বাসের মূলতত্ত্বটি সম্পর্কে সংশয় জাগলে তা নাস্তিক্য বলেই অভিহিত হয়। সংশয়, অজ্ঞেয়বাদ ও নাস্তিক্য একই অভিজ্ঞতার বিভিন্ন মাত্রা ও স্তরে বিন্যস্ত; চূড়ান্ত অবস্থানটি নাস্তিক্য, অর্থাৎ বিশ্বাসের সার্বিক অভাব। কিন্তু ‘যথার্থ ধর্মবিশ্বাসে… সর্বদাই একটি সন্দেহ সংশ্লিষ্ট থাকে।’ [Authentic religious faith… must always entail doubt. — McMillan Encyclopaedia of Religion. Doubt. p.425]। বিশ্বাসে যেমন সন্দেহ অন্তর্লীন থাকে, তেমনই সন্দেহের অন্তরেও একটি বিশ্বাস থাকে।’ কবি টেনিসন বলেন, ‘খাঁটি সন্দেহের মধ্যে অনেক বেশি বিশ্বাস থাকে।’ [There lives more faith in honest doubt. — In Memoriam., (১৩৫ নং স্তবক)] কী সেই বিশ্বাস? কার্যকারণ-পরম্পরা; আজ এখনও আমরা না বুঝতে পারলেও সেটা যে আছে এমন বিশ্বাস। সন্দেহ ও নাস্তিক্যের ভিত্তিভূমি মানুষের অবচেতনে এই প্রত্যয় যে, সংসারে নিষ্কারণ কিছুই ঘটে না, সবকিছুই কার্যকারণ পরম্পরায় গ্রথিত, তার কতক আমাদের জানা। কিছু-বা অজানা, কিন্তু সত্যকার আকস্মিক বলে কিছুই নেই। কোনও না কোনওদিন সেইসব কারণ জানা যাবে, যা এখনও মানুষের অজানা।

প্রশ্ন ও প্রগতি

এই প্রত্যয় সন্দেহের ভিত্তি বলেই পৃথিবীর জ্ঞানবিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণ। আপেল মাটিতে পড়ে কেন, এ প্রশ্ন নিউটনকে যদি বিচলিত না করত তাহলে মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব আবিষ্কৃতই হত না, জ্ঞানের জগতে অগ্রগতি প্রতিহত হত, ওই সূত্রে গ্রথিত আরও অনেক আবিষ্কার হতে পারত না। তেমনই, কে দেখেছে ইন্দ্রকে জন্মাতে? এ প্রশ্ন মানুষকে ভাবিয়েছে যে যেহেতু সব মানুষই একদিন জন্মায়, এবং অধিকাংশ দেবতাই যাস্কের মতে মনুষ্যাকৃতি, তাই ইন্দ্রেরও নিশ্চয়ই একদিন জন্ম হয়েছিল, কিন্তু কেউ তো তা দেখেনি, অতএব ইন্দ্রের জন্ম ব্যাপারটাই সংশয়াচ্ছন্ন এবং তার ফলে ইন্দ্রের অস্তিত্বও সংশয়াতীত নয়। নেম ভার্গব বলে : ইন্দ্র নেই। এই উক্তি খণ্ডন করতে একটি সূক্ত জুড়ে ধ্রুবপদ সৃষ্টি করতে হল, ‘স জনাস ইন্দ্রঃ’।  কিন্তু জনমানসে প্রশ্ন এবং নেম ভার্গবের ইন্দ্রকে অস্বীকার করা ঘোষণাটি রয়ে গেল। পুরনো বহু দেবতা, ভগ, পর্জন্য, ইলা, ভারতী, মার্তণ্ড, অর্যমা, দক্ষ, অংশ — এরা ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে গেল, নতুন অনেক দেবতা স্থান পেল দেবমণ্ডলীতে, দেবমণ্ডলীর বিবর্তন ঘটল, তা আর স্থাণু রইল না। তেমনই পূর্বতন বহু যজ্ঞে ফল হচ্ছিল না দেখে মানুষ সন্দেহ প্রকাশ করেছে, সরে এসেছে, কখনও-বা কোনও সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ে যোগ দিয়েছে কারণ সমাজের মূল ধারা তাদের চিহ্নিত করেছে নাস্তিক, বেদবিরোধী বলে। এই বিরোধ প্রকাশিত হয়েছে সন্দেহের রূপে, কখনও-বা আরও গভীর, ব্যাপক বা মৌলিক হলে, নাস্তিক্যের রূপে। এর ফলে চিন্তাশীল মানুষ নতুন নতুন চিন্তা করেছে, কখনও উত্তর পেয়েছে, তখন সমাজে জ্ঞানের জগতের পরিসর বেড়েছে। রাহুকেতুর গ্রাসে সূর্য-চন্দ্র-গ্রহণ মানুষ ততদিনই বিশ্বাস করেছে যতদিন তার চেয়ে সঙ্গততর কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেলেই জ্ঞান বেড়েছে, মানুষ পুরাতন কুসংস্কার ত্যাগ করে কার্যকারণ-পরম্পরার সন্ধান পেয়ে জ্ঞানের জগতের দিকচক্রবালকে প্রসারিত করেছে।

দেখা যাচ্ছে, জ্ঞানের বৃদ্ধির জন্যে, ঐতিহ্যবাহিত কুসংস্কারের পরিবর্তে কার্যকারণ-সম্বলিত যথার্থ তথ্য জানবার জন্যে প্রাথমিক প্রয়োজনই হল সন্দেহ, অস্বীকার করা, প্রচলিত ধারণার বিরোধিতা করা, শাস্ত্র-পুরোহিতের দেওয়া ব্যাখ্যাকে পরিহার করা, তাকে ভুল, অযথার্থ বলে ঘোষণা করা। এর পরে যদি কেউ সঙ্গততর, বেশি যুক্তিপূর্ণ কার্যকারণ-পরম্পরায় গ্রথিত কোনও সমাধান পেশ করেন যা সমাজপতিরা তাদের স্বার্থহানি না হলে স্বীকার করে; আর তাদের স্বার্থহানি হলে সরাসরি নাস্তিক, পাষণ্ড, পাপী বলে ব্যাখ্যাত ও প্রশ্নকর্তা দু’জনকেই শাপশাপান্ত করে। কিন্তু যখন সমাধান পাওয়া যায়, তখন সমাজ জ্ঞানের জগতে এক ধাপ এগিয়ে যায়। এটা সম্ভবত হত না যদি না প্রাথমিক স্তরে প্রশ্ন, সন্দেহ, বা নাস্তিক্য ঘোষিত হত। যজ্ঞ ও বেদ সম্বন্ধে সংশয় ঘোষিত হতে হতে জৈন, বৌদ্ধ, আজীবিক ও আরও বহু বেদবিরোধী প্রস্থান রচিত হয়েছে, ফলে জীবনজিজ্ঞাসা গভীরতর হয়েছে, দর্শন ও নীতি সমৃদ্ধ হয়েছে। যজ্ঞকে অস্বীকার করে জন্ম নিয়েছে জন্মান্তরবাদ, মোক্ষ ও নির্বাণের কল্পনা, এতে সমাজের অগ্রগতি নিশ্চয়ই হয়নি বরং ক্ষতিই হয়েছে; কিন্তু পরম্পরাক্রমে লব্ধ বিশ্বাসের ছকটিকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করার এই চেষ্টার (justifying the ways of God to men) মধ্যে নতুন করে চিন্তা করতে হয়েছে মানুষকে, এবং বাণপ্রস্থ ও যতি দু’টি আশ্রমকে আশ্রমবর্গের অন্তর্গত করতে হয়েছে, এতে কিছুকালের জন্য অন্তত সামাজিক সংহতি রক্ষিত হয়েছে।

যাস্কের বহু ব্যুৎপত্তি ভুল। কিন্তু শব্দমাত্রেরই যে ব্যুৎপত্তি আছে এই বিশ্বাসই ব্যুৎপত্তিশাস্ত্রের সৃষ্টির মূলে এবং এরই বিশ্বাস এসেছে প্রশ্ন ও সন্দেহের মধ্যে দিয়ে, ‘তৎ কাবশ্বিনৌ’? তাহলে অশ্বিনরা কারা? উত্তরে যা বলা হল, তার সব-কটি বিকল্পই ব্যুৎপত্তি হিসেবে অগ্রাহ্য। কিন্তু দেবতাদের একটি বাস্তব পটভূমিকা আছে, এ বিশ্বাসের ওপরেই সব-কটি বিকল্প প্রতিষ্ঠিত, এবং এ উত্তর মিলত না যদি মূলে প্রশ্নটি না থাকত। সমস্ত বেদাঙ্গের সৃষ্টি ওই প্রশ্ন থেকে। (অথর্ববেদে যত উদ্ভিজ্জ ও খনিজ দিয়ে রোগ সারাবার কথা আছে তার সবই বিজ্ঞানসিদ্ধ নয়, কিন্তু অভিজ্ঞতায় পাওয়া কিছু জ্ঞানের সঙ্গে প্রশ্ন ও সন্দেহ থেকে উৎপন্ন অনুসন্ধিৎসা ওই সব আবিষ্কারের মূলে।) রোগই একটা প্রশ্ন, স্বাস্থ্য স্বাভাবিক, তার থেকে বিচ্যুতিই রোগ; তা কেন হবে এই প্রশ্নই ভেষজশাস্ত্র আবিষ্কারের মূলে। পৃথিবীতে এখনও অনেক জাতি আছে যারা মোটামুটি এক ধরনের চলনসই জীবনযাত্রার উপায় নির্ধারণ করে সেই অনুসারে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে, তার বাইরে তাদের উন্নতি হয়নি, কারণ তার বাইরে তারা প্রশ্নই করেনি।

যে-জাত যত বেশি তীব্র, দুরূহ, গভীর ও ব্যাপক প্রশ্ন করেছে, নিতান্ত হতদরিদ্র না হলে সে-জাত প্রশ্নোত্তরের কার্যকারণ পরম্পরা অবলম্বন করে তত বেশি এগোতে পেরেছে। আপ্তবাক্য মেনে নিয়ে স্তব্ধ নিস্তরঙ্গ সুখের বদ্ধ জলাশয়ে বাস করা যায়। অনেকে তা করেওছে। কিন্তু অন্য বিকল্পটি মানুষের মনুষ্যত্বের মর্যাদার পক্ষে বেশি গৌরবজনক।

পরিশেষে, মনে রাখা প্রয়োজন যে, ভারতীয় আর্যদের প্রথমতম রচনা ঋগ্বেদের প্রথম পর্যায় থেকেই এত সংশয়। একটি সজীব জনগোষ্ঠীই পারে, পদে পদে সংশয় বোধ করতে। এ কথা অনায়াসেই ধরে নেওয়া যায় যে, তদানীন্তন মানুষের মনে যত সন্দেহ এসেছিল তার সবই রক্ষিত হয়নি। হয়তো বহু প্রশ্ন সমাজপতিদের কাছে অত্যন্ত অস্বস্তিজনক ছিল বলে সেগুলিকে লুপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল, সে-কারণে চার্বাকের মতবাদ পূর্ণাঙ্গভাবে রক্ষিত হয়নি। চার্বাকের প্রভাব যে জনমানসে খুবই বিস্তৃত ছিল তার প্রমাণ, এ মতকে খণ্ডন না করে কোনও দর্শনপ্রস্থান-রচয়িতাই জলগ্রহণ করেননি। তা-ও চার্বাকমতের যেটুকু রক্ষিত হয়েছে তার মধ্যে শাস্ত্রসুলভ সংহতি নেই, শুধু সেইটুকুই চার্বাকের কৃতি হলে চার্বাকের জনপ্রিয়তা এত বাড়ত না এবং চিন্তাশীল মানুষ তাঁর অনুগামী হতেন না। তেমন মানুষ যে চার্বাকপন্থী হয়েছিলেন তার প্রমাণ হল, এ মতের খণ্ডনে এত গরজ, ঔৎসুক্য ও চিন্তাশ্রম। শুধু নির্বোধরা চার্বাকপন্থী হলে শাস্ত্রকাররা এত ভয় পেত না। বহু বুদ্ধিমান মানুষ তাঁর মতের অনুসরণ করেছিলেন বলেই তাঁর সম্বন্ধে এত আতঙ্ক। এবং চার্বাকের মত ধর্মের মূল ধরে টান দিয়েছিল, আত্মা পরলোক ঈশ্বর অস্বীকার করে। নাস্তিক্য সন্দেহের চূড়ান্ত অবস্থান। আনুষঙ্গিক বহু সন্দেহ ধীরে ধীরে এসে ঠেকে নাস্তিক্যে। নেম ভার্গবের ‘ইন্দ্র নেই’ বলা সেকালে নাস্তিক্য। নচিকেতা যখন বলে, ‘কেউ কেউ বলে মত্যুর পরে কিছুই থাকে না’ তখন সে সমাজে সঞ্চরমাণ নাস্তিক্যকেই প্রকাশ করে।

অত প্রাচীনকালে অত মৌলিক সংশয় ও নাস্তিক্য যে-জাতির মধ্যে উদগত হতে পেরেছিল, সে-জাতি নিসংশয়ে একটি অত্যন্ত সজীব, নিয়ত মননশীল জাতি, যারা প্রশ্ন সমস্যা-সংকুল চিন্তাজগতে আপস করতে অস্বীকার করেছিল। প্রচলিত মত ও পথে তাদের চিত্ত তৃপ্তি পায়নি, তাদের চাই ভূমা, কারণ তাদের ‘নাল্পে সুখমস্তি’। ঐতিহ্যধারায় প্রাপ্ত বিশ্বাস, শাস্ত্র ও আপ্তবাক্যকে আজ থেকে সওয়া তিন হাজার বছর আগে যে-ভারতীয়রা সন্দেহ করে জীবন সম্বন্ধে নানা মাত্রার, নানা যন্ত্রণাদীর্ণ জিজ্ঞাসাকে এত তীব্রভাবে উচ্চারণ করতে পেরেছেন, তাঁরা অবশ্যই নমস্য; কারণ তাঁরাই যুক্তিতর্কের সূত্রে নবতর সত্যের পথে এ জাতিকে রওনা করে দিতে পেরেছেন। তাঁদের সংশয় ও নাস্তিক্য আমাদের গর্বের বস্তু — এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। তাই নিয়েই এই লেখা।

[রচনাটি প্রথম প্রকাশিত হয় পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে ২০০০ সালে (পুনর্মুদ্রণ ২০০৯)। গাঙচিল থেকে খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত আমার প্রবন্ধসংগ্রহ-র জন্য যথাসম্ভব পরিমার্জন করার চেষ্টা  হয়েছে।]

সমাপ্ত

 

About Char Number Platform 598 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*