পঞ্চম পাঠ : অন্য ইতিহাস অথবা শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত

পূর্ণা চৌধুরী 

 

 আভাস

অনেক তত্ত্বকথা হল। এইবার একটি গল্প শোনাই। পাঠক, যদি কোনও গল্প এইভাবে শুরু হয় তাহলে গল্পের চরিত্রটি কী হবে?

“আইন কলেজে পরিবার সময় আমার পিতার বিবাহ হইয়াছিল। তখন আমার পিতামহ জীবিত। আমার মাতুল পরিবার কলিকাতায় বাস করিতেন। তাঁহারা বিশেষ অর্থশালী ছিলেন না কিন্তু বংশ মর্যাদায় উচ্চ এবং রূপে অতুলনীয় সুন্দরী বলিয়া আমার মাতাকে পুত্রবধূ করিবার জন্য পিতামহ বিশেষ আগ্রহান্বিত হইয়াছিলেন। আমার জন্মের দুই বৎসর পর আমার পিতামহের মৃত্যু হয়। ঠাকুরদাদার কোলে যে সুখ লাভ আমার ভাগ্যে ঘটিয়াছিল-– কেবলমাত্র কল্পনাতেই সেই স্মৃতি জাগিয়া আছে।

কন্যা বলিয়া শিশুকালে অনাদৃত হই নাই। পিতার বন্ধুগণ কেহ কেহ বলিলেন, ‘প্রথম কন্যাসন্তান সৌভাগ্যের লক্ষণ’। কথাটা হাস্য পরিহাসের সহিত বলা হইলেও, তাহার মধ্যে সত্য রহিয়াছে বোধ হইল। আমার জন্মের কয়েক মাস পূর্বে পিতা আইন ব্যবসায় আরম্ভ করিয়াছিলেন। দিন দিন তাঁহার উন্নতি দেখা গেল। কিছুকালমধ্যেই আমার পিতা কোনও সুযোগে বার্ষিক দশ হাজার টাকা আয়ের একটা ছোট জমিদারি নীলামে ক্রয় করিলেন।”

যেহেতু আমরা সাহিত্যপ্রেমী বাঙালি এবং বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের শাঁসে জলে এত বড়টি হয়েছি, আমরা নাক কুঁচকে বলব এ তো বোঝাই যাচ্ছে এটা হলো গে Exposition। এর থেকে দুইটি সম্ভাবনা আশু দেখিতে পাওয়া যাইতেছে: ইহা একটি রোম্যান্স বা রোমান্টিক ট্রাজেডিতে পর্যবসিত হইবে, কারণ উপরোক্ত বাবুরা আমাদের তাই শিখিয়েছেন। এরপর আমরা ভুরি ভুরি  উদাহরণ দিতে থাকব এবং আমাদের ইনফারেন্সটি প্রমাণ করে ছাড়ব।

আদতে এটি একটি বেথুনে স্কুলে পড়া শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত নাম মানদা। পদবী অজ্ঞাত। সম্ভ্রান্ত বংশীয়া ব্রাহ্মণকন্যা। এবং সেই কারণেই “পাপী কলঙ্কিনী” হওয়া সত্ত্বেও ‘দেবী’। ১৯০০ সালে এনার জন্ম। কবে গতাসু হয়েছিলেন জানা নেই, তবে এই জীবনটি দিয়ে বেশ মনের মতন একটু রোমান্টিক ট্রাজেডি যে লেখা হতে পারত সে বেশ বোঝা যায়, বিশেষ করে একটি প্রভূত সম্ভাবনাময় নায়ক চরিত্র যখন ছিল–

“প্রথম যেদিন তিনি পড়াইতে আসিলেন, সেইদিনই তাঁহার আকৃতি প্রকৃতি এবং পরিচ্ছদে আমি একটু আকৃষ্ট হইলাম। তাঁহার লম্বা লম্বা চুল কপাল হতে উল্টা দিকে আঁচড়ানো ও ঘাড়ের কাছেই ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া বাবরি পাকানো— তাঁহার বয়স আন্দাজ বাইশ তেইশ-– দাড়ি গোঁফ উঠে নাই, না পরিষ্কার কামানো, তাহা বুঝিতে পারিলাম না। কাপড় ঢিলা মালকোঁচা দিয়া পরিয়েছেন, মনে হয় কাবুলিদের পাজামা। গায়ে একটা পরিষ্কার ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি জামা-– তখন খদ্দরের চলন হয় নাই। তাঁহার সূক্ষ্মাগ্র উন্নত নাসিকা, চোখ দুটি সুন্দর কিন্তু একজোড়া সোনার ফ্রেমে বাঁধানো চশমা সেই সৌন্দর্যকে অন্য রূপ দিয়াছে। পায়ে নকল জরির কাজ করা নাগরা জুতা। তাঁহার বর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম, দেহ অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ, তাঁহার কথায় জানি বাঁশি বাজে। তিনি সম্প্রতি  বি.এ পাশ করিয়া কোনও স্কুলে শিক্ষকের কার্য করিতেছেন। মাস্টার মশায় অবিবাহিত।”

এই ‘মুকুল দাদা’কে দেখে বোধ হয় যেন রবিবাবুর কোনও নভেলের পাতা থেকে উঠে আসা এক ধীর ললিত নায়ক। মানদার কপাল। মুকুল দাদা তাঁকে কাব্য শেখালেন, শেলি, বায়রন, শেক্সপীয়ার, বিদ্যাপতি ভারতচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র, বঙ্কিম, দীনবন্ধু, গিরিশচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ সব পড়ালেন, কিন্তু নায়ক হয়ে উঠতে পারলেন না। সে তাঁর সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য বলতে পারব না। পতিতার আত্মচরিতে তিনি এক পার্শ্ব চরিত্রই হয়ে রইলেন, কারণ মানদার জীবনের নায়ক বা খলনায়ক হয়ে পড়ল এক ‘রমেশ-দা’ যিনি নাকি আবার, ঘটনাচক্রে বেরিয়ে পড়ল, কলেজে মুকুল দাদার সহপাঠীও ছিলেন।

এই রমেশ দাদা যে কোনও সৎ সাহিত্যে খলনায়কের ভূমিকাটি বিনা চেষ্টায় পেতে পারেন। কারণ ইনি বিবাহিত হইয়াও পঞ্চদশ বর্ষীয়া বালিকা প্রণয়িনীকে গর্ভিণী করেন এবং গর্ভসঞ্চারের আভাস পেয়েই তাকে গৃহছাড়া করেন। এরপর কি কি ঘটতে পারে সে না বোঝার কোনও কারণ নেই, তাও একটু বলে রাখা ভালো। ইনি তাঁর অফিসের তহবিল তছরুপ করে তিন হাজার টাকা, একটি নাবালিকা প্রেমিকাকে নিয়ে দিল্লি, লাহোর, শ্রীনগর, বোম্বাই এই সকল শহরে খানিক বিচরণ করে শেষমেশ কাশীধামে এসে উপস্থিত হন। পাঠক, কাশীধামে বেশ্যাগমন শুনে হাসবেন না। রমেশদা মানদাকে বোঝাচ্ছেন–

“জানিস এই কাশীতে যত বাঙালি আছে তার অধিকাংশই তোর রমেশদার দলের, কেহ বা কারো ঘরের বৌ বের করে এনেছেন, কেউবা বিধবা পোয়াতি খালাস করতে এসেছেন, কেহ আপন রক্ষিতা নারীর হাওয়া বদলাচ্ছেন— আবার এমন কেহ আছেন যাঁহারা নিজের আত্মীয়া দ্বারা পাপ ব্যবসায় করাচ্ছেন। বাঙালির কলঙ্কের এই তিনটি স্থান: নবদ্বীপ, কাশী, বৃন্দাবন। ভয় দেখাচ্ছিস কাকে?”

বস্তুতঃ ‘সৎসঙ্গে কাশীবাস অসৎসঙ্গে সর্বনাশ’-এর এই বিপরীতধর্মী ভাষণ দেখে তাবৎ আশ্চর্য হওয়ার কোনও কারণ নেই। নির্ভীক রমেশদার কাশীবাসের এই প্রাঞ্জল বর্ণনাটি সুকুমারী দত্তর ‘অপূর্ব সতী’ নাটকেও দেখা গেছে। বাবু চন্দ্রকেতু ঘোষ নলিনীকে নিয়ে কাশীধামেই পৌঁছেছিলেন এবং সেই পবিত্র স্থান হতেই তাঁর পিতা গোরা পুলিশের সাহায্যে তাঁকে উদ্ধার করে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। নলিনী কাশীধামেই মরে বাঁচে। সুতরাং আলোচ্য লেখায় রমেশদার কথায় অতিরঞ্জন থাকতে পারে, কিন্তু অসত্য নেই বলেই বোধ হয়। যাহা হউক এক্ষণে ‘অপূর্ব সতী’ অথবা কাশীধামের মাহাত্ম্য কোনওটিই আমাদিগের বিবেচ্য বিষয় নহে।

আত্মচরিতে ফেরা যাক। বলাই বাহুল্য, রমেশদা যথাসময়ে উধাও হলেন এবং চরিতের গতি কিছু শ্লথ হলেও প্রভূত সম্ভাবনাময় হয়ে পড়ল। কাশীর ঘাট থেকে মোহান্তর মঠ; তথায় মৃত সন্তান প্রসব; তৎপর কলকাতার উদ্ধারাশ্রম, হাড়কাটার গলি, রামবাগান এবং তৎপরবর্তী কালে ডাবল প্রোমোশন পেয়ে ভবানীপুর। মানি বা মানু থেকে ফিরোজা বিবি এবং শেষ পর্যায়ে মিস মুখার্জি। এই কাহিনির মাঝে নানা বাবু, প্রফেসর, সমাজসেবী, ডাক্তার, মোক্তার, ব্যারিস্টার ছড়িয়ে আছেন দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনের মতো।

এইবার আসল কথায় এসে পড়া যাক।

তার আগে একটি কথা সবিনয়ে মনে করিয়ে দিই। লেখাটি একটি বেশ্যার এবং ইঁহাদিগের লজ্জাবোধ সচরাচর কিছু কম হইয়া থাকে। এরপর যদি তাঁহারা হন শিক্ষিতা বেশ্যা, তাহা হইলে সমাজের সমূহ বিপদ, কারণ এঁদের স্পষ্ট বিবৃতিতে ইতিহাসের নির্মল উদার ভাবমূর্তি কিছু কলঙ্কিত হইয়া পড়ে।

শ্রী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়

 

২ পতিতোদ্ধারিণী প্রকল্প এবং মানদা সংবাদ

মহারাণীর আমলটি ইংলন্ড-এর ‘Woman Question’-এর যুগ। নারীদের কী রূপে আমরা দেখতে চাই অথবা চাই না সে নিয়ে তত্ত্বের ঘনঘটা এবং তৎপ্রসূত সমাজ সংস্কার এবং সমাজ উন্নয়ন প্রচেষ্টা। এই সৎ প্রচেষ্টা উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা করজোড়ে গ্রহণ করি। এই গুরুদায়িত্ব চিন্তায় অনেক বড় বড় মাথা ঘুরে গেছিল সে আমরা জানি। তবে সমস্ত তত্ত্বই গৃহস্থ অবলা প্রসঙ্গে। বেশ্যা কল্যাণ প্রকল্পটি খুব সোচ্চারে জাহির হয়নি। তাতে সমাজপ্রেমী ভদ্রলোকদের কিছু নৈতিক অসুবিধা ছিল। অবশ্য কিছু সদাশয় মানুষ পতিতাদের নিয়ে যে একেবারে ভাবেননি তা নয়। মানদা দেবীর আত্মচরিতে উদ্ধারাশ্রমের উল্লেখ আছে, সেরকম কিছু নারী উদ্ধার সঙ্ঘ-র কর্মকাণ্ড ১৯০০ সালের বছর তিন চার আগেই শুরু হয়েছে। তবে তার অন্দরের আসল কথাটি যে কি ছিল তা সঠিক জানা যায় না। তদ্রূপ আশ্রমের যে বর্ণনা পাওয়া গেল এই বইয়ে তা যে সম্পূর্ণ চিত্র নয় তা আমরা তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম, তবে মানদা যে তাঁর আর দুই সই রাজবালা আর হরিদাসীর অথবা কালিদাসীর সঙ্গে সে স্বর্গ থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলেন সে কথা তিনি বিশদ বলেছেন। পালিয়ে কোথায় গেছিলেন সে কথায় পরে  আসছি।

কাগজপত্র বলছে ১৮৯২ সালে ব্র্রাহ্ম সমাজের কিছু মানুষ ‘দাসাশ্রম’ বলে একটি অনাথালয় শুরু করেন। দাসাশ্রম ছিল গরীব মানুষের আশ্রয়, খাওয়া থাকার জায়গা। ঠিকানা ছিল ১৬৭/২/৩ নম্বর কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট। ১৮৯১ সালে বসিরহাট মহকুমায় জালালপুর গ্রামের মৃগাঙ্কধর চৌধুরী ও ক্ষীরোদচন্দ্র দাস দাসাশ্রম স্থাপন করেছিলেন এবং পরে এটি কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। এই আশ্রমের  মুখপত্র ‘দাসী’ পত্রিকা কলকাতায় প্রকাশিত হতে থাকে ১৮৯২ সালের জুলাই মাস থেকে। ব্রাহ্ম সমাজের যে মানুষটি এই কাজের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন, তিনি শ্রী রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। তিনি কে আমরা জানি তাই অধিক পরিচয় দিয়ে সময় নষ্ট না করাই স্থির করলাম। এই ‘দাসী’ পত্রিকার পাতা ওল্টালে নানা আশ্চর্য খবর চোখে পড়ে। একটি বলি। আশ্বিন ১২৯৯ সংখ্যায় আছে–

‘আমরা প্রথম সংখ্যা ‘দাসী’তে প্রকাশ করিয়াছি যে আমরা খুলনা হইতে একজন বিপথগামিনী অল্পবয়স্কা রমণীকে ফিরাইয়া সৎপথাবলম্বন করাইবার জন্য চেষ্টা করিতেছি। এই সংবাদ প্রকাশ হওয়াতে দেখা যাইতেছে যে বহু সংখ্যক হতভাগিনী রমণী আমাদের আশ্রয় পাইবার জন্য আমাদের নিকট সংবাদ পাঠাইতেছে।’

এইরকম আটটি রমণীর সংবাদ আছে এই সংখ্যায়। হতভাগিনী রমণীগণ সংবাদ পাঠাইতেছে ঠিকই, কিন্তু এই সকল বিপদ ঘাড়ে নেবে কে? তাই লেখকের আহ্বান–

‘হায় হায়, এই সকল হতভাগিনীদের উত্তপ্ত অশ্রুবিন্দু বঙ্গদেশকে পুড়াইয়া ছারখার করিবে। বঙ্গমাতার কি কোনও উদারপ্রাণা, প্রেমময়ী কন্যা নাই, যে আপনার প্রেম পক্ষপুটের আচ্ছাদনের নিম্নে রাখিয়া এই হতভাগিনীগণকে পাপের হস্ত হইতে, অপার যন্ত্রণার হস্ত হইতে রক্ষা করেন? কেহ যদি থাক মা এস। অগ্রসর হও।’

উদারপ্রাণা, প্রেমময়ী কন্যা কেউ এগিয়ে এসেছিলেন কিনা বলতে পারব না তবে উদারপ্রাণ, প্রেমময় পুরুষ যে বহু সাতিশয় উৎসাহিত হয়েছিলেন সে এই বইখানিতেই প্রমাণ।

রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের দুঃসাহসটি কিছু বেশি মাত্রায় ছিল, একথা স্বীকার করতেই হবে। অনিচ্ছাকৃতভাবে যারা বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে তাদের উদ্ধারের জন্য রামানন্দ অনেক আইনের বই পড়াশুনা করে প্রবন্ধ লিখে পাঠক সমাজকে সচেতন করার চেষ্টায় ব্রতী হন–- মাঘ ১২৯৯ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘স্ত্রী জাতির দুঃখ বিমোচন’ প্রবন্ধে তিনি লিখছেন–

‘এই কলিকাতা শহরে, বেশ্যাদের নিজের বাড়ী আর কয়টা আছে? সমুদয় বেশ্যাগৃহই কোন না কোন ‘ভদ্র’ বাড়ীওয়ালার সম্পত্তি। কি ঘৃণার কথা। জঘন্য পাপে হতভাগিনীগণ শরীর ও আত্মা কলুষিত করিতেছে। আর তাহাদের পাপার্জিত অর্থে এই ভদ্রলোকেরা স্ত্রী পুত্র কন্যার ভরণপোষণ করিতেছে? আমাদের বোধ হয়, এই কলিকাতা শহরের বেশ্যাগৃহ সকলের একটা তালিকা করিয়া কোন বাড়ীটা কোন্‌ ভদ্রলোকের তাহা স্থির করিতে পারিলে খুব ভাল হয়। তাহা হইলে ঐ সকল নীতিজ্ঞানশূন্য লোকদের নাম সহিত ঐ তালিকাটি সাধারণের গোচরার্থে প্রকাশ করা যাইতে পারে।’

রামানন্দবাবুর দোষ ধরব এ স্পর্ধা আমার নেই। তাঁর চরিত্র বা অভিসন্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলব, তেমন কদর্য রুচিও আমার নয়; ভাদ্র, ১২৯৯ সংখ্যায় ‘দাসী’ পত্রিকায় তাঁর ‘পতিত পুরুষগণের উদ্ধার’ প্রবন্ধটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ–

‘সকল দেশেই দেখা যায় যে ব্যভিচার দোষে দোষী পুরুষগণের সামাজিক দণ্ড অতি লঘু, কিন্তু ব্যভিচারিণী রমণীর দণ্ড অতি কঠোর। পুরুষ রমণী উভয়েই সমাজ অপরাধী হইলেও রমণী কলঙ্কিতা নামে অভিহিতা এবং সমাজ কর্তৃক পরিত্যক্তা হন। তাহাতে ফল এই দাঁড়ায়, যে নারীর একবার অধঃপতন হইয়াছে, তিনি ক্রমেই গভীরতর পাপপঙ্কে নিমগ্ন হইতে থাকেন। অপরদিকে পুরুষ শত অপরাধে অপরাধী হইয়াও ভদ্রলোকের বেশে সমাজে সর্বত্র অবাধে গতিবিধি করিয়া থাকেন এবং সেই সুযোগে আরও কত রমণীর সর্বনাশ করেন।’

সবই অত্যন্ত খাঁটি কথা। কিন্তু আদর্শ এবং বাস্তবের মধ্যে যে একটি মস্ত ব্যবধান আছে তা তাঁর মতো আদর্শবাদী মানুষরা দেখতে পান না। আমরাও পেতাম কিনা সন্দেহ যদি না একজন শিক্ষিত পতিতা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে না দিতেন। রামানন্দবাবু যে বাবুদের বেশ্যাদিগের বাড়ি ভাড়া দেওয়া নিয়ে একটি মরালিস্ট অ্যাঙ্গেল খাড়া করলেন, সেই প্রসঙ্গে বলি, বাড়িওলারা ভাড়া না দিলে “প্রেম পক্ষপুটের আচ্ছাদনের নিম্নে” এই সকল অনাথদের আশ্রয় দিত কে, সেকথা উনি ভেবে দেখেছিলেন কি? উদ্ধার আশ্রমের পরম নিশ্চয়তার চেয়ে মানদা দেবী যে হাড়কাটা গলির খোলার ঘরশ্রেয় মনে করেছিলেন, এই কথা জানতে পারলে সম্ভবত এইসব উদার হৃদয় সমাজবান্ধব যারপরনাই আহত হতেন…

ভাবের ঘরে থাকার নানা সুবিধে। তাতে বাস্তবটিকে নস্যাৎ করে একটি ভাবগম্ভীর বাতাবরণের মধ্যে নিশ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া যায়।

খানিক আগেই বলেছি মানদা পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন। কোথায় এবং কিভাবে, এইবার সেই আখ্যানটি শুরু করা গেল। গোড়াতেই বলে রাখি, লেখিকার ভাষা খুবই প্রাঞ্জল এবং চাঁচাছোলা, ফলে কী বলার চেষ্টা করছেন সে বুঝতে অযথা সময় নষ্ট করতে হয় না। পাঠক এইবার এটি পড়ুন–

“একদিন আমি রাজবালা আর কালিদাসী ও আর একটি মেয়ে (তাহার নাম এখন আমার মনে নাই-– বোধয় খেঁদি বা এমন কিছু হইবে) এই চারিজন একখানি ঘোড়াগাড়ি ভাড়া করিয়া টালিগঞ্জে আসিলাম। সেখান হইতে ট্রামে আমরা কর্নওয়ালিস স্ট্রিট-এ সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনা মন্দিরে উপস্থিত হইলাম। […] আমাদের ব্রাহ্ম মহিলাদের মতো কাপড় পরা ছিল! পায়ে জুতাও ছিল, আমরা অগ্রসর হইয়া গেলাম।

ব্রাহ্ম সমাজে আসিবার ষড়যন্ত্র আমরা অনেকদিন হইতেই করিতেছিলাম। রাজবালাই ইহার মূল কারণ। সে বলিয়াছিল ব্রাহ্ম সমাজ সকলকেই গ্রহণ করে, ব্রাহ্মধর্ম অবলম্বন করিলে বিবাহ করা সহজ হইবে, কিন্তু দেখিলাম সেখানেও বাধা আছে।”

পাঠক কি খাবি খাচ্ছেন? ঘটনার বাকিটুকু শুনুন তাহলে–

“সম্মুখে একজন পক্ককেশশ্মশ্রুবিশিষ্ট দীর্ঘাকৃতি বলিষ্ঠ দেহ বৃদ্ধকে দেখিয়া রাজবালা আমার কানে কানে বলিল, ‘এই বুঝি কৃষ্ণকুমার মিত্র–- প্রণাম করো।’… আমরা চারিজন পাদস্পর্শ করিয়া প্রণাম করিলাম। তিনি স্নেহপূর্ণ স্বরে আমাদের আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলে আমরা তাঁকে একপাশে ডাকিয়া নিয়া সকল কথা বলিলাম, এবং আমাদের রক্ষার উপায় করিতে অনুরোধ করিলাম। উদ্ধার আশ্রমের কর্তৃপক্ষদের দুর্ব্যবহার ও আমাদের ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণের অভিলাষ তাঁহাকে জানাইলাম।

তিনি বলিলেন, ‘আপনাদের রক্ষার উপায় একাকী আমার দ্বারা সম্ভবপর হয় না। সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিগণকে জিজ্ঞাসা করাও প্রয়োজন। তৎপরে তিনি একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোককে নিকটে ডাকিলেন। তাঁহার নিকট সমস্ত ঘটনা বলা হইলে তিনি বিশেষ ঘৃণার সহিত আপত্তি জানাইয়া কহিলেন, “না, তাহা কিরূপে হয়? ইহাদের পূর্ব জীবন কলুষিত। ব্রাহ্ম সমাজে কি পাপ প্রবেশ করিবে?”

পূর্ববর্তী পর্বে গিরিশ চন্দ্রের স্মৃতিসভায় সুধাকণ্ঠী সুশীলাবালার একটি প্রশ্ন দিয়ে শেষ করেছিলাম। আশা করছি সেইটি কেউ বিস্মরণ হননি; পরবর্তী কোনও এক সন্ধিক্ষণে ‘কলুষিত পূর্ব জীবন’ নিয়া দুই চার কথা বলা জরুরি হয়ে পড়বে সেটিও আগে থেকেই জানিয়ে রাখা হল।

‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে’ রোগটি নারীজাতির ক্রনিক এইলমেন্ট, সে শিক্ষিতই হোক, বা পতিতাই হোক। ফলে যা হবার তাই হল–

“আমরা নিরাশ হইয়া চলিয়া আসিলাম। বিদায় লইবার সময় পুনঃপ্রণাম করিতে গেলে শ্রীযুক্ত কৃষ্ণকুমার মিত্র মহাশয় আমাদের প্রণাম গ্রহণ করিলেন; কিন্তু অপর লোকটি, পরে শুনিয়াছিলাম তাঁহার নাম হেরম্ববাবু— ‘না–না–’ করিয়া সরিয়া গেলেন।”

রামানন্দবাবুর মতো হেরম্ব চন্দ্র মৈত্রও এক প্রাতঃস্মরণীয় মানুষ। তাঁর অধিক পরিচয় আর কী দেব। অধিকাংশ বাবুদের বড় কন্টামিনেশন-এর ভয়। এ কথা আগেও বলেছি, এখনও বলছি। এই ব্যাপারটি  নাটুকে বাবুদের ক্ষেত্রে আমরা আগেই দেখেছি, এইবার দেখলাম সমাজসংস্কারক বাবুদের মধ্যে। এঁরা জ্ঞান ও আদর্শের জগতের লোক। নারীর সঠিক কর্তব্য কী এবং কোথায়, কিভাবে এঁদের স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করা যায় এই নিয়ে নীতিগর্ভ বক্তৃতা দিতে পারেন, কিন্তু পতিতার ছোঁয়ায় বড়ই মর্মাহত হন এবং সেই ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেই ‘না–না..’ বলে আর্তনাদ করতে থাকেন। তবে দুই একটি নিকষ সোনার কথাও উদ্ধার হল শিক্ষিত পতিতার আত্মচরিত থেকে। তাঁদের একজন পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী। মানদা আমাদের একটি কাহিনী শোনান এই ছুঁৎমার্গ প্রসঙ্গে। কাহিনীর নায়িকা বেশ্যাটি ছুতোরের মেয়ে, সাত বছুরে বিধবা। বিদ্যাসাগর এবং শিবনাথ শাস্ত্রী তার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে ব্যাপার কোনও কারণে ঘটে ওঠেনি; মেয়েটি শিবনাথ শাস্ত্রীর পূর্বপরিচিত এবং শিবনাথ শাস্ত্রীকে সে বালবিধবা ছোটবেলায় ‘দাদা’ ডাকত। অবশেষে নানা কার্যকারণে সে মেয়ে যখন খাতায় নাম লেখায়, শাস্ত্রী মশাই স্বয়ং যান তার বাড়ি তাকে সৎ পথে ফেরাতে…। সে হতভাগী ফিরতে পারেনি বটে কিন্তু ঘরে শিবনাথ শাস্ত্রীর একটি ছবি বাঁধিয়ে রেখেছিল। প্রতিদিন সে ছবিকে সে ফুল দিয়ে সাজাত। মরবার সময় এলে আর এক কচি বেশ্যাকে ছবিখানা দিয়ে সে বলে যায় সে যতদিন বাঁচে ততদিন যেন ছবিখানি সে অমনি ফুল দিয়ে সাজায়। মানদা এই গল্পটি শোনে সেই অল্পবয়েসী বেশ্যাটির নিজের বয়ানে, তার প্রৌঢ় কালে। এ কাহিনী থেকে এও জানলাম যে ঢাকার এক পতিতার কন্যা লক্ষীমণিকে উদ্ধার করে এই অদ্ভুত মানুষটি এক ব্রাহ্ম যুবকের সঙ্গে বিবাহ দিয়েছিলেন। মানদার বৃত্তান্তে এইরকম দুই একটি কন্টামিনেশন প্রুফ বাবুর দেখা পেলাম, কিন্তু তাঁরা লাখে এক। তাঁদের প্রণাম করি।

 

৩ বাবু বিচার

ফিরি মানদা ইতিবৃত্তে।

সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের জুতোর ঠোকর খেয়ে তিনি নিজের পাকাপাকি বন্দোবস্ত করলেন। দেখলাম এই পর্যায় থেকে পোশাকি বাঙলা ছেড়ে তিনি এক পরিভাষা ব্যবহার ঘোষণা করলেন এবং পাঠককে তার জন্যে প্রস্তুতও করলেন। বিদ্বানরা বলতে পারেন এ হল এক ধরণের ভাষাগত সাবল্টার্ন বদমাইশি, ভদ্রজনের ভাষাকে ইতর করে তোলার এক ষড়যন্ত্র। সে হতে পারে। আমরা তার প্রতিবাদ করব না। কারণ কুসঙ্গে যে অধঃপতন হয় তা তিনি আগেই স্বীকার করে নিয়েছেন। গোড়াতেই বলেছি তিনি এক চাঁচাছোলা ‘মেয়েমানুষ’। সংজ্ঞা এবং উদাহরণ সহ তাঁর সামাজিক এবং মানসিক অবস্থানটি তিনি পাঠকদের পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন–

“লম্পট প্রণয়ীকে পতিতা সমাজে ‘বাবু’ বলা হয়। এখন হইতে এই শব্দটি আমি মাঝে মাঝে ব্যবহার করিব। এই ‘বাবু’ লইয়া খুব গোলযোগ হইত। কোনও পতিতার প্রণয়ী অন্য নারীর ঘরে প্রবেশ করিলে তাহা লইয়া তুমুল ঝগড়া বিবাদ বাধিয়া উঠিত। সকলেই তাহাতে যোগ দিত। আমি বাদ যাইতাম না। আর যতরকমের অশ্লীল অশ্রাব্য কথা, শুনিতে শুনিতে আমার সহিয়া গিয়েছিল। বুঝিলাম স্কুলের পড়া হইতে যে অল্পবিদ্যা পাইয়াছি তাহা আমার অহংকার বাড়াইয়া সর্বনাশ করিয়াছে, কিন্তু আমাকে পাপের আক্রমণ হইতে বাঁচাইতে পারে নাই।”

মান্নাদা প্রবাসী ও ভারতী নিয়মিত পড়তেন। শিবনাথ শাস্ত্রীর কথা যখন প্রথম শোনেন তখন তাঁর লেখা ‘নিমাই সন্ন্যাস’ কবিতাটি মনে পড়েছিল–

আজ শচীমাতা কেন চমকিলে,

ঘুমাতে ঘুমাতে উঠিয়া বসিলে?

লুণ্ঠিত অঞ্চলে ‘নিমু’ ‘নিমু’ বলে

দ্বার খুলে মাতা কেন বাহিরিলে?

অশ্রাব্য ভাষায় সাবলীল, যৌন প্রসঙ্গে মুখে কিছু বাধে না আবার ‘প্রবাসী ও ভারতী’ পড়েন, কবিতা মনে রাখতে পারেন, এ কেমন পতিতা? পাঠক, আমি বলব, এই কলঙ্কিনী আমাদের ওপেন টি বায়োস্কোপ নানটেইন টেলিস্কোপ। ইনি আমাদের অন্য ইতিহাসের পাতা।

পরবর্তী পরিচ্ছেদে এ বিষয়ে আরও কিছু বলার আশা রাখলাম।

এখন শুধু এইটুকু বলি, প্রথম সংস্করণটি প্রকাশের পর, কিছু সাহিত্য সমালোচক বাবু সাব্যস্ত করেছিলেন এ লেখা কোনও মহিলার লেখা হতে পারে না। তার জবাবে লেখিকা বলেছিলেন: ‘পতিতগণ যদি বই লিখিতে বা পত্রিকা সম্পাদনা করিতে পারেন, তবে পতিতাগণ পারিবে না কেন?’

 

আলোচ্য বই: শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত (Memoirs of Manada Devi)
প্রথম প্রকাশ: ১৯২৯

 

Featured Image: Courtesy Google

 

Be the first to comment

আপনার মতামত...