বিল-বিরোধিতা, নাগরিকত্ব ও উত্তরপূর্বে জাতিবিদ্বেষী রাজনীতির চলমান অধ্যায়

তানিয়া লস্কর

 

আজকাল রাজনীতি এবং খবরের জগতে উত্তর-পূর্বাঞ্চল খুব চর্চার বিষয়। বিশেষ করে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপনের পর থেকে। মিটিং, মিছিল থেকে শুরু করে আত্মহত্যার হুমকি পর্যন্ত। এমনকি ত্রিপুরাতে বিরোধ প্রদর্শনকারীদের উপর পুলিশ গুলিও চালায়। মিজোরামে আবার লোকজন “হ্যলো চাইনা, বাই বাই ইন্ডিয়া” লেখা প্লেকার্ড হাতে নিয়ে রাস্তায় নামেন। আপাতদৃষ্টিতে বিচার করলে এই বিলটি ধর্মীয় পরিচয়কে নাগরিকত্বের আধার বানিয়ে ভারতীয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্টকে ধ্বংস করে। সুতরাং এর বিরোধিতা করা ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি শুভ লক্ষণ। কিন্তু উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উপজাতি প্রধান রাজ্যগুলিতে বিল-বিরোধিতার স্বরূপ বিচার করলে একটি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র উঠে আসে।

মিজোরাম, মণিপুর কিংবা নাগাল্যান্ডে ইত্যাদি জনজাতি প্রধান রাজ্যগুলোতে বহু আগে থেকেই সমতলীয় লোকদের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ প্যারানোইয়া কাজ করে। মাঝে-মাঝেই ছোটখাট ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেখান থেকে সমতলীয় লোক বিশেষ করে বাঙালিদের খেদিয়ে পাঠানো হত। আজকাল সরাসরি বাংলাদেশি অপবাদে খেদে পাঠানো কিংবা মবলিঞ্চিং এর রূপ নিচ্ছে। গত বছর আগস্ট মাস থেকে অরুণাচল প্রদেশ ছাত্র ইউনিয়ন আপসু অপারেশন “ক্লিন ড্রাইব” বলে একটি অভিযানের ডাক দিয়েছে। তাদের দবি তাদের এই অভিযান বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে। গত ১২-ই জানুয়ারি অরুণাচলের অঞ্চলে একটি বাস আটকে প্রায় ত্রিশজন লোককে আটক করা হয় এবং তাদের জিনিসপত্রগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুয়াহাটি রেলস্টেশনে আকছার কিছু বিশেষ বেশভুষার লোকদের বাংলাদেশি সন্দেহে ধরপাকড় করা হয়। এবং কোথাও কোথাও তাদের কান ধরে উঠাবসা করানো, বেত্রাঘাত ইত্যাদি খবর প্রয়াশই খবরের কাগজ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। ২০১৮ সনের ৩০শে জুলাই যখন এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হয় তখন মণিপুর এবং মেঘালয়ের অসম সীমানাগুলোতে কিছু ছাত্র সংগঠন চেকপোস্ট বানিয়ে পাহারায় বসে। তাদের ভয় এখন হাজারে হাজারে বাংলাদেশি যাদের এনারসিতে নাম আসেনি তারা তাদের রাজ্যে ঢুকে পড়বে। অবশ্য তারা একজনও বাংলাদেশি লোক ধরতে পেরেছেন বলে শোনা যায়নি। পরে রাজ্য সরকারগুলোর হস্তক্ষেপের ফলে সেসব বন্ধ হয়। বিলের বিরোধিতার মূলেও রয়েছে সেই একই প্যারানোইয়া। প্রতিবাদকারীরা ধরে নিচ্ছেন যে বিল হলে লাখে লাখে বাংলাদেশি হিন্দুরা ভারতে এসে ঢুকবে এবং এতে তাদের প্রভুত্ব হ্রাস পাবে। বিলের ফলে হিন্দুরা নাগরিকত্ব আদৌ পাচ্ছেন কি না সেটা স্বতন্ত্র প্রশ্ন। কিন্তু বিলের নামে উপজাতি এবং বৃহত্তর অসমিয়া জনগোষ্ঠীকে তাদের শত্রু চিনিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে। তাদেরকে বোঝানো হয়ে গেছে যে একশ্রেণির লোক তাদের প্রভুত্ব কেড়ে নেওয়ার পথে। মানে গোদা বাংলায় বললে নাগরিকদের মধ্যে দুইটি শ্রেণি তৈরি করা হয়ে গেছে।

অমর্ত্য সেন তাঁর নোবেল বিজয়ী গবেষণা গ্রন্থ “পরিচিতি ও হিংসা”র প্রথম পরিচ্ছদের নামকরণ করেছিলেন “বিভ্রম থেকে হিংসা”। এই পরিচ্ছদে তিনি আত্মপরিচয়বোধ এবং এর সাথে সংযুক্ত দ্বন্দ্ব ও সংঘাত নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি কিংবা জন্মস্থান অনুযায়ি মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন বর্গে ভাগ করা  যায়, এমন একটি ধারণা সমকালীন জগতে সম্ভাব্য সংঘর্ষের এক প্রধান উৎস। নেলি থেকে শুরু করে বড়োল্যান্ড, অরুণাচলের কিছুলোকের জিনিসপত্র জ্বালিয়ে দেওয়া এপর্যন্ত এখানে যেসব সহিংস ঘটনা ঘটেছে (নাকি ঘটানো হয়েছে) সেগুলির মূলে যে ভূমিপুত্র এবং বহিরাগত দ্বন্দ্বটি রয়েছে সেটির তথ্যমূলক বিশ্লেষণ করলে এ সত্যটি খুব সহজেই নজরে পড়ে। শরণার্থী, বাংলাদেশি কিংবা বহিরাগত যে নামেই সম্মোধন করা হোক না কেন মানুষের  কিংবা আরও স্পষ্টভাবে বললে নাগরিকদের মধ্যে দুটি শ্রেণি সৃষ্টি করলে যে নিট ফলাফল আসে তার একটি হল  সস্তায় শ্রম। চা-বাগানের লোকেরা যেটা শতাব্দী ধরে দিয়ে আসছে (তাই কি ওঁরা এনআরসি বিভ্রমে সহজে রেহাই পেলেন)। তার সাথে যদি বাঙালি নিম্নশ্রেণির হিন্দু এবং মুসলমানরাও যুক্ত হন তাহলে তো সোনায় সুহাগা। সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত এবং ব্যবসায়িক শ্রেণি তো লাভবান হচ্ছেনই সেই সঙ্গে ফাউ হিসেবি রাজনীতিতেও যুক্ত হচ্ছে এক নতুনমাত্রা। যেকোনও সময় এই বিভ্রমকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক লাভালাভের হিসেব কষা যাবে। তাছাড়া এই বিরোধটা যদি হিংসাত্মকরূপ নেয়, তাহলে আফস্পার মেয়াদ বাড়ানোটাও আরও সহজ হয়ে পড়বে। সুতরাং এই বিল-বিরোধিতা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার চেয়ে বেশি জরুরি প্রকৃত গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিগামী অবস্থান থেকে বিলের বিরোধিতা করা। কিছুলোকের মধ্যে একটি জাতির বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে ভয় উসকে দিয়ে বিল বিরোধিতা করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1254 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...