পিরিয়ড ও কলকাতার প্যাডম্যান

সৌমিত দেব

 

সমস্যা দু-ধরনের। মেয়েদের সমস্যা, ছেলেদের সমস্যা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়—

মেয়েদের সমস্যা— আর কাঁদিস না।
ছেলেদের সমস্যা— আর ‘মেয়েদের মতো’ কাঁদিস না।

কিন্তু কোনও সমস্যাই সময়কে থামিয়ে রাখতে পারে না। সেই ধর্ম মেনেই জানুয়ারি মাসের ২৪ তারিখে আমাদের দেশে পালিত হল “ন্যাশনাল গার্ল চাইল্ড ডে,” অর্থাৎ জাতীয় কন্যাশিশু দিবস।

এখন যতরকম দিবসই পালন করা হোক মেয়েদের ঘিরে, উহারা ওপিনিয়ানেটেড হইলে যে খুবই অসুবিধে হয়ে পড়ে সে কথা আমরা স্বরা ভাস্করকে দেখেই জানতে পারি। ফলে ‘ওদের’ বেশি কথা বলতে দেওয়া উচিৎ নয়। দিবস ফিবস ও আমরাই বুঝে নেব। তাই আজ, জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের কথা মাথায় রেখে সেইরকমই একটা কাজ করা যাক। পিরিয়ড নিয়ে কথা বলা যাক। এখন বায়োলজিকাল কারণেই আমার পিরিয়ড হয় না। এ জীবনে হওয়া সম্ভবও নয়। ফলে যাহা এক্সপিরিয়েন্স করি নাই, করিবার উপায়ও নাই, তাহা লইয়া বাতেলা করা প্রবল অনুচিত কার্য রূপেই গণ্য হওয়া উচিত এ কথা মিছা নয়। এদিকে দেশ মেরা রংরেজ ইয়ে বাবু, তাই কণ্ঠরোধ করিবে এমন কেউ আছে কি এই ভবে? তবে? বলব আমি বটেই। নিজের এক্সপিরিয়েন্স নেই তো কী হয়েছে? এক্সপিরিয়েন্স দেখে তো বলাই যায়! সুধী, আমিও সে পথে হেঁটে কিছু ‘দেখা এক্সপিরিয়েন্স’ শেয়ার করতে চলেছি। দা হিয়ার দা উই দা গো…

পিরিয়ড। বয়ঃসন্ধিকালে প্রায় প্রত্যেকটি মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় এই শব্দটির (এবং তার হরেক প্রতিশব্দের)। এবং ছেলের সাথে পরিচয় হয় একটা উৎকট কৌতূহলের। কারণ পিরিয়েড শব্দটি নিয়ে সে খুব বেশি কিছু জানতে পারে না। পারবার কথাও নয়।

কারণ এ কথা স্বীকার করে নিতেই হবে যে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা, মানে যে বয়সটায় প্রকৃত বোধ যেমন ‘তুই ব্যাটাছেলে? যা হাতে চুড়ি পরে বসে থাক’, জাতের মরমী একটা মন গড়ে ওঠে, তার দায় যতটা সমাজশিক্ষা পর্ষদের তার চাইতে অনেক বেশি বিনোদনের। আর এই আমরা যারা তিরিশে প্রায় পড়েই গেছি, তাদের ক্ষেত্রে ছোট বয়সে বিজ্ঞাপনের প্রভাবও অনস্বীকার্য। ফলে পিরিয়ডকে পিরিয়ডই বলে, ‘উন দিনোমে’ বলে না, এ কথাই আমরা জেনেছি বহুকাল পর। তার আগে পর্যন্ত জানতাম ‘উন দিনোমে’তে মেয়েরা অর্কেস্ট্রিয় ব্যাকগ্রাউন্ডে, সাদা প্যান্ট পরে, কলেজের করিডোর দিয়ে স্লো-মোশনে হাঁটতে হাঁটতে রকেটে চেপে চাঁদে চলে যায়, বা টেনিস খেলে, বা ম্যারাথনে ‘স্প্রিন্ট টেনে’ ফার্স্ট হয়। সেই দেখে পাড়ার লোক, আত্মীয়স্বজন উঠে দাঁড়িয়ে স্লো-মোশনে হাততালি দেয়। কিন্তু বিজ্ঞাপন কি আর এমনি এমনি হয়? কত মার্কেট রিসার্চ, কত কত পাবলিক পোল, কতই না হাবিজাবিএম্বিয়াবি করে তবে হয়। তা এই সমস্ত মার্কেট রিসার্চে আমার এক বন্ধুনির এই ঘটনাটা উঠে এসেছিল কিনা আমি জানি না। কিন্তু ঘটনাটি হল এমন, একান্নবর্তী পরিবারের সেই বন্ধুনির পিরিয়ড বেশ কম বয়সে শুরু হয়েছিল বলে তাঁর ঠাকুমা তাকে নষ্টা মেয়ে আখ্যা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চেয়েছিলেন। আর এই ঘটনার বহু আগে কিনা রাকেশ শর্মা মহাকাশে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধির সাথে ফোনালাপ সেরে এসেছেন। অর্থাৎ দেশ হিসেবে আমরা এগিয়ে গিয়েছি বলে আমেরিকার কাছে বার্তা গিয়েছে।

এখন প্রতিটা ঘটনারই একটা টেকনিক্যাল আর একটা সোশাল পার্সেপশন থাকে।

পিরিয়ড কেন হয়? তা আমাদের সময় এগারো ক্লাসের বায়োলজিতে ছিল। এগারো ক্লাস! প্রায় ষোলো সতেরোর দামড়া! তার আগে? কেন, হিন্দিতে হ্যায় না আপনা দুলারা ‘উন দিনোমে’ আর বাংলায় ‘শরীর খারাপ’। বর্তমানে কোন ক্লাসে পড়ানো হয় জানি না। একটু চেষ্টা করলেই জানা যাবে। না হলে গুগুল করে নিন।

পিরিয়ড হলে কী হয়? এই নিয়ে আমার কিছু ‘মজার’ কথা বলার আছে। না না কোট আনকোট দেখে ঘাবড়াবেন না। সত্যিই ‘মজার’। সে যে কী ফানি কী ফানি কী বলব! আরি? পিরিয়ড হলে মেয়েদের যে প্রায় সমস্ত জায়গাই আউটকাস্ট করে দেওয়া হয় এটা মজার না?

–অ্যাই অ্যাই অঞ্জলি দিবি না!
–ওমা কেন?
–কারণ তুই সেই প্রসেসটার মধ্যে দিচ্ছে যাচ্ছিস যেটা না হলে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেত কারণ রিপ্রোডাকশন হত না।
–হ্যাঁ! তো?!
–তাই তুই অশুচি।
–কীহ?
–ওভার অ্যান্ড আউট!

এদিকে চালাক পাঠকরা ভাবছেন, এবং ভেবেই চলেছেন, এই নাদান এখনও মান্ধাতা আমলের বাতেলা করছে কেন? কই এখন তো বেশ পরিষ্কার বিজ্ঞাপনে পিরিয়ড বলে, পিরিয়ড নিয়ে মিম শেয়ার হয়, বিভিন্ন ইউটিউব ভিডিও আছে। এখন তো প্রায় সকলেই এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশ স্বচ্ছন্দ। তাহলে? ওয়ার্ড লিমিট বেশি বলেই যা খুশি তাই ইতিহাস কপচাতে হবে! নতুন দিনের সূর্য ইত্যাদি।

এইখানে ত্যাড়া ঘাড়খানা নেড়ে আমার দুটি কথা বলার আছে।

  1. যে সমস্ত বিষয় বা মানুষের কথা হচ্ছে তা অকথ্য শহুরে। শহরের এক কিমি বাইরের পরিস্থিতিটা আপনি বিশ্বাস না করতে চাইলেও খুবই আলাদা।
  2. যে সমস্ত বিষয় বা মানুষের কথা হচ্ছে তা অকথ্য ইন্টারনেটে। ডেটার কিলোবাইট বাইরের পরিস্থিতিটা আপনি বিশ্বাস না করতে চাইলেও, অই আলাদাই।

কিছুদিন আগে আমার এক পরিচিতা হঠাৎ ফোন করে বলল তখুনি ওর অফিসের সামনে যেতে একটা স্যানিটারি প্যাডের প্যাকেট কিনে নিয়ে। ডেটের আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে। আমি তড়িঘড়ি গেলাম একটা দোকানে। সেখানে গিয়ে জিনিসটা চাইতেই দোকানদার ভদ্রলোক আমায় যে চাহনিটা ছুঁড়ে দিলেন সেটা প্রথম মাল খেয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার পর বাবা দিয়েছিল। না বাবাও কিছু বলেননি। লোকটাও কিছু বললেন না। সেই কাগজে আচ্ছা করে মুড়েই দিলেন। এর পরেও এমন অবস্থায় পড়া দু’এক জন বন্ধুনির জন্যে স্যানিটারি প্যাড কিনতে গেছি। কোথাও এক রিয়্যাকশন কোথাও আবার খুবই স্বাভাবিক ব্যপারের মতোই ডিল করা হয়েছে।

আমার মাথা যন্ত্রণা হলে যদি আমি আমার কোনও বন্ধুনিকে বলি একটা ক্যালপল নিয়ে আয়, সে নিয়ে আসবে। মাথা যন্ত্রণা অসুখ, স্বাভাবিক নয়। তাও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সেটা স্বাভাবিক। এই নিয়ে লেখার বা বলার কিছু নেই।

বন্ধুনির পিরিয়েড হলে আমায় বলল একটা স্যানিটারি ন্যাপনিকের প্যাকেট নিয়ে আয়। আমি নিয়ে এলাম। পিরিয়ড অসুখ নয়, স্বাভাবিক ঘটনা। তাও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সেটা অস্বাভাবিক। এই নিয়ে লিখতে হয়, বলতে হয়।

তা অনেকে শুধু লিখে, কথা বলে শেষ না করে, কাজে করে দেখান। মেয়েদের সব বিষয়ে ছেলেদের কথা বলার শুধু অধিকারটা ধরে না রেখে, অহেতুক বাকবিতণ্ডায় না গিয়ে, শুধু একটু চোখ মেলে তাকিয়ে সহ-নাগরিকের প্রতি সামান্য একটু সহমর্মিতা দেখানোর সাহস রাখেন কেউ কেউ।

তা এই যে হুট কর পিরিয়ড শুরু হয়ে গেলে প্যানিক শুরু হয় তার কারণ হল শহরের প্রায় কোনও সরকারি, বে-সরকারি, আধা-সরকারি, ইস্কুল, কলেজ, অফিস কোথাও, কোত্থাও স্যানিট্যারি প্যাড সহজলভ্য নয়। সুলভ শৌচাগারে তো ছেড়েই দিলাম। এক ওই ওষুধের দোকান এবং শুধুমাত্র ওই ওষুধের দোকানই। একেকটা জায়গায় কফি মেশিন থেকে শুরু করে ক্লোনিং ডিভাইস সব থাকে। এই চেলো কাবাব খেয়ে ওজন বেড়ে গেল বলে পাশে গিয়েই ট্রেডমিলে খানিক দৌড়ে নিলেন। কিন্তু স্যানিটারি প্যাডস? উঁহু! থাকে না। কেন থাকে না? কারণ পিরিয়ড সবার হয় না। আর যাদের হয় তাদের মধ্যেই আর্ধেকের বেশি মানুষ সেই বন্ধুনির ঠাকুমার মতোই মনে করেন বিষয়টা বেজায় গুহ্য। আমার এক বন্ধুর একটা অমর উক্তি আছে।

–বল তো কী করে বুঝলাম বন্ধুরাই সবচে’ কাছের হয়?
–কী করে?
–ক্লাস ফাইভে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম— মা পিরিয়েড কী? বাবা উদমা কেলিয়েছিল। তারপর এক বন্ধু বলে দিয়েছিল। সেই থেকেই।

সমাজের পরিস্থিতির গড় করলে এই হল তার রেজাল্ট। ভাগফল শূন্য। কিন্তু প্রতিটা হ্যাপি এন্ডিং-এরই একটা করে শাহরুখ খান থাকে। তেমনই প্রতিটা থেমে থাকার থাকে একটা বদলের আশা।

সেই আশার কথা হল পরিস্থিতি বদলাচ্ছে একটু একটু করে। এই প্রশ্নটা যদিও আমার বা আপনার মাথায় কোনওদিন আসেনি যে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেন সহজলভ্য নয়, বাইশ বছরের একটা ছেলের মাথায় এসেছিল। শোভন মুখোপাধ্যায়। তার কাজের কথা আপনারা আগেও পড়েছেন এই পত্রিকায়। এঁর উদ্যোগেই শহরের বেশ কিছু সুলভ শৌচাগারে কিছুদিন আগে থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন পাওয়া যাচ্ছিল। চেনা-অচেনা মেয়েদের জীবনগুলোকে একটু সহজতর করে তুলতে কাজটাকে কীভাবে আরও ভালোভাবে করা যায় সেই চিন্তা তাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলে দিনরাত্রি।

এখন একা নয়। রোটারি ইন্টারন্যাশনাল (সল্টলেক শাখা) ও প্রথমা ফাউন্ডেশনের সাহায্যে আজকাল পাঁচ টাকায় স্যানিটারি ন্যাপকিন পাওয়া যাচ্ছে ভেন্ডিং মেশিন থেকে। আগে এগুলি থাকত পিচবোর্ড বা কাঠের বাক্সে। গোলপার্কের কাছের এক সুলভ শৌচালয় দিয়ে শুরু করা হয়েছিল এই উদ্যোগ। ঠিকঠাক অর্থসাহায্য পেতে থাকলে আস্তে আস্তে তা আরও ছড়িয়ে পড়বে। ছড়িয়ে পড়ুক। ছড়িয়ে পড়া উচিত।

শোভনের বয়স বাইশ। তাঁরও বায়োলজিক্যালি পিরিয়ড হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কেন এই উদ্দাম প্রেমটেম বন্ধুবাজি মস্তি করার বয়সে সে এমন একটা গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল? এ কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম তাঁকে। উত্তরটা হুবহু তুলে দিচ্ছি।

আসলে পত্রিকার একটা মিটিংয়ের সময় আমার এক বান্ধবীর হঠাৎ করে পিরিয়েড শুরু হয়ে যায়। আশেপাশে কোনও দোকান বা কিছুই ছিল না। সে নাজেহাল অবস্থা তার। তখনই মাথায় আসে এবং আরও বান্ধবীর সাথে কথা বলে জানতে পারি যে সত্যিই যদি বিভিন্ন সুলভ শৌচালয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখা যায় তাহলে বিশেষ সুবিধে হয়। সেই থেকেই এই উদ্যোগ।

নাহ। এখানেও থামেনি শোভন। এই ভেন্ডিং মেশিন থেকে যে প্যাড পাওয়া যায়, সেই প্যাডে “স্যাপ জেল” (যা অধিকাংশ প্যাডে থাকে এবং যার কারণে প্যাড ফ্লাশ করলে ফুলে ওঠে) নেই। তাই আমাদের পরিবেশের জন্য এই প্যাডগুলি তুলনামূলকভাবে ভালো। যাদের পিরিয়ডে বেশি ফ্লোয়ের সমস্যা থাকে, তাদের কথাও ভেবেছে শোভন। এই প্যাডগুলি তারাও ব্যবহার করতে পারবেন।

গুগুল প্লে-স্টোরে “BANDHAN NAPKIN” বলে সার্চ দিলে একটা অ্যাপও পাওয়া যাবে যেখানে সেই সমস্ত বাথরুমের লোকেশন দেওয়া আছে যেখানে শোভনের উদ্যোগে ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন লাগানো হয়েছে। আশা করা যায় শহরের সব সুলভ শৌচালয়ের লোকেশনই একদিন পাওয়া যাবে এখানে।

আর কী, এই অ্যাপ ডাউনলোড করে ফেলুন তাড়াতাড়ি। আর আমার মতো কোনও ইনসেনসিটিভ পি.এম.এস জোক ক্র্যাক করলে তাকে ঘাবড়ে দিতে ব্যাটম্যানের গলা জিজ্ঞাসা করুন—

“TELL ME, DO YOU BLEED?”

আরেকটা কাজ করতে পারেন। একটু সময় নিয়ে নিজেকে ভাগ্যবান/ভাগ্যবতী মনে করুন, যে শোভনের মতো মানুষেরা সাড়ম্বরে কোনও দিবস পালন না করে, কোনও বিশাল ক্যাম্পেনের বিজ্ঞাপনে প্রচুর টাকা খরচ না করে, কোনও প্রত্যাশা না রেখে শুধুমাত্র ভালো মানুষ হওয়ার সুবাদে এইসব পাগলামি করে বেড়ায়।

একটা আর্টিকেলে পড়েছিলাম শোভনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—

–মেশিন খারাপ হয়ে গেলে তখন?
–আমি আছি তো!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...