লেই-জু ও অহিংসা পথ

সেবন্তী ঘোষ

 

স্বাস্থ্যবতী নারী শরীরগুলিকে আগেই এনে রাখা হয়েছিল। এবারে তারা তুলনায় ক্ষুদ্রকায়, সতেজ চনমনে পুরুষগুলিকে এনে ছেড়ে দিল। উর্বরতার পরীক্ষায় একশো ভাগ উত্তীর্ণ নারীর দল এই প্রবল সক্ষম তরুণদের উপস্থিতিতে মাতোয়ারা হয়ে আহ্বান গন্ধ ছড়াতে শুরু করল। এতক্ষণ একদলা হয়ে থাকা নারীর গুচ্ছকে ভেঙে ফ্যালে সেই ভেজা, সদ্য পচা পাতার সঙ্গে মেশা মাছের আঁশটে গন্ধের মতো কামনা-মদির সুবাস। হৃষ্টপুষ্ট নারীরা ক্ষীপ্রগতির সুছাঁদ পুরুষগুলিকে শীঘ্রই তাদের শরীরে লগ্ন অবস্থায় দেখতে পেল। মুহূর্ত মধ্যে সংঘবদ্ধ বাধ্যতামূলক মিলন ক্ষণিক সুখে পরিণত হল।

না হবেই বা কেন? পাঁচ হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরায়  ক্রীতদাসের জীবনে এই সুখ ছাড়া কী-ই বা অবশিষ্ট থাকে?

জালে ঘেরা উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে এতগুলি নারী-পুরুষের প্রকাশ্য গমনে শৃঙ্খলা থাকার কথাও নয়। এদের পরিচালকরা এমনটা যে চায় তাও নয়। কিন্তু এই তুচ্ছ প্রজা উৎপাদক যৌনদাসদের নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। এখানে নারী-পুরুষের অনুপাত মেলে না। ফলে অচিরেই ভয়ানক বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হয়। হালকা পাতলা, শিশ্নসর্বস্ব জীবন, পুরুষগুলি এ ওকে ধাক্কা মেরে ডিঙিয়ে পাড়িয়ে মাড়িয়ে কেবল যোনি চিহ্ন খুঁজতে থাকে। অপেক্ষারত পুরুষের পাশে কামজর্জর নারী-পুরুষ উপগত হয়। অস্থির চঞ্চল অপেক্ষমান দ্বিতীয় পুরুষ সঙ্গমরত পুরুষটিকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে চলে।

এই উদ্যান যেন কোনও এক পটচিত্রকরের কারুকাজ। সে যেন তার গোটানো ছবির রোল এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঢেলে ছড়িয়ে দিয়েছে। নিটোল জলবিন্দুর মতো এই উদ্যানে মৃদুমন্দ বায়ুসেবন নিমিত্ত রানি লেই-জুর বৈকালিক ভ্রমণে যুক্ত হয় চা-পান পর্ব। লেই-জুর পরনে অনুজ্জ্বল সূতি বস্ত্র। কাঁচা হলুদ রঙা সোনায় ঠাসা অলঙ্কারে ও বহু বিচিত্র কেশ বিন্যাসে এই সূতিবস্ত্রের নম্রাভা ঢেকে গেছে। প্রতীক ও জ্ঞাননির্ভর উদ্যান রচনায়  অনাবশ্যক অপ্রয়োজনীয় বৃক্ষলতার স্থান উদ্যানের একেবারে শেষ প্রান্তে, সীমানা প্রাচীর বরাবর। নিঁখুত নিয়ম মেনে জলাশয়, প্রস্তর ও দারুভাস্কর্য, জ্যামিতিক সরণীর আশপাশ জুড়ে পাইন, বাঁশ ও অ্যাপ্রিকটের সমাহার। এরা আয়ু ও জীবনযুদ্ধের প্রতীক। এরা তিনজন শীতের তিন বন্ধু। প্রবল হিমেল হাওয়াতেও চিরহরিৎ।

পুষ্পকুঞ্জের মধ্যে অ্যাজেলিয়ার বিচিত্র বর্ণের বাহার চোখে পড়ে বেশি। রঙের আগুন ছড়ানো অ্যাজেলিয়া অপেক্ষা করবে বসন্তের কোকিল আসা পর্যন্ত। এ দেশের গল্পগাথায় তারা ভাইবোন।

আভিজাত্যের প্রতীক পিওনি তার বড়সড়ো গোলাপাকৃতির ফুল নিয়ে রানি লেই-জুর বাগান আলো করে বসে আছে। পিওনি একান্তভাবে রাজা-রাজড়ার অহঙ্কার। রাজা, রাজ অমাত্য, অভিজাতরা ছাড়া পিওনি কেউ বাড়িতে ফোটাতে পারে না।

লেই-জু ও তার সখীরা চা-পানের আসর বসিয়েছে অন্যান্য দিনের মতো। চা-এর আসর আরেক রাজকীয় পর্ব। বসার ভঙ্গি থেকে চা ঢেলে দেওয়া, আর তা পান করার নানা নিয়ম কিন্তু লেই-জু চিরকালীন প্রথা, রীতি-নিয়মের অনুগত নয় সবসময়। সে তার অন্যরকম চিন্তাভাবনা লালন করতে পেরেছে ব্যতিক্রমী স্বভাবের স্বামীর প্রশ্রয়ে। রাজা প্রতিনিয়ত নতুনের সন্ধানে রত। ইতোমধ্যে অরণ্যচারী এক শিকারী গোষ্ঠীকে বুঝিয়ে ও ভয় দেখিয়ে পশুপালক জাতিতে বদলে দিয়েছে। ভারবহনকারী মানুষ বা পশুর কাঁধ থেকে পরিশ্রম লাঘব করার জন্য পশু দ্বারা টানা গাড়ির ব্যবস্থা করেছে। এমনকি নদী পারাপারের আদিম ভেলার বদলে শক্তপোক্ত নৌকার প্রচলনও করেছে লেই-জুর স্বামী, বর্তমানে এ-দেশের রাজা।

লেই-জু এই কারণেই স্বামীর অন্য স্ত্রী-দের অপেক্ষা তার বেশি ঘনিষ্ঠ। রাজার মতোই সে অনুসন্ধিৎসু।

লেই-জুর পিছনে তার খাস পরিচারিকা ঢাকনা দেওয়া চা-পানের পাত্র নিয়ে এক জায়গায় বসে না থেকে ঘুরে বেড়ায়। উদ্যান সীমান্তে এলোমেলো গাছের সারি। নিয়ম পালনের বৃক্ষসজ্জায় একমাত্র এখানে এসেই সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

একসার একইরকম গাছের নিচে পাথরের বেদিতে বসে সে চা পানের জন্য ঢাকনা খোলে। ক্রিসানথিমামের শুকনো পাপড়ি মেশানো সুগন্ধী চা-এর গরম ভাঁপ নাকে যেতেই অর্ধেক ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। টুপ করে কী যেন খসে পড়ে গোলাকার সেই বাটিতে। পরিচারিকা খেয়াল করে না। লেই-জু আঙুল ডুবিয়ে তোলার চেষ্টা করে। ফুটন্ত উত্তাপে ততক্ষণে সে আঁশ ছড়াতে শুরু করেছে। কৌতুহলী, লেই-জু সেই আঁশ ছাড়াতে ছাড়াতে আঙুলে প্যাঁচায়। বাইরের শুকনো হাওয়ায় আঁশ শুকিয়ে যেতে থাকে। ভারি উষ্ণ আর রুক্ষ কোমলে মেশানো সেই স্পর্শ। লেই-জু দেখে গোটানো সুতোর লম্বাটে বলের মধ্যে একটা তুলতুলে পোকা। চা-এর ভাপে তখন সে মৃত। তীক্ষ্ণ নখের ডগা দিয়ে সেই চা-সহ অকিঞ্চিৎকর মৃতদেহ বাইরে ফেলে দেয় রানি।

মাথা উঁচু করে উপরে দেখে। মার্লবেরি গাছের পাতায় পাতায় এমনই থোকা থোকা পোকার বাসা ঝুলছে। লেই-জু পরিচারিকাকে বলে অন্যদের খবর দিতে। খাস পরিচারিকা ভয় পায়। ভয় দেখায়। হাতে লাগলে কী হবে জানা নেই। কোনও জিন পরী মানুষকে কোন অশুভ কামনায় বেঁধে ফেলে কে জানে! আবিষ্কারের প্রতি চিরকেলে অবিশ্বাস।

লেই-জুকে দমায় কে? পাঁচ হাজার বছর আগে সে ধরে ফেলে ওই সোনালি আঁশের উৎপত্তি ও সম্ভাবনা। ক্ষুদ্র পোকাটির ভাগ্যচক্র সেদিনই নির্ধারিত হয়ে যায় চির খঞ্জ ক্রীতদাসত্বে।

সন্তান জন্মের ধকলে মরে যায় মেয়েগুলি। জালের ওপর বসা তীক্ষ্ণচঞ্চুরা ডানাগুলি নামিয়ে আনে। মাংসের গন্ধে কাতর তখন তারা।

মালিকরা সন্তর্পণে ডিমগুলি তুলে নেয়। তারপর অপ্রয়োজনের অর্ধমৃত, ফ্যাকাশে রক্তহীন মৃত মায়েদের শরীরগুলি ছুঁড়ে ফেলে দেয়। খাঁচার বাইরে মুহূর্তমধ্যে মহাভোজ শুরু হয়ে যায়।

এখানকার পুরুষগুলির আয়ুও বেশি নয়। রানি লেই-জুর উদ্ভাবিত শয়তানি তারপর থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়ে গেছে। লেই-জু শুধু সুতো সংরক্ষণ নয়, তাঁতে সে সুতো বুনে সিল্ক তৈরির ব্যবস্থাও করে ফেলেছিল। আর পরম উৎসাহী রাজা সেসব একেবারে শিল্প বিপ্লবের পর্যায়ে নিয়ে গেল। প্রায়ান্ধকার ঘুপচিতে একত্রিত নারী-পুরুষ জন্মাল, রমণ করল, আর সন্তান জন্ম দিয়ে মরে গেল। বদ্ধ জালের ভিতর প্রথমদিকে এই ঘটনাগুলি ঘটত। ধীরে ধীরে শরীরগুলি পাল্টাতে লাগল। ডিম বহনের জন্য বি-মোরির মেয়ে শরীর হয়ে উঠল বড়সড়ো আর ভারী। পুরুষের কাজ এখানে শুধু শুক্রক্ষেপন হেতু লিঙ্গোত্থান, তাই তারা ক্রমশ হয়ে গেল ক্ষুদ্রকায়। লেই-জুর দলবল প্রকৃতি থেকে তাদের তুলে এনে মার্লবেরি বা তুঁতগাছে ছেড়েছে। ডিম ফুটেছে। লার্ভা বেরিয়েছে। প্রকোষ্ঠে রেখে তুঁতপাতা খাইয়েছে। নিজে খেতে ভুলে গেছে বি-মোরি। ধীরে ধীরে বদ্ধ দশায় ওড়ার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে। পোষা কুকুরের মতো শিকার ভুলেছে সে। ক্রমাগত নিজেদের মধ্যে জননে গায়ের রঙের হলুদ বাদামী খয়েরির ফুলকারি বৈচিত্র পালটে সে ফ্যাকাশে আর সাদা। মুখগহ্বরের কাজ ফুরিয়েছে পূর্ণাঙ্গ বি-মোরির, কারণ জননক্রিয়া, সন্তানজন্ম ও মৃত্যু ভিন্ন তার জীবনচক্র নেই। সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে জন্মায় এক প্রজাতি কারণ একশো ভাগ মানুষনির্ভর এদের জীবনে দৃষ্টির প্রয়োজন নেই এখন!

সন্তান জন্ম দিয়ে মেয়ে বি-মোরি মরে যায়। পুরুষের আয়ু বড়জোর সপ্তাহ দুয়েক। লেই-জুর আবিষ্কার এক স্বাধীন বুনো মথকে অথর্ব যৌনদাসে পালটে দিল— যে মানুষের দয়া ভিন্ন আর বাঁচে না।

ডিম-ফোটা লার্ভাগুলো মানুষের দেওয়া তুঁতপাতা খায় আর ফুলতে থাকে। ফুলতে থাকে আর নিজের লালা দিয়ে নিজের মৃত্যুফাঁদ তৈরি করে। এক পাউন্ড সিল্কের জন্য প্রায় আড়াই হাজার গুটিপোকা শুদ্ধ তার বাসা ফোটানো হয়। ফুটন্ত নরক কুণ্ডে মুহূর্তমধ্যে গলে মরে যায় তুচ্ছ প্রাণগুলি।

এই কৃৎকৌশল গোপন রাখে রানি লেই-জু। তারপর যেমন সব গল্পে হয়, একশো-দুশো বছর গোপন থাকার পর কোনও এক রানি বা রাজকন্যা কঠোর পাহারা ভেদ করে তার বিচিত্র কেশসজ্জার মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে যায় এক কোকুন। আবার কেউ বলে, এক পুরোহিত এ বিদ্যা চুরি করে নিয়ে গেছিল। এ-দেশ ও-দেশ হয়ে সারা পৃথিবী  এক স্বাধীনকে ক্রীতদাসে রূপান্তরিত করার ও হত্যার কৌশল শিখে নেয়।

বি-মোরির রেশম মসৃণ সুতোর জন্য ধুন্ধুমার বেঁধে যায় দেশে দেশে। রেশম পথ ধরে ভাগ্যান্বেষী ভাগ্যতাড়িত তস্কর লুঠেরার কাজিয়া বেঁধে যায়।

বি-মোরির প্রাচীন বুনো আত্মীয়রা ফেলে যাওয়া গুটি থেকে মানুষকে মুগা তসর এরি রেশম উপহার দিয়েছে। কিন্তু তারা এক স্বাধীন প্রাণ। এরা নিশাচর বা কদাচিৎ দিবাচর, উড়ে বেড়ায়, ফেরোমেন ছড়ানো মেয়ে সঙ্গীর দিকে রমণ অভিলাষে ছুটে চলে, স্বাভাবিক বা শিকারী প্রাণীর উদ্যত হাঁ-এর সঙ্গে লড়াই করে বাঁচে।

এক প্রৌঢ় নাকি মৃত পোকার থ্যাঁতলানো শরীর মেশা সহিংস সিল্কের বিরুদ্ধে সূতি বস্ত্রের পক্ষ নিয়েছিলেন। চরকায় সুতো কেটে মোটা কাপড় তৈরির পেছনে নাকি এ হত্যার ইতিহাস কড়া নেড়েছিল।

সহিংস সিল্ক পরে শুদ্ধ শরীরে পুজো দিতে যাই। যেভাবে হাঁড়িকাঠে ছাগরক্ত ছিটকে ওঠে মরণান্তিক পুণ্যে, সেভাবেই মহার্ঘ্য রেশম বস্ত্র পরিধানে আমরা বিয়ে করতে বসি, নিরামিষ ভক্ষণ করে মনস্কামনা সিদ্ধ করি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1097 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*