আজ বসন্ত

উত্তম দত্ত

 

সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে আমি প্রথম দেখি ১৮ বছর বয়সে, রানিগঞ্জ শহরে, এক সর্বভারতীয় কবি-সম্মেলনে। মাথায় বাবুই পাখির বাসা। আশ্চর্য ধীর ও ললিত কণ্ঠস্বর। হাতে মাটির ভাঁড়ে দেশীয় সুরা। মঞ্চে দাঁড়িয়ে অলোকসামান্য সোনালি কণ্ঠে খুব ধীর লয়ে পাঠ করছিলেন : ‘ফুল ফুটুক, না ফুটুক, আজ বসন্ত’…

সেই প্রথম কোনও জীবন্ত কবিকে আমার সামনে থেকে দেখা। তারপর সময় গড়িয়ে গেছে তার নিজস্ব বিন্যাসে। আর সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে ক্রমশ বেড়েছে আমার কৌতূহল ও মুগ্ধতাবোধ।

তাঁর ভাবনা, লেখালেখি, ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন আমাকে আকৃষ্ট করেছে আজীবন। এখানে তারই কিছু স্মারক-অভিজ্ঞান তুলে ধরছি।

(এক)

সাহিত্য ও কমিউনিজম : দুই কবির দ্বন্দ্ব ও মৈত্রী

কবি কিটসের মতো বুদ্ধদেব বসুও মনে করতেন, রাজনৈতিক সংস্পর্শ একজন কবির পক্ষে প্রায় আত্মহননের মতোই ভয়ংকর। সময়টা তখন এতই উত্তাল ছিল যে, বাম এবং অবামপন্থী কবিরা স্পষ্টত দুই বিপরীত শিবিরে বসে পরস্পরের বিরুদ্ধে ভল্ল নিক্ষেপ করতেন।

১৯৪০-এর ফেব্রুয়ারি মাসে বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতাভবন’ থেকে প্রকাশিত হল এক তরুণ কবির প্রথম কবিতার বই — ‘পদাতিক’। মাত্র তেইশটি কবিতার সংকলন। উচ্ছ্বসিত বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথকে এই তরুণ কবির একেবারে তাজা কবিতার বইটির একটি কপি পাঠিয়ে দিয়ে লিখলেন :

‘এত অল্প বয়সে এতখানি শক্তির প্রকাশ আমার তো বিস্ময়কর মনে হয়।’ (পৌষ ১৩৪৭)

এই কবির অসামান্য ছন্দ-বোধ, ধ্বনির বিচ্ছুরিত আভা, ব্যঙ্গের চাতুরি, সম্পূর্ণ নিজস্ব নির্মাণ-রীতি বুদ্ধদেবকে বিপুল পরিমাণে মুগ্ধ করে :

‘কলাকৌশলে তাঁর দখল এতই অসামান্য যে কাব্যরচনায় তাঁর চেয়ে ঢের বেশি অভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরও এই ক্ষুদ্র বইখানায় শিক্ষণীয় বস্তু আছে বলে মনে করি।’

কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এই তরুণ বামপন্থীকে সতর্ক করে দিলেন :

এই কাব্যের কিছু কবিতা সরল ও চড়া গলার কবিতা। আর কিছু কবিতা জটিল বিন্যাসময় সংস্কৃতিবান। —

‘দুদিক বজায় রাখা চলবে না, একদিক ছাড়তে হবে। যদি তিনি বিশ্বাস করেন যে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করাই তাঁর কর্তব্য, তিনি তা করবেন মানুষ ও কর্মী হিসেবেই, কবি হিসেবে নয়। কিন্তু যখন এবং যতক্ষণ তিনি কবি, কবিতার উত্‍কর্ষই হবে তাঁর সাধনা। হয় তাঁকে কর্মী হতে হবে, নয়ত কবি। তিনি কোন্ দিক ছাড়বেন?’

(কালের পুতুল)

‘কবিতা’ পত্রিকায় তাঁর শেষ কবিতা প্রকাশিত হল ‘চীন’ (কার্তিক ১৩৪৯) — এর পর দৃশ্যত ব্যবধান বাড়ে। প্রিয় তরুণ কবি শ্রদ্ধেয় বুদ্ধদেবকে সচেতনভাবেই পরিহার করেন শুধু শিবিরগত পার্থক্যের কারণে :

‘আমি তখন লেখা ছেড়ে আস্তে আস্তে পার্টির কাজে ডুবছি। মাঝে মাঝে বুদ্ধদেব বসুর বাড়ি যাই। বেআইনি কাগজপত্র পড়াই, চাঁদা আদায় করি, বিবৃতিতে সই নিই। আমার নতুন পৃথিবী গড়ার সংকল্প তাঁর মধ্যে সংক্রামিত করতে পেরেছি মনে করে খুশি হয়ে ফিরে আসি। কিছুদিন পরে গিয়ে দেখি আমার সব ভস্মে ঘি ঢালা হয়েছে। …উল্টে আমাকেই কিনা বলেন, পার্টির খপ্পরে পড়ে লেখা নষ্ট করছি। সেই রাগে দীর্ঘদিন তাঁর মুখদর্শন করিনি।’

(শাপভ্রষ্ট দেবশিশু, ‘কলকাতা’, ৬৮-৬৯)

সেদিনকার সেই রাগী তরুণ পরবর্তীকালের প্রখ্যাত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ‘কবিতা’য় তিনি সুভাষচন্দ্র মুখোপাধ্যায় নামে লিখতেন।

সমসাময়িক অন্য এক বামপন্থী তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকেও অত্যন্ত ভালোবাসতেন বুদ্ধদেব। ‘জাত-কবি’ বলে প্রশংসাও করেছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁকে মৃদু তিরস্কার করে বলেছিলেন :

‘রাজনৈতিক পদ্য লিখে শক্তির অপচয় করছ তুমি; তোমার জন্য দুঃখ হয়।’

পার্টির প্রতি সুকান্তর নিবিড় আনুগত্যকে তিনি কটাক্ষ করে বলেছিলেন — ‘সুচিন্তিত দাসত্ব’। বলেছিলেন :

‘ধনিকের দ্বারা শ্রমিকের রক্ত শোষণ সুকান্তর রীতিমতো একটা ম্যানিয়া হয়ে উঠেছিল, চিত্তের একটা অসুস্থতা; সর্বত্রই সে যেন বিভীষিকা দেখছে, আর তা থেকে পালাতে গিয়ে বারবার ডুব দিচ্ছে ভাবালুতার পাতালে। …কোনও মতবাদের দাসত্ব স্বীকার করলে, শক্তিশালী কবিরও কী-রকম অপমৃত্যু ঘটে, তারই উদাহরণ সুকান্ত। …কবি হবার জন্যই জন্মেছিল সুকান্ত, কবি হতে পারার আগেই মরল সে। দ্বিগুণ দুঃখ হয় তার জন্য।’

তারপর ১৯৫৩ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে বসন্ত-উত্‍সবকে উপলক্ষ করে আয়োজিত হয়েছিল একটি সাহিত্যমেলা। দশ বছর পর সুভাষ ও বুদ্ধদেব এক মঞ্চে। রোমাঞ্চকর সেই স্মরণীয় সাক্ষাত্‍কারের প্রত্যক্ষদর্শী তরুণ কবি শঙ্খ ঘোষ তুলে ধরেছেন এক বিস্ফোরক দৃশ্যের বর্ণনা :

স্বাধীনতার পরবর্তী পাঁচ বছরে দুই বাংলায় কী লেখা হল, সেটাই ছিল সেদিনের আলোচনার মূল বিষয়। আজকের বিষয় ‘কবিতা’। বক্তা বুদ্ধদেব বসু, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, সুভাষ মুখোপাধায়…..।

কিন্তু বুদ্ধদেব জানালেন, কাল অনেক রাতে ফিরেছেন। শরীর মন ধ্বস্ত। মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন, কিন্তু কিছু বলবেন না। সবাই খুব দুঃখিত এই সংবাদে। ধূসর একটি চাদর জড়িয়ে অবিন্যস্ত চুলে, ক্লান্ত শিশুর মতো মুখ নিয়ে বসে রইলেন তিনি। মন দিয়ে  শুনছেন সুভাষের বক্তৃতা।

সুভাষ বলছিলেন কেবল সেইসব কবিদের কথা, যাঁরা কবিতায় তুলে এনেছেন দেশ আর সমাজের বাস্তব সংকট ও আর্তিকে, কবিতা যাঁদের কাছে ব্যক্তিগত আবেগের উত্‍সারণ মাত্র নয়।

কথা শেষ করে সুভাষ যখন নেমে যাচ্ছেন মঞ্চ থেকে সেই মুহূর্তে ‘ক্লান্ত’ ও ‘ধ্বস্ত’ বুদ্ধদেব ক্ষুব্ধ বাঘের মতো লাফিয়ে উঠে সবাইকে বিস্মিত করে সরাসরি ক্রুদ্ধ ও ব্যথার্ত স্বরে বলে উঠলেন :

‘সুভাষ যা বলে গেলেন, এই যদি হয় সত্যি সত্যি পাঁচ বছরের বাংলা কবিতার ছবি, তবে তার নিতান্তই দুর্দশা ঘটেছে বলতে হবে। কবিতা এক গাঢ়তর বোধের জগত্‍, ভাত-ভাত করে সরল চিত্‍কার করলেই সেটা কবিতা হয় না।’

সুভাষ তখন মঞ্চ থেকে নিচে নেমে গেছেন। বুদ্ধদেবের কথা শুনে ‘ন যযৌ ন তস্থৌ’-এর আধুনিক উদাহরণ হয়ে বিনীত ছাত্রের মতো তাকিযে থাকেন সেদিকে। কথা শেষ করে বুদ্ধদেব তাঁর দিকে তাকিয়ে চকিতে বললেন : সুভাষ, পরে দেখা কোরো আমার সঙ্গে, কথা আছে আরও।

সভার পরে দেখা গেল, এক রিক্সায় চলেছেন দুই কবি, বাম ও অবাম। প্রবীণ ও নবীন দুই যুযুধান তখন একাকার… চলেছেন পাশাপাশি কথা বলতে বলতে।

সেদিনকার সেই আশ্চর্য সুন্দর অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণা প্রসঙ্গে শঙ্খ ঘোষ তাঁর অননুকরণীয় ভাষায় লিখেছেন :

‘মতের ভিন্নতা তীব্রস্বরে জানিয়ে দিলেও যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সৌন্দর্য থেকে ভ্রষ্ট হয় না মানুষ, তার এই ছবিটি হয়ে রইল সাহিত্যমেলার এক বড় প্রাপ্তি, এরই তো নাম মিলন।’

(এখন সব অলীক)

(দুই)

কবির বিয়ে

১৯৪৮ সাল। ‘অগ্নিকোণ’ সবে প্রকাশিত হয়েছে। দীর্ঘ আট বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল, ‘পদাতিক’; যা পড়ে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, সম্ভবত ইনিই প্রথম বাঙালি কবি যিনি প্রেমের কবিতা দিয়ে কাব্যজীবন শুরু করলেন না, মানুষ ও রাজনীতির কবিতা দিয়েই যাত্রা শুরু করলেন।

১৯৪৮-এ কম্যুনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হল। বিনা বিচারে গ্রেপ্তার করা হল কবিকে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত কবি বন্দি রইলেন কারাগারে। মুক্তি পাবার পর প্রকাশিত হল ‘চিরকুট’। লেখা হয়েছিল আগেই। পার্টির নির্দেশে ‘পরিচয়’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নিলেন কবি।

সময়টা ১৯৫১। চালচুলোহীন কবি স্থির করলেন, বিয়ে করবেন। কিন্তু ধুতি পাঞ্জাবি কেনারও পয়সা নেই পকেটে। টোপর তো দূরের কথা। সস্ত্রীক শোবার মতো একটা খাটও নেই। জীবনের সেই করুণ-রঙিন মুহূর্তগুলিকে পরবর্তীকালে তিনি নিজেই রোমন্থন করেছেন তাঁর একটি আত্মজৈবনিক গদ্যে :

‘জেল থেকে বেরিয়ে সবে দুপুরে আধবেলার একটা নড়বড়ে চাকরি জুটিয়েছি। এক প্রকাশক প্রতিষ্ঠানে। বিকেলে বিয়ে। দুপুরে আপিস। রেজিস্ট্রি বিয়ে। তার আবার পাঁজি দেখাদেখি কী? না দেখার ফল হল এই যে, বিয়ের রাত পোহাতে না পোহাতেই চাকরিটা নট হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তা যাক, বিয়েটা তো বেঁচে গেছে।’

বিয়ের দিন বন্ধু রমাকৃষ্ণ একটা ডোরাকাটা শার্ট ধার দিয়েছিল। আর দেবীপ্রসাদ দিয়েছিল জলচুড়ি পাড়ের একটা ধুতি। ওই পরেই বিয়ে। সইসাবুদ হয়ে গেল। বন্ধুরা কেউ মিষ্টি, কেউ ফুল নিয়ে এসেছিল। তারপর দল বেঁধে কমলালয়ে গিয়ে চা খাওয়া হল। অবশেষে ঘরে ফেরা। কবি লিখেছেন সেই আশ্চর্য ঘরের কথা :

‘ঘর বলতে চিলেকোঠা। চারতলায় একটা চিঁড়ে-চ্যাপটা পায়রার খোপ। পেছনে এক চিলতে চাঁদ-সোহাগী ছাদ।’

সেখানেই সেই রাতে কবির এক শ্যালিকা উন্মুক্ত কণ্ঠে গেয়েছিল : প্রেমের জোয়ারে ভাসাব দোঁহারে…

পাশ ফেরা যায় না এমন একটা ছোট্ট জুনকে চৌকিতে নতুন বর-বধূ শুতে গেলেন। একটু পরেই ঘুম। পাশ ফেরার প্রয়োজনও হল না।

মাঝরাতে সিঁড়িতে শোনা গেল ভারি বুটের শব্দ। পুলিশ! শব্দ সোজা উঠে আসছে চারতলায়। বুকের মধ্যে ছাঁত করে উঠল। আবার ধরে নিয়ে যাবে!

কান খাড়া করে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বিছানায় বসে থাকেন কবি। দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ। আত্মসমর্পণ অনিবার্য ভেবে কবি দরজা খুললেন।

না, পুলিশ তো নয়! টেলিগ্রাম! এত রাতে টেলিগ্রাম! চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ঘোচাতে একটু সময় লাগল। বার্লিন থেকে কবির নববধূ গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিয়ের অভিনন্দন জানিয়ে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক নারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদিকা মারি ক্লোদ।

ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল কবির। সে রাতের অভিজ্ঞতা কখনও ভুলতে পারেননি তিনি।

অনাড়ম্বর সেই বিবাহের সজীব স্বাক্ষর রয়েছে তাঁর একটি অসামান্য কবিতায় —

‘কেউ দেয় নিকো উলু
কেউ বাজায় নি শাঁখ,
কিছু মুখ কিছু ফুল
দিয়েছিল পিছু ডাক।

পরনে ছিল না চেলি
গলায় দোলে নি হার :
মাটিতে রঙিন আশা
পেতেছিল সংসার।’

(ছাপ — যত দূরেই যাই)

এভাবেই কবিতা উঠে আসে আমাদের ব্যক্তিগত যাপনের অজস্র গোপন রক্ত-ক্ষরণ থেকে। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাও তার ব্যতিক্রম নয়।

বিয়ের পরেই তিনি সস্ত্রীক বজবজে চলে যান। মাসিক ২০ টাকায় একটি মাটির ঘর ভাড়া নেন। নিবিড়ভাবে আত্মনিয়োগ করেন চটকল শ্রমিক সংগঠনের কাজে। দুজনেই পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী। মজুর বস্তিতে থাকার সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই রচিত হয় — ‘সালেমনের মা’ (ফুল ফুটুক)।

(তিন)

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও তাঁর কবিতার প্রথম শ্রোতা 

একটি কবিতা লিখেই সমমনস্ক বন্ধু কিংবা প্রিয়জনকে শোনানোর অভ্যেস আমাদের অনেকেরই আছে। শ্রোতা হিসেবে তেমন কাউকেই আমরা বেছে নিই, যার মননে ও বোধের জগতে বহু কবিতার আলো প্রবেশ করেছে বহুকাল ধরে।

কবিতার ফর্ম ও কারুকৃতি সম্পর্কে যার নিবিড় ধারণা আছে, তার একটা প্রাথমিক মতামতের উপরে আমরা অনেকটাই নির্ভর করি। কিন্তু বিশ্বাস করবেন কি, যদি বলি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর বহু সুখ্যাত ও জনপ্রিয় কবিতা লিখে প্রথম শোনাতেন বাড়ির পরিচারিকা সুধাকে।

সুধাপিসি মূলত ও বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন। মেঝেতে উবু হয়ে বসে শুনেছেন কবির বহু সদ্যোরচিত কবিতা। এমন কি দেশ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় কবিতা পাঠানোর আগে তিনি শুনিয়েছেন ওই সুধাপিসিকে। স্ত্রী গীতা মুখোপাধ্যায়ও তাঁর অধিকাংশ কবিতার প্রথম শ্রোতা। গীতার অনুপস্থিতিতে সুধাপিসি অথবা বাড়ির অন্য কোনও কাজের লোক। ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত — সেই বিখ্যাত কবিতার প্রথম শ্রোতাও ছিলেন সুধাপিসি।

‘দেশ’ পত্রিকার জন্য লেখা আনতে কবির বাড়িতে গিয়ে সেদিনকার এক তরুণ কবি জয় গোস্বামী বিস্মিত হয়ে দেখেছিলেন :

‘সুধাপিসি সুভাষদার বাইরের ঘরের মেঝেতে উবু হয়ে বসে আছেন। …আর সুভাষদা ধীরে ধীরে, হাতে কাগজ ধরে কবিতাটা পড়ে সুধাপিসিকে শোনাচ্ছেন।’

গত শতাব্দীর আশির দশকের গোড়ার দিকে লোথার লুত্সে নামে এক জার্মান অধ্যাপক কলকাতায় এসে কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের সহায়তায় বহু কবি ও লেখকের সাক্ষাত্‍কার নিয়েছিলেন। সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত সম্পাদিত ‘কালপুরুষ’ পত্রিকায় সেসব নিয়মিত ছাপা হয়ে বেরোত। লোথার লুত্সেকে দেওয়া সেরকমই এক সাক্ষাত্‍কারে সুভাষ বলেছিলেন : ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক’ কবিতাটি লেখার পর তিনি ভেবেছিলেন, ওটা কিছুই হয়নি। তাই বাড়িতে যে রান্না করে তাঁকে শুনিয়ে মতামত চেয়েছিলেন। সুধাপিসি বলেছিলেন, ভালোই হয়েছে। তাই দিয়েও দিলেন কাগজে ছাপার জন্য।

একেবারেই সমাজের নিচুতলায় যাঁরা বসবাস করেন তাঁদের অসম্ভব সম্মান করতেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। গুরুত্ব দিতেন তাঁদের মতামতকে। চাষি মজুর ও অকিঞ্চিত্‍কর পেশায় সংলগ্ন মানুষদের মুখের ভাষাকে তিনি সরাসরি তুলে এনেছিলেন কবিতায়। ধোপাদের কাপড় কাচার শব্দের তাল ও লয় শুনে তিনি কবিতার ছন্দ শিখেছেন। এসব তথ্য অনেকেই জানেন। কিন্তু কবিতার অন্তর্নিহিত কারুকৃতি বিষয়ে, আধুনিক কবিতার নানা নিগূঢ় শৈলী সম্পর্কে যাঁদের কোনও ন্যূনতম ধারণা পর্যন্ত নেই, তাঁদের মর্মে কবিতার অন্তরের কথাগুলি কোনও স্পন্দন সৃষ্টি করতে পারছে কিনা সেটা দেখার জন্যই যেন তিনি বেছে নিতেন ওই নিরক্ষর সরল সহজ সুধাপিসির মতো মানুষদের।

১)

আমি ভীষণ ভালবাসতাম আমার মা-কে
— কখনও মুখ ফুটে বলি নি।
টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে
কখনও কখনও কিনে আনতাম কমলালেবু
— শুয়ে শুয়ে মা-র চোখ জলে ভ’রে উঠত
আমার ভালবাসার কথা
মা-কে কখনও আমি মুখ ফুটে বলতে পারি নি।
হে দেশ, হে আমার জননী —
কেমন ক’রে তোমাকে আমি বলি!…

২)

ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।
শান-বাঁধানো ফুটপাথে
পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ
কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে
হাসছে।
ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।
আলোর চোখে কালো ঠুলি পরিয়ে
তারপর খুলে —
মৃত্যুর কোলে মানুষকে শুইয়ে দিয়ে
তারপর তুলে —
যে দিনগুলো রাস্তা দিয়ে চলে গেছে
যেন না ফেরে।
গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলে
একটা দুটো পয়সা পেলে
যে হরবোলা ছেলেটা
কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত
— তাকে ডেকে নিয়ে গেছে দিনগুলো।
লাল কালিতে ছাপা হলদে চিঠির মত
আকাশটাকে মাথায় নিয়ে
এ-গলির এক কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে
রেলিঙে বুক চেপে ধ’রে
এই সব সাত-পাঁচ ভাবছিল —
ঠিক সেই সময়
চোখের মাথা খেয়ে গায়ে উড়ে এসে বসল
আ মরণ! পোড়ারমুখ লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি!
তারপর দড়াম করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ।
অন্ধকারে মুখ চাপা দিয়ে
দড়িপাকানো সেই গাছ
তখনও হাসছে।

৩)

জলায় এবার ভাল ধান হবে —
বলতে বলতে পুকুরে গা ধুয়ে
এ বাড়ির বউ এল আলো হাতে
সারাটা উঠোন জুড়ে
অন্ধকার নাচাতে নাচাতে।

দুর্বোধ্যতাবিলাসী আধুনিক কবিরা কী বলবেন এইসব সরল অথচ অমোঘভাবে মর্মস্পর্শী কবিতার সামনে দাঁড়িয়ে?

 

About Char Number Platform 844 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. পরমত সহিষ্ণুতার এই উদাহরণ(দুই বিপরীত মেরুর কবির একসাথে এক রিক্সায় যাওয়া) নিঃসন্দেহে অনুকরন যোগ্য ।

  2. ঠিক এইরকম লেখা পড়বার লোভেই বোধহয় অনলাইনে পড়ে থাকা। আদর্শের দ্বন্দ্ব (রাজনৈতিক) এবং ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠতা, স্নেহ মমতা, বুদ্ধদেব কর্তৃক নতুনদের অনুপ্রাণিত করা। আর সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কবিতায় জনমানুষের স্বর।

    ধন্যবাদ জানবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*