ফহমিদা রিয়াজ় ও তাঁর কবিতা : সাহস, যা সীমান্তকে অস্বীকার করতে শেখায়

নীলাঞ্জন হাজরা  

 

ফহমিদা রিয়াজ়-এর সঙ্গে আমার শেষ কথোপকথনটার কথা ভাবলেই মনটা ভেঙে যায়। ফেসবুকে। আজীবন গণতন্ত্রের দুধে-ভাতে বড় হওয়া অর্বাচীনের স্পর্ধায় তাঁকে কটূ কথায় আক্রমণ করেছিলাম। তাও পাবলিক পোস্ট-এই। সেটা ২০১৫। নরেন্দ্র মোদী জমানায় ভারতে গণতন্ত্রের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে দুঃশ্চিন্তা প্রকাশ করে এ দেশের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কিত হয়েছিলেন ফহমিদা। তাই নিয়ে বাদানুবাদের জেরে বলে ফেলেছিলাম, ভারতের সংখ্যালঘুদের নিয়ে কোনও পাকিস্তানির মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। উত্তরে উনিও কিছু কড়া কথা বলেছিলেন। তফাৎ একটাই, বলার এক্তিয়ার ফহমিদার ছিল, আমার ছিল না। সে এক্তিয়ার উনি অর্জন করেছিলেন, নিজের জীবনে গভীর মূল্য দিয়ে।

এই মূল্যর নাগাল পাওয়া ভারতবাসীর পক্ষে খুবই কঠিন। কঠিন এই কারণেই যে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭, ২১ মাসের জরুরি অবস্থা এবং ২০১৪ থেকে এই আজ পর্যন্ত ফাশিস্ত রাজনৈতিক মতাদর্শের ভয়ঙ্কর আগ্রাসন সত্ত্বেও, গণতন্ত্রের প্রদীপটা এখানে এখনও জ্বলছে — সেই ম্যাজিক মোমবাতির মতো যাকে কিছুতেই ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া যায় না। ফয়েজ় আহমেদ ফয়জ়-এর দু’কলি মনে পড়ছে —

হল্কা কিয়ে বয়ঠে রহো এক শম্মা কো ইয়ারো
কুছ রওশনি বাকি তো হ্যায়, হর চন্দ্ কে কম হ্যায়

[প্রদীপটাকে ঘিরে রাখো বন্ধু তোমরা
একটু আলো এখনও তো বাকি, হোক না একটুই]

অনুবাদ : লেখক

ভারতীয়দের পক্ষে পাকিস্তানের এই ‘একটু’-টা দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করা কঠিন। কেন কঠিন, সেটা বুঝতে গেলে চট করে একটু পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের ওপর চোখ বুলাতেই হবে। আমি মনে করি, সে জন্য পাকিস্তানি ইতিহাসকার আয়েশা জালালের বই, প্রবন্ধ এবং সাক্ষাৎকারগুলো পড়া জরুরি। আর পড়া জরুরি পাকিস্তানের বৌদ্ধিক ধারণাটার — কেন পাকিস্তান, কী পাকিস্তান — তার অন্যতম প্রধান রূপকার এই মহাদেশের অন্যতম প্রধান কবি মহম্মদ ইকবালের লেখালিখি। ইকবাল ১৯৩৮ সালে মারা গিয়েছিলেন, পাকিস্তান তৈরির ন’বছর আগে। কিন্তু পাকিস্তানের সংজ্ঞা নিরুপণে তাঁর অবদান একেবারে অপরিহার্য ছিল। এখন বাঙালিদের একটা মস্ত সুবিধা হয়েছে — ইকবালের ধর্মীয়-রাজনৈতিক-রাষ্ট্রীয় ধারণার অন্যতম প্রধান কাব্যিক বিশ্লেষণ কলেজ স্ট্রিটে গেলেই এক পরমাশ্চর্য তরজমায় পেয়ে যাওয়া যায়। মূল কাব্যগ্রন্থটার নাম ‘জাভিদনামা’। গোটা কাব্যগ্রন্থটির জাদু-তরজমা করেছেন শঙ্খ ঘোষ, অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর ‘ইকবাল থেকে’ নাম দিয়ে। প্রকাশ করেছে প্যাপিরাস। অধ্যাপক জালাল বা আল্লামা ইকবালের লেখালিখির বিশদ আলোচনার পরিসর এটা নয়, কিন্তু চট করে দু’কথা বলা দরকার।

প্রথম কথা হল, ইকবাল যে ইসলামি রাষ্ট্রের কথা কল্পনা করেছিলেন, সে এক উদার শ্রেণিসাম্য সুনিশ্চিত করা রাষ্ট্র। ইকবালের ব্যখ্যায় ইসলামের আসল কথাই সেই উদারতা এবং সাম্য। কিন্তু তা জড়বাদী আদর্শ নয়, তার মূলে রয়েছে একটা আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি। সে ভাবনাটা মোটেই সহজ নয়। ‘জাভিদনামা’-য় রয়েছে তার পূর্ণ বিবরণ।

কিন্তু ইকবাল তো নন, পাকিস্তানের মূল রূপকার ছিলেন মহম্মদ আলি জিন্নাহ্‌। মুসলমানরা ভারতে সংখ্যালঘু হয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থেকে যাবেন, এই বিশ্বাস থেকেই জিন্নাহ্‌ পৃথক পাকিস্তানের আন্দোলন করেছিলেন। তিনি পাঞ্জাব এবং বাংলা ভাগ চাননি (কলকাতা ছাড়া বাংলা জিন্নাহ্‌-র কল্পনায় ছিল হৃদয়হীন দেহ)। এই পাকিস্তানের আন্দোলন আসলে ছিল রাজনৈতিক আন্দোলন, যার মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত রাখা, যা তিনি মনে করেছিলেন অবিভক্ত ভারতে সুরক্ষিত থাকবে না। জিন্নাহ্‌ ব্যক্তিগত জীবনে কোনও ধর্মীয় আচার মানতেন না, এবং তাঁর ধারণার পাকিস্তান রাষ্ট্র মোল্লাতন্ত্র ছিল না। পরিষ্কার জানাচ্ছেন অধ্যাপক জালাল, “It was a political movement. Whatever an Islamic state means is another debate. I mean, what kind of Islamic state are you referring to? Are you referring to one run by the mullahs? Well, that was clearly not what Jinnah had in mind. When Nawab Bahadur Yar Jung tried to force him to commit to an Islamic state in 1943, he resisted and said the Constitution of Pakistan would be what the representatives of the people wanted, what the people of Pakistan wanted.”[i]

তাঁর পাকিস্তানের ধারণা কেমন ছিল? পাকিস্তানের Dawn সংবাদপত্রের সম্পাদক আব্বাস নাসির The New York Times-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে সে কথা বেশ আলোচনা করেছেন।[ii] ধর্ম ও জাতি নির্বিশেষে সব পাকিস্তানি নাগরিকের সমান অধিকারের বিষয়ে জিন্নাহ্‌-র মনে তিলমাত্র দোলাচল ছিল না। ১৯৪৭ সালের ১১ অগাস্ট, মানে পাকিস্তান সরকারি ভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষিত হওয়ার তিন দিন আগে, পাকিস্তান গঠনের জন্য তৈরি ‘কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লি’-তে জিন্নাহ্‌-র ভাষণের এক টুকরো এরকম ছিল, “You are free, free to go to your temples, you are free to go to your mosques or to any other places of worship in this state of Pakistan. You may belong to any religion or caste or creed — that has nothing to do with the business of the state.” মুশকিল হল তাঁর পাকিস্তানের স্বপ্নকে দিশা দিয়ে বাস্তবায়িত করার সুযোগই পাননি তিনি। যক্ষ্মায় মারা গেলেন ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর।

জিন্নাহ্ যখন রাষ্ট্রপ্রধান গভর্নর জেনারেল ছিলেন, ১৯৪৭-এর ১৪ অগাস্ট থেকে ১৯৪৮-এর ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, তাঁর ডেপুটি, পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লিয়াকত আলি খান। এই লিয়াকত আলি খান, জিন্নাহ্‌-র রাষ্ট্রীয় ধারণাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ঠিক ছ’মাস পরে কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লি-র সামনে পাকিস্তানের সংবিধানের যে রূপরেখা পেশ করলেন, তাতে পাকিস্তানকে ইসলামি রাষ্ট্র করে দেওয়া হল। অ্যাসেমব্লি-র সমস্ত অ-মুসলমান সদস্য এবং একজন মুসলমান সদস্য মিয়া ইফতিকারউদ্দিন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও তা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অনুমোদিত হয়ে গেল। ১৯৫৬ সালে তারই ভিত্তিতে তৈরি হয়ে গেল পাকিস্তানের সংবিধান। পাকিস্তান পাকাপাকি ভাবে ধর্মীয় রাষ্ট্র হয়ে গেল। প্রসঙ্গত, এই ইফতিকারউদ্দিন ছিলেন সংবাদগোষ্ঠী Progressive Papers-এর মালিক। আর তারই অন্তর্গত Pakitan Times-এর সম্পাদক ছিলেন ফয়েজ়।

জিন্নাহ্‌-র মৃত্যুর পর বছর আড়াই সবে কেটেছে কি কাটেনি। ১৯৫১-র ৯ মার্চ। ভোর সাড়ে ছ’টা। বাড়ির চারপাশে ভারী বুটের শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেল ফয়েজ়ের স্ত্রী অ্যালিস-এর। তাঁর স্বামীর নাম ধরে বেদম হাঁকডাক হচ্ছে। ‘‘বারান্দা পেরিয়ে রেলিংয়ের ওপর ঝুঁকে দেখি বাগানে গিজগিজ করছে সশস্ত্র পুলিশ।’’[iii] ১৮১৮ সালের বেঙ্গল রেগুলেশন্‌স প্রয়োগ করে ফয়েজ়-কে গ্রেপ্তার করা হল অনির্দিষ্টকালের জন্য। লিয়াকত আলি পাকিস্তান রেডিও-তে জাতির উদ্দেশে ভাষণে ঘোষণা করে দিলেন, একদল লোক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র এঁটেছিল। কিন্তু সরকারি গুপ্তচরেরা ব্যাটাদের চক্রান্ত ধরে ফেলেছে। এরপর এই ষড়যন্ত্রকারীদের যে তালিকাটি তিনি স্তম্ভিত দেশবাসীকে শোনালেন, সেটা মনে রাখার মতোই বটে — সেনা প্রধান মেজর জেনারেল আকবর খান, তাঁর স্ত্রী নসিম খান, ৫২ নং ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মহম্মদ আব্দুল লতিফ খান, এবং কবি ফয়েজ় আহমেদ ফয়েজ়!! প্রথমেই তিন মাসের নিঃসঙ্গ কারাবাসে চলে গেলেন ফয়েজ়। লয়ালপুর জেলখানায়। কেউ দেখা করতে পারবে না। পড়া বা লেখার মতো কিছু দেওয়া হবে না তাঁকে। জুন মাসে ঠিক হল এই কবিটিকে পাকিস্তানের সিন্ধ্ প্রদেশের হায়দরাবাদ জেলে নিয়ে যাওয়া হবে অন্যান্য জনাকতক ষড়যন্ত্রকারীর সঙ্গে। কী ভাবে চালান করা হবে? তিন কামরার স্পেশাল ট্রেন। বিশাল পুলিশের বাহিনী সঙ্গে। হায়দরাবাদ জেলের পাঁচিল উঁচু করা হল, কাঁটাতারে ও ফটকে বিদ্যুৎ চালানোর ব্যবস্থা করা হল। ফয়েজ় পরে স্ত্রীকে লিখেছিলেন, “সব ব্যবস্থাই ছিল, শুধু তাশা পার্টি আসেনি।”

এটা জুন মাসে। তার আগেই ১৯৫১-র এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি সংসদ এক গোপন অধিবেশনে পাশ করে দিল একটা বিশেষ আইন — রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র আইন, ১৯৫১। তার মূল কয়েকটা ধারা এ রকম —

১। বিশেষ ট্রাইবুনালে অভিযুক্তদের বিচার হবে
২। কোনও জুরি নয়, সরকারি ট্রাইবুনালই ঠিক করবে অভিযুক্ত দোষী না নির্দোষ
৩। বিচার হবে গোপনে। কোনও তৃতীয় পক্ষ আদালতে থাকতে পারবে না
৪। এই ট্রাইবুনালে রায়ের বিরুদ্ধে কোনও আদালতে আপিল করা যাবে না

অতঃপর রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত ১৩ নম্বর কয়েদি ফয়েজ়ের বিচার শুরু হল। লিয়াকত আলি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডিরই মিউনিসিপাল পার্কে এক জনসভায় ভাষণ শুরুর ঠিক আগে সাদ আকবর নামের একজন প্রধানমন্ত্রীকে গুলি করে খতম করে দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে তার দেহ গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিল লিয়াকত আলির দেহরক্ষীরা। ফলত কার বা কাদের ইশারায় সাদ আকবর এই হত্যা করলেন তার আর কিনারা হল না। সকলে বিলাপ করতে থাকল ফয়েজ়-এর বিচারের দণ্ড যাই হোক, আসল রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্রের রহস্য আর কোনও দিন জানা যাবে ন। তৎক্ষণাৎ গদি দখল করলেন উপপ্রধানমন্ত্রী খাজা নিজামউদ্দিন। দারুণ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তান সরকার ফয়েজ়কে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার বেশি আর কিছু করেনি। কিন্তু পাকিস্তান পাকাপাকি ভাবে একটা অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হল, জিন্নাহ্‌-র স্বপ্ন চুরমার করে।

ফহমিদা রিয়াজ়ের বয়স তখন পাঁচ। ১৯৪৬ সালে, অবিভক্ত ভারতের ইউনাইটেড প্রভিন্স-এর মিরাটে তাঁর জন্ম। বাবা রিয়াজ়উদ্দিন আহমেদ ছিলেন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ। ফহমিদা যখন খুব ছোট, রিয়াজ়উদ্দিন চাকরিতে বদলি হয়ে চলে আসেন সিন্ধ্ প্রদেশের হায়দরাবাদে। থেকে যান সেখানেই। কাজেই ছোটবেলা থেকেই তিনি বেড়ে উঠছিলেন ধর্মীয় মৌলবাদ আর অগণতান্ত্রিক শাসনের খাঁচায় বন্দি এক দেশে। এটা তাঁর জীবন, অতএব তাঁর কবিতা দুটোকেই দিশা দিয়েছিল। আরও দুটি জিনিস দিশা দিয়েছিল তাঁর জীবনকে। বাবা মারা যান যখন তাঁর বয়স মাত্র চার। তাঁকে বড় করেছিলেন মা হুসনা বেগম। খালিদ সোহেলকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বিশদে মায়ের কথা বলেছিলেন ফহমিদা রিয়াজ়[iv] — ‘‘মা বেশ বিত্তবান পরিবারের মানুষ ছিলেন। একটি প্রদেশের ডেপুটি কালেক্টারের মেয়ে। গৃহশিক্ষকদের কাছে তাঁর শিক্ষালাভ। তাঁদের কাছে তিনি শিখেছিলেন ফারসি, আরবি, উর্দু আর অল্প একটু ইংরেজি। এই সব গৃহশিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু পণ্ডিতরাও, পড়াতেন পর্দার ওপাশ থেকে। তাঁদের কাছে তিনি পাঠ করেছিলেন ফারসি ধ্রুপদী সাহিত্য, যেমন সাদি-র গুলিস্তান এবং বোস্তান। এর ফলে তাঁর মধ্যে একটা কাব্যিক চেতনা তৈরি হয়েছিল, একটা কবিতাবোধ। হাজার হাজার দ্বিপদী তাঁর মুখস্থ ছিল…। মায়ের অভ্যেস ছিল শিশুদের ছড়া জোরে জোরে আবৃতি করে বাচ্চাদের ঘুম থেকে তোলা…। কবিতা জোরে জোরে আবৃত্তি করার অভ্যাস হয়ে গেল আমারও। ছন্দে ভুল হলে মা ঠিক করে দিতেন। কাজেই আমি কবিতার মৌলিক ব্যাপারটা শিখেছিলাম মায়ের কাছে। পরে অবশ্য মা আমার লেখা দেখে খুব আক্ষেপ করতেন!’’

আর তাঁর এই গড়ে ওঠাকে দিশা দিয়েছিলেন — ফয়েজ়। পাঁচ বছর যখন বয়স, তখন ফয়েজ় কারারুদ্ধ। যখন তাঁর ন’বছর, তখনও ফয়েজ় জেলখানাতেই। ওই একই সাক্ষাৎকারে ফহমিদা বলছেন — ‘‘আমি লেখালিখি শুরু করি যখন ক্লাস নাইন বা টেন-এ পড়ি। সে সময় ফয়েজ় সাহেব জেলে।’’ বলতেন না কথাটা বোধ হয়, যদি সেই বয়স থেকেই ফয়েজ় তাঁর উপর ছায়া না ফেলে থাকতেন। কী করে ফেললেন? একটু সময়ের হিসেব করতে হবে। জেলখানা থেকেই বেরিয়ে এসেছিল ফয়েজ়ের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ — ‘দস্ত-এ-সবা’ (ভোরের হাওয়ার হাত)। সেটা ১৯৫৩। তা হলে ফহমিদার তখন সাত বছর বয়স। কবিতার সেই চটি বইটি বিপ্লবের স্বপ্নের মতো হৃদয়ে হৃদয়ে সংক্রমিত হয়ে গিয়েছিল সারা পাকিস্তানময়। যে কবিতার বইয়ের মূল কবিতাগুলি শুরু হওয়ার আগেই ডান দিকের পাতায় ছিল একটি চৌপদী —

মতা-এ-লওহ-ও-কলম ছিন গয়ি তো কেয়া গ়ম হ্যায়
কে খুন-এ-দিলমে ডুবোলি হ্যায় উঙ্গলিয়াঁ ম্যায়নে
জ়ুবাঁ-পে মুহর লগি হ্যায় তো কেয়া, কে রখ দি হ্যায়
হরেক হল্কা-এ-জ়ঞ্জির মে জ়ুবাঁ ম্যায়নে”

[সব কাগজ কলম ছিনিয়ে নিয়েছে, তাতে দুঃখ কিসের
হৃদয়ের রক্তে যে আঙুলগুলো ডুবিয়ে নিয়েছি আমি
বন্ধ করেছে মুখ, তাতে কী? শিকলের প্রত্যেকটা মোচড়কে যে
মুখর করে দিয়েছি আমি]

অনুবাদ : লেখক

১৯৫৪ সাল। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে গেল। বই যদি বা না পৌঁছত, মুখে মুখেই পাচার হয়ে যেত অত্যাচারী শাসকের ঘুম-কাড়া সেই কবিতা। ফহমিদা-র কথা থেকে বুঝি, যদিও স্মৃতিতে সময়কালটা সম্ভবত একটু গুলিয়ে ফেলেছিলেন, কিশোরীর মনে চোরা পথে ঢুকে পড়েছিল সেই ভীষণ কবিতা। আগুনটা লেগে গিয়েছিল।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণীত হয়ে পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র তৈরি হল। ১৯৫৭ সালের ২৭ অক্টোবর সেনা প্রধান আয়ুব খান গণতন্ত্র বাতিল করে দিয়ে মিলিটারি শাসন চালু করে দিলেন। রাজনৈতিক নেতাদের দলে দলে জেলে পাঠানো হল, রাস্তায় রাস্তায় কারফিউ, নিষিদ্ধ হল জমায়েত, বামপন্থী সমস্ত দল। এই নিয়ে একটা মজার চুটকি পড়েছিলাম, সম্ভবত খালিদ হাসানের একটা লেখায়। বামপন্থী গন্ধ থাকলেই রাজনৈতিক কর্মীদের জেলে পোরা হচ্ছে। একবার এমনি এক দলকে লাহোর জেলের লক-আপে আনা হয়েছে। একই কারণে আগে থেকেই সেখানে বন্দি এক রাজনৈতিক কর্মী নবাগতদের একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন — “তা, আপনারা কোন পার্টির?” উত্তর এল — “ফয়েজ়-এর বার্থ ডে পার্টি!!” পাকিস্তান পাকাপোক্ত ভাবে মার্কিন শিবিরে ঢুকে পড়ল, ঠাণ্ডা যুদ্ধে সোভিয়েত শিবিরের ভারতের বিরুদ্ধে। মার্কিন সহযোগিতায় চলতে লাগল সেনা-স্বৈরতন্ত্র।

দশ বছর টানা সহ্য করার পর আর পারলেন না পাকিস্তানের মানুষ। ফেটে পড়লেন। সেটা ১৯৬৮। দলে দলে মানুষ রাস্তায়। রাস্তায় ২২ বছরের ফহমিদা। কিন্তু তার আগেই বেরিয়ে গিয়েছে তাঁর প্রথম কবিতার বই — ‘পত্থর কি জ়ুবান’। ফয়েজ় শিকলকে মুখর করেছিলেন, ফহমিদা পাথরকে দিলেন জিহ্বা, বা কথা। এর মধ্যে বিয়ে করেছেন। বিয়ে করে ব্রিটেন চলে গিয়েছেন। বিয়ে ভেঙে গেছে, ফিরে এসেছেন পাকিস্তানে। কিন্তু ‘পত্থর কি জ়ুবান’-এর কবিতাগুলি তার আগের সময়ের লেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে। বেশ রোম্যান্টিক। কিন্তু সেই পাথুরে সময় সচেতন। উর্দু সাহিত্য মহলে বেশ পিঠ চাপড়ানি পেলেন।

আকাশ ভেঙে পড়ল যখন ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হল তাঁর দ্বিতীয় কবিতার বই — ‘বদন দরিদাহ্’। দেহ ছিন্নভিন্ন। কিন্তু তার মধ্যে ঘটে গিয়েছিল অনেক কিছুই, পাকিস্তান আর ফহমিদার জীবনে। পাকিস্তানে গণ-অভ্যুত্থানে আয়ুব খান সরলেন বটে, কিন্তু সেনা শাসন শেষ হল না। ১৯৬৯ সালে এলেন ইয়াহিয়া খান। আর এই আয়ুব খান হটাও আন্দোলন থেকে একজন নেতা উঠে এলেন, তাঁর নাম জ়ুলফিকার আলি ভুট্টো। বিদেশে পড়াশোনা করা অতি উচ্চশিক্ষিত এই ব্যারিস্টার ভদ্রলোক আয়ুব খানের বিদেশমন্ত্রী ছিলেন। পরে পদত্যাগ করেন। মতাদর্শে ছিলেন একাধারে জাতীয়তাবাদী এবং সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, তা বলে হিটলার-মার্কা ‘ন্যাশনালিস্ট সোশালিস্ট’ নন। একটা বাম ঝোঁক ছিল। আয়ুব-বিরোধী গণরোষের জোয়ারে প্রতিষ্ঠা করলেন পাকিস্তান পিপল্‌স পার্টি (পিপিপি)। কাজেই কমিউনিস্ট পার্টি-নিষিদ্ধ পাকিস্তানে বামপন্থীদের অনেকেই তাঁর ছাতার তলায় এসেছিলেন। ফয়েজ়ও।

ইয়াহিয়া আসার পরেও গণতন্ত্র এল না। কাজেই গণ-অসন্তোষ ফুটতেই থাকল। কিন্তু আসল অসন্তোষ ফেটে পড়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের ভয়ঙ্কর অত্যাচারে দানা বেঁধে গেল মুক্তিযুদ্ধ। নির্দয় পাল্টা আঘাত হানল পাকিস্তান সেনা। মার্কিন সাহায্যে। পাকিস্তানি বামপন্থীরা কেঁপে উঠলেন। যে ফয়েজ় নিঃসঙ্গ কারাবাসে, মৃত্যুদণ্ডের দোরগোড়ায়, গৃহবন্দি হয়ে, দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে নির্বাসনেও কখনও কবিতাকে কোনও দিন তিক্ত করেননি, সেই ঋষিসুলভ মানুষটিও পিত্ত বমি করার মতো উগরে দিলেন, আমার মতে, তাঁর একমাত্র তিক্ত কবিতা — ‘হজ়র করো মেরে তন সে’। সাবধানে থেকে আমার এই দেহ থেকে।

সাজতেই যদি হয় কী করে সাজবে বলো তো, গণহত্যার এই মেলা
বলো তো, প্রলোভিত করবে কাকে আমার রক্তের এই আর্তনাদ
শীর্ণ এ শরীরে আমার কতটা রক্ত আছে
জ্বলবে না প্রদীপ কোনও, ভরবে না তো কোনও পেয়ালাই
জ্বলবে না আগুন কোনও, মিটবে না কারও তৃষ্ণাই
ক্ষতবিক্ষত এই দেহে কতটুকু রক্ত রয়েছে বাকি আর
শিরায় শিরায় শুধু ভরে আছে বিষ
ছিদ্র করো, প্রতিটা বিন্দু বুঝি বিষের পারাবার
শত শত বছরের আঘাত আর অপূর্ণ আকাঙ্খায় পরিশ্রুত বিষ
ফোঁটায় ফোঁটায় শুধু মুখ-বন্ধ ক্রোধ আর বেদনার তাপ
সাবধানে থেকো আমার এই দেহ থেকে, এ দেহ বিষের পারাবার
সাবধানে থেকো আমার এই দেহ থেকে, এ দেহ মরুর কাঠ
জ্বালিয়ে দিলে জ্বলে যাবে বাগানের উঠোন ভরে
জুঁই নয়, ধূপ নয়, বাবলার কাঠ, আমার হাড়
উড়িয়ে দিলে মরু থেকে শহরে শহরে ছড়িয়ে পড়বে শুধু
সুগন্ধী বাতাস নয়, কঠিন এই জীবনের ধুলো
সাবধানে থেকো আমার এই দেহ থেকে, এই প্রাণ রক্তপান চায়

অনুবাদ : লেখক

এ কবিতা ফয়েজ়ের? বিশ্বাস করাই কঠিন। প্রকাশ মার্চ ১৯৭১। মনে পড়বেই ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে শুরু হয়েছিল পাকিস্তানি সেনার চালানো গণহত্যা। ২৬ মার্চ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হয়ে গেলেন। সারা পশ্চিম পাকিস্তানে যখন পাথুরে নীরবতা — সেনা যুদ্ধে গেছে, কে করবে সে যুদ্ধের বিরোধিতা। একমাত্র ফয়েজ়। তারপর ভারতীয় সেনা ও মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর কাছে হার। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণ। পাকিস্তান টালমাটাল। ২০ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন ভুট্টো। সেনা শাসন সত্ত্বেও প্রথম অসামরিক রাষ্ট্রপ্রধান। মুজিবুরকে মুক্তি দিলেন। জাতীয়করণ হল সব বড় শিল্পের। ভয়ঙ্কর গণহত্যা চালিয়ে বালুচিস্তানে বিদ্রোহ দমন করলেন সেনা পাঠিয়ে। তৈরি করলেন পাকিস্তানের নয়া সংবিধান। পাকিস্তান হলো সংসদীয় গণতন্ত্র। ১৯৭৩ সালে নির্বচিত প্রধানমন্ত্রী হলেন ভুট্টো।

প্রথম বিয়ে ভেঙে গিয়ে ১৯৭৩ সালেই পাকিস্তানে ফিরে এলেন ফহমিদা। এসেই বামপন্থী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছেন। আর সেই আঙিনাতেই দেখা হয়ে গিয়েছে বামপন্থী যুবক জ়ফর আলি উজান-এর সঙ্গে। ক্ষতবিক্ষত ব্যক্তিগত জীবন ধীরে ধীরে পিছনে ফেলে উজানের হাত ধরে চলেছেন আলোর দিকে। ‘বদন দরিদাহ’-র কবিতাগুলোতে তার ছাপ স্পষ্ট, ক্ষতবিক্ষত পাকিস্তানকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষতবিক্ষত ফহমিদা মন্থর গতিতে চলেছেন আলোর দিকে। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় কথা, ফহমিদা নিজের স্বর পেয়ে গেলেন, আর নিজের ভাষা পেয়ে গেলেন। এই ‘ছিন্নভিন্ন দেহ’তেই। একলা চলার স্পর্ধা দেখানো আহত নারীর স্বর, পুরুষের একটা চেহারা যে দেখে ফেলেছে। বামপন্থী স্বর, যে জেনে ফেলেছে অত্যাচার থেকে আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই আলোর দিকে এগনো সম্ভব। কাজেই, ‘বদন দরিদাহ’ থেকে ফহমিদা-র স্বর দ্ব্যর্থহীন অবস্থান নেওয়া নারীবাদী স্বর। ‘আক্‌লিমা’ (সঙ্গের অনুবাদ দেখুন) কবিতাটিকে যার প্রতীক বলা হয়ে থাকে। সে স্বরে শুধু নারীর মন নেই, আছে নারীর পুঙ্খানুপুঙ্খ দেহ। আক্‌লিমার দু’পায়ের ফাঁক আর স্তন বর্ণিত সেই স্বরে। আর বুঝলেন, ফয়েজ়িয় সাবেকি উর্দু ভাষা তাঁর নয়। একেবারে কথ্য উর্দু বেছে নিলেন তিনি। স্তনকে বুকের ঢেউ-ফেউ না-বলে, বললেন স্তন, ‘পিস্তান’।

ব্যস, আকাশ ভেঙে পড়ল। যে পুরুষেরা সস্নেহে পিঠ চাপড়েছিলেন, তাঁরা লজ্জায় মুখ লুকনোর জায়গা খুঁজতে লাগলেন। লজ্জা শীঘ্রই হয়ে উঠল ক্রোধ। এ মহিলা উর্দু সাহিত্যকে কলুষিত করছে। ঢিঢি পড়ে গেল। তার আগে সাদাত হাসান মান্টো দেখেছেন এই পবিত্রতার ঘৃণা। গদ্যে। কবিতায় উর্দুর কাপড় খুলে শরীর দেখালেন ফহমিদা। ফহমিদা পিছু হটেননি জীবনে কোনও দিন আর। স্বামী উজান কারারুদ্ধ হয়েছেন। পিছু হটেননি। লিখেছেন — ‘ধুপ’। রোদ্দুর। বার করলেন নারীবাদী বামপন্থী পত্রিকা আওয়াজ়। লড়াইটা চলতে লাগল। কবিতায়, জীবনে।

ঠিক এই সময় পাকিস্তানে ভুট্টো একের পর এক বামপন্থী পদক্ষেপ করতে থাকলেন — ভূমি সংস্কার শুরু হল। চেম্বার অফ কমার্স-এর সভায় শিল্পপতিদের জানিয়ে দেওয়া হল, ক্ষমতা এবং ধন কিছু হাতে কেন্দ্রীভূত করা যাবে না। শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো হল। কিন্তু তিনি যথেষ্ট করছিলেন কি? পাকিস্তানের দারুণ অত্যাচারী শাসনকে কিছুটা শিথিল করলেন। কিন্তু যাকে প্রকৃত বামপন্থী বলা যেতে পারে, তা তো ছিলেন না মোটেই। কাজেই, আমার মনে হয়েছে, পাকিস্তানে ভুট্টোর জমানা তাই ঘটিয়েছিল, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের গবেষণায় বলা হয় — ‘Toqueville Paradox’। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলেক্সি দ্য তোকভিল-এর তত্ত্বটা ছিল — “The regime that a revolution destroys is almost always better than the one that immediately preceded it, and experience teaches that the most dangerous time for a bad government is usually when it begins to reform.” ভুট্টোর সময় ঠিক তাই হয়েছিল। যতই বামপন্থী সংস্কার হতে থাকল, ততই তার জন্য ক্ষুধা বাড়তে থাকল, বাড়তে থাকল গণ-অসন্তোষ। ১৯৫৭ সালে ঢাকায় আব্দুল হামিদ খান ভাসানি আর ইয়ার মহম্মদ খান যে বামপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টি তৈরি করেছিলেন, তা তেড়েফুঁড়ে উঠল পশ্চিম পাকিস্তানে। সাংঘাতিক গণরোষ দেখা দিল তার পতাকার তলায়। সারা পাকিস্তানময় ছড়িয়ে পড়ল সংঘর্ষ। তা ছিল মূলত মধ্য-বাম আর বামের মধ্যে সংঘাত। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে অমিমাংসিত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যখন এই তরজা তুঙ্গে, মৌলানা মওদাদি-র নেতৃত্বে কট্টর মুসলমান মৌলবাদীরা ভুট্টোর অপসারণ চেয়ে আর একটা নয়া ফ্রন্ট তৈরি করলেন। ভুট্টো সরকার অচল হয়ে পড়ল। ১৯৭৭-এর ৫ জুলাই জেনারেল জিয়া উল হক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ১৯৭৯ সালে তাঁর ফাঁসি দিয়ে দিলেন। শুরু হয়ে গেল পাকিস্তানের অন্ধকারতম সামরিক শাসন, যা শুধু গণতন্ত্রই হত্যা করল না, ইসলামি শাসনের নামে বিশেষত মহিলাদের সব স্বাধীনতা কেড়ে নিল, ‘হদুদ অর্ডিন্যান্স’ জারি করে। ফিরিয়ে আনা হল চাবুক মারা, হাত-পা কেটে ছেড়ে দেওয়া, পাথর মেরে মেরে হত্যা— সরকারি শাস্তি হিসেবে।

তিরিশ বছরের ফহমিদা বললেন, মানছি না। ফয়েজ় ছাড়া কোনও পাকিস্তানি কবি এই নিদারুণ ঝুঁকি আর কখনও নিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। প্রথমে তাঁর স্বামী উজানকে গ্রেফতার করা হল। কিন্তু সরষের মধ্যেও ভূত থাকে। কবিতার ভূত বড় সাংঘাতিক। ওই ভয়ঙ্কর প্রশাসনের মধ্যেই এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক ছিলেন ফহমিদার কবিতার ভক্ত। উজানের জামিনের ব্যবস্থা হল। তার পরেই ফহমিদার বিরুদ্ধে রুজু হল ১৪টি (মতান্তরে ১০টি) মামলা, যার একটি হল ১২৪-এর এ ধারায়। দেশদ্রোহিতা। দোষ প্রমাণ হলেই মৃত্যুদণ্ড। আর সেনাশাসনে দোষ কী করে ‘প্রমাণিত’ হয়, তা আমরা ভারতীয়রা পড়েশুনে জানতে পারি, অনুভব করতে পারব না কোনও দিন।

পালিয়ে গেলেন ফহমিদা। ভারতে। অমৃতা প্রীতমের বাড়ি। একটা মুশায়রায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। আর ফিরলেন না। ১৯৮৮ সালের ১৭ অগাস্ট মাঝ আকাশে বিমানে বিস্ফোরণ ঘটে জিয়া উল হকের ইন্তেকাল না হওয়া পর্যন্ত ফিরতে পারেননি। তারপর ফিরে গিয়েছেন।

পাকিস্তানি সমাজ ক্রমে বদলেছে, দু’কদম করে এগিয়ে এক কদম করে পিছিয়ে যতটা এগনো যায়। ভাল কথা, জিয়া ১৯৭৯ সালে সমস্ত নারী স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে যে হদুদ আইন করেছিলেন, ২০০৬ পর্যন্ত তা বজায় ছিল। ২০০৬-এ কিছুটা বদলেছে, পুরোটা নয়।

কাজেই ফহমিদার লড়াই চলেছে। পত্র-পত্রিকায়, কবিতায়, বিভিন্ন আন্দোলনে যুক্ত থেকে। আসলে ফহমিদা-র কবিতার সঙ্গে তাঁর অকুতোভয় অ্যাক্টিভিজম-এর বিশেষ পার্থক্য নেই। মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। উর্দু সাহিত্যে এটা এই প্রথম হল না। ১৯৩৬ সালে ‘অঙ্গারে’ নামক সংকলন প্রকাশ দিয়ে যে প্রগতিবাদী সাহিত্য আন্দোলন শুরু হয়েছিল উর্দুতে, সেই ধারায় এমন উদাহরণ আরও কিছু রয়েছে। ফহমিদা তার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন নারীবাদী স্বর। যে স্বর তাঁরই সঙ্গে যোগ করেছিলেন কিশ্বর নাহিদ, আজ়রা আব্বাস বা সারা শগুফতাও। কিন্তু আমার মনে হয়নি, ফহমিদার কবিতা উর্দু কবিতার ধারাটাকেই একেবারে বদলে দিয়েছিল। সেটা ঘটেছিল অনেক পরে — ১৯৮৪ সালে অফজ়াল আহমেদ সৈয়দ-এর ‘ছিনি হুয়ি তারিখ’ — কেড়ে নেওয়া ইতিহাস — নামের সংকলন প্রকাশ দিয়ে। সেই বিপ্লব থেকে অনেক দূরে ফহমিদার কবিতা।

‘পত্থর কি জ়ুবান’ (পাথরের জিভ), ‘ধুপ’ (রোদ্দুর), ‘কেয়া তুমি পরা চাঁদ না দেখোগে’ (দেখবে না তুমি পূর্ণ চাঁদ?), ‘হম-রিকাব’ (সহ-সওয়ার)-এর মতো কাব্যগ্রন্থ আমাকে নতুনে শিহরিত করে না। দুর্দম সাহসে শ্রদ্ধাশীল করে। আমাকে মনে করায়, কবিতা আমরা কেন লিখি, কেনই বা পড়ি, এ প্রশ্ন ঘিরে বিতর্ক আজও অমীমাংসিত। আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিশ্বাস করি, কবিতার প্রথম শর্ত তাকে কবিতা হয়ে উঠতে হবে। তাই তো কবিতা হল তা-ই, যা গদ্যে অনির্বচনীয়কে ভাষা দেয়। তথ্য, তত্ত্ব, মতাদর্শগত অবস্থানের শুধুমাত্র প্রকাশের পরিসর কবিতা হতে পারে না, এমন একটা অবস্থানে আমি বিশ্বাসী। আমি তোমায় ভালোবাসি — এটা বোঝাতে কবিতা লাগে না। কবিতা লাগে ওই তিনটি শব্দের অন্তর্গত আর্তনাদ থেকে পরমানন্দ পর্যন্ত বহু লক্ষ কোটি হৃদ্‌তরঙ্গকে মন থেকে মন পাচার করতে। ফহমিদার কবিতা আমাকে সেই তলে স্পর্শ করতে পারে না। কিন্তু একই নিশ্বাসে ভাবি, যদি ফহমিদা-র কবিতা মানুষের মনোতলে সেই স্পর্শ না-ই দিতে পারে, তবে একটা রাষ্ট্র সে কবিতার ভয়ে এত জুজু কেন? কেন কবির নামে রুজু করতে হবে মৃত্যুদণ্ডের মামলা? তা হলে নিশ্চয়ই ফহমিদার কবিতা অত্যাচারীর রাতের ঘুমে কোথাও একটা ভয়ের সঞ্চার করে। সাহস। সাহসের মতো ছোঁয়াচে আর কিচ্ছু নেই। সেই সাহস যা কবিকে সীমান্ত অস্বীকার করার অধিকার দেয়। সেই সাহস, যা প্রার্থনা করা যায়, সব সীমান্ত অস্বীকার করে হৃদয়ে হৃদয়ে সংক্রমিত হোক।

ফেসবুকের তঞ্চক পরিবেশে ভুলে গিয়েছিলাম, সীমান্ত অস্বীকার করার এক্তিয়ার ফহমিদা অর্জন করেছেন। প্রায় সারা জীবন গভীর মূল্য দিয়ে। সহসা ২০১৮-র ২১ নভেম্বর তিনি চলে গেলেন। ক্ষমা চাওয়ার আর সুযোগ নেই। গভীর অপরাধবোধটা থেকে গেল।

কয়েকটি কবিতা
(মূল উর্দু থেকে তরজমা)

আক্লিমা*

আক্‌লিমা
হাবিল আর কাবিল-এর বোন সে
নিজের বোন
একই মায়ের সন্তান
তবু সে আলাদা
আলাদা সে উরুর মাঝখানে
আলাদা উদ্ভিন্ন স্তনে
আলাদা পেটের ভেতরে
আলাদা গর্ভেও
তাগড়াই ভেড়ার মতো বলি হওয়াই
এ সবের ভবিতব্য যেন
নিজের শরীর
দাঁড়িয়ে আছে ঠা-ঠা রোদের হল্কায়
জ্বলন্ত টিলায়
পাথরে খোদাই করা চিহ্নের মতো
খুঁটিয়ে দ্যাখো ওই চিহ্নকে
লম্বা উরুর উপরে দ্যাখো
উদ্ভিন্ন স্তনের ওপরে দ্যাখো
প্যাঁচানো জরায়ুর ওপরে দ্যাখো
আক্‌লিমার একটা মাথাও আছে, দ্যাখো

ঈশ্বর, আক্‌লিমার সঙ্গে কখনও তো কিছু কথা বলো
কিছু তো জানতেও চাও তার কাছে।

* আদম আর ইভ-এর দুই পুত্র হাবিল (Abel) এবং কাবিল (Cain) কথিত আছে বোন আক্লিমার পাণিগ্রহণের জন্য তারা একে অপরের সঙ্গে লড়াই করেছিল : অনুবাদকের টীকা

 

এখন এত রাতে ওরে প্রাণ

এখন এত রাতে ওরে প্রাণ
কী কথা হবে ডুবে যাওয়া তারাদের সাথে
ক্লান্ত প্রতিটি তারা মুখ ফিরিয়েছে
মোহ কেটে গেছে
মন ভেঙে গেছে
আমাদের সময়ের যত তারা
হতভাগ্য তারা
ডুবে গেছে
এখানে আর কী বাকি, কালো রাত ছাড়া
উতলা হওয়ার আর সময় কোথায়
এখন তো মিশ-কালো রাত ওরে প্রাণ
এখন তো তোরই সময় ওরে প্রাণ

এ ছাড়া আর কী বা উপায়
জিব্রাইলের ডানায় ফের ভোরের বাতাস
দেহ-মন ভাঙবে আবার
বুকের শিরায় শিরায় দৌড়োনো লাল
পায়ে পায়ে ব্যথার চিহ্ন রেখে যাবে

ওরে প্রাণ তোকে ছুঁয়ে ফের
প্রেমের মন্ত্র পড়ি
ফের তোকে অস্থির করি
ওরে প্রাণ! জামশেদের মদের পেয়ালা*
তৃষ্ণার্ত প্রতিটি চোখকে দেখা
না-দেখা হরেক ছবি
আর দেরি নয়, দেখা এই নিমেষেই দেখা
কোনখানে ফুলে ফুলে সাজবে বাগান
মিলবে বিরহী প্রাণ
ছিঁড়বে ফাঁসির দড়ি
খুনখার পালাবে প্রহরী
পাখি ফের নীড় কেড়ে নেবে
নিশ্চিন্ত বিশ্রাম
অনেক শুনেছি বদনাম
এখন আরাম
এত রাত্রিই যদি হলো ওরে প্রাণ
আর কী বা উপায় তোকে ছাড়া
সর্বতাপহরা
প্রাণ, ওরে প্রাণ

* পারস্য গাথায় কথিত আছে সম্রাট জামশদ তাঁর সুরাপাত্রে গোটা দুনিয়ার ছবি দেখতে পেতেন : অনুবাদকের টীকা

 

পাথরের জিভ

এই নিঃসঙ্গতা পাহাড়েই তো পেয়েছিলাম
এমনই অভ্রভেদী তো তোমায় পাওয়া
এইতো আমার বিশ্বাসের পাথর
বিধ্বস্ত, ঊষর, বিষণ্ণ, নির্জন
শত-সহস্র যুগ ধরে তবু তাকে আঁকড়ে ধরে আছি
শতছিন্ন ওড়নায় বেঁধে সিক্ত শ্বাসটুকু
হিংস্র হাওয়ায় উড়ছে আঁচল
সামলে নিই পাথর আঁকড়ে ধরে
শান দেওয়া ধারালো পাথর
সময়ের সাথে সাথে এমন গভীর হয়ে বসে গেছে বুকে
যে আমার জীবন্ত রক্তে চারপাশে লালে লাল
শত-সহস্র যুগ ধরে তবু, তাকেই আঁকড়ে ধরে আছি
আর অনেক-উঁচুতে-ওড়া কোনও পাখির ডানায়
তোমায় খবর পাঠাই
একবার এসে তো দ্যাখো
কী আনন্দ
সব নুড়িগুলো ঝলমলে চুনি হয়ে গেছে
পাথরে ফুটেছে গোলাপ।

 

শীতের একটি সন্ধে

গাছের আশ্রয় থেকে বেরিয়ে
ডুবে গেল শীতের হলদেটে সূর্য
ধূসর মেঘের ওপারে
দিগন্তের চাপা কান্না
ফিসফিসিয়ে কী যেন বলে
বইল বিবাগী দমকা শীতের হাওয়া
শুকনো পাতার সঙ্গে খেলা করে
সুগন্ধ মেশামেশা বিষণ্ণতা
সমস্ত কিছুর বর্ণ ভাবলো
চলে যাচ্ছে নিঃসঙ্গতার সন্ধে
ভারী হয়ে উঠছে বুকের বোঝা
পুরনো কথার স্মৃতি হয়ে
কাঁপছে আকাশের প্রথম তারাটি
যেন খুব কাছাকাছি কেউ
গুঙিয়ে কাঁদছে গোপনে
চোখে বিঁধছে চোখের জল
কে যেন হৃদয়টা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে
যে কাঁচা রাস্তাটা ভেঙেছে তোমার কাছে
এখন তা গভীর বুকের ক্ষত
পাথর হয়ে ভাবি
আমার জন্য নও তুমি
তবু প্রাণের বিষণ্ণ স্পন্দন
চুপি চুপি কেবলই বলে
আমার শিরায় শিরায় শুধু তুমি।

 

বন্ধুর জন্য

হলদে ঋতুর এইসব শুকনো পাতা
হাওয়া যা উড়িয়ে নিয়ে গেছে
যদি কখনও তাদের দেখা পাও
তবে ভেবে নিও
প্রতিটি পাতার বেড়ে ওঠায় বৃথাই গিয়েছে যে রস, ফুলন্ত শাখায় শাখায়
একদিন তারা ছিল তাজা কচি পাতা
ছিল ঝিকমিকে টইটম্বুর
ফাঁক হওয়া ঠোঁটের মতোই নরম খুশিতে ভরা
অনেক অনেক দিন ধরে
এই সবুজ পাতাগুলি
অসহায় সহ্য করেছে হাওয়ার ঠেলাঠেলি
কিন্তু এই যে শুকিয়ে গেল
কিন্তু এই যে শুকিয়ে গেছে
যদি কখনও সেদিক দিয়ে যাও
তবে ঠিক দেখো
হাওয়ার হৃদয়ে গাঁথা আছে উলঙ্গ শাখা
এখন আর তা
তোমার জন্য নয়

 

রক্তের একটা ছন্দ আছে

রক্তের একটা ছন্দ আছে
শিরা উপশিরার টকটকে লাল জালে
টগবগিয়ে ছোটা রক্তের গরম ছন্দে
এ কী রহস্য?
এ কী কথা?
যেন তটভূমি জুড়ে দূরদূরান্তের কোনও কোলাহল
সমুদ্রের এই উত্তাল ঢেউ ফেনা ওড়াচ্ছে কার জন্য!

এই অল্প একটুখানি প্রাণ
সারসের মতো যার উড়ান
এই সারসের ডানা ঝাপটানি কার জন্য

 

সুরাইয়াসিন*

রাত্রি শেষের এই স্তব্ধতা
এই আধো-আলো রাস্তায়
দ্রুত পায়ে হেঁটে চলি
আমি একা এক নারী
অনেকক্ষণ ধরে আমায় তাড়া করছে
একটা পায়ের শব্দ
বাড়ি…!
নিজের বাড়ি!
কী করে পৌঁছবো নিজের বাড়িতে
শুকিয়ে কাঠ গলা আর দুরু দুরু বুক নিয়ে ভাবি
হয়তো পথ হারিয়েছি
এ তো আমার পথ নয়
প্রতিটি গলিতেই তো এখানে নাম লেখা থাকে
এটার তো নেই
আর যতদূর চোখ যায়, দম আটকানো
এই বাড়িগুলোও তো অচেনা
ওই গেল! হলদেটে চাঁদের ফালিটাও
অন্ধকার পাতায় ডুবে গেল
এখন আর কিছুই নেই
শুধু মুখের মধ্যে আছে ভীত আড়ষ্ট একটা জিভ
অথবা
পায়ের পাতা থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসা
সমস্ত শরীর জুড়ে
একটা হিম স্রোত।

* কোরানের একেকটা অধ্যায়কে আরবী ভাষায় বলা হয়সুরা ৩৬তমসুরাটির নাময়া-সিন এই বিশেষ সুরাটিকে কোরানেরহৃদয়বলে গণ্য করা হয় কারণ এর বিষয়বস্তু প্রোফেট মহম্মদ, তাঁর মানসদৃষ্ট তত্ত্ব  পরলোক এই সুরায় পরলোকের বিষয়টিও উল্লিখিত বলেই তা মানুষের মৃত্যুকালে পাঠ করা হয় অনুবাদকের এই টীকা সৌদি আরবের The Presidency of Islamic Researches, Ifta, Call and Guidence সম্পাদিত উস্তাদ আব্দুল্লা য়ুসুফ আলি অনূদিত কোরান থেকে নেওয়া [অনুবাদক]

 

খুব সহজ একটা কথা

প্রত্যেক নারীর মনে একটা পুরোনো অভিলাষ লুকিয়ে থাকে
মনের মানুষটির সঙ্গে ঘোরে ফেরে
বর্ষায় ভেজে
শীতে কাঁপে
গ্রীষ্মের রোদ মাথায় নেয়
মাটির সঙ্গে খেলা করে
মাটিকেও বলে গোপন কথা
লজ্জা দেয় তাদের যারা নারীকে বলে শর্মিলা
আর ভাবতে থাকে গর্ভে বেড়ে ওঠা জীবনের নাম
কিন্তু এই বিবাগী অভিলাষের হাতে পড়লো বেড়ি
যাতে বাঁধা আছে নানা জ্ঞানগর্ভ কথা
যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই-মহলা পুরী, গালিচা, দারোয়ান
বিদ্যুৎ চালিত নানা আগডুম বাগডুম জিনিস
মূর্খ-পুরুষের আকাঙ্ক্ষা
দেহের যতো অপমান
গালিচার সাথে নারী আর কতোকাল শোবে
এবং চোখের জল ফেলবে লুকিয়ে, অবশ্যই রাতের অন্ধকারে।

 

ছবি

আমার মনের গোপন কোণে আমার নিজের একটা ছবি আছে
ঈশ্বরই জানেন কখন কে এঁকেছে সেই ছবি
লুকনো আছে বন্ধুদের নজর থেকে এমনকি নিজের দৃষ্টি থেকেও
ভুলবশত যদি হঠাৎ কখনও চোখে পড়ে
নিজের সঙ্গে তুলনা করলেই বুক কেঁপে ওঠে

 

খানাতল্লাশি

দারোগা :
এই যে দেখুন ম্যাডাম তল্লাশির পরোয়ানা
সঙ্গে পুরো বাহিনীই আছে, তবে তাদের গলির মুখে রেখে এসেছি
ভাবলাম একা এলেই চলবে
আমার তো শুধু সেই লেখাটা দরকার
সিন-ক্রিয়েট করে আর কী লাভ, বরং আপনিই বার করে দিন
অথবা কোনও ঝামেলা না করে দেখিয়ে দিন কোথায় লুকোনো আছে
নিজের বাড়িটাকে এইভাবে তো দেখিনি আগে কোনও দিন
প্রতিটা ইটে যেন প্রাণের স্পন্দন
পাথর আর ইস্পাত থেকে টপ-টপ করে রক্ত ঝরছে
গরম নিঃশ্বাস, অতন্দ্র জোড়া জোড়া চোখ, চারপাশে ফুটে উঠল জিভ
ফিসফিস করে আমায় আর একবার মনে করিয়ে দিল এই মাটির সঙ্গে আমার সাত
জন্মের বন্ধনের কথা
আমার ঘরের চার দেওয়াল, আমার দেশ
তোমার কোলে কাটানো এই কটা দিনই তো আমার ঋণ তোমার কাছে
কত গোপন কক্ষ খুলে যাচ্ছে চোখের সামনে
কত সম্ভাবনা
পায়ের নীচে খুলে গেল কত আশার সুরঙ্গ
দেওয়ালগুলি ঝলমলে জীবনের সাত রঙে
এবার শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে ফুটবে নতুন লিখন
হে অনিত্য মুহূর্ত, তোমার লাঞ্ছিত সম্মানের নামে এই অঙ্গীকার
আমার গলির ধুলো লাল
এই জানলার ওই পারে ফুল লালে লাল
অতীতের একটা বইয়ের জন্য আমার এত বিপদ?
বরং পর্দা সরিয়ে দেখ আমার আগামী দিনের স্বপ্ন।

 

কোনও এক নারীর হাসি

পাথুরে পাহাড়ের গান-গাওয়া ঝর্নায়
প্রতিধ্বনিত কোনও এক নারীর নরম হাসি
ধন-দৌলত-ক্ষমতা-নাম-যশ— এসব কিছুই নয়
তারই শরীরে গোপন তার মুক্তি
সংসার-মন্দিরের নতুন অধীশ্বরেরা যতই চেষ্টা করুক
শুনতে পাবে না তার পরম সুখের সেই আর্তি
এই বাজারে নাকি সবই বিকোয়?
সেই পরম তৃপ্তি তার কিনে এনে দেখাক না কেউ
এক তুরীয় মদিরতা যার স্বাদ শুধু সেই জানে
সে নিজেও পারেনা তা বেচে দিতে
এসো বাঁধন ছাড়া পাহাড়ী হাওয়া
তার কপালে এসে চুমু দিয়ে যাও

হাওয়ায় মেলে চুলের রাশি ওই যে চলে যায়।

 

[i] Jinnah did not want Partition: Ayesha Jalal (https://herald.dawn.com/news/1153717)

[ii] How Pakistan Abandoned Jinnah’s Ideals. By Abbas Nasir. Aug. 15, 2017 (https://www.nytimes.com/2017/08/15/opinion/pakistan-jinnah-ideals-abandoned.html)

[iii] Over My Shoulder: Alys Faiz. 1993. Lahore।

[iv] পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কবিতা। সংকলন ও উর্দু থেকে ভাষান্তর নীলাঞ্জন হাজরা। উর্বী। ২০০৫।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1683 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...