অন্তেবাসী — পঞ্চম পর্ব

পীযূষ ভট্টাচার্য

 

চতুর্থ পর্বের পর

স্বপ্নে দেখেছিলাম আলমারি থেকে লাফিয়ে নামা বাঘকে ঘরের ভেতর পায়চারি করতে দেখে মা তাকে অনায়াস ভঙ্গিতে ভল্লুক বানিয়ে দিল। জানি না এই প্রথম স্বপ্নভঙ্গ কিনা! তবে এটা যে স্বপ্নভঙ্গের শুরুর শোহারত ছিল সে বিষয়ে নিশ্চিত। তবে কতবার যে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে তার কোনও হিসেব কিন্তু নিজের কাছে নেই। যদি অসংখ্যবার হয়, তবে তার হিসেব রেখেই বা কী হবে! তাই এখন মনে হয়, জীবনে যাই ঘটুক না কেন, আমি যেন যতদিন বেঁচে আছি আত্রেয়ীর তীর ধরে হেঁটে যেতে পারি। নদী তো কাঁটাতারের বেড়া টপকে আমার কাছে ধরা দিয়ে আবার হারিয়ে গেছে কাঁটাতারের ওপারে। সামান্য কয়েক কিলোমিটার আমার জন্য বরাদ্দ করে দিয়েছে দেশভাগ। বহতা নদীতে স্রোত আছে আবার সেই স্রোত বেদখল হয়ে যাওয়াও আছে। অথচ আত্রেয়ীর বুকে জ্যোৎস্নার মুনস্ট্রাকের ভেতর বারবার খুঁজতাম মা’র পূর্বপুরুষকে, তা যে কেন, আজও জেনে উঠতে পারিনি।

কিন্তু দ্বিতীয়বার ‘বাচ্চু’ শব্দটি উচ্চারণ করে মা শশব্যস্ত হয়ে আমাকে বাইরে নিয়ে যাবার জন্য একটি সোয়েটার পরিয়ে দিল (মা ভালো সেলাই জানা সত্ত্বেও ঐ একটা মাত্র সোয়েটার বুনে দিয়েছে, সেটা না ছেঁড়া অব্দি পরতেও হয়েছিল, আর এই বুনে দেওয়াটাও এখানে আসার জন্যই)। ‘গতকাল তো ঘুমিয়ে পড়লি, বেলু তোকে দেখতেই পায়নি, চল’ বলে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়ার সময় সাবধান করে দিল ‘খবরদার ভয় পাবি না, এটা দিদি।’

মা যদি ভয় পাবার পরিবর্তে ‘হাসবি না’ বলত তাহলেই যথাযথ হত। কেননা বেলুদির গোঁফের রেখা স্পষ্ট, থুতনিতেও বেশ কয়েকটা দাড়ি। তা দেখে ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, চরম বিস্ময়ে হাসতেও ভুলে গেছিলাম।

সেই শীর্ণা মহিলা ঘরের ভেতর লেপ মুড়ি দিয়ে বসে আছে, ঘরটা যে উষ্ণ দরজায় দাঁড়িয়েই টের পাওয়া যায়, তাই ঘরের ভেতর ঢুকতে চাইছিলাম, বেলুদিই হাত তুলে নিষেধ করে দিল। ‘এ ঘরে ঢুকতে নেই।’ তারপর মিষ্টি হেসে মা’কে মাসি না বলে ফুলদি সম্বোধন করে বলে ‘বাচ্চুর চোখ দুটো মামার মতন।’

ঠিক গুছিয়ে নয়, কোনওমতে জানিয়ে দিই— আমার নাম বাচ্চু নয়…

–বাচ্চু তোর মামাবাড়ির নাম।
–মা তো কোনও দিন বাচ্চু বলে ডাকে না…

তারপর বেলুদির চোখ মা’র চোখের সঙ্গে কী যে কথা বলল জানি না, তবে দুজনেই চুপ। কেবলমাত্র ফিরে আসবার সময়ে বেলুদি মা’কে নির্দেশ দিল ‘মা’কে বল বাচ্চুর জন্য একটা হনুমান টুপি বের করে দিতে। কাঠের বাক্সে আছে…’

 

গতকাল থেকে যা যাচ্ছে প্রথমে চিতাবাঘ, স্বপ্নেও চিতাবাঘ, এবং সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই চিতাবাঘকে মা ভল্লুক বানিয়ে দেবার পর বেলুদি বানিয়ে দিল আমাকে ‘হনুমান’। আমি অবশ্য হনুমানকে চাক্ষুষ দেখিনি, তবে বানরের নাচ দেখেছি। তাই হনুমানের সঙ্গে বানরের পার্থক্য করতে করতেই আমার মাসতুতো ভাই যে আমার সমবয়সি, নাচতে নাচতে আমাকে একটা হনুমান টুপি ধরিয়ে দিল। সেটা আমার সাইজের বেশ বড়, হয়তো মেসোমশাইয়ের। মাসতুতো ভাই বাবলু ফিরে যাচ্ছিল, তখনই মা তাকে নাচ দেখাতে বলতেই তা তা থৈ থৈ বলে নেচে উঠে আমাকে বলে— তুই নাচতে পারিস?

–না।

এ শোনার পর সে যা যা নাচ শিখেছে সব দেখিয়ে দিয়ে জানিয়ে দিল সন্ধ্যায় ঘুঙুর পরে নাচের বোল শোনাবে।

কিন্তু হনুমানের টুপিটা এতটাই বড় আমাকে পরিয়ে দিতেই চোখমুখ ঢেকে যায়, তাই বাবলুর ফিরে যাবার নৃত্যভঙ্গিমা দেখাই হয়নি। আমার বিশ্বাস মা’র সেই একই অবস্থা, একটা হনুমানের টুপিকে বানরের টুপিতে পরিণত করার কসরতের মধ্য দিয়ে সেই সময়টা চলে গেছে।

ভাঁজ করে, সেফটিপিন গুঁজে শেষ পর্যন্ত কিছু একটা হল, তা দেখে মা বলল এতেই চলবে। এদিকে আমি টুপি পরে হনুমান হয়ে তটস্থ হয়ে বসে থাকলাম কিছুটা সময়। তারপর মনে হল, আয়নায় নিজেকে দেখলে হয়।

আয়না পর্যন্ত যেতে হলে বাঘের আলমারির পাস দিয়ে যেতে হবে, পা টিপে টিপে একটা মরিয়া প্রচেষ্টার মধ্যে দেখি আমারই প্রতিবিম্ব বাঘের আলমারির ভেতর স্বচ্ছ বাঘের শরীরের উপর ভাসছে। বলা যেতে পারে বাঘ ও আমার প্রতিবিম্ব একাকার হয়ে গিয়েছিল। তাই ঠিকমতন বুঝে ওঠা যায়নি কতখানি হনুমানের মতন হয়েছি। তখনই নিচ থেকে হুকুম উপরে উঠে এল ‘বালতি পাঠাও’। কথাও শেষ, বালতি হাতে কালুদাও উপস্থিত। মা’র দিকে অবাক হয়ে তাকাতেই মা হেসে ওঠে। এত নিচ থেকে কেউ ঠান্ডা জল আনতে যায়? কালু যাচ্ছে গরম জল আনতে স্নানের জন্য।

ডাউন ট্রেন নামবার সময়ে স্টিম ইঞ্জিনের ড্রাইভার গরম জল দেবে, সেই জল যে ইঞ্জিনের পেটের ভেতরেই থাকে তা কোয়ার্টারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম। পিছন থেকে এই জলের বাস্পের জোরেই ইঞ্জিন নিয়ে যায় ট্রেন। মা’র এ কথা শুনে আবার চমকে উঠি। প্রখর রৌদ্রে জলের বাস্প হয়ে আকাশে মিশে যাওয়া, যা চোখে দেখা যায় না কিন্তু বৃষ্টির জলধারায় বোঝা যায় আকাশের এই অন্তঃস্রোতের ভেতরে আমরা। ঠিক কোন জলধারার জল বাস্প হয়েছিল তা তো মিলেমিশে একাকার। অসম্ভব এক প্রক্রিয়া অথচ পৃথকীকরণ করা যায় না। বর্ষার বৃষ্টিই তো নিয়ে আসে জীবনের আহার্য।

ইঞ্জিন তার পেটের ভেতর থেকে বাড়তি বাস্প বের করে দেবার সময় তীব্র একটা শব্দ হল। এখান থেকেই বোঝা গেল ইঞ্জিনের ধারেকাছে কেউ নেই, যে ভিড়টা ছিল পাতলা হতে শুরু করেছে। ইঞ্জিন গরম জলের সত্র খুলেছিল, তার ঝাঁপ বন্ধ। এখন তাকে যেতে হবে গন্তব্যে।

প্রথমে লক্ষ করিনি কারণ হনুমানের টুপিটা নিজের থেকে চোখের উপরে নেমে এসেছিল। সেটা ঠিক করতেই দেখি কালুদাদের। কালুদা শুধু একা নয়, তার সঙ্গে আরও তিনজন। বাঁশের মাঝখানে এমনভাবে বালতিকে স্ক্রু বল্টু দিয়ে আটকে আনা হচ্ছে যাতে করে বালতির জল ছিটকে না যায় বা বালতি একদিকে গড়িয়ে না আসে। বাঁশের দুই প্রান্ত একজন করে ধরে আছে। তাদের রাস্তা মুখস্থ থাকা সত্ত্বেও একে অপরের পায়ের ছন্দ’র নজর রাখছে। পদক্ষেপ ভুল হলেই গরম জলে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। কোয়ার্টারের সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে কালুদা চিৎকার করে ওঠে— ফুলমাসি সরে যাও— বাচ্চুকে ঘরের ভিতর নিয়ে যাও। পাহাড়ি সিঁড়ি বেয়ে এক নিশ্বাসে তারা এবার উঠবে। ওঠেও তাই।

মা বা আমি লক্ষ্যই করিনি এদের অনুসরণকারী ছিল এক এদেশীয় মহিলা আর তাকে অনুসরণ করছিল একটি রামছাগল। ছাগল কিন্তু যে পথে গরমজল নিয়ে যাওয়া হয়েছে সে পথে না গিয়ে স্বচ্ছন্দে আমাদের থাকার জন্য যে ঘরটা বরাদ্দ করা হয়েছে তার মধ্যে ঢুকে অপর দরজা দিয়ে বোটকা গন্ধ ছড়িয়ে চলে যায়। সহজেই বোঝা যায় এটা তারই যাতায়াতের পথ।

বোটকা গন্ধটা কিন্তু থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকল বেলুদির ঘরের দরজায়। শুধু গলার ঘণ্টিটা টুং টুং করে বাজলেই গন্ধটা একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়, না হলে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।

–বেলুটা এই গন্ধের ভেতরে থাকে কী করে ভগবানই জানেন!
–দিদিটা থাকে কেন?
–ও তুই বুঝবি না, মেয়েটাকে রাজরোগে ধরেছে।

 

এরপর আমি যেন আবিষ্কার করলাম। রামছাগলটা বাঘের আলমারির সামনে দিয়ে নির্ভয়ে এল, কিন্তু বাঘ তার প্রিয় খাদ্য হাতছাড়া করে নির্বিকার ভঙ্গিতে যেভাবে ছিল, সেভাবেই আছে কিনা ঘরের ভেতর থেকে দেখে এলাম। আছে।

এই থাকাকে কী বলব? শিকার, না শিকারির মাহাত্ম্য প্রচার হচ্ছে? না, এসব কিছুই নয়, এক হিংস্রতাকে অপর হিংস্রতা দিয়ে জয় করবার প্রদর্শনমূলক স্থাপত্য।

এরপর আগামী সংখ্যায়

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1097 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*