দক্ষিণ আমেরিকার বন্ধুদের সঙ্গে মৃণাল সেন

ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী

 

 

লেখক ক্যুবার ইআইসিটিভি (EICTV)-তে ফিল্ম পরিচালনা ও চিত্রনাট্য রচনার পাঠ নিয়েছেন। তখন ঘনিষ্ঠ পরিচয় মৃণাল সেন ও মার্কেজের সঙ্গে। স্প্যানিশ ভাষায় ব্যুৎপত্তির কারণে সেই ভাষাতে গ্রন্থ রচনাও করেছেন। এ-ছাড়া ইংরিজিতেও বই লিখেছেন সিনেমা-বিষয়ক। বর্তমানে নিউজিল্যান্ডের বাসিন্দা।

 

মৃণালদা গল্প বলতে ভীষণ ভালবাসতেন। অনেক সময় একই গল্প বারবার বলতেন। জানতাম কী হতে চলেছে তবু নতুন করে শুনতে বেশ মজা লাগত৷ ওঁর জ্বলজ্বলে, প্রাণবন্ত সরল অথচ গভীর চোখদুটো ছিল আকর্ষণের প্রধান কারণ। শুধু চোখের উজ্জ্বলতার ভিত্তিতে যে সাধারণ ও অ-সাধারণ মানুষের মধ্যে সহজে পার্থক্য করা যায়, সেটা মৃণালদাকে দেখে প্রায়ই মনে হয়েছে৷

অনেকগুলো প্রিয় গল্প ছিল ওনার— ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে তর্কালাপ, বিখ্যাত ফরাসি পরিচালক এরিক রোমার-এর সুন্দর বাথরুমে শ্যাম্পু ভেবে কী একটা ভুল জিনিস মেখে সম্পূর্ণ নীল হয়ে যাওয়া, ‘একদিন প্রতিদিন’ দেখানোর পর ধর্মতলার রাস্তায় সহস্রাধিক মানুষ ওনাকে ঘেরাও করেছিল এটা জানার জন্য মহিলা আগের দিন রাত্রে কোথায় ছিলেন, এরকম  আরও কত কী! এরই মধ্যে একটা প্রিয় গল্প ছিল ওনার সঙ্গে ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের বন্ধুত্বের কথা। ফরাসি দেশে ১৯৮২ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দুজনেই আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বিচারক হিসেবে৷ সেই সময় গার্সিয়া মার্কেজ নাকি তাঁকে বলেন যে তাঁর ‘অটম অফ দা প্যাট্রিয়ার্ক’ উপন্যাসের একটা দৃশ্য ভারতের একটা ফটো দ্বারা অনুপ্রাণিত৷ দেড়শো বছরের একনায়ক যখন মারা যায়, তার ফাঁকা প্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় একটা গরু৷ মৃণালদাকে লেখক প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে যদি চান, ঐ উপন্যাসটার তিনি চলচ্চিত্রায়ন করতে পারেন ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপট। পরে, উপন্যাসটা পড়ে ও তার জটিলতা দেখে মৃণালদা হাল ছেড়ে দেন।

কিন্তু এক বছর পরে গার্সিয়া মার্কেজ ওনাকে আমন্ত্রণ জানান হাভানায়, EICTV ফিল্ম স্কুলের উদ্বোধনে, যার প্রতিষ্ঠাতা ও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সভাপতি ছিলেন লেখক নিজেই৷ দুজনের একসঙ্গে যে ফটোটা দেখা যায়, সেটা EICTV-র ওয়ার্কশপের সময়। প্রসঙ্গ ছিল, গল্পের আইডিয়া কোথা থেকে আসে। আর ঐ EICTVকে কেন্দ্র করেই মৃণালদার সঙ্গে আমার পরিচয়। সেখানে চার-বছর ধরে পড়াশুনো করার জন্য আমার নাম পাঠান মৃণালদা। তাই ব্যক্তিগতভাবে আমি ওনার কাছে বিশেষ কৃতজ্ঞ। সেই যোগাযোগটা হয়েছিল আশ্চর্য আকস্মিকভাবে। কিন্তু সে কথা থাক।

হাভানা থেকে উনি ফিরে আসার বেশ কয়েক বছর পরেও, ঐখানে মৃণালদার জনপ্রিয়তার অনেক প্রমাণ আমি পেয়েছি। সাধারণ মালি থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার বিখ্যাত অনেক পরিচালক ওনার কথা জিজ্ঞেস করতেন। তখন ওনার ‘জেনেসিস’ ছবিটি বেরিয়েছে। সেটা এদেশে বিশেষ চলেনি, কিন্তু বিদেশে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার জ্যঁ ক্লদ কররিয়ের একটা কাব্যিক প্রবন্ধ লিখেছিলেন ছবিটাকে নিয়ে৷ ‘জেনেসিস’ নিয়ে একটা গল্প প্রায়ই বলতেন। প্যারিসের বিমানবন্দরে কোনও এক কারণে এক ইমিগ্রেশন অফিসার ওনাকে অনেকক্ষণ ধরে জ্বালাচ্ছিল। তারপর জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি ঠিক কী কারণে এদেশে এসেছ?’ উনি বলেন, ‘আমার ছবি এখানে দেখাচ্ছে।’

‘কী নাম তার?’
‘জেনেসিস।’

বলতেই সেই সরকারি কর্মচারী চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে ওনাকে জড়িয়ে ধরে। বলে, গতকাল রাতে আমি আর আমার প্রেমিকা ‘জেনেসিস’ দেখেছি৷ আমাদের অসাধারণ লেগেছে। তারপর সেই অফিসারের কত আদর-যত্ন আর ক্ষমা চাওয়া!

গার্সিয়া মার্কেজকে আমরা সকলেই ওনার ডাকনাম ‘গাবো’ বলে ডাকতাম। আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন, ‘মিরিনাল’ এখন কী করছে। মৃণালদা ‘গল্পের সূত্রপাত’ নিয়ে যে ওয়ার্কশপটা করেন, তার শুরুতেই বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত আমাকে ইংরিজিতে কথা বলতে হচ্ছে আর তার কারণ এই যে ভারতে ইংরেজের উপনিবেশ হয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে, যদি স্পেনের উপনিবেশ হত ভারতে, তাহলে অন্তত একটা মজা হত৷ আপনাদের সঙ্গে সরাসরি স্প্যানিশে কথা বলতে পারতাম।’ তাতে এতই হাততালি পেয়েছিলেন যে তারপরে যেখানেই যেতেন, ঐ কথাগুলো দিয়েই শুরু করতেন৷ আর আমার মতো তারাও, এক কথা বারবার শুনে মজা পেত।

দক্ষিণ আমেরিকার মানুষেরা বাঙালিদের মতোই আড্ডাপ্রিয়। আমাদের মধ্যে একটা ভুল ধারণা বদ্ধমূল যে ‘আড্ডা’ একটা বাঙালি প্রতিষ্ঠান। আড্ডার একটা বাঙালি চরিত্র আছে ঠিকই কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে যারা কোনও সাংস্কৃতিক আড্ডা এবং আলাপ-আলোচনা উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন, তারা অন্তত ওই কূপমণ্ডুকতা থেকে মুক্ত হয়েছেন। আড্ডার কয়েকটা বাহ্যিক অসাদৃশ্য উপেক্ষা করতে পারলে, সাদৃশ্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনীতি আর সংস্কৃতিকে কেন্দ্রে রেখে, সাহিত্য চলচ্চিত্র আর ভালোবাসা নিয়ে আলোচনা, নাচ-গান আর পশ্চাতে প্রেমলীলা, সব মিলেমিশে যায়। ভাষার সমস্যার জন্য মৃণালদা সরাসরি যোগদান করতে পারতেন না বলে খুব দুঃখপ্রকাশ করতেন। আমাকে একবার বলেছিলেন, ‘তোমার কী মজা! ওদের সঙ্গে এক্কেবারে মিশে যেতে পারো!’ প্রায়ই বলতেন, ‘আমি গ্লোবট্রটার, কিন্তু হাভানার মতো উষ্ণতা কোথাও পাইনি।’

হাভানা থেকে ফিরে গীতাদিও খুব উত্তেজিত ছিলেন। সব কিছু ছাপিয়ে ওনাদের যেটা বিশেষ স্পর্শ করেছিল সেটা হচ্ছে কিউবার ‘সালসা’ নাচগান আর ‘ফিয়েস্তা’-র প্রাণবন্ত পরিবেশ। গীতাদির কাছ থেকে শুনে দারুণ লেগেছিল যে ওখানে ওনার মনে হয়েছিল যে মানুষ কেন যৌন উত্তেজনায় অবগাহন করবে না! ফিয়েস্তার পরিবেশে ওনার মনে হত যে আমাদের সাধারণ প্রচলিত মূল্যবোধগুলো কেমন যেন অর্থহীন।

১৯৮৮-তে হাভানায় যাওয়ার আগে, মৃণালদাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওখানে খাওয়া-দাওয়ার রীতি কীরকম। মৃণালদা বলেন, “ভাত খাবে, পাউরুটি খাবে, চুমু খাবে।” বলে ওনার নিজেরই এত মজা লাগল যে বারবার বললেন, “অনেক অনেক চুমু খাবে।” গীতাদি পাশেই বসে ছিলেন। বললেন, “খুব একটা ভুল কিছু বলেনি।” আমাকে মৃণালদার সঙ্গে আলাপ করাতে নিয়ে গেছিলেন তখনকার একজন বিদগ্ধ অধাপক, ধ্রুব গুপ্ত৷ ধ্রুবদা বললেন, “মৃণালদা, আপনি এই সরল ছেলেটার মাথায় এখন থেকে কী সব ঢোকাচ্ছেন।” মৃণালদা বললেন, “আরে, চুমু খেতে বলছি, ওটাই তো সরলতা।”

মানুষের উষ্ণতা ছাড়াও দক্ষিণ আমেরিকার বামপন্থী চলচ্চিত্র ওনার খুব প্রিয় ছিল। ভাষার বিভেদ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে বাছাই করে ওদের ছবি দেখতেন আর ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতেন। অবশ্যই ওদের ছবি-করার লড়াই, রাজনৈতিক/ইতিহাস-চেতনা আর টানাপোড়েন ওনাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করত। ব্রেসিলের বিখ্যাত পরিচালক গ্লোবার রশা এবং দস সান্তোস, কিউবার আলেয়া এবং সোলাস, আর্জেন্টিনার সোলানাস এবং বিররি, চিলের মিগেল লিতিন, এঁদের  সঙ্গে মৃণালদার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। সোলানাস ১৯৯৩-এ, এবং লিতিন ১৯৯৪-এ কলকাতায় আসেন, চলচ্চিত্র উৎসবে। সেই সময়ে সারাক্ষণই আমি অনুবাদক হিসেবে ওনাদের মাঝখানে ছিলাম। প্যারিসে প্রথম সোলানাসের সঙ্গে মৃণালদার আলাপ। “আপনি কোন দেশের পরিচালক?”, এই প্রশ্নের উত্তরে সোলানাস বলেছিলেন, “আমি এমনই এক দেশের মানুষ যে দেশ থেকে আমি নির্বাসিত।” প্যারিসে ছিলেন নির্বাসনে আর তখন আর্জেন্টিনার জীবন নিয়ে অসাধারণ অনেক ছবি করেছিলেন। কলকাতায় সোলানাসের সঙ্গে যে সব কথোপকথন হয়েছিল, সে বিষয়ে অনেকদিন আগে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম ইংরিজিতে। মিগেল লিতিনও দীর্ঘদিন নির্বাসনে ছিলেন, কিছুকাল মেক্সিকোতে, বাকি সময় প্যারিসে। লিতিনকে নিয়ে আমাদের যে সময়টা কেটেছিল, সেটা অত্যন্ত স্মরণীয়।

ওনাকে নিয়ে উত্তেজনার একটা প্রধান কারণ এই যে গার্সিয়া মার্কেজ লিতিনের ওপর একটা রোমহর্ষক বই লিখেছিলেন। বঙ্গানুবাদে তার নাম দাঁড়ায়, ‘চিলেতে গোপনে’। আমাকে ছাড়া যেহেতু কোনও আলোচনাই সম্ভব ছিল না, আমি সর্বত্র নিমন্ত্রিত হতাম। লিতিন আমাকে একবার বলেছিলেন যে ‘গাবো’কে উনি যত কথা বলেছিলেন বইয়ে তার পাঁচ শতাংশ মাত্র পাওয়া যাবে। ঔপন্যাসিক আলেহো কার্পেন্তিয়ের, চলচ্চিত্রকার বুনুয়েল এবং ‘গাবো’ সম্বন্ধে ওনার ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের যে গল্পগুলো লিতিন আমাকে বলতেন, তার কিছু কিছু এসে মৃণালদাকে শোনাতাম; অবাক হয়ে শুনতেন আর আমাকে হাজারটা প্রশ্ন করতেন। একবার মৃণালদা লিতিনকে ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেছিলেন বর্ধমানের একটা গ্রামে যেখানে দশ বছর আগে উনি ‘আকালের সন্ধানে’ শুটিং করেছিলেন। আমাদের পেছনে ধাওয়া করেছিল আনন্দবাজারের একজন সাংবাদিক আর সেই ধাওয়া করার ভিত্তিতেই একটা লেখা লিখেছিল।

পথে একটা জায়গায় বিশ্রাম করার জন্য আমরা থেমেছিলাম নদীর ধারে একটা অপূর্ব বাগানবাড়িতে। সেটা ছিল বিড়লা-দের; মৃণালদাকে তারা বলেছিলেন, যতদিন ইচ্ছে ওখানে থাকতে পারেন। নদীর ধারে বসে আছি আমরা,  আমার একদিকে লিতিন, অন্যদিকে মৃণালদা। দূরে একটা নৌকো যাচ্ছে, তার ছায়া পড়েছে জলে। লিতিন আমায়  বললেন, “মিরিনালকে জিজ্ঞাসা করো, কোনটা বেশি সুন্দর, নৌকোটা না কি নৌকোর ছায়াটা?” আমি তর্জমা করতেই মৃণালদা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করতে শুরু করলেন। প্রশ্নটার একটা রাজনৈতিক দিক আছে ভেবে বললেন, “সবকিছু সুন্দর, নৌকো সুন্দর, তার ছায়াটাও সমান সুন্দর।” গাড়িতে যেতে যেতে দুজনের মধ্যে নানারকম যৌন-ভিত্তিক রসিকতা চলত, বিশেষত বিখ্যাত লেখকদের যৌনজীবন নিয়ে, আর আমি কোনওরকমে তার অনুবাদ করে যেতাম।

এমনি একটা আনন্দের মুহূর্তে লিতিন ওনাকে জিজ্ঞেস করলেন, “মিরিনাল, এখনও বলো, অমরত্ব চাও? তাহলে কিন্তু কানেতে গ্র্রা প্র্রি পেতে হবে।” মৃণালদা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “যদি কেউ বার্লিনে গোল্ডেন বেয়ার পায়?” (যেটা মৃণালদা পেয়েছিলেন ‘আকালের সন্ধানে’র জন্য)। উনি বললেন, “তাতে অমরত্ব হবে না।” আবার মৃণালদা জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, যদি কেউ কানেতেই জুড়ি প্রাইজ পায় (যেটা উনি পেয়েছিলেন ‘খারিজ’-এর জন্য), তাহলে তার কী হবে?” লিতিন আবার বললেন, “কোনও কিছুতেই অমরত্ব হবে না; একমাত্র কানেতে গ্র্রা প্র্রি পেলে অমরত্ব সুনিশ্চিত।” একটু হতাশ হলেন মনে হল মৃণালদা সেই মুহূর্তে। লিতিন নিজে যদিও দুবার মনোনীত হয়েছিলেন ‘শ্রেষ্ঠ বিদেশি ছবি’ অস্কারের জন্য, তবু কানের সম্মান এদের কাছে সর্বোপরি শ্লাঘনীয়।

লিতিন ও তার স্ত্রী দুজনেই রবীন্দ্রনাথের ভক্ত, স্প্যানিশ জগতে যিনি ‘তাগোরে’ নামে বিশেষ পরিচিত (যদিও বর্তমান প্রজন্মে স্প্যানিশভাষী সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা নিতান্তই ক্ষয়িষ্ণু)। লিতিনের কাছেই প্রথম শুনেছিলাম যে তার দেশের কবি পাবলো নেরুদা রবীন্দ্রনাথের শুধু ভক্ত ছিলেন না, তার বিখ্যাত ‘কুড়িটি প্রেমের কবিতা’ কাব্যগ্রন্থের ছয়নম্বর কবিতাটি নাকি সরাসরি রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতার অনুবাদ। এই সব বিষয়ে মন্ত্রী বুদ্ধদেববাবুর সঙ্গেও অনেক কথা হত। ওকাম্পো-রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তখন লিতিন একটা ছবি করার কথা ভেবেছিলেন। পরে চিলে থেকে চিত্রনাট্যটা পাঠিয়েছিলেন আমাকে; সেটা খুবই গভীর ছবি হতে পারত, আর তাতে দেখি উনি আমাকে একটা চরিত্রে রূপান্তরিত করেছেন। আমার চরিত্রটার নামটা ছিল ভিন্ন কিন্তু তাকে একটা প্রেমিকাও দিয়েছিলেন, তার নাম ছিল ইন্দ্রাণী। আমার বলা অনেক কথা ওই ইন্দ্রাণীর মুখে দিয়েছিলেন। মৃণালদার আশঙ্কা ছিল, “প্রেম নিয়ে যদি ও বাড়াবাড়ি করে ফেলে না, বাঙালি সমাজে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে; তুমি এটা ওকে বুঝিয়ে বলো।” বললাম। তাতে মিগেল লিতিনের উল্টো প্রশ্ন: “তোমরা রবীন্দ্রনাথের যৌনতাকে মেনে নিতে পারো না কেন? আমাদের নেরুদা, গাবো, অন্যদিকে পিকাসো তো দিব্যি চারিদিকে প্রেম করে বেরিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ কেন করতে পারবে না? জীবন-চেতনার একটা বড় অঙ্গ জুড়ে থাকে যৌন-চেতনা, বিশেষত শিল্পীদের ক্ষেত্রে।” মন্ত্রী বুদ্ধদেববাবু ছবিটা করতে খুবই উৎসুক ছিলেন আর আমিও অনেকদিন দৌড়োদৌড়ি করেছিলাম কিন্তু এরই মাঝে বইমেলায় আগুন লাগল, তখন আর ছবির কথা তোলা গেল না।

দক্ষিণ আমেরিকার চলচ্চিত্র মৃণালদার মনে কতটা দাগ কেটেছিল তার সহজ প্রমাণ পাওয়া যায় ওনার নিজের ছবিতে। আসলে তখনকার সত্যজিৎ-বনাম-ঋত্বিক-বনাম-মৃণাল, এইসবের ডামাডোলে মৃণাল সেনের প্রকৃত মূল্যায়ন এখনও হয়নি। তাই কয়েকমাস আগে দেখে ভালো লাগলো ‘নিউ ইয়র্ক রিভিউ অফ বুকস’-এ মৃণালদার ওপরে প্রচ্ছদ-প্রবন্ধ।

মৃণালদা হাভানায় গেছিলেন ১৯৮৬ সালে। তারপর কত কী বদলেছে। আমার যেহেতু দক্ষিণ আমেরিকাতে খানিকটা যোগাযোগ, যাতায়াত আছে, মৃণালদাকে সমাজতন্ত্রের অন্দরমহলের ভয়াবহ অনেক গল্প শোনাতাম। একেবারেই মোহমুক্ত হয়ে গেছিলেন। সোলানাসকে ১৯৯৩-এ জিজ্ঞেস করেছিলেন বাম-আন্দোলনের অধঃপতন তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে কীভাবে স্পর্শ করেছে। সোলানাস, যিনি বামপন্থী চলচ্চিত্রের একজন কর্ণধার, তিনি বলেছিলেন যে বাম চিন্তাধারা ও রাজনীতির অবক্ষয় দেখে তিনি সামান্যতম ব্যথিত নন। এরকম হবে সেটা অনেকদিন আগে থেকেই জানা ছিল। “কিউবাকেই দেখো না, যে ডিক্টেটরকে সরিয়ে ফিদেল কাস্ত্রো এসেছিল, সে এখন নিজেই ঐ ডিক্টেটরের থেকে আরও অনেক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।”

রাজনৈতিক চিন্তাধারা, ধ্যানধারণা যখন সময়ের স্রোতে মুছে যায়, তখন শুধু পড়ে থাকে মানুষের হৃদ্যতা, আর উষ্ণতার স্মৃতি। গাবো আমাদের প্রায়ই বলতেন, “জীবনে কী ঘটে, সেটা জীবন নয়; যা কিছু আমাদের মনে থাকে আর যেভাবে মনে থাকে, সেটাই জীবন।” বছরখানেক আগে হাভানায় নিমন্ত্রিত হয়েছিলাম EICTV-তে অধ্যাপক হিসেবে। ফিরে আসার সময়, মৃণালদার এক বান্ধবী, লোলা কালভিনো, আমাকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে দুগালে চুমু দেন এই বলে, একটা তোমার জন্য, অন্যটা ‘মিরিনাল’-এর জন্য।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...