গাছবুড়ির গল্প

ধ্রুবজ্যোতি মুখার্জি

 

এলোমেলো দোকানদানি, সরু সরু পিচ ঢালা রাস্তা, অকারণে সিমেন্টের গার্ডওয়াল দিয়ে চৌবাচ্চা বানিয়ে ফেলা পুকুর, চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা থার্মোকলের থালা আর প্লাস্টিক ব্যাগ ইত্যাদি নিয়ে চন্দ্রকোনা এ রাজ্যের আর পাঁচটা গঞ্জশহরের থেকে আলাদা কিছু নয়। প্যাকেট পণ্য এখানেও উপচে পড়ছে দোকানে দোকানে, জমির দাম বাড়ছে এবেলা-ওবেলা, উন্নয়ন আসছে রথে চড়ে। আর, কে না জানে, উন্নয়নের রথ আসার জন্য রাস্তা চাই। যদিও চন্দ্রকোনাতে সাত নম্বর রাজ্য সড়ক এসে চার নম্বর রাজ্য সড়কে মিশেছে, কিন্তু নামে-দুই-আসলে-দেড় লেনের রাস্তা দিয়ে উন্নয়নের রথ আসতে পারে না। অতএব চার নম্বর সড়কটি চওড়া করার কাজ শুরু হয়েছে, চলছে অনেকদিন ধরেই। মহকুমা শহর ঘাটাল থেকে চন্দ্রকোনা অবধি রাস্তা বানানোর কাজ যখন প্রায় শেষ, তখন হঠাৎ বাধা।

উন্নয়নের চেনা ছক মেনেই সব এগোচ্ছিল। চার আর সাত নম্বর সড়ক যেখানে মিশছে সেই মোড়ে, একদম চাররাস্তার মাঝখানে এক বটগাছ বেয়াক্কেলের মতো দাঁড়িয়ে। তলায় শীতলার থান। গাছের দক্ষিণে শিবমন্দির। মাঝে গোটা কয়েক অস্থায়ী ফলের দোকান। শিব-শীতলা দুজনেই অন্তত দেড় শতাব্দী প্রাচীন, ব্যাপক জনপ্রিয়, নিয়মিত পূজা পেয়ে থাকেন, এবং তাঁদের সেবার জন্য দস্তুরমতো ট্রাস্টিবোর্ড আছে। রাস্তা চওড়া করতে গেলে উভয়কেই নিরাশ্রয় হতে হয়। ট্রাস্টিদের সাথে বেশ ক’ রাউন্ড আলোচনার পর অবশেষে ঠিক হল শিব-শীতলার জন্য অন্যত্র মন্দির গড়ে নেওয়া হবে। বর্তমানে যে দুই ‘মন্দির’ আছে, তা ভেঙে ফেলা হবে, যাকে বলে বৃহত্তর জনস্বার্থে। লক্ষ করুন, বটগাছটিকে এই সব আলোচনায় নেহাৎই দেবীর মন্দির বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। বিগ্রহ সরলেই গাছটি কাটা পড়বে, এটি ছিল স্বতঃসিদ্ধ। এটাই উন্নয়নের চেনা ছক। বহু শ’বছর বয়সী বটগাছটিকে নিয়ে আলাদা করে ভাবাই হল না। না ভাবলেন প্রশাসকরা, না শিব-শীতলার সেবায়েৎরা। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে গাছটি কাটার, থুড়ি, শীতলা মন্দির ভাঙার দিন-ক্ষণ ঠিক হয়ে গেল উন্নয়নের দাবি মেনে।


‎গাছ কিন্তু কাটা পড়ল না। আটকে গেল। স্থানীয় মানুষ আটকে দিলেন। এ পোড়া দেশে রাস্তা বানাবার স্বার্থে গাছ কাটা পড়বেই, প্রতিবাদ করে বিশেষ লাভ হয় বলে জানা নেই। কিন্তু চন্দ্রকোনার গাছবুড়ি টিকে গেলেন। হ্যাঁ, ভাঙা পড়ল শিবের মন্দির, গাছের তলায় তাঁর ‘থান’ থেকে বিদায় নিলেন শীতলাও, কিন্তু রাস্তার মাঝে দিব্যি দাঁড়িয়ে রইলেন শহরের সবচেয়ে পরিচিত ল্যান্ডমার্ক এবং প্রাচীনতমা বাসিন্দা গাছবুড়ি। দাঁড়িয়ে রইলেন তাঁর অজস্র ছানাপোনার ভালোবাসায় ভর করে।

কেমন করে এসব সম্ভব হল সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে চন্দ্রকোনা নিয়ে দু-এক কথা বলে নেওয়া যাক। এ হল শিব-শীতলার দেশ। চন্দ্রকোনা শহরের মহল্লাগুলির প্রতিটিরই নিজস্ব শিবের দালান এবং শীতলার থান আছে। লক্ষ করুন, শিবের দালান, কিন্তু শীতলার থান। লৌকিক দেবী গাছের তলাতেই থাকতে পছন্দ করেন। এই গাছগুলি বেশ প্রাচীন, এবং দেবীর সাথে তারাও শ্রদ্ধা-ভালোবাসার পাত্র। নিজেদের শিকড়ে, ঝুরিতে জড়িয়ে তারা দেবীকে আত্মীকৃত করেছে। এই শহরেই বৈষ্ণব সাধক প্রেমসখী গোস্বামীর সমাধিমন্দির জড়িয়ে ধরে বেঁচে আছে আর এক সুপ্রাচীন বট, গুরু নানক আর গুরু মর্দানা কবে পুরী থেকে ফেরার পথে নাকি মঞ্জী বেঁধেছিলেন আর একটি মহাবৃক্ষের নীচে। ইতিহাসের নানা টুকরোটাকরা, কিংবদন্তি, লোকশ্রুতি আসলে এইসব গাছেদের আর একরকম শিকড়, যা দিয়ে তারা অধিকার করে আছে মানুষী চেতনা। মাটি থেকে তাদের উপড়ে ফেলার আগে স্থানীয় মানুষের মন থেকে তাদের উপড়ে ফেলতে হবে, আর সেটা সহজ কাজ নয়। গাছবুড়ি এইসব ইতিহাস-লোককথা আশ্রয়ী গাছেদের মধ্যে অন্যতমা। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থানের কারণে সবাই তাকে চেনে, ভালোবাসে। তাই যখন গাছবুড়িকে কেটে ফেলা স্থির হয়ে গেল, অনেকে নড়েচড়ে বসল। মুখ শুকিয়ে গেল সবার, কিন্তু এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করার সাহস দেখাল কমবয়সীরাই। যেদিন কেটে ফেলার কথা তার আগের দিন বিকেলবেলায় গাছবুড়িকে বাঁচানোর আবেদন নিয়ে এক মিছিল বেরোল শহরে। শুরুতে মাত্র সত্তর-আশিজনের মিছিল গোটা শহর ঘুরে যখন গাছবুড়ির কোলে ফিরে এল তখন পাঁচশোর বেশি মানুষ তাতে পা মিলিয়েছেন। মিছিল থেকে সরকারি কর্তাদের উদ্দেশ্যে বার্তা দেওয়া হল– শহরের মানুষ গাছবুড়ির সাথে থাকবেন শেষ মুহূর্ত অবধি। প্রাচীনতমা নাগরিককে সবাই শ্রদ্ধার সাথে বিদায় জানাতে চায়, ক্ষমা চায় তাঁকে মেরে ফেলার জন্য।

পরের দিন আর গাছ কাটা হল না। তার পরের দিন বা পরের সপ্তাহেও না। মাসখানেক কেটে যাওয়ার পর আবার সরকারপক্ষ উদ্যোগী হলেন। ফের শুরু হল কথাবার্তা। জানা গেল শিবের মন্দির আর গাছবুড়ি দুইই সরকারি জায়গার ওপর। চার নম্বর সড়ক চওড়া করতে মন্দিরটি ভাঙার আশু প্রয়োজন নেই, কিন্তু সেক্ষেত্রে গাছবুড়িকে সরতেই হবে। অন্যদিকে, মন্দিরটি সরিয়ে নিলে রক্ষা পেতে পারে গাছটি। সেটিকে ঘিরে তৈরি হতে পারে ট্রাফিক আইল্যাণ্ড। হ্যাঁ, দেবীর থানও সরিয়ে নিতে হবে সুরক্ষার প্রয়োজনে, কিন্তু গাছটি থেকে যাবে। চন্দ্রকোনাবাসী এই দ্বিতীয় সমাধানটি মেনে নিলেন। তেসরা ফেব্রুয়ারি সরিয়ে নেওয়া হল শীতলাদেবীকে, তার ক’দিন পরেই শান্তিনাথ শিবের বিগ্রহ, আর ফেব্রুয়ারির আট তারিখে ভেঙে ফেলা হল শিবের মন্দিরটি। পরের দিন বনদপ্তরের লোকজন, পিডব্লুডি-র অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার, বিডিও এবং স্থানীয় মানুষজন সবাই উপস্থিত থেকে গাছবুড়ির অল্প কিছু ডালপালা ছেঁটে দেওয়া হয় শুধু। এবং এইভাবেই চন্দ্রকোনায় নিঃশব্দে ঘটে গেল এক ছোটখাটো বিপ্লব। উন্নয়নের নাটকে কোনওদিন চান্স না পাওয়া গাছেদের একজন হঠাৎ নামভূমিকায় উঠে এল।

মজার কথা, এরকম একটি দৃষ্টান্ত কিন্তু জনসমক্ষে এল না। উলটে তাই নিয়ে এক অলীক কুনাট্যের অবতারণা করা হল। আট তারিখে মন্দির ভাঙার পর কোনওভাবে কয়েকটা ছবি এবং ভিডিও কিছু রুদালিদের হাতে পড়ে যাদের কাজই হল ভাড়ায়, এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিনা ভাড়াতেই, কান্নাকাটি করা। এদের কেউ ডেভিড ম্যাককাচিয়নের নাম তুলে বাঙলার হারিয়ে যেতে বসা মন্দির স্থাপত্যের দুঃখে চোখের জল ফেলার ফাঁকে ব্যাপারটাকে ‘কালাপাহাড়ি’ তকমা এঁটে দিলেন, কেউ বা আবার সোজাসুজিই প্রশ্ন করে বসলেন এটা মসজিদ হলে ভাঙার দম হত কি না। মজার কথা, এরা কেউ কিন্তু ভাবলেন না মন্দির না ভাঙলে রাস্তাটা হত কোথায়! সবাই ধরে নিলেন এ ব্যাপারে স্থানীয় মানুষ কেউ কিচ্ছু জানে না, সবটাই একতরফা হয়েছে। আর এই ডামাডোলে গাছবুড়ির কথাটা চাপাই পড়ে গেল। চাপা পড়ে গেল এই সত্যিটাও যে গাছবুড়িকে বাঁচাতে চন্দ্রকোনার সব মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন– হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে। কোথায় নাটকের শেষে তার এনকোর পাওয়ার কথা, বদলে ফুটলাইটের আলো থেকেই বিলকুল গায়ব হয়ে গেল সে।

তা যাক। ফুটলাইটের দরকার গাছবুড়ির নেই। শুধু বেঁচে থাকুক সে অবিরল ধোঁয়া আর বিষ উগরানো মোটরগাড়ির স্রোতের মধ্যে এক দ্বীপ হয়ে, সব উন্নয়নের গল্প থেমে যাবার পরেও বেঁচে থাক। তারপর একদিন সে নিজের কাহিনী শোনাবে অনাগত কোনও প্রজন্মকে। আশা করি সেদিন তাকে ঘিরে দ্বিতীয়বার জন্মাবে চন্দ্রকোনা আর তার হারিয়ে যাওয়া তুচ্ছ মানুষজন।

About Char Number Platform 602 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*