দেশ-ক্ষমতা-সত্য-সংলাপ-ধর্ম

সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়

 

Power exists only when it is put into action.
Michael Foucault
‘The Subject and Power’

The oppressed want at any cost to resemble the oppressor.
Paolo Freire
‘Pedagogy of the oppressed’

Truth is not born, nor is it to be found inside the head of an individual person, it is born between people collectively searching for truth in the process of their dialogic interaction.
Mikhail Bakhtin

না, কেবল বড় বড় কিছু নাম নিয়ে একখানা লেখা শুরু করব বলেই করছি তা নয়। এই কথাগুলো দিয়ে লিখতে শুরু করছি কারণ আসলে আমরা এমন একটা সময় দাঁড়িয়ে আছি যখন আমরা কথা বলছি ‘ক্ষমতা’ নিয়ে, ‘বাকস্বাধীনতা’ নিয়ে এবং ‘ধর্ম’ নিয়েও। ‘ধর্ম’ যা নাকি আমাদের পৌঁছে দেয় সত্যের পথে, যা নাকি ধারণ করে আমাদের। তাহলে ভেবে দেখতে হয়, ‘সত্য’ কী? ‘সত্য’ কি কোনও একখানে, কোনও এক গন্তব্যে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায়? নাকি ধর্ম এসে সত্যকে জন্ম দিতে পারছে কোনওভাবে? নাকি সত্য এক ধারণা মাত্র? বাখতিন অবশ্য বলছেন, সত্য কোনও ব্যক্তির মস্তিষ্কের মধ্যে জন্মায় না বা পাওয়া যায় না, সত্য জন্ম নেয় সমষ্টির সংলাপের মধ্যে, যে সমষ্টি একসঙ্গে সত্যের অনুসন্ধানে বেরিয়েছে। অর্থাৎ ধরে নিতে হয় যে সত্য অপরিবর্তিত নয়, কারণ সমষ্টিও তো আসলে বদলে বদলে যেতে পারে সময়ের সঙ্গে, অবস্থানের সঙ্গে আর তাই সেই সমষ্টির ব্যক্তিদের মধ্যে হওয়া সংলাপ সেও তো পরিবর্তনশীল। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই ‘সংলাপ’। অর্থাৎ মোনোলগের থেকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হল ডায়লগকে। সত্যকে জন্ম দিতে গেলে এই সংলাপের প্রয়োজন আছে। সুতরাং শুরুতেই বুঝে নেওয়া যাক যে যেকোনও অবস্থাতেই কোনও প্রেস্ক্রিপশন কোনও সত্যের জন্ম দিতে পারে না। তাই, যদি কোনও ধর্মও ‘প্রেস্ক্রাইব’ করে দিতে যায় কোনও সত্যকে, তাকে গ্রহণ করার হয়ত কোনও দায় আমাদের নেই কারণ ইতিমধ্যেই আমরা জেনে গেছি, যে সংলাপ চলতে থাকলে তবেই সত্য জন্ম নেবে এবং সংলাপ বদলালে, বদলাবে সত্যও।

এবার যদি ফিরে তাকাই ‘ক্ষমতা’র দিকে। তাহলে ‘ক্ষমতা’ নিয়ে কী বলছেন ফুকো? বলছেন ক্ষমতার অস্তিত্ব কেবল তখনই থাকে যখন তা কাজে প্রযুক্ত হয়। অর্থাৎ ক্ষমতাকে নানান কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে বারবার জানান দিয়ে যেতে হবে তার অস্তিত্ব, কারণ ‘সত্য’ তবু চুপচাপ বসে থাকতে পারে, নিজে নিজে বদলে যেতে পারে সংলাপের মধ্যে দিয়ে, কিন্তু ‘ক্ষমতা’র তো আর কোনও কাজ নেই, তাই তার অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে যদি না তাকে মনে রাখবার মতো কোনও কাণ্ডে সে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে পারে। যদিও এই ‘ক্ষমতা’কে ব্যবহার করে অনেক কিছুই করা সম্ভব, তবু ‘ক্ষমতা’র একটি প্রধান কাজ তো নিঃসন্দেহে শাসন করা, নিপীড়ন করা। আর তাই তাকে চলে যেতে হয় শাসকের হাতে আর কাজ করতে হয় নিপীড়িতর উপর। তাহলে এই যে প্রক্রিয়া যেখানে শাসক নিপীড়ন করছে ‘ক্ষমতা’কে ব্যবহার করে এবং ‘ক্ষমতা’র দ্বারাই তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারছে, এই প্রক্রিয়ার যাত্রাপথ কীরকম? নিপীড়তরা নিজেদের মুক্ত করবেন কীভাবে? পাওলো ফ্রেইরি এই প্রসঙ্গে বলছেন নিপীড়তরা মুক্তির পথ হিসেবে শাসকদের মতো হয়ে যেতে চান কোনও না কোনও উপায়ে অর্থাৎ ক্ষমতায়নের যাত্রাপথকেই মুক্তির যাত্রাপথ ভেবে নেন তাঁরা। আর এইখানেই উধাও হয়ে যায় সংলাপের সম্ভাবনা। কারণ ‘ক্ষমতা’ দাঁড়িয়েই থাকে মনোলগের উপর, যে কোনওরকম সংলাপই নড়িয়ে দিতে পারে ক্ষমতার মূল। আর তাই সংলাপকে এড়িয়েই ক্ষমতার টিকে থাকা। তাহলে এও বুঝতে আমাদের অসুবিধে থাকে না যে এই কারণেই ‘ক্ষমতা’র সঙ্গে ‘সত্য’র কোনও যোগাযোগ নেই। কারণ সত্য তো সংলাপ ছাড়া জন্মাবেই না।

তাহলে কী দাঁড়াল? যেদিকে ক্ষমতা আছে সেদিকে সংলাপ বা সত্য নেই। আর যেদিকে সংলাপ বা সত্য আছে সেদিকে ক্ষমতা থাকতে পারে না। এখন ঠিক এইখানেই যদি ধর্মকে বসাতে চাই আমরা তাহলে কোথায় বসাব? ধর্ম তো সত্যের পূজারী, সত্যের অনুসন্ধানকারী। তাহলে নিঃসন্দেহে তাকে সত্য আর সংলাপের দিকেই বসাতে হয়। কিন্তু মুশকিল হল ধর্মের মূল চেহারা থেকে সরে গিয়ে ধর্ম মাঝেমাঝে বসে পড়ে ক্ষমতার পাশে। কিংবা এও হতে পারে যে ক্ষমতাই ধর্মকে টেনে এনে পাশে বসায়। ভাবে, ধর্মকে পাশে বসালেই বুঝি সত্যের পাশে বসা যাবে। কিন্তু ‘সত্য’ যে বহু দূর। সংলাপ ছাড়া তার জন্মই নেই। আর তাই বোঝবারও আগে ধর্ম মিশে যায় ক্ষমতার সঙ্গে। চেহারা বদলে যায় তার। তখন সে বুঝতেও পারে না যে ক্ষমতা তাকে ব্যবহার করছে। কারণ ক্ষমতার তো নতুন করে জন্ম হয় না, তাকে কেবল টিকিয়ে রাখতে হয় তার অস্তিত্ব। অপরিবর্তিত অস্তিত্ব।

ফলে, এই সংলাপ, সত্য, ক্ষমতা আর ধর্মের ধারণা নিয়ে এইবার যদি আমরা চোখ ফেরাই আমাদের বর্তমান ভারতবর্ষের দিকে তাহলে কিন্তু পরিষ্কার হয়ে আসে এই মুহূর্তের ভারতবর্ষের চেহারা। যে ভারতবর্ষ তার রাজনীতির মূল সুরে বেঁধে ফেলেছে ধর্মকে। ক্ষমতা টেনে পাশে বসিয়েছে তাকে। ধর্ম ভুলে গেছে তার মূল কাজ। আর তাই, কোথাও কোনও ‘সংলাপ’ নেই।

কেন বারবার বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে শাসক, কেন মুখ আটকে দেওয়া হচ্ছে শিল্পীদের? কারণ কথা বলবার স্বাধীনতা মানে সকলের কথা বলবার স্বাধীনতা। আর সকলে কথা বললে সেই কোলাহলের ভিতরও তৈরি হয় সংলাপ। ক্ষমতা এই সংলাপকে ভয় পায়। কারণ এই সংলাপ বা ডায়লগ ভেঙে দিতে পারে ক্ষমতার মনোলগকে, প্রেস্ক্রিপশনকে। তাই যখন এই প্রচণ্ড সহনশীলতার অভাবে ভোগা ভারতবর্ষে আমরা বারবার শুনি ‘ধর্মের ভাবাবেগে আঘাত’, আমাদের বুঝে নিতে হবে ‘ধর্মের’ নয় ‘ক্ষমতার’। ধর্মের ভাবাবেগে আঘাত লাগতেই পারে না, কারণ ধর্ম সত্যের অনুসন্ধানকারী। আর সত্যের জন্মের জন্য সংলাপের প্রয়োজন আছে। সেই সংলাপকে ধর্ম কোনওদিন ফিরিয়ে দিতে পারে না, মুখ বন্ধ করে দিতে পারে না সংলাপকারীদের। তাই আসলে ভারতবর্ষ জুড়ে যে আঘাতের কথা উঠে আসছে বারবার তা ক্ষমতার ভাবাবেগে আঘাত, ধর্মের নয়। যদিও ক্ষমতার ভাব বা আবেগ কোনওটাই থাকে না। থাকে কেবল নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারা আর না পারার মাঝে দুলতে থাকা সংকট আর সেই সংকট থেকেই কখনও কবির কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা কখনও বা অভিনেতার প্রতি আস্ফালন। বুলেনশাহ-এর ঘটনার উল্লেখ করে যখন অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ বলছেন মানুষের জীবনের মূল্যের চেয়ে গরুর জীবনের মূল্যই বেশি এই ভারতবর্ষে, তখন এই কথা বলার জন্য হেনস্থা হতে হচ্ছে তাঁকে। বলা হচ্ছে ‘অ্যান্টি ন্যাশনাল’। কিন্তু তারপরেও তিনি বলছেন তিনি ভারতবর্ষ ছেড়ে যাবেন না, এবং তিনি নিজেকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ মনে করেন না। করবার কথাও নয় কারণ আমরা যাকে ভালোবাসি তারই ভুল ধরি। আমরা চাই, ভালোবাসার মানুষের এক সম্পূর্ণ আদর্শের চেহারা দেখতে। ফলে দেশকে ভালোবাসলে তবেই সেই দেশের মাটিতে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন মানুষ। প্রতিবাদ করবেন শিল্পীরা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধে বলছেন “Man’s history is being shaped according to the difficulties it encounters.”  মানুষের অসুবিধের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয় মানুষের ইতিহাস। তাহলে আমরা যদি আমাদের অসুবিধে বুঝতেই না পারি, বলতেই না পারি তাহলে কীভাবে তৈরি হবে আমাদের ইতিহাস? আর মানুষের ইতিহাস ছাড়া কীভাবে তৈরি হবে কোনও দেশের ইতিহাস? এখান থেকেই আসলে প্রশ্ন করতে পারি ‘দেশ’ কাকে বলে? যেভাবে কোনওকিছুর সংজ্ঞা নির্দিষ্ট হয় সে যা নয় তা দিয়ে, সেভাবেই ভারতবর্ষের সংজ্ঞা হল যে ভারত আমেরিকা নয়, ভারত পাকিস্তান নয়, ভারত চিন নয়… এই অনেকগুলো ‘নয়’ দিয়ে আমরা বোঝবার চেষ্টা করি ভারতবর্ষের চেহারা। যে চেহারা ভৌগোলিক মানচিত্রের চেয়ে খানিক বেশি! কিন্তু এই ‘হয়’ আর ‘নয়’-এর মধ্যেও দুলতে থাকে ক্ষমতা আর সে চায় না এদের মধ্যে কোনওদিন কোনও সংলাপ হোক।

যে কোনও মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে আমাদের তাই আগেই বুঝে নিতে হবে এই ‘ক্ষমতা’, ‘সংলাপ’, ‘দেশ’, ‘ধর্ম’, এগুলোর সংজ্ঞাকে। আর সেটুকু বুঝে নিতে পারলে আমাদের বুঝতে অসুবিধে হবে না কীভাবে জন্ম নেয় ধর্মীয় মৌলবাদ, আর কেন তার প্রধান অস্ত্র হিসেবে সে বেছে নেয় কণ্ঠরোধ করার নীতিকে। ক্ষমতার পাশে বসে ধর্মও ক্ষমতার মতো করে ব্যবহার করতে শুরু করে আর ক্ষমতার মূল কাজই হল সংলাপকে জন্ম নিতে না দেওয়া কারণ সংলাপ জন্ম দেবে কীসের? আমরা জেনে গেছি সত্যের। আর ধর্ম, ক্ষমতার হাত ধরে আসলে ক্রমে দূরে সরতে থাকে এই সত্যের থেকে। ফলে যে কোনও মৌলবাদ আসলে এই সত্যের থেকে দূরত্বের যাত্রা।

এই লেখা আসলে শেষ করা সম্ভব নয়, কারণ এই ভাবনারা নিজেদের মধ্যে সংলাপ করেই চলে। তবু এটুকু দিয়েই শেষ করতে চাই, যত আস্ফালন করুক কোনও ধর্ম, কোনও দল, কোনও ‘ক্ষমতা’ আমরা যেন ভুলেও সংলাপ না বন্ধ করে ফেলি, যেন ভুলেও কোনও এক পক্ষ নিয়ে সবকিছুকে ‘অপর’ না করে ফেলি। কারণ বৃহত্তর রাজনীতির এটাই অভিসন্ধি, এই ‘নিজ’ আর ‘অপর’, self and other-এর মধ্যে সংলাপ বন্ধ করে দেওয়া। এই ভুল যেন আমরা কখনও না করে ফেলি, কারণ এই সংলাপ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলে, আমাদের দেশজুড়ে একা আধিপত্য স্থাপন করবে ক্ষমতা, আর আমরা ক্রমে সরে যাব সত্যের থেকে। আতঙ্কের সঙ্গে, হতাশার সঙ্গে এ কথা স্বীকার করতেই হয় যে আমরা সেইদিকেই চলেছি। এখনও সময় আছে, আসুন, সব্বাই মুখোমুখি বসি, গোল হয়ে, জানবার প্রয়োজন নেই, আপনি কোন দল, কোন ধর্ম, কোন মতে বিশ্বাসী! আসুন, আমরা কথা বলি… সেটুকুই আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারে ক্ষমতার হাত থেকে। যে কোনও মৌলবাদের হাত থেকে।

হাম কে ঠেহরে আজনবি ইতনি মাদা রাতোঁ কে বাদ
ফির বনেঙ্গে আশনা কিতনি মুলাকাতোঁ কে বাদ?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...