হাত

কৌশিক দত্ত

 

হেমন্তরাত শিরশির, এ সময়ে ঝরে যেতে হয়। শরৎ অবসৃত। বসন্ত, সে তো শীতের ওপারে। মধ্যরাত উত্তীর্ণ। এমনকি পেঁচাদের ডাকাডাকি শেষ। প্রজ্ঞাবান পাতারা এই সময় নিজেদের খসিয়ে দেন। শীতের পেয়াদা এসে হলুদ সমন দরজায় সেঁটে দেবার আগে সসম্মানে চলে যাওয়া ভালো। সোমনাথ পা বাড়ায়। নিজস্ব রাতের দিকে এগোয়।

পাঁচ মিনিট দূরে স্টেশন। সেখানে যায় না। খানিক দক্ষিণে দীঘলপোতা খালের ওপর যেখানে লোহার রেলব্রিজ, সেদিকে এগোয়। ওদিকটায় স্টেশনের চেয়েও বেশি রাত এখন, অন্যরকম রাত। স্টেশন আর সংলগ্ন বাজারে রাত ফ্যাকাসে, অ্যানিমিক। ব্যস্ত অথবা ক্লান্ত পদচারণ, কথাবার্তা, মালপত্তর বাঁধাছাঁদা, তোড়জোড়, পাহারায় জ্বলে থাকা হলুদ সাদা বাতি, সারাদিনের পরিশ্রমের ফেলে যাওয়া গরম আর স্বেদ রাতকে নিশুতি হতে দেয় না। সেখানে রাতের ঘুম আসে না। নিরিবিলি খুঁজতে রাত সরে আসে বাজার ছেড়ে, স্টেশন ছেড়ে, কাছারিপাড়া রোড ছেড়ে, লোকালয় ছেড়ে খালের ধারে। রেল ব্রিজের পুব দিকে খালের পাড় জুড়ে হিজল গাছের কলোনি। এই ছোট মহকুমা শহরের প্রায় চল্লিশ শতাংশ বাসিন্দার মতো তারাও বোধহয় উদ্বাস্তু। অন্য কোনও দেশের অতীত ছিঁড়ে এখানে এসে ঘেঁষাঘেষি করে বসত জমিয়েছে বেঁধে বেঁধে থাকার প্রতিজ্ঞা নিয়ে। নইলে এমন জায়গায় এক গোত্রের এতজন বৃক্ষের সহাবস্থানের হেতুই বা কী?

গাছেদের তটভূমি বেয়ে ব্রিজমুখী উজান হাঁটে সোমনাথ। পায়ে পায়ে উঠে দাঁড়ায় সংকীর্ণ লৌহ পরিসরে। এখান থেকে খালটিকে দেখাচ্ছে জীবনের মতো, দীর্ঘ ও অবিচ্ছিন্ন। খালটিকে দেখাচ্ছে সোমনাথের জীবনের মতো, ক্লান্ত, নিস্তরঙ্গ, মলিন। অপ্রবাহে, ঘূর্ণিহীনতায় শরীরে ক্লেদ মেখে সে শুয়ে আছে রেলব্রিজের নীচে। উপরে দাঁড়িয়ে সোমনাথের মনে হল, খাল নয়, পঞ্চমীর মৃদু চন্দ্রালোকে সুদীর্ঘ আছড়ে পড়েছে তারই ছায়া। এখন সে অনায়াসে মিশে যেতে পারে এই ছায়ায়, স্তব্ধতা থেকে স্তব্ধতাকে, অন্ধকার থেকে অন্ধকারকে, কেউ আলাদা করতে পারবে না। আর কিছুক্ষণ পরে এই লাইনে আসবে কর্ণফুলি এক্সপ্রেস। কাল সকালে কেউ আর এসব আঁধার খুঁজবে না। জীবন বেয়ে উঠতে উঠতে এতখানি ব্যক্তিগত হয়ে উঠতে পেরেছে সোমনাথ, যে তার অনুপস্থিতি কেউ টের পাবে না।

আদতে সাফল্যেই পৌঁছতে পেরেছে সোমনাথ। অভীষ্টেই। দীর্ঘ দৌড়, থামেনি সে। চড়াই-উৎরাই, থামেনি সে। কাটাছেঁড়া, ক্লান্তি, বিয়োগ ব্যথা তুচ্ছ করে সে ছুটেছে আড়াই দশক। তিলে তিলে শিখেছে নাবিক যাপন, পর্বতারোহণ। কোথায় কখন নোঙর ফেলতে হয়, কখন বদলাতে হয় বন্দর, কীভাবে এড়িয়ে যেতে হয় গড়িয়ে পড়া পাথর, কখন আঁকড়ে ধরতে হয় উপরে ওঠার রশি, পা রাখতে হয় পিছল পাথরের বদলে অন্য কারও পুঁতে রাখা লোহার গজালে, সব শিখেছে নিজ উদ্যমে। শিখেছে সার সত্য, তুষারঝড়ে হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীর খোঁজে যে অভিযাত্রী নেমে আসে, সে পারে না শিখর ছুঁতে। বেস ক্যাম্প থেকে ফিরে আসা আর শৃঙ্গে নিশান ওড়ানোর মাঝখানে শুয়ে থাকে মহাসাগর। কতিপয় বিজয়ী ছাড়া সকলেই পরাজিত, তারা সংখ্যামাত্র, নামগোত্রহীন, পরিচয়হীন। সোমনাথ শৃঙ্গ ছুঁয়েছিল। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে ছোটছোট শৃঙ্গ, সামর্থ্যের বিচারে উচ্চ শিখর তারা।

চূড়ায় বা চূড়ান্তে মানুষ একক। যাত্রাপথে কুড়িয়ে পাওয়া যাবতীয় পদ ও পদক, ঝিনুক, বেলে পাথর ও পোখরাজ, সবই ব্যক্তিগত। কাউকে কিছু দেবার থাকে না। ওঠা ফুরোলে বাকি থাকে শুধু নেমে আসা। স্বর্গারোহণ সমাপ্ত হতে যুধিষ্ঠির সহসা অনুধাবন করলেন, তিনি একাকী পাণ্ডব। সোমনাথ টের পেল ঋভুর সঙ্গে সৌমিতার বিয়ের খবর শুনে। সিঁড়ির হাতল চেপে ধরার সূচিমনস্কতার অবসরে অন্যমনে ধরে থাকা সব হাত খসে গেছে হাত থেকে। এখন পকেট ভর্তি নুড়ি-পাথর। কাউকে দেবার কিছু নেই, নেবার কেউ নেই। বয়স সাতচল্লিশ। পা অবসন্ন। আরোহণ শেষ। সামনের শৃঙ্গগুলি দুরূহ, সেখানে ওঠার স্বপ্ন বা সামর্থ্য ছিল না শুরুতেও। আগামী কেবলই উৎরাই।

সৌমিতার বিয়ে যেদিন হয়ে গেল, সেদিনই কোলকাতা থেকে বিরাজপুরের পৈতৃক বাড়িতে চলে এল সোমনাথ। কদিনের জন্য আসছে, কেন আসছে, কাউকে বলেনি। বাড়িটা মোটামুটি বাসযোগ্য আছে। বাবা আর চিরকুমার দাদা, দুজনেই খুব যত্ন নিতেন বাড়ির। বছর দেড়েক আগে দাদার মৃত্যুর পর থেকে ফাঁকা পড়ে থাকে, কিন্তু নিয়মিত ঝাড়মোছ হয়, যদিও দাদার শ্রাদ্ধের পর আর আসা হয়নি সোমনাথের। বাড়িটা বেচে দেয়নি, কারণ অর্থের প্রয়োজন হয়নি, সময়ও পায়নি এসব নিয়ে ভাবার। কৌস্তভ বুদ্ধি দিয়েছিল বাগানওয়ালা বাড়িটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে অনুষ্ঠান আর পিকনিকে ভাড়া দিতে। যদিও তাতে যা আয় হবে এই মফস্বলে, তা তেমন কিছু নয়, তবু ব্যবসায় যেকোনও মূলধনই বিনিয়োগযোগ্য, অলস পুঁজি জমিয়ে রাখার কোনও মানে হয় না। সেই প্রকল্পেও এগোনোর ফুরসৎ পায়নি সোমনাথ এতদিন। ব্যবসার কাজ দেখার জন্য এখন বোর্ড আছে, সোমনাথের পরিশ্রম ক্রমশ কমছে, তবু যেন সময় হয় না কোনওকিছুর। সৌমিতার জন্য সময় ছিল না, নদীর জন্য সময় হয় না, গাছের জন্য না, এমনকি নিজের কথা, সাফল্য-ব্যর্থতা-অর্থ-গরিমার বৃত্তের বাইরে দাঁড়ানো কোনও ব্যক্তি সোমনাথের কথা ভাবার সময়টুকু হয় না। কতদিন দেখা হয়নি নিজের সাথে!

বিরাজপুরে এসে শেষ অব্দি সময় পেল সোমনাথ। এখানে সে খুব কম আসতে পেরেছে গত কুড়ি বছরে, তাই লোকে তাকে তেমন চেনে না এখানে। অফিসের ফোনটা বন্ধ, ব্যক্তিগত নম্বরে কোম্পানির দু-একজন বিশিষ্ট ম্যানেজারের গুটিকয়েক ফোন ছাড়া সারাদিনে জ্বালাতন করার কেউ নেই। এই অপূর্ব অবসরে সোমনাথ দেখতে পেল, হেমন্ত এসে গেছে। কালীপূজা, ভ্রাতৃদ্বিতীয়া পেরোনো শরৎগন্ধহীন নিবিড় হেমন্ত এসে হাত ধরে তাকে নিয়ে যাচ্ছে পর্ণমোচী বিবর্ণ হলুদের দেশে, আদিম হিমের সারারাত ঝরে পড়ার অন্ধকারে। শিশিরের ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে সোমনাথ দেখল, তার পায়ের তলায় রেলব্রিজের লোহা, লোহার নীচে তার দীঘলপোতা ছায়া, সামনে কুয়াশা, পিছনে সময়, আর সময়ের আড়ালে কর্ণফুলি এক্সপ্রেস। আর বড়জোর আধ ঘণ্টা।

বহুযুগ পেরিয়ে আবার প্রতীক্ষা করার আধঘণ্টা ফুরসৎ পেল সোমনাথ। সেই কবে সৌমিতার জন্যে প্রতীক্ষা শিখেছিল! ক্রমশ ব্যস্ততা তার আপন হল, ক্ষমতা তার নিজস্ব হল… ক্রমশ ঘড়ি তার দখলে এল আর তাকে ছেড়ে একে একে চলে গেল প্রতীক্ষা, অবসর, সময় ও সৌমিতা। আরও কতজন, কত কিছু ছেড়ে গেছে, তেমনভাবে অনুভব করেনি সোমনাথ। যা এসেছে, যারা এসেছে, তাদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতে খেয়াল করেনি যে আসলে কেউ আসেনি ভেতরে। এই শেষ আধঘণ্টা আর কোনও কাজ না করে, এমনকি ভাবনা এড়িয়ে, বিশুদ্ধ প্রতীক্ষায় ফিরবে বলে সিদ্ধান্ত নিল সোমনাথ। পল… পল… পল… নির্বাসিতবাক বিসর্জিতচিন্তা এক মানুষ নিজেকে দেখতে পেল আদিগন্ত মাঝরাতের শরীর বেয়ে এপার থেকে ওপার অব্দি বয়ে যাবার এক অনন্ত রেললাইনের সাঁকোর ওপর দাঁড়ানো। এই লাইন ধরে সেও চলে যেতে পারে কর্ণফুলি এক্সপ্রেসের মতো, যদিও তার কোথাও যাবার নেই।

এই অন্ধকারে মিশে যাবার জন্য বস্তুত তার কোনও রেলগাড়ির প্রয়োজন নেই, যদিও সময় অভ্রান্ত এনে দেয় সেইসব ছাঁটাইয়ের চিঠি, ছুটন্ত চাকা ও লোহা। লৌহ নিমিত্ত মাত্র, প্রবাহ ক্ষণিকের… খালে ভেসে যাওয়া নয় কোনও মানুষের অন্তিম ঘটনা; সময়, অন্ধকার ও অপ্রবাহী অনন্তে মিশে যাওয়া ছাড়া আর কিছু চাইবার থাকতে পারে না গভীর রাতের মেল ট্রেনের কাছে। সেই ট্রেন আসার আগেই স্তব্ধতার হাত ধরে শিশির পেরিয়ে শীতের কাছে, রাত পেরিয়ে আকাশের দিকে পৌঁছতে চেষ্টা করছে সোমনাথ, এমন সময় হেমন্ত কাঁপিয়ে গিটার ও বাঁশি! জীবন ও মৃত্যুর সব মহান মুহূর্ত ধসিয়ে দেবার জন্যই যেন মানুষ আবিষ্কার করেছে সেলফোন।

ফোনটা বন্ধ করে বাড়িতে রেখে বেরোনো উচিত ছিল, কিন্তু অভ্যাস আর অন্যমনস্কতায় সে থেকে গেছে বক্ষলগ্ন। কে ফোন করল এখন? অফিসের কেউ? কী বলতে চায় এত রাতে? জরুরি সমস্যা কিছু? সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনি? কিছু জানার আগ্রহ বোধ করে না সোমনাথ। একসময়ের প্রিয় কিন্তু এই হেমন্তে বেমানান গানটাকে থামাবার জন্যই বাধ্য হয়ে পকেট থেকে ফোনটাকে টেনে বের করে সে। বুদ্ধিমান ফোনের ছয় ইঞ্চি ঝকঝকে স্ক্রিনের গা থেকে তার দিকে ভাসা ভাসা চোখ মেলে তাকায় যে হারানো সময়, তার মুখ দেখে বিস্মিত ও অপ্রস্তুত, সবুজ গোলকটিকে ছুঁয়ে ফেলে সোমনাথ। ফোন কথা বলে ওঠে, “হ্যালো! শুনছিস?”

অনির্বাণ! এতদিন পর! ঠিক এই সময়!

অনির্বাণ আসলে ঠিক সময়েই ডাকে, কিন্তু সাড়া দেওয়া হয় না। সময় না পেরোনো অব্দি মনে হয় কেন জ্বালাচ্ছে এখন, এই অসময়ে? আবার মনে হল। বছর চারেক আগে শেষ দেখা হয়েছিল, তাও বহুদিন পর। কথা নেই, যোগাযোগ নেই, তবু নম্বরটা মোছেনি সোমনাথ। অনেকদিন আগের একটা ছবি দিয়ে জমিয়ে রেখেছে এমনকি নতুন ফোনেও। বস্তুত এই অনেক আগের ছবির অনির্বাণকেই সে চিনত। বলা ভালো, ওই অনির্বাণ তাকে চিনত। একমাত্র সেই ওকে চিনতে পেরেছিল, তবু ছেড়ে যায়নি। সোমনাথ আর অনির্বাণ দুজনেই জানে, একেবারে ছেড়ে যাওয়া হয়ে উঠবে না কিছুতেই।

“শুনতে পাচ্ছিস? দেখা কর একবার।” সেলফোন কথা বলে অনির্বাণের গলায়। সোমনাথ সহসা উত্তর দিতে পারে না।

“কলেজের অবস্থা জানিস তো? ল্যাবে যন্ত্রপাতি নেই, হস্টেল বন্ধ হয়ে পড়ে আছে মেরামতির নামে, রিটায়ার্ড ফ্যাকাল্টির জায়গায় রিক্রুটমেন্ট নেই। ছেলেমেয়েরা ডেপুটেশন দিতে গেছিল। সাদা পোশাকের পুলিশ আর গুণ্ডা দিয়ে বেদম পিটিয়েছে। মৃণাল নামের একটা ছেলেকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ঘণ্টা পাঁচেক আটকে রেখেছিল। কিছু খাইয়েছিল বোধহয়, পরদিন অস্বাভাবিক আচরণ করছিল। ডাক্তার তো বলল স্টুপিফাইং এজেন্ট হতে পারে। তারপর থেকে ওরা অনশনে বসেছে, সাতজন। জানিস কিনা জানি না, খবরের কাগজে তো একটা শব্দও নেই। সাতদিন হয়ে গেল, জানিস? প্রিন্সিপাল কথাই বলছে না। এবার কিছু করা উচিত আমাদের, মানে প্রাক্তনীদের। হ্যালো, লাইনে আছিস?”

তেইশ বছর আগে পিলখানা বস্তিতে কাজ শুরু করার সময় ডেকেছিল অনির্বাণ। ডাকাই স্বাভাবিক ছিল তার পক্ষে। সোমনাথ সাড়া দেবে, এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল। বস্তুত ইনিয়েবিনিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার কাজটা প্রথমবার বেশ কঠিন হয়েছিল সোমনাথের পক্ষে। ততদিনে সোমনাথ ‘ভবিষ্যৎ’ দেখতে পেয়েছে, এই নতুন কথাটা অনির্বাণ বুঝে উঠতে পারেনি। অথচ আরো আগে বোঝা উচিত ছিল, যখন ইউনিভার্সিটি ইলেকশনের গণ্ডগোল আর সেক্রেটারি ঘেরাওয়ের জেরে ঝুটো অভিযোগ এনে তাকে আর তুষারকে তিনবার জিজ্ঞাসাবাদের পর দুই রাত লক আপে আটকে রাখল, অথচ সোমনাথকে প্রথমবারের পর আর ডাকলই না। সোমনাথ মুচলেকা দিয়ে গ্রেপ্তারি এড়িয়েছে আমেরিকা যাবে বলে, একথা তুষার, প্রত্যুষ, সবাই বলা সত্ত্বেও বিশ্বাস করতে চায়নি অনির্বাণ। এমনকি স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েও, সত্যিটাকে বিশ্বাস করার পরেও সে দেখল, অন্য মানুষ হয়ে যাওয়া ছোটবেলার বন্ধুটিকে সে কম ভালবাসতে পারছে না। যেন সে ধরে নিল, সাত সমুদ্র সরে যাওয়া বন্ধুটির ঝাপসা হতে থাকা অবয়বের দিকে বারবার হাত বাড়ানো তার বাল্য-কৈশোর-তারুণ্যের ঋণ শোধ। বারবার হাত নাড়ে, কুয়াশা ছেঁড়ে, ছায়া ছোঁয় অনির্বাণ। চার বছর পর আবার কর্ণফুলি এক্সপ্রেসের আগেই অঘ্রাণ রাতের রেল ব্রিজে পৌঁছে যায় সে। এখনো নিভে যায়নি তার উচ্চারণের স্বাভাবিকতা।

“শুনতে পাচ্ছিস তো? কথা বল।”

অন্তিম প্রতীক্ষার নিশ্চয়তা, স্তব্ধতার ঘোর কাটিয়ে এতক্ষণে “হ্যাঁ” বলে ফেলে সোমনাথ। যদি আরো আগে বলতে পারত! অনেক বছর আগে যদি বন্ধুকে বলতে পারত, “আমি পারছি না রে, ওরা খুব চাপ দিচ্ছে! পাসপোর্ট আটকে দেবে। এই কোর্সটা আমি করতে চাই, অনেক কষ্টে স্কলারশিপ জোগাড় হয়েছে। পুলিশের খাতায় একবার নাম উঠে গেলে সব শেষ।” অনির্বাণ কি বুঝত পাসপোর্ট, ভিসা, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দাম? সে কি বোঝে বস্তি আর চা বাগানের  বাইরে আর কিছু? এগোনো বোঝে? উন্নতি বোঝে আদৌ? মানুষ না এগোলে, সম্পদ সৃষ্টি না হলে উন্নয়নই বা হবে কী করে? মুঘল আমলের টেকনোলজি, চিকিৎসা বা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মানুষের পাশে গিয়ে ভালবাসার ন্যাকামি করে কী হবে? স্পষ্ট তর্ক করা হয়ে ওঠেনি, করলেও অনির্বাণ বুঝত না। এই বোঝা আর না বোঝার ক্রমবর্ধমান ব্যবধান দুজনকে নিয়ে গেছে দুই দিকে। সেই বোঝা আর না বোঝার বৈপরীত্য তেইশ বছর পর আবার দুজনকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে মাঝরাতের রেল লাইনে।

“শোন, আমি যাচ্ছি। আরো কয়েকজন আসবে। আমরা হয়ত অনশনে বসব ওদের সঙ্গে। পারলে একবার আসিস কাল-পরশু। তোদের মতো হেভি ওয়েট লোকজন এক ঘণ্টার জন্য এলেও কিছুটা মিডিয়া অ্যাটেনশন অন্তত পাবে বাচ্চাগুলো। একটু দেখিস ভাই। কী রে?”

“আমি… মানে আমি তো কাল অব্দি…”

“যেখানেই যাবি, যাবার আগে একবার ঘুরে যা কলেজ থেকে। অনেক জায়গায় তো গেলি, অনেক দূর তো গেলি। নাহয় একটা ফ্লাইট মিস করবি, দুদিন পরে যাবি। লোকসান হবে না রে। একবার আয়, দেখবি ভালো লাগবে নিজেকে আবার।”

অনির্বাণ এত সহজে ক্ষমা করে দেয় কী করে? এভাবে সুযোগ ছুঁড়ে দিয়ে যায় কেন বারবার? “ভালো লাগবে নিজেকে আবার!” আবার ভালো লাগবে? নিজেকে?

তবে কি সে ফিরতে পারে এখনো? এখান থেকেও? কী হবে ফিরে গেলে? সকলের নজরে পড়ে যাবে, যা ব্যবসার পক্ষে ক্ষতিকর? রাজনৈতিক শত্রুতায় গুটিয়ে যাবে তার এতদিন ধরে তৈরি করা বাজার? একবার ওদের সাথে হাত মেলালে যাপন করতে হবে অন্যরকম জীবন? মুচলেকার প্রতিশ্রুতি ভাঙা সোমনাথের ওপর ক্রুদ্ধ হবে সরকার? এই সবই হবে হয়ত। যদিও দল বদলেছে মসনদে, কিন্তু প্রজাদের লিখে দেওয়া দাসখত এক রাজা বুঝিয়ে দিয়ে যায় পরের রাজাকে, সোমনাথ জানে। রাজার নাম বা বংশপরিচয় বদলালেও রাজদণ্ড একই থাকে, সোমনাথ জানে। কিন্তু আজ যেন সমীহ জাগাতে পারছে না এইসব জ্ঞান। কী করবেন ক্রুদ্ধ রাজা? চাপ দেবেন সেই আগের রাজার মতো? টেনে বের করবেন পুরনো ইনকাম ট্যাক্সের ফাইল? গোপন ব্যবসায়িক নথি বা কথোপকথন? একা করে দেবেন? নিক্ষেপ করবেন মথুরার কারাগারে? ডাক পড়বে কোতোয়ালের? রক্তচক্ষু রাজা স্বয়ং লাফিয়ে উঠে ছুঁড়ে মারবেন বক্ষভেদী ভল্ল? কী শাস্তি দেবেন তিনি? ধ্বংস? মৃত্যু? রাত্রিচর রেলগাড়ির শীত-লাগা চাকার চেয়েও ভয়ানক কোনও অস্ত্র আছে কি তাঁর ভাণ্ডারে?

ফতু মামা উচ্চতাকে ভয় পেত। পেটে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর প্রথমবার পাহাড়ে গিয়েছিল, একেবারে আঠারো হাজার ফুট। যাবার আগের দিন বলেছিল, “যাই বুঝলি, শালা মরবই যখন!” সোমনাথ টের পেল, ট্রেনের প্রথম চাকাটি বুক ছোঁয়ার প্রাকমুহূর্ত অব্দি সে স্বাধীন। তখনো সে বিকল্প মৃত্যু বেছে নিতে পারে। শুধুমাত্র ভয় না পাবার দ্বারা সে মরে যাবার আগে বেঁচে নিতে পারে আরো কিছুক্ষণ। কর্ণফুলি এক্সপ্রেস মিনিট পাঁচেক দূরে। ব্রিজ থেকে নেমে আসে সোমনাথ।

দুদিন বাদে কলেজে পৌঁছে দেখে যেন তাদের সেই সকালবেলা উজ্জ্বল হয়ে আছে। সাতজন তরুণ-তরুণী বসে আছে উপবাসক্লিষ্ট যোগীর মতো। তাদের পাশে আরো কিছু স্বপ্ন ছোঁয়া মুখ। সহাস্য অনির্বাণ জড়িয়ে ধরে। “এলি তাহলে, শেষ পর্যন্ত!” অনেক কিছু ফিরে পাবার আনন্দ তার চোখে। সোমনাথ অবাক হয়ে কলেজ বাড়িটাকে দেখে। বুড়ো হয়ে গেছে থামগুলো। সন্তানকে জমিবাড়ি লিখে দেওয়া পরিত্যক্ত বৃদ্ধার লোলচর্মের মতো ঝুলে আছে ছাদের প্লাস্টার। চারদিকে ধোঁয়ারঙ পরাজিত প্রাচীনতার মধ্যে উজ্জ্বল কিছু মুখ… মানুষের মুখ, তারুণ্যের মুখ… সোমনাথদের হারানো সময়ের মত, তাদের আগের প্রজন্মের তারুণ্যের মতো, তার চেয়েও আগের, আরো আরো আগের অনন্ত মানুষের পৌরাণিক পবিত্রতার মতো সেইসব মুখ। অনীক নামের ছেলেটির গালে হালকা দাড়ি, ওজন বোধহয় পঁয়তাল্লিশ কেজির কাছাকাছি হবে। এই শরীর না খেয়ে জেগে আছে নয়দিন। তবু তার হাসিটুকু মরেনি। ছেলেটা ভয় পাচ্ছে না… পাসপোর্ট ভিসা আটকে দেওয়াকে নয়, অধ্যক্ষের অবজ্ঞাকে নয়, প্রতীক্ষারত লাঠিসোঁটাকে নয়, অনাহারে মৃত্যুকেও না। ছেলেটার চোখে সোমনাথদের ছেড়ে আসা তারুণ্য চিকচিক করছে। এক মানুষ বুড়ো হয়ে গেলে অন্য এক শিশু তরুণ হবে সরল শৈশবে আগুন ছুঁইয়ে, আর কিছুতেই বুড়ো হয়ে যেতে পারবে না এই প্রজাতি, হেরে যেতে পারবে না, কিছুতেই মাকড়সার ঝুলের শরীরে মিশে যেতে পারবে তার সত্তা। এমনই অপূর্ব নিয়তি মানুষের জন্য লিখেছে জীবন!

সোমনাথ অবাক হয়ে দেখে এদের। অনির্বাণকেও দেখে। অনির্বাণকে বেমানান লাগে না এদের দলে। বয়স ছোঁয়নি তাকে। অনির্বাণের পিছনে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সতরঞ্চির ওপর বসে আছে প্রত্যুষ। অন্তত কুড়ি বছর দেখা নেই, তবু চিনতে ভুল হয় না। প্রত্যুষ চোখাচুখি এড়িয়ে যায়। তার এড়িয়ে যাওয়া চোখ এড়ায় না সোমনাথের। দোষ দেওয়া যায় না তাকে, নজর তো ফিরিয়েছিল সোমনাথই আগে। চুল কমে গেছে প্রত্যুষের, শরীর একটু ভারি। সেই শরীরে, পাশ ফেরানো মুখের মধ্যে প্রত্যুষকে খোঁজে সোমনাথ। খুঁজতে খুঁজতে দেখতে পায়, প্রত্যুষের পিঠে ঠেকে থাকা দেওয়ালটা মুছে যাচ্ছে, দুহাজার আঠারো সালের নবীনচন্দ্র কলেজের ঝুপসি অ্যাডমিন্সট্রেটিভ ব্লকের দেশকাল ছাপিয়ে আড়াই দশক জুড়ে ওরা বিছিয়ে রেখেছে ফরাস। সামান্য চেষ্টা করেই সেই কালোত্তীর্ণ সতরঞ্চির উপর দেখতে পায় হিন্দোল, সৌরীশ, অনুরূপদের। প্রায় সবাই আছে। এতবড় গালিচায় শুধু নিজেকে খুঁজে পায় না সোমনাথ।

অথচ তারও থাকার কথা ছিল, অন্তত পিছনদিকে পুরনো ছবির মতো। নেই কেন? সোমনাথের কিছুটা কি পড়ে আছে অফিসের টেবিলে, খানিক লেপ্টে আছে সেন্সেক্সের গ্রাফের সাথে, কিছুটা বিবর্ণতায় ছাদের ঝুলের গায়ে? খানিক এদিক, খানিক ওদিক… ঈশান, বায়ু, অগ্নি, নৈর্ঋত মিলে উপড়ে নিয়ে গেছে সোমনাথকে? তাই সে কোথাও নেই, কোনও সমগ্রে নেই? টুকরো কাগজের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ছিন্নভিন্ন? অসহায়তায় অনির্বাণের হাত চেপে ধরে সোমনাথ, প্রাণপণে ফিরে আসতে চেষ্টা করে নিজের সত্তায়। অনির্বাণ তার হাত ধরে তাকে সতরঞ্চিতে বসায়। সেখানে বসে সে দেখতে পায় ছাদের পলেস্তারা ওঠা কালো থেকে চুঁইয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা সোমনাথ। পুরনো থাম বেয়ে দ্রুত নেমে আসছে পারদের মতো খানিক তরল সোমনাথ। গুঁড়ো গুঁড়ো সোমনাথ ভেসে আসছে বাস স্ট্যান্ডের দিক থেকে বয়ে আসা বাতাসে। সব সোমনাথ ধীরে ধীরে এসে জমা হয় অনির্বাণের পাশে বসা সোমনাথে। এতখানি সোমনাথ ফেরত পেয়ে দুঃসাহসী সোমনাথ হাত বাড়ায় প্রত্যুষের দিকে, “ভালো আছিস?”

সোমনাথ দেখতে পায়, তার বুকেও ওরা লাগিয়ে দিয়েছে ব্যাজ। ছাত্রছাত্রীদের আমরণ অনশনের পাশে প্রতীকী রিলে অনশনে বসেছে প্রাক্তন ছাত্রেরা। তাদের কেউ কেউ সুপ্রতিষ্ঠিত এতদিনে, যোগাযোগ ভালো। শহরতলির কলেজে তাদের অনশনে বসা মিডিয়ার নজর এড়ায় না। ক্যামেরা আসতে শুরু করে, কলম খাপ খোলে, বার্তা ছড়ায়। বারো ঘণ্টার প্রতীকী অনশন সেরে বাড়ি ফিরেও ঘুমোতে পারে না সোমনাথ। রাতে রুটি খেয়ে ফেলার জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হয়। এতদিন ভাবত, কার লড়াই কে লড়ে? প্রত্যেকের নিজস্ব সংগ্রাম আছে, সোমনাথ নিজেরটা লড়ছিল প্রাণপণ। লড়তে লড়তে, জিততে জিততে, সব জয় তার একার হয়ে যাচ্ছিল। সব গোপন পরাজয় তার একার। সব একাকীত্বও তার একারই। এতদিন পর আবার অন্য কারো লড়াইকে তার নিজের মনে হচ্ছে।

বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে একসময় দেখতে পায় জানালার কাচে ভোর এঁকে দিয়েছে কেউ। উঠে পড়ে। হেঁটে আসে খানিকটা। পার্কের বদলে রাস্তা ধরে হাঁটে আজ। ফিরে এসে অনেকখানি স্নান করে সোমনাথ, যেন শরীর থেকে পঁচিশ বছর ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসে দেখতে পায়, খবরের কাগজের সাতের পাতায় তার ছবি। অনশনে সোমনাথ মুখার্জি। টোস্টে কামড় দিতে পারে না আর। কয়েকটা ছেলে সত্যি না খেয়ে আছে, আজ দশম দিন, আর অনশনে ছবি তুলে সকালে নিশ্চিন্ত মাখন-রুটি নিয়ে বসেছে সোমনাথ! তার সারাজীবনের জমানো মিথ্যা সম্মানের পাহাড় আরেকটু উঁচু হল যেন। এবার সে পাউরুটিতে সামাজিক ফুটেজ মাখিয়ে খেতে পারে ক’দিন, যেমন মাঝেমাঝে খায়। আজ কেন পারছে না?

খাবার ফেলে উঠে পড়ে সোমনাথ। অফিসে ফোন করে বলে দেয়, আজ যাবে না। আবার ছোটে কলেজে। প্রিন্সিপালের কাছে কাল ডেপুটেশন দেওয়া হয়েছে। আজ একটা মিছিল হবার কথা। তার তদারকিতে লেগে যায়। সামাজিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে লোক ডাকতে শুরু করে।

প্রিয়ম নামের ছেলেটা অসুস্থ হয়ে পড়ল এবার। বাকিদেরও অবস্থা ভালো নয়। তবু ওরা অনশন ভাঙতে রাজি নয়। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে এরকম হয়। এই কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় যখন প্রায় পঁচিশ জন মিলে ঘিরে ধরেছিল তাকে, পিছনে বন্ধ গেট, পালাবার শেষ উপায়টুকু নেই, তখন মরিয়া এবং হিংস্র সোমনাথ গলার শিরা ফুলিয়ে স্লোগান দিতে আরম্ভ করেছিল। তারপর গরিলার মতো নিজের বুকের খাঁচায় দুমদাম কিল মেরে চিৎকার করেছিল, “মার দেখি শালা, কত দম!” তার সামান্য শরীরকে নয়, হিংস্র চোখের চ্যালেঞ্জকে ভয় পেয়ে গায়ে হাত তোলার আগেই থেমে গিয়েছিল উদ্যত পঁচিশ। সোমনাথ জানে, চারদিক বন্ধ করে লাঠি দিয়ে পেটালে বেড়াল বাঘ হয়ে ওঠে। বেড়ালের ভেতরে লুকোনও ছোটছোট বাঘেরা জেগে ওঠে তখন, ঝাঁপিয়ে পড়ে, টুটি ছিঁড়ে ফেলে, কিন্তু আসলে তারা শ্বাপদ নয়, কাউকে খেয়ে ফেলার লক্ষ্য ছিল না তাদের, প্রিয় ছিল নরম ভালোবাসাই। সহসা আগ্রাসী হয়ে ওঠা সেইসব প্রাণী, সেইসব মানুষ, আসলে স্রেফ বাঁচতে চায়। সোমনাথ বুঝতে পারে, এরা থামবে না, থামতে পারবে না আর। সম্ভবত মরে যাবে দুএকজন। যে কথা তারা সবাই বুঝতে পারছে, সেই সামান্য কথাটুকু কেন প্রশাসন বুঝতে পারছে না?

“আর রিলে নয়, প্রতীকী নয়, এবার আমাদেরও আমরণ অনশনে বসা উচিত। কলেজটা তো আমাদেরও ছিল, সুতরাং বসতেই পারি আমরা। এখন চাপ না বাড়ালে ছেলেমেয়েগুলো মরে যাবে।” প্রস্তাবটা সোমনাথই দিল।

পরদিন বিকেলে খবর পাওয়া গেল মহারাজা নবীনচন্দ্র কলেজের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারে পাঁচটা মিছিল বেরিয়েছে কোলকাতায়। কলেজ কমিটি আজ দুই দফা কথা বলেছে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে, কিন্তু কোনও কথা দেয়নি এখনো। এদিকে বিকেল থেকেই বমি শুরু হল আত্রেয়ী নামের মেয়েটির। জীবনে কখনো টানা এগারো দিন না খেয়ে থাকতে হয়নি এদের কাউকে। তবু হাসপাতালে যেতে রাজি নয় মেয়েটা। সন্ধে সাড়ে ছটা নাগাদ অজ্ঞান হয়ে গেল। হিরন্ময় অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছিল আগেই। সংজ্ঞাহীন মেয়েটাকে নিয়ে ওরা ছুটল বিটি রোড ধরে কোলকাতামুখো । কিছুক্ষণ পর খবর এল, প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। আজ রাতে বিশাল পুলিশ বাহিনী এসে জোর করে অনশন তুলে দেবে। নবারুণ সেই খবর ছড়িয়ে দিল তার বন্ধুদের কাছে। দেখাদেখি অন্যরাও। বাতাসের মুখে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ল খবর।

দশটা নাগাদ ওরা দেখতে পেল বেশ কিছু আলো এগিয়ে আসছে কলেজমুখো। টর্চ নিশ্চয়, পুলিশ আসছে। আপত্তি কিছু নেই। উঠে যেতে বললে ওঠা হবে না। জোর করে তুলে দিক, তুলে নিয়ে যাক, ফাটকে চালান দিক। তারপর দেখা যাবে। এই জবরদস্তিতে আন্দোলন যে থেমে যাবে না, বরং ছড়িয়ে পড়বে আরো, সেকথা এতক্ষণে বুঝে গেছে ওরা। পুলিশ বোঝেনি? শেষ পর্যন্ত বলপ্রয়োগেই ভরসা রাখবে তারা? কাছে আসছে আলোগুলো। ধীরেধীরে আসছে। আলোগুলো কাঁপছে। আলোর সাথে যে আওয়াজ আসছে, তা হুইসিলের নয়, হুমকির নয়, গানের মতো যেন। ক্রমশ কলেজের সামনে জড়ো হল শ’দুয়েক মোমবাতি। মোমবাতি হাতে মানুষ। অচেনা মানুষ, অথচ তাদের চেয়ে আপন কেউ নেই এখন। কার লড়াই কে লড়ে! কে যে কাকে হঠাৎ ছুঁয়ে দেয়! কে কখন কোথায় পেয়ে যায় আগুন! কে যে কখন ধরে ফেলে কার হাত, আর একটানে তাকে সরিয়ে নিয়ে আসে কর্ণফুলি এক্সপ্রেসের চাকার তলা থেকে!

সোমনাথ দেখতে পায়, তার কুঁকড়ে যাওয়া পৃথিবীকে, তার ব্যক্তিগত আঁধারকে, হন্যমান হেমন্তকে ঘিরে ফেলেছে অগুন্তি মোমবাতি। ব্রিজের ওপর থেকে নেমে আসছে অপরিচিত হাতেরা, মৃতবৎ শয়ান দীঘলপোতা খালের ছায়াশরীর থেকে তারা তুলে আনছে বিন্দু বিন্দু সোমনাথ। এক লক্ষ হাত একত্রে রুখে দিল মৃত্যুবাহী ট্রেন। ট্রেনের তলা থেকে যত্নে কুড়িয়ে নিল সোমনাথের চশমা, মেরুদণ্ড, আত্মা, ইত্যাদি যাকিছু হারিয়েছিল। ফের বেঁচে উঠে সোমনাথ দেখতে পেল, তাকে ঘিরে আছে মানুষ আর আলো। রাজার সান্ত্রী আর শীতের পেয়াদা ফিরে যাচ্ছে ব্যূহের দরজা থেকে। পরাস্ত রাজা মাথা ঠুকছেন দুর্গের প্রাচীরে।

সাতচল্লিশ বছর পেরিয়ে শীতমাখা অঘ্রান রাতে অপূর্ব নিরাপদ আর জীবন্ত বোধ করে সোমনাথ।

About Char Number Platform 844 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

20 Comments

  1. সস্তা লেখা। লেখকের আদৌ অন্য সমসাময়িক বা বরিষ্ঠ সাহিত্যিকদের লেখা পড়ার অভ্যাস নেই বোধহয়। ভাষা প্রাচীন এবং গদ্যসাহিত্যের অনুপযুক্ত। হাবিজাবি উপমা ঢুকিয়ে চটকদার কিছু করার চেষ্টা ছিল, কিন্তু কাহিনী অগোছালো এবং বক্তব্য কিছুই দাঁড়ায়নি। আগের লেখিকার গল্পটা পড়ার পর এটা আর নেওয়া যাচ্ছিল না।

    • সঠিক মূল্যায়ন। আমিও দেখছি মাসখানেক ধরে ইনি বিভিন্ন জায়গায় একই ছাত্র আন্দোলনের থিমে ঘ্যানঘ্যান করে যাচ্ছেন। সে নাহয় হল, কিন্তু কী লিখছেন, কী ফর্মে লিখছেন, উনি নিজেই জানেন না। প্রবন্ধগুলো গ্যাঁজাগল্পের মতো আর গল্পটা গেঁজিয়ে ওঠা পচা ভাতের মতো।

    • ধন্যবাদ। সঠিক সমালোচনা। অধিকন্তু গল্পের শেষদিকে তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট এবং চরিত্রগুলো অনেকটাই ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। সুসাহিত্যিকের হাতে পড়লে ট্রিটমেন্ট অন্যরকম হত। সমালোচনা মূল্যবান। সেখান থেকেই আমরা শিখি। সাহিত্য সৃষ্টি করছি ভেবে লিখি না, নেহাতই হাত মক্সো করার জন্য লিখি। তবে ভবিষ্যতে আর কোনো লেখায় হাত দেবার আগে খানিক পড়াশুনা করার চেষ্টা করব।

  2. ইয়ে আমার সামান্য সাহিত্য বোধ দিয়ে…কিছুটা বোঝা আর অনেকখানি না বোঝা সাহিত্য বোধ দিয়ে লেখাটা দিব্য লাগলো…আর ভাষা টাও বেশ খানিক ভালোলাগার অনুভূতি দিল !!

  3. কৌশিক খুবই শক্তিশালী গল্পকার।

    অনসূয়ার গল্পটা ভালো লাগেনি। হতেই পারে। সমালোচনাও স্বাগত, এবং কৌশিক তা স্বাগত জানিয়েওছেন। কিন্তু আরএম বাবুর বক্তব্যে যেন তার বেশি কিছু বা অন্য কিছুর প্রকাশ!!

    সেও ভালোই বোধহয়… তাই না, কৌশিক? 😀

    • গল্পটা ভালো লাগেনি একেবারেই। লেখক নিজেও স্বীকার করেছেন যে একেবারেই ফ্ল্যাট। গা বাঁচাতে তাড়াহুড়োর কথা বলেছেন। কিসের তাড়াহুড়ো জানি না। পুজো সংখ্যায় প্রচুর লেখেনটেখেন বোধহয়। আমি কখনো পড়িনি। নামও শুনিনি।

      খুবই শক্তিশালী গল্পকার শুনে খুবই মজা পেলাম। গল্পের শক্তি সম্বন্ধে আমার পড়াশুনার সঙ্গে মিলছে না। সাহিত্য পড়াই। প্রচুর পড়েছি। সবার সব লেখা সমান হয় না জানি, কিন্তু একটা ভাত টিপলে হাঁড়ির খবর বোঝা যায়। কাফকারও একটা গল্প একটু খারাপ হতে পারে, কিন্তু তার পরেও সেটা পাঠযোগ্য থাকবে। যে আদৌ লিখতে পারে, তার পক্ষে এতটা সাবস্ট্যান্ডার্ড লেখা সম্ভব নয়। ঠিক এর আগেই যে গল্পটা পড়লাম শতাব্দী ঘোষের পিগম্যালিয়ন, সেটা হল শক্তিশালী লেখা। উনি শক্তিশালী লেখক। ইনি নন। ওয়েব পত্রিকায় নতুনদের একটু দেওয়া ঠিক আছে, কিন্তু বাজে লেখককে শক্তিশালী বলে চালানোর চেষ্টা ঠিক নয়। মুড়িমুড়কি একদর করবেন না।

      • অনসূয়া, আপনি এত দুর্বীনিত কেন? আপনার সমালোচনা তো স্বাগত জানানোও হয়েছে। একটা চাল টিপে ভাতের খবর জানার মতো বাজে উপমা সাহিত্য শিক্ষকের কাছে আশা করিনি৷ কোনো সাহিত্যিকই সব সৃষ্টি সমমানের করেননি আজ পর্যন্ত। আর তুলনাই বা কেন করছেন বারবার দুজনের?মেনস্ট্রিম পুজোসংখ্যায় আপনি ভালো ভালো লেখা পান জেনে খুব খুশি হলাম৷ না, সেখানে এঁকে পাবেন না। আপনার প্রথম সমালোচনা স্বাগত ছিল। কিন্তু এবারেরটা খারাপ হল৷ আমরা যারা ওঁর লেখা পড়েছি তাঁরা জানি এটা ওঁর প্রথম সারির গল্পগুলির একটি নয়। কিন্তু আপনি কেন না পড়েই এত কনফিডেন্ট?বাই দ্য ওয়ে, শতাব্দী ঘোষ নয়৷ দাশ। আমিই সেই জন।

        • “না, সেখানে এঁকে পাবেন না।”

          ভাগ্যিস। সেখানে একে কে জায়গা দেবে? সেইজন্য ওগুলো লোকে পয়সা দিয়ে কেনে আর পড়ে। এসব ভুষিমাল ছাপলে ওগুলো মেনস্ট্রিম থাকত না।

        • সারনেম ভুল করার জন্য দু;খিত। আপনার লেখাটি আমার ভালো লেগেছিল, কিন্তু পাঠিকা হিসেবে রুচির মিল হল না। আপনার লেখা ছাড়াও আরো কিছু লেখা ভালো লেগেছিল। সেগুলোকে ভালো বলেছি। খারাপটাকে খারাপ বলা যদি দুর্বিনীত হয় তবে আপনি সাহিত্য সমালোচনা বিষয়টির নাম শোনেননি। সাহিত্যের ছাত্রীদের কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন। ওটা পাঠ্য বিষয়।

          সব লেখা একরকম হয় না আমিই বলেছিলাম। সেটা দেখেই তো আপনি লিখলেন। কাফকার কথাও বলেছিলাম। কম ভালো আর অতি বাজের মধ্যে পার্থক্য আছে। এটা পাতে দেবার যোগ্য নয়। আমি সম্পাদক হলে পাড়ার ওয়াল ম্যাগাজিনেও ছাপতাম না। ক্লাস সেভেনের ছেলেও এর থেকে ভালো লেখে।

    • রদ্দিশালী লেখক। বেশ লবিশালী দেখছি। বাজে লেখাকে বাজে লেখা বললেও এরা দল পাকিয়ে ঝগড়া করতে আসে। এরা নাকি সাহিত্য করবে?

  4. আমার তো ভালো লাগল। বেশ ভালো। ধন্যবাদ লেখককে।

  5. আমি কৌশিকের লেখা বহুদিন পাঠ করছি। আমার ওঁঁর লেখা থেকে অনেক প্রত্যাশা। ‘গুরুচণ্ডালী পত্রিকায় ‘কাঠগড়া’ ও ‘পারিবারিক’, ‘পরবাস’ পত্রিকায় একটি গল্প যার নাম মনে পড়ছেনা-আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এই গল্পটি সুন্দর ও সহজ৷ বড়জোর বলা যায় লেখকের নিজেরই সেট করা মান অনুযায়ী তাঁর প্রথম সারির লেখাগুলির একটি নয়। কিন্তু এত বিরূপতার কী হল, বুঝলাম না। আর হলই যদি, শুধু এই গল্পের সমালোচনা না হয়ে সমগ্র সাহিত্যসৃষ্টির সমালোচনা কীভাবে হয়ে গেল, যেখানে বক্তারা স্বীকারই করছেন যে তাঁরা পড়েননি?

    এঁঁর সাম্প্রতিক প্রবন্ধগুলি ছাত্র আন্দোলন নিয়ে আমাকে ভাবিয়েছে অন্য রকম ভাবে। আর উনি চিকিৎসক শুনেছি, তাই ‘একই থিমে ঘ্যানঘ্যান’ করবেনই ডাক্তারি ছাত্র আন্দোলন নিয়ে। তাতেও আপত্তি কেন বুঝলাম না।

  6. ওরে বাবা! এত কিছু। বারবার খবর পাচ্ছি আমার সমালোচনার উত্তর দিচ্ছে লেখকের বন্ধুরা। আবার ফিরে এসে দেখতে হচ্ছে। বাঙলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ ভেবে আতঙ্কিত হচ্ছি। একটা ফালতু লেখা আর লেখককে নিয়ে এত সময় নষ্ট করতে আর পারছি না।

  7. আপনার সাহিত্যবোধ যে অত্যন্ত উঁচুমানের, সে বিষয়ে এতক্ষণে বিলক্ষণ অবগত হয়েছি। এবং এই যে বুঝেছেন সময় নষ্ট করছেন, সেটাও ভাল লক্ষণ। বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃথা আতঙ্কিত হবেন না। সে এত ঠুনকো, পলকা কোনও নির্মাণ নয় যে, একটি গল্পের গুঁতোয় ভেঙে পড়বে। আপনি নিশ্চিন্তে নিজের কাজে যান। এবং অনুগ্রহ করে প্রমাণ করুন যে, আপনি আপনার নামের অর্থ সম্পর্কে অনবগত নন।
    ভাল থাকুন…

  8. এ এক উত্তরণের গল্প। নিজের মেরুদণ্ড ফিরে পাবার গল্প। বিষয়ের দিক থেকে হয়তো খুব নতুন কিছু নয়, অন্তর্গত সঙ্কট হয়তো একটু বেশি সহজেই নেগোশিয়েট করে ফেলল সোমনাথ। কিন্তু মোটেই খারাপ গল্প বলতে পারছি না এটিকে। ভালো লেগেছে, বেশ ভালো। লেখকের কাছে প্রত্যাশা বেড়ে গেল।

    কমেন্টগুলো দেখে আশ্চর্য হলাম। যারা সমালোচনা করলেন, তারা গল্পের বিষয়, শৈলী, বা বক্তব্য নিয়ে কোনও শব্দ খরচ করলেন না, শুধু গল্পটি ফ্ল্যাট বলে ততোধিক ফ্ল্যাট একটি কমেন্ট ছেড়ে গেলেন। গল্পটির চেয়েও গল্পের লেখকের প্রতি ব্যক্তিগত অসূয়াপ্রসূত মনে হচ্ছে এই মন্তব্যগুলি। আপনি কি কারো বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছেন, কৌশিকবাবু?

  9. “কবিতাগুলো স্লোগান হয়ে উঠছে বলে দুঃখ করেছ
    স্লোগানগুলো কবিতা হয়ে উঠছে না বলে দুঃখ করোনি
    আমার দুঃখ সেইখানেই।”

    গল্পটি পড়ে, এবং তৎপরবর্তী বহু মূল্যবান আলোচনাগুলি পড়ে অনসূয়াদেবী এটালদের চরণে সরোজ দত্তের এই চূর্ণ কবিতাটি নিবেদনের লোভ সম্বরণ করা গেল না…

  10. ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না। বহুদিন ধরে কৌশিক দত্ত আমার প্রিয় লেখক। গুরুচণ্ডালীতে ওর একটা গল্প পড়ে এই ভালো লাগার শুরু। ডার্ক হিউমারের সেটা একটা সেরা উদাহরণ ছিল। একটি মাত্র লেখা পড়ে লেখককে নস্যাৎ করা, তার পড়াশুনো কতটা বুঝে ফেলা নতুন সাহিত্য সমালোচনার ধারা হতে পারে। দীর্ঘদিন সাহিত্যের অধ্যাপনা করেও আমার সেটা রপ্ত হয়নি তাহলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*