হিংসার নেপথ্যে, অথবা, হিংসার ঊর্ধ্বে

সব্যসাচী দাস

 

“লেবার ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারত, আজ, পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে বেশি কর্মহীনের ধাত্রীভূমি। সর্বাঙ্গীন (ইনক্লুসিভ) বৃদ্ধি সূচকে আমাদের অবস্থান ষাট নম্বরে, আমাদের প্রতিবেশীদের থেকেও ঢের পেছনে।”

লিখতে বসলাম রানিগঞ্জ-আসানসোল নিয়ে! কিন্তু এসব কী?

আসল কথা। আজ্ঞে হ্যাঁ। এসব-ই হল আ-স-ল ক-থা। এটা বিশ্বাস করুন। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করুন। ভেতরে গেঁথে নিন একেবারে। ছেনি হাতুড়ি দিয়ে।

আগের একটা লেখায় বলেছিলাম, উগ্র হিন্দুত্ব, সাম্প্রদায়িকতা এগুলি হল বিজেপি-র মুখোশ। আর এই মুখোশটাও ঘৃণ্য, ন্যক্কারজনক। সেই কারণেই, দানবিকতায় কেউই খুব ইতরবিশেষ না হলেও, বিজেপি-ই দেশের সবচেয়ে বিপজ্জনক দল।

আসল মুখটারই একটা ছবি দিলাম ওপরে। এটাকেই চেনা দরকার ভালো করে। ঠিক যেমন কদিন আগে দেখেছিলাম ক্ষুধা সূচকে সেঞ্চুরি করার ছবি। এই ক্ষুধা, বেকারত্বের জ্বালায় জর্জর আমরা ভারতবাসী, যদি মুখ ভুলে মুখোশ নিয়েই মাতি, তবেই আসানসোল…

সেটাই চায় এরা!

ঠিক একটা রামনবমী লাগল বিজেপি-র এ রাজ্যে একটা দাঙ্গা বাধিয়ে তুলতে। আগের রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল করে যে সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল, অনুকূল পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে তাকে দাঙ্গায় নিয়ে যেতে লাগল মাত্র একটা বছর।

প্রশ্ন হল, এই অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য রাজ্য সরকার কতটা দায়ী? নাকি তারাও চায় এটাই?

আসছি। তার আগে এটা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে দেওয়া দরকার, এই দাঙ্গা বা সামগ্রিকভাবে রাজ্যে এই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি, এ একেবারেই বিজেপি এবং সংঘ পরিবারের দুষ্কর্মের ফসল। তৃণমূল প্রত্যক্ষভাবে বা সিপিএম পরোক্ষভাবে এতে ইন্ধনই জুগিয়েছে কেবল, মার্কসীয় পরিভাষায় এদের ভূমিকাকে বাহ্যিক শর্ত বলা যেতে পারে, কিন্তু আভ্যন্তরীণ ভিত্তি এক এবং একমাত্র বিজেপি।

হোয়াটস অ্যাপ এখন সবচেয়ে রোমহর্ষক জায়গা। সেদিন একটা মেসেজ আসল। একটু উদ্ধৃত করি:

‘…এইবার আসানসোল দাঙ্গার প্রসঙ্গে আসুন। দাঙ্গার মাস্টারমাইন্ড কে? তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলের নেতা এবং অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট ধর্মের লোক। দাঙ্গা হয়েছে কেন? মিছিল সংখ্যালঘু পাড়া দিয়ে যাচ্ছিল বলে।

নিজেকেই প্রশ্ন করুন পাঠক। আমি আপনি ছোটবেলা থেকেই পাড়ায় মহরমের মিছিল যেতে দেখতাম, অনেকে হয়তো প্রণাম ও করতাম। কোনোদিন কোনো গন্ডগোলের খবর শুনেছেন?? উল্টোটা হলে গন্ডগোল হবে কেন?…’ (বানান, বয়ান এবং ভাষা অপরিবর্তিত)

এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং সূক্ষ্ম প্রচারকৌশল। লেখক নিজেকে নাস্তিক দাবি করেছে, দাঙ্গাবাজদের ‘দলমতনির্বিশেষে’ শাস্তির দাবিও জানিয়েছে, কিন্তু লেখার মূল সুর ওইটে — ‘দাঙ্গার মাস্টারমাইন্ড একটি নির্দিষ্ট ধর্মের লোক’ এবং দাঙ্গা হয়েছে ‘মিছিল সংখ্যালঘু পাড়া দিয়ে যাচ্ছিল বলে’।

ঠিক যেমন বিজেপির এক রাজ্য নেতা, নাম মনে পড়ছে না, দেখলাম ঘরছাড়া হিন্দুদের দেখিয়ে দাবি করেছে, পশ্চিমবাংলায় ‘হিন্দু-পলায়ন’ শুরু হয়ে গেছে।

তা, মিছিলকে যে সংখ্যালঘু পাড়া দিয়ে যেতে হবে — সেটার মাস্টারমাইন্ড কে? সেই মিছিলে উত্তেজক স্লোগান দেওয়া হবে, তার মাস্টারমাইন্ড? রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল হবে, সেটা কে ঠিক করে দিল? কেন বিজেপি-র খোদ রাজ্য নেতৃত্বরাই প্রকাশ্যে তরোয়াল, ত্রিশূল হাতে মিছিলে হাঁটল? নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বাচ্চাদের হাতে অস্ত্র দিয়ে মিছিল করানো হল কেন? সর্বোপরি মিছিল হবে কেন রামনবমীতে, যে মিছিলের কিনা উত্তেজনা ছড়ানো ছাড়া আর কোনও অ্যাজেন্ডা নেই?

প্রশ্নগুলি বিজেপিকে করার নয়। কারণ ওদের কদর্য অ্যাজেন্ডা নিয়ে আমরা নিঃসন্দেহ।

বিজেপি-র জন্য, ওই যে হোয়াটস অ্যাপে যে পাঠাল মেসেজটি, তাকে ওই হোয়াটস অ্যাপেই ধরুন, ধরে জিজ্ঞেস করুন, ছোটবেলায় মহরমের মিছিল থেকে যদি স্লোগান উঠত, ‘সব হিন্দুদের শ্মশানে পাঠানো হবে’ তাহলেও প্রণাম ঠুকত নাকি? তারপর চোখে আঙুল দিয়ে বলে দিন এই জন্যই মহরম আর রামনবমীর অস্ত্র মিছিল এক নয়! সে বুঝবে না, কিন্তু যদি কোনও গ্রুপ হয়, গ্রুপেই এসব আসে বেশি, তবে অন্যদের এগুলিতে প্রভাবিত হওয়া কিছুটা ঠেকানো যাবে।

এইতো, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব, রাজস্থানে বিজেপি সরকারের পুলিশের গুলিতে বিক্ষোভরত দলিতেরা মারা গেলেন, এর আগেও মধ্যপ্রদেশে শিবরাজ সিং চৌহান সরকার বিক্ষোভরত কৃষকদের ওপর গুলি চালিয়েছে, তখন কিন্তু বলা হবে না যে হিন্দুরা বিপন্ন! মুখ আর মুখোশের তফাত বড় সুস্পষ্ট।

এই প্রশ্নগুলি রাজ্য সরকারের কাছে।

তৃণমূলের সবচেয়ে বড় সমস্যা এদের কোনও লোকদেখানো নীতি-আদর্শেরও বালাই নেই। ভোটসর্বস্বতা, সেই সূত্রে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ, যাকে ভাষান্তরে গিমিক বলা যেতে পারে, এবং চূড়ান্ত অরাজকতার দর্শন — এই দিয়েই তৃণমূলকে মোটের ওপর ব্যাখ্যা করে দেওয়া সম্ভব। সেই কারণেই বিজেপির উত্থানে আতঙ্কিত তৃণমূল তাদের রোধ করার কোনও ব্যবস্থা নেয় না, বিজেপির পালটা নিজেরাও রামনবমী পালনে নেমে পড়ে। পাছে হিন্দু ভোট সব ওদিকে চলে যায়! সেই কারণেই মিছিলে অস্ত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করেও রামনবমীর দুদিন আগে পুরনো মিছিলগুলির ওপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে নেয় রাজ্য সরকার। সেই কারণেই বিজেপি নেতারা দিব্যি অস্ত্র নিয়ে হেঁটেও, বা রামনবমীর দুদিন আগে প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে বিজেপি-র রাজ্য সভাপতি ‘অস্ত্র মিছিল হবেই, প্রশাসন বাধা দিতে এলে ঝামেলা হবে’ বলেও বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সরকারি দল মনোনিবেশ করে কীভাবে পঞ্চায়েত ভোটে বিরোধীদের মনোনয়ন দিতে না দেওয়া যায় তার ওপর!

এহেন সরকারের প্রশাসন দাঙ্গা দমনে আর কত সচেষ্ট হবে!

সিপিএমের কথা বলছিলাম। এখানেও সেই, কথাটা বলতে বলতে নিজেরই এখন কিছুটা বিরক্ত লাগছে, মুখ ও মুখোশ। ওদের অসুবিধেই হয়তো, কিন্তু জনগণের জন্য সুবিধে ছিল যে সিপিএমের একটা মার্কসবাদী মুখোশ রয়েছে। ফলে খুল্লম খুল্লা সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করা ওদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু সিপিএম, যাকে বলে কৌশলী সাম্প্রদায়িক। স্মর্তব্য, এলাকার ধর্মীয় গরিষ্ঠতা মেপে সেই ধর্মের প্রার্থী নির্বাচন। স্মর্তব্য, ভালুক শেখ। স্মর্তব্য, সুভাষ চক্রবর্তী। স্মর্তব্য, তসলিমা নাসরিন। স্মর্তব্য, এমনকি বিমান বোসেরও গিয়ে মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে হত্যে দেওয়া। ফল? রাজ্যের আজকের পরিস্থিতি দেখে বলতে লজ্জা হয় যে আমরা চৌত্রিশ বছর ‘বাম’ শাসনে ছিলাম। যে সেই শাসনের অবসান হয়েছে মাত্র সাত বছর হল! এও তো অস্বীকার করার জায়গা নেই যে, বাংলায় বর্তমানে বিজেপির ভোটব্যাঙ্কের অধিকাংশই আগে সিপিএমের ভোটার ছিল।

সব মিলিয়ে, যা পরিস্থিতি, রাজ্যে আসানসোলের মতো ঘটনা আরও ঘটার সম্ভাবনা ক্রমশ জোরদার হচ্ছে। এখন দরকার মানুষকে এই ধর্মের আফিম থেকে বের করে এনে ওই যে আসল সত্যগুলি, যার একটি প্রথমেই বললাম, সেগুলি বেশি করে দেখানোর। নোটবন্দির ফলে যারা ভুগেছে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু। স্বাস্থ্য-শিক্ষা সহ সামাজিক ক্ষেত্রগুলিতে সরকারি বাজেট ক্রমশ কমছে এবং তারও ভুক্তভোগী জনতার বেশিটাই হিন্দু। ক্ষুধার্ত এ দেশে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুধার্ত মানুষের মধ্যে সংখ্যাগুরু হিন্দুরাই। নতুন লেবার ল, মেডিক্যাল বিল যেগুলি আসতে চলেছে সবই নির্লজ্জভাবে জনস্বার্থবিরোধী, এবং তাতেও ভুগবে হিন্দুরাই বেশি। আর এই ভয়ানক কর্মহীনতা, তার রোষ, হ্যাঁ হিন্দুদের ওপরই বেশি! ফলে, হিন্দু হোন যাই হোন, ধর্ম নিয়ে মেতে থাকার বিলাসিতা আমাদের মানায় না!

কে নেবে দায়িত্ব?

প্রায় অর্ধ শতাব্দীর সঞ্চিত মেদ ঝরিয়ে আমাদের সংসদীয় বামেরা কি পারবে এই বুনিয়াদী কাজে দাঁতে দাঁত চিপে লাগতে? উদাহরণ কিন্তু আছে হাতের কাছে। মহারাষ্ট্র।

আর অসংসদীয় বামপন্থীরা? এই দুঃসময়ে তাদের কথাও খুব মনে হয়…

 

About Char Number Platform 843 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*