প্রতিপক্ষ

সাইদুল - প্রতিপক্ষ

শুভ্র মৈত্র

 

ঐ কালো কালো মুখগুলি চেনে সাইদুল। হবিবপুর-বামনগোলা ও সব দিক থেকে আসে ভোরবেলা। অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে করে কাঁকড়া বা গুগলি। সেই নাকি রাত থাকতেই পুকুর নদীর কাদা ঘেঁটে জোগাড় করে ওই সব। বাজারের এক কোণে কোনওমতে ঠাঁই। বড় দোকানগুলির লাথি ঝাঁটা খেয়ে পসরা বেচে দেয় জলের দরে। তাতেও খদ্দেরদের দরদাম চলে অহরহ। আর শুধু তো বেচলেই হবে না, দিতে হবে কেটে কুটে সাফা করে। সাইদুল ভাবে এরপর লাভ থাকে কিছু?

অবশ্য খুব বেশি ভাবার সময় পায় না। নিজের দোকান নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময় এখন। মুরগি বেচে ও। এখানে তো ওঠা পড়া লেগেই আছে। এমনিতে টাউনের মানুষ এখন মুরগির দিকেই ঝুঁকে আছে, কী সব কোলেস্টেরলের গল্প শোনে সাইদুল। এসব বাজে কথা। আসলে দাম। খাসি কেনার ক্ষমতা আছে নাকি? ও নিজেও তো পরবের দিনগুলো ছাড়া খাসির মাংস কবে আর খায়?

তবে ওই যে মাঝে মাঝেই ভদ্দরলোকেদের বাতিক ওঠে। আজ বার্ড ফ্লু তো কাল ভাগাড়। খবরওয়ালাদের আর কাজ নেই। কিছু একটা হইচই করে দাম কমিয়ে দিতে ওস্তাদ। আচ্ছা, কলকাতা ছাড়া ভাগাড় আছে কোথায় শুনি? এই শহরে তো ময়লা ফেলার জায়গাই নেই। সেসব গিয়ে জমা হয় পুকুর খাল বিলে। তারপরে সেখানেই তৈরি হয় উঁচু উঁচু বাড়ি। সাইদুল নিজেও তো দেখেছে, ছোটবেলায় যেগুলো ডোবা জমি ছিল, সেগুলোই আজ ‘সানি পার্ক’ ‘রিজেন্ট পার্ক’। এসব কথা বোঝায় কাকে? রাস্তার ধারে যে বিরিয়ানি-কাবাবের দোকানগুলো ওর রেগুলার কাস্টমার, তারাও এই হুজুগে কমিয়ে দেয় কেনা। অবস্থা বেশ খারাপ হয়। পাইকারের টাকাও মেটানো যায় না সব সময়, লাভ তো দূরের কথা। এই সময়গুলিতে নিজের সাথে ওই খাঁচার ভিতরে গাদাগাদি করে থাকা মুরগিগুলির কোনও ফারাক পায় না সাইদুল। শুধু ঝিমোয় বসে বসে।

চটকা ভাঙে ওদের পায়ের শব্দেই। ওই কালো কালো মুখগুলি। সকালে যে দু একটা মুরগি কাটতে পেরেছিল তাদের পা, পালক, গলা— এসব উচ্ছিষ্ট নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে। এককথায় ছাঁট। সাইদুল জানে নিজেদের রসদ বিক্রির পরে রোজকার ওদের এই উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ। নিজেদের মধ্যে খলবল করে কী কথা চালাচালি করে বোঝে না সাইদুল। বাজারের ধর্ম মেনেই দরদাম করে। ‘দশ না কুড়ি, পঁচিশে হবে না তিরিশ’। শেষমেশ অবশ্য পরিষ্কারই হয় দোকান। ওরা নিয়ে যায় ফেলে দেওয়া নাড়িভুঁড়ি, নখশুদ্ধ হলুদ পাগুলো। কয়েকটা তখনও নড়ে। আবার ওদের দিয়েই সাফাইও করিয়ে নেয় দোকানটা।

ও শুনেছে, বাড়ি নিয়ে গিয়ে গরম জলে সেদ্ধ করে, আরও কী কী সব মশলা দিয়ে এগুলো দিয়েই ভাত মাখবে। কী বলে ওরা? মুরগির ঝোল? না, বাবুদের মতো চিকেন? জানে না। বরং ও ইচ্ছে করলেই দেখতে পায় খেতে বসে কেমন চকচকে হয়ে ওঠে মুখগুলি। এটা খুব কষ্ট করে ভাবতে হয় না। ওর সাত বছরের আজমকে দেখেছে তো! যে দু একদিন সাইদুল বাড়িতে নিয়ে যায় মাংস, নুসরাত রেঁধে দেয় বাপ ব্যাটাকে। ভাত পাতে মুরগির ঝোল দেখলে আজমের মুখটা কেমন হয় জানে তো সাইদুল! একটা ঠ্যাং পেলে তো আর দেখতে হবে না। চুষে চুষে একেবারে ছিবড়ে করেও ছাড়তে চায় না ধমক না দিলে।

মাঝে মাঝে মনে হয়, কোন আদিম যুগ থেকে আসছে ওরা এভাবেই। একটানা। মুখগুলির ফারাকও নেই কোনও। বাসের মাথায় চেপে টাউন। এখানে দু একটা দানা কুড়িয়ে আবার উচ্ছিষ্টের মতো বাড়ি ফেরা।

ভাগাড় ভূত কাটিয়ে আস্তে আস্তে উঠছে বাজারটা। টুকটাক খদ্দের আসছে দোকানে। সাইদুলের ব্যস্ততা বেড়েছে। কারও চাহিদা শুধু ঠ্যাং, কারও বা সিনা। সবাইকে তুষ্ট করতে হয়। হেসে হেসে বলতে হয়, ‘কেনা দামে দিচ্ছি দাদা, আপনি তো আমার পুরনো কাস্টমার।’ সেই ভোর থেকে শুরু হয়, বেলা বাড়ে। বিনবিনে ঘাম জমতে থাকে সাইদুলের কপালে।

ঠিক এই সময়টাই রিক্সা থেকে নামে গোপালদা। সাইদুলের বাঁধা খদ্দের। ফোনেই বলে রাখে, বাড়ির জন্য দু’কেজি আর ছাঁট যা আছে সব। দরদাম করে না। সাইদুল যা বলে তাই। বাড়ির মাংসটার কিছুটা একটু ছোট করে কাটতে হবে। চিলি চিকেন হবে। আর গোপালদা এলেই ব্যস্ত হতে হয় পা-মাথা-গলা এসব বানাতে। বৌদি রাস্তার কুকুরদের খাওয়ায়। ওদের জন্য রান্না হয়। সাইদুল শুনেছে, ওদের জন্য আলাদা চাল, বৌদি নাকি নিজের হাতে কাগজের প্লেটে ভাত বেড়ে দেয়। ঠিক যেমন আজমের জন্য ভাত বাড়ে নুসরাত। ‘আর বলিস না, তোর বৌদির কুকুরগুলোর আদর তো আমার থেকেও বেশি’, হাসতে হাসতে বলেছিল গোপালদা। অবশ্য বলার মধ্যে কোনও রাগ দেখেনি সাইদুল। বরং বেশ শুনিয়েই বলে সবাইকে।

গোপালদার বড় ব্যবসা। বাজারে দোকান আছে। হাতের আঙুলে চকচক করে আংটি। মোবাইলটাও অনেক বড়। দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালে এই ভিড়ের মধ্যেও একটা সুন্দর গন্ধ ভেসে আসে।

সাইদুল কখনও গোপালদার বাড়ি যায়নি। ওর পাড়ার কুকুরগুলিকেও চেনে না। কিন্তু আন্দাজ করে। গোপালদাকে দেখে যেমন ওর নিজের চোখ চকচক করে ওঠে, তেমনই বৌদিকে দেখে কুকুরগুলোরও নোলা ঝরে নিশ্চয়ই।

ছাঁট বানাচ্ছে সাইদুল নিজেই। সেই ব্যবসায় যখন থেকে ঢিলা পড়তে শুরু করেছিল তখনই ছাড়িয়ে দিয়েছে কর্মচারীকে। আবার একটু বাজারটা জমুক, রাখবে কাউকে। খাটনি একটু বেশি হচ্ছে বটে, তবু এখনও এভাবেই চলে যাচ্ছে।

ঠিয়ার উপরে মুরগির হলুদ পাগুলোকে রেখে দা দিয়ে টুকরো টুকরো করছে সাইদুল। এখন বেশ মনোযোগ রাখতে হয়, এদিক ওদিক হলেই হাতে কোপ পড়বে। তবুও চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেল ওদের।

গুটিগুটি পায়ে এসে দাঁড়িয়েছে কালো কালো মেয়ে বউগুলো। চোখগুলো অসম্ভব সাদা। আজমের চোখদুটোও খুব সাদা। গোপালদার কুকুরগুলিরও কি তাই? দাবিহীন প্রত্যাশার চোখ এমন সাদাই হয় বুঝি!

গলা, মাথা, নাড়িভুঁড়ি কাটছে সাইদুল, পালক ছাড়াচ্ছে ডানার। আর ওর সামনে যেন দাঁড়িয়ে আছে একপাল কুকুর, ওই সাঁওতাল মেয়ে বুড়ির দল আর ওর নিজের ছেলে। প্রত্যেকেই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সরকার থেকে বাড়ি করার লোন দিচ্ছে শুনে ও নিজে যখন পাড়ার কাউন্সিলর দাদার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, এমনই লাগে ওকে। ওর চোখটাও বুঝি এমন সাদা হয়ে যায় তখন।

–কী রে হল? আর কতক্ষন? গোপালদা তাড়া লাগায়।

মাংসের প্যাকেটটা গোপালদার রিক্সাওয়ালার হাতে ধরে থাকা ব্যাগে ঢুকিয়ে দেয় সাইদুল। দু’কেজি, তার মধ্যে কিছুটা ছোট ছোট করে চিলি চিকেনের পিস। –‘তিনশো টাকা’। গোপাল’দা দর করে না, একটা পাঁচশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আর ছাঁট?’

–‘হবে না’, দুটো একশো টাকার নোট ফেরত দেবার সময় গোপালদার অবাক হয়ে যাওয়া চোখ দুটোর দিকে আর তাকাল না সাইদুল।

এতক্ষণ ধরে যত্ন করে কাটা ছাঁটের পুরো প্যাকেটটাই ঐ বুড়ির হাতে তুলে দিল, ‘নে, আজকে তিরিশ টাকা দিস।’ কুঁচকানো কালচে দশটাকার নোটগুলি পকেটে ঢোকানোর সময় একবারও মনে এল না ছাঁটের পরিশ্রমটার বিনিময়েই গোপালদার মতো বাঁধা খদ্দের জোটে। মনে এল না, কোনওদিন না দেখা কুকুরগুলির কথা। কালো চামড়ার নিচে চকচকে সাদা চোখগুলোই দেখছিল শুধু। আজ বাড়িতেও একটু মাংস নিয়ে যাবে সাইদুল।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1254 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...