আমাদের ইকো(নমিক) ট্যুরিজম ও আজকের নববাবু-বিলাস

সুরমিতা

 

 

সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে
নির্জনতা আছে।….

মাঝেমাঝে মনে হয়, এই নির্জনতা শব্দটিকে এবার বাতিল করা দরকার। একটা মিথ্যে শব্দ। পৃথিবীতে এমন কোনও স্থান আর নেই, যা নির্জন। কিন্তু মানুষেরই কখনও কখনও নির্জনতার দরকার হয়। অন্য প্রাণীদের কথা তো ছেড়েই দিলাম। নির্জনতা খুঁজতে গিয়ে বারবারই জনবহুলতার আবর্তে আটকে পড়ি আমরা। আর দারুচিনি-বনানীর দেশকে— খুব ভালো পিকনিক স্পট বানিয়ে ফেলি।

আমাদের ঘুরতে যাওয়াগুলো নিয়ে ভাবছিলাম আসলে। চাকরি পাওয়ার পর পকেট যখন একটু-আধটু ভারি হতে শুরু করল, এতদিনের সুপ্ত ইচ্ছাগুলো চাগাড় দিতে শুরু করল অমনি। তাছাড়া এ একটা হুজুগও বটে। বছর পড়তেই ছুটির তালিকায় চোখ বুলিয়ে নেওয়া। আর তারপর বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান। কখনও বন্ধুদের সঙ্গে, কখনও আত্মীয়। উইকেন্ড ট্যুর, শর্ট ট্যুর, লং ট্যুর, ২৩ থেকে ২৬শে জানুয়ারি ছুটি— চলো বেরিয়ে পড়ি ট্যুরে। এই ট্যুরকে ঘিরে চোখের সামনে হাজাররকম পসরা। বিলাসবহুল হোটেল, রিসর্ট। ছোট্ট কটেজ। শহরের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা পাবেন। ওয়াইফাই কানেকশনও মিলবে। আর থাকবেন প্রকৃতির একদম কোলে। প্রচণ্ড কাজের চাপ থেকে রেহাই পেতে আসুন আসুন— দুদিন জিরিয়ে যান। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, খোলা আকাশের নিচে বিশুদ্ধ অক্সিজেন। আদিবাসী নাচ, মাদলের আওয়াজ— লাগবে? তারও ব্যবস্থা আছে। রিসর্টের আঙিনায় বসে দেখবেন একদম।

সাধ্য কী এই হরেক বিজ্ঞাপনকে এড়িয়ে চলার। ফলে আমরাও দৌড় দিই। টিকিট কাটা, গাড়ি বুক, হোটেল বুক— হাজার, হাজার ছাড়িয়ে লক্ষ টাকা খরচ করে আসি।

ভাবি না, একবারও ভাবি না প্রকৃতির বিজ্ঞাপন দেখে যেখানে গেলাম, তা প্রকৃতির ধ্বংসকেই ডেকে আনল আরও বেশি করে।

আমার এক বন্ধু বলছিল, এই যে প্রত্যন্ত গ্রামে ঘুরে এলাম— শহরের সব দূষণগুলোকে ভরে দিয়ে এলাম সেখানে। প্লাস্টিকের বোতল, ওষুধের র‍্যাপার, চিপসের প্যাকেট, গাড়ির ধোঁয়া— দিয়ে এলাম। আর দেখে এলাম, গাছ কাটা হচ্ছে রোজ। কুড়িটা, তিরিশটা করে গাছ। কটেজ হবে। পাহাড় ভাঙা হচ্ছে। রাস্তা হবে। ফোর লেন রাস্তা। গাড়ি যাবে। আমরা যাব। আমরা শহরের মানুষরা যাব। হুল্লোড় করতে করতে যাব। ওখানেও হুল্লোড় চলবে। সন্ধেবেলা লাইট না পেলে নাক সিঁটকোব। তাই বিদ্যুৎ-তার বসবে। নদীর ওপর বাধ বসবে। আর ইকো-ট্যুরিজম হবে। প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে প্রকৃতিভ্রমণ হবে আমাদের।

সেদিন পাটুলি থেকে রুবির দিকে আসছি। বাঁদিকে একটি ডোবা। তার ওপরে ছোট্ট সাঁকো। রঙিন। ওপারে বড় বড় সূর্যমুখী ফুল। তার পাশে কয়েকটি ছেলেপুলে ফুটবল খেলছে। সব সিমেন্ট দিয়ে বানানো। আসল সূর্যমুখী না, আসল ফুটবল না। কসমেটিক। শহর সাজানো হচ্ছে। সৌন্দর্যায়ন। ফেয়ারনেস ক্রিম মাখিয়ে সুন্দর করা হচ্ছে। মনে হল, আমাদের ইকো-ট্যুরিজমের গল্পটা ঠিক এমনই। কসমেটিক।

আমরা জানি, ভূ-উষ্ণায়নের গল্পগুলো। আমরা জানি, পরিবেশ আর এতটুকু অত্যাচার, আর এতটুকু ধকল নেওয়ার জায়গায় নেই। কেরলের বন্যা, নেপালের ভূমিকম্প, পৃথিবী জুড়ে আরও বড় বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোর কথা আমরা জানি। শুধুই জানি। মানি না। মানুষ তো অনেক কিছুকেই খরচের খাতায় ফেলে। আমরা প্রকৃতিকে ফেলেছি সেই খরচের খাতায়। তাই তাকে দেদার নষ্ট করা চলে। আঁচড়ানো, কামড়ানো চলে। প্রকৃতিকে আমরা দেখেছি রোজগারের পন্থা হিসেবে। যে-সে রোজগার না। মুনাফা। দেখেছি মুনাফা লাভের মাধ্যম হিসেবে। মাটি খুঁড়ে খনি, পাহাড় খুঁড়ে খনি, নদী বুজিয়ে বিদ্যুৎ। উন্নয়ন। আমাদের চোখ চকচকে হয়ে ওঠে। আরও ভালো থাকতে হবে। আরেকটু আরাম। তবে এখানেই শেষ না। আমরা আবার প্রকৃতিকে খুব ভালোবাসি। প্রকৃতিকে তো বাঁচাতেই হবে। বড় বড় আন্তর্জাতিক বৈঠক হয়ে গেল। প্রকৃতি বাঁচানো দরকার। তাই আরেকটি নতুন পন্থা। ইকো-ট্যুরিজম।

বড় বড় কোম্পানিরা দলে দলে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রকৃতি বাঁচাতে। মাঝেমধ্যে ভাবি, কোম্পানির শাসন— কতকাল ধরে কোম্পানির দল আমাদের শাসন করে গেল। তাদের নাম বদলায় শুধু। আমরাও কোম্পানিতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম।

তা সে বড় বড় কোম্পানির দল প্রকৃতি রক্ষার ভার নিল। পাহাড়ে, জঙ্গলে, উপকূলে ঢুকে পড়ল তারা। এর আগেও তারা ঢুকেছিল জঙ্গলের গহনে। কোথাও তারা কাঠ কেটে বিক্রি করেছে। কোথাও আবার মুনাফা এনে দেবে, এমন চাষবাস চালিয়ে গেছে। তাতে গোটা অরণ্যটির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যটি হয়তো হারিয়ে গেছে। সে অঞ্চলের জীববৈচিত্র‍্যটি হয়তো সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে গেছে। তবুও মুনাফা লাভের জন্য তারা বন লুঠ করেই গেছে। এবার তারা এল প্রকৃতি বাঁচানোর দায় নিয়ে। মানে কোথাও যদি তারা গাছ কেটে থাকে, তাহলে নাকি সে গাছ তারা আবার লাগিয়ে দেবে। মুসকিলটা হল, দেড়শো বছরের পুরনো গাছের বিকল্প কি একটি চারাগাছ হতে পারে। কিন্তু তাও একথা তারা বলে চলে। বন নষ্ট করলে নাকি বনও তারা  নির্মাণ করতে সক্ষম। অথচ সত্যটি হল এই যে, বন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। বন প্রাকৃতিকভাবে যুগের পর যুগ ধরে তৈরি হয়। বনের বদলে  মানুষ বড় জোর বাগান বানাতে পারে। সে যাই হোক। তারা এমন নানা কথা বলতে থাকেই। সরকারও হাত মেলায় তাদের সঙ্গে। এবার তারা প্রকৃতিপ্রেমী হয়ে উঠল। কখনও বলল, এখানে যে মানুষরা থাকে তারাই প্রকৃতি ধ্বংস করে। তাদের জন্য জঙ্গলের ক্ষতি হয়। কিন্তু কীভাবে? স্বাভাবিক হিসেব বলে, জঙ্গলের মানুষ, নদীর ধারে থাকা মানুষ, সমুদ্রের তীর ঘেঁষা মানুষ— জঙ্গলকে, নদীকে, সমুদ্রকে বাঁচায়। কারণ তারা সেগুলির ওপরেই নির্ভর করে থাকে। জঙ্গল পাহাড় তাদের ঘর বাড়ি, অস্তিত্ব, সংস্কৃতি, বেঁচে থাকা।

কিন্তু না। কোম্পানি বলছে। দেশের সরকার বলছে। আর সরকারদের নামজাদা ভৌগোলিক, বৈজ্ঞানিক থাকে। তারাও বলছে। আমরাও, শহরের মানুষরাও মেনে নিলাম। মেনে নেওয়া এমনিতেই আমাদের স্বভাব।

শুধু এটুকুই না। কোম্পানি দখল নিল প্রকৃতির। যদিও বহুযুগ ধরেই তার দখলদারির কাজ চলছে। আরও নিচ্ছে। সমস্তটা সে নেবে।

এবার তার ভেতরের বাইরের সবটুকু শুষে নেওয়ার পর, পরিবেশ সেবারও খানিক দায় পড়ল তার। ইকো পার্ক হল। ইকো ভিলেজ হল। এগুলি নাকি ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃতিকে, সেই অঞ্চলের সংস্কৃতিকে, জীবনাচরণকে রক্ষা করবে।

কীভাবে করবে, তা পরিষ্কার হল না। কারণ শহুরে বাবুবিবি, মফস্বলের বাবুবিবিদের থাকার জন্য একের পর এক হোমস্টে নির্মিত হয়ে চলেছে। নাম হোমস্টে। কিন্তু ব্যবস্থা প্রায় পাঁচতারা হোটেলের মতোই। মিনারেল-ওয়াটারের বোতল, ফ্রুট জুসের প্যাকেট সব হাজির করে দেয় তারা। ডিজে চালিয়ে নাচও হতে পারে। আগুন ঘিরে উল্লাসও হতে পারে। সেই অঞ্চলের, সেই পরিবেশের বান্ধব হয়ে থাকা হল কোথায়…?

আর সে অঞ্চলের পশুরা, পাখিরা? ধরুন উত্তরবঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় হোমস্টে। সেখানকার বন্য পশুদের তো সবার আগে সরিয়ে ফেলা হবে ট্যুরিস্টদের সুরক্ষার্থে। শহরের ট্যুরিস্ট আর হিংস্র চিতারা নিশ্চয়ই হোমস্টেতে পাশাপাশি থাকে না। তাহলে কোথায় যায় তারা? আর কীভাবেই বা হয় পরিবেশ রক্ষা? অভয়ারণ্য? সেখানেও কি জিপগাড়ির ধোঁয়া উগরে দিয়ে আসি না আমরা? সেখানেও কি রেলগাড়ির ধাক্কায় মারা পড়ে না বিপুল হাতি? কিন্তু এতসব ভাবার সময় নেই আমাদের। বেড়াতে গিয়ে এসব ভাবে নাকি লোকে?

আর আমাদের হাত ধরে, কোম্পানির হাত ধরে, সেইসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের ভিতরেও ঢুকে যায় ‘আধুনিকতা ও উন্নয়ন’-এর বিষ। স্মার্ট ফোন আসে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট আসে। আসে নানা প্রলোভন। নানান রঙিন স্বপ্ন, কল্পনা। যার সাথে প্রকৃতি পরিবেশের কোনও সম্পর্ক নেই।

কোথায় থাকে তার কৃষ্টি আর কোথায়ই বা তার সংস্কৃতি। সারাবছর পর্যটকদের ভিড়। সেখানেও ছোট ছোট শহর গড়ে তোলে।

আর আমরা ইকো-ট্যুরিজমের দারুণ ভাঁওতাবাজিতে সবাই মশগুল হয়ে থাকি।

পরিবেশ-বিরোধী এক জীবনেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি ক্রমশ। তাই আমাদের এই বেড়াতে যাওয়াগুলোর মধ্যে সেই বিরোধিতার বিষ লুকিয়ে থাকে। অজান্তেই আমাদের চাহিদাগুলো তেমনি হয়ে যায়। আর মুনাফা লোটে কোম্পানি, মুনাফা লোটে সরকার। প্রলোভন দেখায়।

আমার এক ছাত্র একদিন বলল, সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গিয়ে তারা নাকি রিসর্টের স্যুইমিং পুলে সময় কাটিয়েছে। ব্যাপারটা দারুণ, না?

হাসি পেলেও বুঝতে পারি, ইকো ট্যুরিজমের মায়া।  বেড়াতে যাওয়ার নেশা প্রায় ইনজেকশন দিয়ে চারিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের রক্তে। আর প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে আমরা নেশার মতোই বেড়িয়ে চলেছি। একটা শেষ না হতেই আরেকটা। পাহাড় জঙ্গল সমুদ্র— ছুট ছুট ছুট….

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...