সংঘর্ষবিরতি: এক চিলতে আশা

follow link সুজাত বুখারি

 

জম্মু ও কাশ্মীরের তথা দেশের এক অগ্রগণ্য সাংবাদিক ড. সুজাত বুখারি গত মাসে অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান। মৃত্যুর সামান্য কয়েকদিন আগে, রমজান মাস শুরু হওয়ার প্রাক্কালে, কেন্দ্র সরকার ঘোষিত সংঘর্ষবিরতি নিয়ে নীচের লেখাটি তাঁর নিজের কাগজ 'রাইজিং কাশ্মীর'-এ প্রকাশ পেয়েছিল। লেখাটি প্রকাশ হবার পর ঝিলমের বুক দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। রমজান মাস শেষ হওয়ার আগেই সুজাত খুন হয়েছেন, সংঘর্ষববিরতি তুলে নেওয়া হয়েছে, জম্মু ও কাশ্মীরেরর সরকারে পিডিপি-বিজেপি জোট ভেঙে দিয়ে রাজ্যপালের শাসন চালু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অজিত ডোভাক ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ-এর মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে মতপার্থক্য তুঙ্গে। এই পরিস্থিতিতে সুজাতে চূড়ান্ত আশাবাদী এই লেখাটি কোনও কোনও পাঠকের খানিক 'ডেটেড' মনে হতে পারে। কিন্তু লেখাটিকে আরেকবার তলিয়ে পড়লে বোঝা যাবে, লেখাটি সমস্যার সমাধানকে যে বোঝাপড়ার অভিমুখে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছে, একমাত্র সেই পথেই কাশ্মীর ও কাশ্মীরের মানুষের কল্যাণ হতে পারে। আসুন, লেখাটি পড়া যাক। এই লেখাটি দিয়েই আমরা তাঁকে স্মরণ করছি।

অনুবাদ : সাগরিকা শূর

রমজানের পবিত্র মাসের ঠিক দু’দিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহের কাছ থেকে একটি অপ্রত্যাশিত ঘোষণা শোনা গেল– তিনি তাঁর ট্যুইটার হ্যান্ডেলের মাধ্যমে জানালেন যে জম্মু-কাশ্মীরের সরকারি বাহিনীকে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। তাঁর কথা অনুযায়ী, এই ঘোষণাটির উদ্দেশ্য– যাতে এই উপবাসের মাসটা শান্তিপূর্ণভাবে পেরিয়ে যায় তা সুনিশ্চিত করা। অবশ্য এই সংঘর্ষবিরতি সার্বিক হলেও শর্তসাপেক্ষ কিনা তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা শুরু হয়ে গেছে। প্রসঙ্গত, সংঘর্ষবিরতি ঘোষিত হল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জম্মু কাশ্মীর সফরের মাত্র চার দিন আগে।

গত চার বছর ধরে কাশ্মীরে কঠোর শক্তি প্রয়োগের নীতি বজায় রাখার পর এই সিদ্ধান্ত একান্তই অপ্রত্যাশিত, যদিও গত ৯ই এপ্রিল সর্বদলীয় বৈঠকে সব প্রধান দলই সর্বসম্মতিক্রমে সংঘর্ষবিরতির পক্ষে রায় দিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এই ‘ছাড়’-এর জন্য দাবি জানিয়েছিলেন, যাতে রমজান ও আসন্ন অমরনাথ যাত্রা, দু’টোই শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। যদিও, যেভাবে তাঁর সহযোগী শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এর বিরোধিতা করে যাচ্ছিল, এমনকি প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তাতে এই বিরতি উপহার পাবার আশা খুব কমই ছিল। তাছাড়া পিডিপি ও বিজেপি দু’জনেই নিজেদের জোট-কর্মসূচি না মেনে আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট (আফস্পা) বা হুরিয়ত ও পাকিস্তানের সাথে কথা বলা প্রভৃতি বিভিন্ন ইস্যুতে পরস্পরের প্রতি খড়্গহস্ত হয়ে উঠছিল।

যাই হোক, বিভিন্ন মহল থেকে সন্দেহ ও এমনকি সরাসরি প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও এই ঘোষণা প্রতি মুহূর্তে হিংসায় বিধ্বস্ত হতে থাকা কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের কাছে এক আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। কাশ্মীরি উগ্রপন্থী যারা গত কয়েক বছর ধরে জঙ্গি শিবিরে যোগ দিচ্ছে, তাদের হত্যা এবং সেই ঘটনার সমান্তরাল ক্ষতি হিসেবে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের প্রাণহানি– এর মধ্যে কোনওটাই আর সহ্য করা যাচ্ছিল না। একাংশ মনে করছে যে যেভাবে আম কাশ্মীর ভারত রাষ্ট্রকে ক্রমাগত বাধা দিয়ে চলছে, তাতে এই সংগ্রাম এমন এক উচ্চতায় চলে গেছে যে সাধারণ মানুষ এক নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের দিকে তাকিয়ে কোনও কোনও মৃত্যুকে উদযাপন করতেও আর ইতস্তত করছে না। কিন্তু, সম্ভবত এই মতামত কাশ্মীরের সংখ্যাগুরু জনসাধারণের অবস্থান নয়। দিল্লিকে নিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষের অত্যন্ত খারাপ অভিজ্ঞতার পরেও, সংঘর্ষবিরতির এই সাম্প্রতিক ঘোষণাকে তারা সাগ্রহে গ্রহণ করবেন।

http://fisflug.is/?yrus=sugeremento-online-per-opzione-binarie-60-secondi&5b9=25 কট্টরপন্থাকে বিদায়

এই ঘোষণা শুধুমাত্র ২০০০-এর জুলাই-এ হিজবুল মুজাহিদিনের অস্ত্রবিরতির লঙ্ঘনের পর নভেম্বরে রমজানের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এ বি বাজপেয়ীর যুদ্ধ পরিস্থিতির স্থগিতাদেশের স্মৃতিই মনে করায় না, সাথে সাথে মোদীর আরোপিত কট্টরপন্থী পদক্ষেপকেও মনে করায়। মোদী যেহেতু কাল সারাদিনের সফরে আসছেন, সেই সূত্রে গতবছর উনি কাশ্মীরের যুবকদের যে দু’টি পথের কথা বলেছিলেন তা মনে পড়ল। “আমি কাশ্মীরের যুবকযুবতীদের বলব যে তাদের সামনে দু’টো রাস্তা খোলা আছে। একটা রাস্তা পর্যটন (ট্যুরিজম), অন্যটা সন্ত্রাস (টেররিজম)”। তিনি ৩রা এপ্রিল, ২০১৭-এ শ্রীনগর-জম্মু হাই-এর ওপর চেহ্নানি-নাসরি টানেল উদ্বোধনের সময় একথা বলেছিলেন।

বিজেপির তরফ থেকে লাগাতার বিরোধিতাই শুধু নয়, মন্ত্রীরাও জনমানসে আবেগের উৎসারকে ক্রমাগত নাকচ করে গেছেন। এই মনোভাব ২০১৬-র জুলাই-এ হিজব কমাণ্ডার বুরহান ওয়ানির হত্যার পর শুধুমাত্র কয়েকশো জঙ্গির প্রাণই নেয়নি, বরং আরও বেশিসংখ্যক কাশ্মীরি যুবকদের জঙ্গিশাখায় যোগদানের রাস্তা সহজ করে দিয়েছে। দক্ষিণ কাশ্মীরের ধীরে ধীরে জঙ্গিদের স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠা ও লাগাতার সেনা অভিযানে সেখানে অসংখ্য সাধারণ মানুষের প্রাণহানি; হিংসার এই সামাজিকীকরণ ও আকর্ষণ আরও বেশি সংখ্যক ছেলেদের জঙ্গি হতে উৎসাহিত করেছে। এই সংখ্যাটা ৭০ ছুঁয়েছে, সবচেয়ে উদ্বেগের ব্যাপার, ১লা এপ্রিলের হত্যালীলার (যেখানে ১৩ জন জঙ্গি ও ৪ জন সাধারণ মানুষ মারা গেছিলেন) পর থেকে এই সংখ্যাটা দ্বিগুণ হয়েছে। আধিকারিকদের মতে, ১লা এপ্রিলের পর ৩৫ জন যুবক ইতিমধ্যে জঙ্গিশাখায় যোগ দিয়েছে।

http://blossomjar.com/pacinity/2504 অসামরিক প্রাণক্ষয় এড়ানো

সংঘর্ষবিরতির ঘোষণা একটি পরিস্থিতির সাপেক্ষে দেখা উচিত। যুদ্ধক্ষেত্রে অসামরিক মৃত্যু এড়ানো আসলে একটা পরীক্ষা যাতে আমাদের সেনারা নিয়মিত ব্যর্থ হচ্ছে এবং নতুন দিল্লির পক্ষেও আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়মিত এর জবাবদিহি করাও যথেষ্ট কঠিন হয়ে পড়ছিল। জঙ্গিদের প্রতি জনগণের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে বোধহয় এই বিরতিই এই পরিস্থিতি মোকাবিলার একমাত্র রাস্তা ছিল। মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির কাছে এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসার পথটা খুব কঠিন মনে হচ্ছিল এবং কাশ্মীরে মূলধারার চিন্তাভাবনার জায়গার ক্রমসংকোচনও যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ ছিল যা কেন্দ্র একেবারেই হালকাভাবে নিতে চায়নি। বিজেপি ও কেন্দ্রের জোরালো আপত্তি সত্ত্বেও মুফতির জেদ জয়লাভ করে। দিল্লির এই অভিমুখে এগোনো ও এই পদ্ধতি থেকে পিছু হটার বাধ্যতা থাক বা না থাক, এই পদক্ষেপ আপাতত স্বস্তির পরিসরটুকু এনে দিল, বিশেষত এমন এক সময়ে যখন কাশ্মীরে প্রতিদিন একটা না একটা হত্যাকাণ্ড স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল।

জঙ্গি সংস্থা লস্কর-ই-তৈবা সংঘর্ষবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাখ্যান করে; হিজবুল মুজাহিদিনের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড জেহাদ কাউন্সিলও গতকাল একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। পাকিস্তান এ বিষয়ে এখনও কিছু বলেনি। যাই হোক, জয়েন্ট রেজিস্ট্যান্স লিডারশিপ (জেআরএল) নেতারা অর্থাৎ সৈয়দ আলি গিলানি, মিরওয়াজ উমর ফারুখ, ইয়াসিন মালিক প্রমুখ যথারীতি এর বিরোধিতার রাস্তা নিয়েছেন, এর বিপরীতে পাকাপাকি সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। এটা নিতান্ত বাগাড়ম্বর, এর পেছনে কোনও চিন্তাভাবনার ছাপ নেই, কুশলী মতবিনিময়ের চেষ্টাও নেই। এটা একদম সত্যি কথা যে নতুন দিল্লিকে আর বিশ্বাস করা যায় না, দীর্ঘদিন ধরে সে কৌশল করে শুধুমাত্র সময় নষ্টই করে এসেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হিংসার বৃত্তটা শুরু হয়েছিল সেনা অভিযান থেকে যা জনগণের ক্রোধ ও পরবর্তীকালে হত্যা ডেকে আনে। তাই এই ঘোষণা ক্রমঅগ্রসরমান একটা পদক্ষেপ হতে পারে যা শুধুমাত্র একটা স্থায়িত্বই এনে দেবে না, বরং বন্দিমুক্তি বা জনসুরক্ষা আইনের অপব্যবহারের মতো ইস্যুকেও আলোচনার পরিসরে নিয়ে আসবে। জনগণ ও তাঁদের আকাঙ্ক্ষার প্রতি জে আর এল-এর একটা দায়িত্ব আছে এবং তা তাদের যত্নসহকারে পালন করা উচিত, কিন্তু মূল লক্ষ্য এমন হওয়া উচিত যাতে করে মানুষের জীবন বাঁচানো যায়। তাদের এমন কোনও ফাঁদে পা দেওয়া উচিত হবে না যাতে মনে হয় যে হিংসার প্রতি তাদের কায়েমি স্বার্থ রয়েছে।

go পাকিস্তানের সংকেত

এই পদক্ষেপকে আলাদাভাবে বিচার করা উচিত হবে না। গত কয়েক মাসে ইসলামাবাদ, বিশেষত ওদের সেনাবিভাগ থেকে ইতিবাচক সংকেত এসেছে। ১৫ই এপ্রিল, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান কোমার বাজওয়া সমস্ত বিষয় সমাধানের জন্য ভারতের সাথে আলোচনায় বসার কথা বলেছেন। ৩রা মে, লন্ডনের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক রয়াল রিসার্চ ইউনাইটেড ইন্সটিটিউট (রুসি)-এর প্রকাশিত রিপোর্ট বলেছে যে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বেন গাজওয়াকে সাহায্য করছে এবং তারা জানিয়েছে যে “পাকিস্তানি সেনা ভারতের সাথে শান্তি ও আলাপ আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখতে চেয়েছিল।” তারা ইসলামাবাদের হাইকমিশনে মিলিটারি ডে প্যারেডের দিন ভারতের সেনা সংস্থাকে আমন্ত্রণের ঘটনা উল্লেখ করে। এটাও জানানো হয় যে এ বছর আগস্টে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এস সি ও)-এর অধীনে পাকিস্তান, ভারত ও অন্য আঞ্চলিক দেশগুলির সাথে যৌথ সেনা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে। পারস্পরিক আদানপ্রদানের এই আবহে সর্বশেষ ঘটনাটি হল পাবলিক রিলেশানস (আই এস পি আর) ডিরেক্টরেটে ইন্টার সার্ভিসেস-এর ডিরেক্টর জেনারেল মেজর জেনারেল আসিফ গাফুরের সাথে কিছু ভারতীয় সাংবাদিকের কথোপকথন যেখানে তিনি জানান যে (পাকিস্তানি) সেনা ভারতীয়দের সাথে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। পাকিস্তানি সেনা অতিথি সাংবাদিকদের ওয়াজিরিস্তানেও যাওয়ার অনুমতি দেয়। যদি প্রাপ্ত নথিকে বিশ্বাস করতে হয়, তবে বলা যেতে পারে দুই দেশের মধ্যের বেসরকারি মাধ্যমগুলি ইতিমধ্যেই চালু হয়ে গেছে এবং বার্তাবিনিময় চলছে।

এই সবক’টি যোগসূত্রকে একসাথে গাঁথা যাক বা না যাক, দু’ তরফেই শান্তি ও বোঝাপড়ার ক্ষেত্র যে প্রস্তুত হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে। যেহেতু পাকিস্তান এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, নতুন দিল্লিকেও এই সাংকেতিক ইঙ্গিতের বাইরে বেরোতে হবে এবং রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কথা বলা শুরু হবে। তবেই একমাত্র এই পদক্ষেপ অতীতের ব্যর্থ সংঘর্ষবিরতিগুলিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারবে।

About Char Number Platform 602 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*