মিস্টার কাফকা

পোলডিঙ্কা ও মিস্টার কাফকা

বহুমিল হ্রাবাল

 

তর্জমা : সর্বজিৎ সরকার

প্রথম পর্বের পর

বাজারের যে দিকটায় ছাউনি দেওয়া সে দিকটায় কিছু বুড়ি ব্লাড পুডিং বেচে বেশ থালা ভরতি করে, সে দিকে যাই। এখানে হাওয়ায় সদ্য জন্মানো শিশু, বাসি রসুনের ক্বাথ, ভিনিগার আর ভেজা পাটের গন্ধ। কিছু কুলি ট্রাক থেকে জবাই করা ভেড়ার মাংস নামাচ্ছে। এই ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগে যে এই ছুটির দিনগুলোতেই কেন যে এত পশুবলির চাহিদা বেড়ে যায়; ক্রিসমাসে মাছের চাহিদা বাড়ে, ইস্টারের ছুটিতে পাঁঠা আর ভেড়ার। আমার সে দিনটার কথা মনে পড়ে যেদিন বাড়িতে একটা শুয়োর জবাই করার সময় তার নলি কাটতে গিয়ে কীরকম ল্যাটাপেটা হয়েছিলাম আর সে ব্যাটা কীভাবে দৌড়ে ঢুকে পড়েছিল সারের গাদায়, যেন তার মনে হয়েছিল এই কসাইদের ছুরির মুখোমুখি হওয়ার থেকে নিজের গু মুতে ডুবে মরাও ঢের ভালো।

আর একটু ভেতরে যেতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু এমনিতেই অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। এক ক্রেট বিয়ার নিয়ে ফেরার কথা ততক্ষণে ভুলেই গেছি। জিমার ব্রাদার্সের অফিসে, যেখানে পাঁচটা ফ্লোর শুধু খেলনায় ঠাসা, গোডাউনের ম্যানেজার তো রেগে কাঁই হয়ে আছে। “ওহে ছোকরা,” সে চেঁচায়, “তোমায় বিয়ার আনতে বলেছিলাম, জীবনসুধা নয়। এতক্ষণ ধরে কি গাঁড় মারাচ্ছিলে!”

গোডাউনের কুলিটা সাথে সাথে পোঁ ধরে, “এই যে কাফকা! তোমার আডলফ কাকুকে জিগেস করো তো, কবে মরবে? এ তো যা দেখছি সে তো কিস্তিতে কিস্তিতে মরবার তাল করছে।”

“মরবে, মরবে, যে কোনওদিন মরবে,” আমি বলি, আর তারপর সারাদিন ধরে বাচ্চাদের খেলনার যে দুটো কনসাইনমেন্ট এসেছে সেগুলোর মাল মেলাই দুবার করে; এক ঠেঙে বন্দুক ধরা সৈনিক, নৌকোয় বসা একটা সৈনিক, একটা সৈনিক হেলমেট পরা, একটা অফিসার মার্চের ভঙ্গিতে, ওভারকোট পরা একটা জেনারেল, একটা ড্রামার, একটা ট্রামপেটার, একটা ফরাসি ভেঁপু, একটা বড় ড্রাম, রাইফেল হাতে একটা সেপাই, আর একটা কামান নিয়ে দাঁড়িয়ে, আর একটা অফিসার খাড়া দাঁড়িয়ে, ম্যাপ হাতে…

সারদিন ধরে আমি এই পুতুলগুলো মেলাই আর ভাবি লোকে সবসময় আমাকে অন্য কেউ বলে ধরে নেয় কেন কে জানে! সে তো কত বছর হয়ে গেল যে আমি নিজের মনে একা একাই থাকি, তাও, যখনই তারা কোথাও দেখবে একগাদা বমি পড়ে আছে, কিংবা কোথাও রাত্তিরে খুব চেঁচামেচি হচ্ছে, অমনি পাড়াপড়শি দল বেঁধে এসে মা’কে একগাদা কথা শুনিয়ে যাবে। এই যে মাসি, কাল রাত্তিরেও তোমার ছেলে এসে ঝামেলা করছিল। গোল না বাঁধালে ওর কি শান্তি হয় না নাকি?

দূরবীন ধরা একটা বন্দুকবাজ, একটা সেপাই টেলিফোন হাতে নোট নিচ্ছে, একটা মোটরসাইকেল চেপে আছে; একটা আহত সেপাই, চিৎপাত হয়ে; দুজন ডাক্তার; একজন সাদা ল্যাব কোট পড়ে আছে, আর একটা কুকুর, সিগারেট মুখে একটা সৈনিক; একটা ঘোড়সওয়ার…

আমার পিসি মারা গিয়েছিল মারিসেকদের বাড়িতে, আর পরদিন সকালেই মিসেস মারিসকোভা দৌড়ে এসে মা’কে নালিশ করেছিল যে আমি নাকি আগের রাতে ওদের জানলায় এত জোরে জোরে ধাক্কা মারছিলাম যে সেই আওয়াজে পিসি ঘাবড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে মরে গেছে। নিশ্চিত আমারই দোষ ছিল, কারণ মিসেস মারিসকোভা নাকি দৌড়ে এসে শুনতে পেয়েছিল আমি খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসছি, যদিও আমি ঘর ছেড়েছি সেও বহু বছর হয়ে গেছে।

একটা গরু, ঘাস খাচ্ছে; আর একটা গরু, হাম্বা হাম্বা করে ডাকছে; একটা বেড়াল ফিতে বাঁধা, দাঁড়িয়ে আছে; একটা মুরগির ছানা, ঠুকরোচ্ছে; একটা বাঘের বাচ্চা; একটা হায়না, গায়ে ফোঁটা ফোঁটা দাগ; একটা ভাল্লুক দুপায়ে দাঁড়িয়ে; একটা আমেরিকান মোষ; একটা বাচ্চা পোলার বিয়ার; একটা বাঁদর, পেট চুলকোচ্ছে…

একবার, আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে এক পশুচিকিৎসককে দেখছিলাম একটা অসুস্থ বাছুরের ওপর ঝুঁকে পড়ে পরীক্ষা করতে করতে তার মালিককে প্রেসক্রিপসন বলছে, হঠাৎ তিনি চেঁচিয়ে উঠে আমাকে কাছে ডেকে হাতে একটা ব্রাশ ধরিয়ে অর্ডার দিলেন বাছুরটার ক্ষুরের মাঝের খাঁজটা সাফ করো, তারপর ব্রাশের হ্যান্ডেল দিয়ে ওর মুখের ভেতরটা মুছিয়ে দাও। আজব ব্যাপার। আমি শুধু হাঁ করে চেয়েছিলাম ওনার মুখের দিকে, এটা বলতে পারছিলাম না যে আমি ওনার সহকারী নই, এমনিই যেতে যেতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে দেখছিলাম।

একটা পাহাড়ি ছাগল; একটা বুনো শুয়োর; একটা রাখাল; একটা চাষি; একটা চিমনি সাফাইওলা; একটা কাউবয়; একটা রেড ইন্ডিয়ান ল্যাসো ছুঁড়ছে; একটা বড় খরগোশ বসে আছে; টুপি পরা একটা বয়স্কাউট; একটা শিপডগ…

আমি সিনাগগের ভেতরে ঢুকলাম আর গায়ে কাদা মাখা একটা জ্যু কোথা থেকে এসে আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “তুমিও নিশ্চই পুব দিক থেকেই আসছ?” মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ। কিছু পরে যখন বিয়ার নেবার জন্যে দাঁড়িয়েছি, সেখানে দুটো লোক বসেছিল যাদের মধ্যে হঠাৎ একজন আমাকে জিগেস করল, “তুমি তো পাঁউরুটি বানাও,” আর আমি তাতেও মাথা নাড়লাম, আর লোকটা তখন দু হাত কচলে বলল, “দেখলে আমি তোমায় বলেছিলাম না!” এই বলেই লোকটা এক প্যাকেট তাস বার করে বলল, “আমরা এক দান মারিয়াস খেলব বলে আর আর একজন পার্টনার খুঁজছিলাম, বেটল-এর জন্যে এক ক্রাউন, ডারচ-এর জন্যে দুই… বেশি দান খেলব না অবশ্য।

একটা মেরি, একটা বাচ্চা যীশু; একটা যোসেফ; একটা সাধু দাঁড়ানো; একটা কালো সাধু; একটা রাখাল ভেড়া নিয়ে; একটা দেবদূত; একটা বেদুইন; ভেড়ারা ঘাস খাচ্ছে, একটা মেষপালক কুকুর…

মাইসলোভা স্ট্রিটের জিন্নার ব্রাদারসে, আমি দিনে দুটো করে খেলনার কনসাইনমেন্ট চেক করি, ওরা লেদার ব্যাগ আর খেলনার পাইকারি ব্যবসা করে, আর সে জন্যেই প্রতিদিন কাজের পরে হাঁটতে আমার খুব ভালো লাগে, যদিও সারাদিন যে খেলনাগুলো মিলিয়েছি সেগুলোর ওপরেই রোজ হোঁচট খাই। আমার ভালো লাগে কামপা পার্কের ভেতরে হাঁটতে যেখানে বাচ্চারা হামাগুড়ি দিয়ে এশফেল্টের ফুটপাথে চক দিয়ে ছবি আঁকে, আর আঁকতে আঁকতে তারা বাড়িগুলোর দেয়ালেও আঁকতে শুরু করে দেয়, যতটা অবধি তাদের হাত পৌঁছোয় আর কি। একটা লোকের ছবি দেখে আমি চমকে উঠেছি যার টুপিটা সামনে থেকে আর পেছন থেকেও আঁকা। তার যে কানটা আড়ালে থাকার কথা সেটা তার মাথার ওপর উঠে গেছে, ঠিক একটা প্রশ্ন চিহ্নের মত, বা একটা বন্দুকের নলের মত।

“তুমি এঁকেছ?”, বাচ্চা মেয়েটাকে জিগেস করলাম, যে এক্ষুনি আঁকা শেষ করল। ওর কনুইয়ের কাছটা নীল হয়ে গেছে, শটগানের গুলির শেলে যেমন রঙ থাকে।

“হ্যাঁ, কিন্তু এটা তেমন ভালো হয়নি,” সে বলে। বলতে বলতে সে পা দিয়ে ছবিটা মুছতে থাকে যেটা কিনা অনায়াসেই কোন আর্ট গ্যালারিতে জায়গা পেতে পারত।

“আমার চুলটা একটু আঁচড়ে দেবে?”

“হুঁ যদি তুমি চাও।”

বাচ্চা মেয়েটা বেঞ্চের ওপর দু পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে। আমি ওর পেছনে বসি। বাচ্চাটা কাঁধের ওপর দিয়ে একটা চিরুনি বাড়িয়ে দেয়, আমি ওর চুল আঁচড়ে দিই, আস্তে আস্তে ওর চোখ আধ বুজে আসে। পরক্ষনেই তার চোখ পড়ে একটা পাতা ঝরে পড়ছে সেইদিকে, আর সে বলে, “ওই পাতাটার হাতে কালশিটে পড়ে গেছে, তাই ওকে ছেড়ে যেতে হল।”

অন্ধকার দ্রুত নেমে আসছে, পেট্রিন হিল’এর সর্পিল গলিগালা দিয়ে সাইকেল চালকেরা নেমে আসছে, ওদের হেলমেটের মাইনারস ল্যাম্পগুলো জ্বলছে এখনও। ছোট নৌকোগুলো কালচে সবুজ জলে চলাফেরা করে, আর প্রতিবার তাদের দাঁড়ের টানে প্রায় ডজনখানেক অ্যালুমিনিয়ামের চামচ উঠে আসে জল থেকে। একটা অন্ধ লোক তার সাদা ছড়ির এপাশ ওপাশ ঘুরতে থাকা রাডার অনুসরণ করে বেঞ্চের সারির পাশ দিয়ে হেঁটে যায়।

“তুমি যখন ফুটপাথে ছবি আঁকো কী ভাবো?” আমি জিজ্ঞেস করি।

“ওই যে পাখিটা যেমন করে গান গায় সেই কথা”, সে বলে, গাছের ডালের দিকে আঙুল দেখিয়ে। বুকের কাছে থুতনিটা ঝুঁকিয়ে দেয় সে। এখনো মেয়েটা বাচ্চা, কিন্তু আর পাঁচ বছরের মধ্যেই একটা রূপসী পরজীবী ওর মধ্যেই জেগে উঠবে, কিছুটা ঝাঁঝালো গন্ধ আর কিছুটা সোহাগ মিশিয়ে নিয়ে, আর আস্তে আস্তে খুশিতে ভরিয়ে দেবে ওর জীবন। আমি ওর চুল আঁচড়ে দিই, ওর ঘন, নরম বিনুনিটা হাতে নিই, তারপর একটা হলুদ ফিতে দিয়ে সেটা বেঁধে দিই। বাচ্চা মেয়েটা হাত বাড়িয়ে ঠিক প্রথম গিঁটটাতেই আঙুল রাখে যাতে আমার দ্বিতীয় গিঁটটা বাঁধতে সুবিধে হয় আর আমি খুব সুন্দর করে একটা বো বেঁধে দিতে পারি। তারপর সে ঘুরে দাঁড়ায়, যে দড়িটা কোমরে বাঁধা সেটাকে একটু লুজ করে, তার ছোট্ট পেটটা একটু ফুলিয়ে, আবার টাইট করে বাঁধে, আর আমি দড়ির দুটো প্রান্ত যেখানে ক্রস করছে সেই বিন্দুতে একটা আঙুল রাখি যাতে সে গিঁটটা বেঁধে একটা বো বাঁধতে পারে। আর তারপরে, বিদ্যুতচমকের মত, সে আমার হাতের পিঠে একটা চুমু দিয়ে দৌড়ে চলে যায়।

কাম্পা পার্ক থেকে চার্লস ব্রিজ কে দেখে মনে হয় যেন একটা বিশাল নালা যেখানে পথচারীরা যেন স্কেট করতে করতে ভেসে যাচ্ছে। প্রাগ শহর, যার ভাঙা পাঁজরগুলো সে নদীতে পড়ে আছে, ব্যথায় গোঙাচ্ছে। ব্রিজের আর্চগুলো জলের ওপর দিয়ে এমন ভাবে ডোঙা মেরে আছে যেন শিকারি কুকুরেরা শিকারে বেড়িয়েছে, এ পাড় থেকে ও পাড়ে চলে যাচ্ছে তারা। এখন আমি আমার খুড়তুতো ভাইয়ের মদের কারখানায় যেতে পারি, না হলে আমার বাড়িওয়ালির কাছেও ফিরতে পারি, তিনি তো আমায় ব্লুবেরি ওয়াইনের নেমন্তন্ন করেই রেখেছেন, কিন্তু না আমি বরং এমনিই কিছুক্ষণ একা একা হাঁটবো মন যেদিকে যেতে চাইবে সেদিকেই।

মালা কারলোভা স্ট্রিটের একটা ঝলমলে আলো জ্বলা দোকানের সামনে দোকানি দাঁড়িয়ে আছেন, তার মাথার ওপর একটা বোর্ডে তার কোম্পানি’র নাম লেখা, অ্যালফ্রেড উইগহোল্ড।

“শুভ সন্ধ্যা, মিঃ উইগহোল্ড”, আমি বলি তাঁকে, আর মনে মনে তাঁর কাছে ক্ষমা চাই তাঁর কৃত্রিম হাতদুটোর দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকার জন্যে, ঠিক চেস্তোচোয়া’র ব্ল্যাক ম্যাডোনার মত ভাঙা হাত তার। “বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে,” আমি বলি, তাঁর হাত দুটোর থেকে চোখ না সরিয়েই।

“ওহে ছোকরা”, মিঃ উইগহোল্ড বলেন, “দুটো হাত বার করে আমার দোকানের সামনে দিয়ে যাও কোন সাহসে। হাত পকেটে রাখো। দেখো কেমন পকেটটা ভরতি ভরতি লাগবে।”

বলেই তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন, যেন সব কাঠপুতলিদের রাজা তিনি, নিজের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ড্রাম পেটাচ্ছেন তার কৃত্রিম হাতদুটো দিয়ে, আর সেই দুটো হাত হেমন্তের বাতাসে একটা হাওয়া মোরগের মত ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ তুলছে। এর পর আমি মিচালস্কা স্ট্রিট ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা সাইন বোর্ড দেখি যেখানে লেখা— “লৌহ দরজা : সুরক্ষিত মদের মত কঠিন করবে আপনাকে”।

প্যাসেজে ঢোকার মুখে ঘড়ির দোকানের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে একজন নতুন কর্মচারী ঘর মুছছে। দেখি সে চোখ পিটপিট করছে আর তার চোখটাও বেশ কড়কড়ে হয়ে আছে; নির্ঘাত কনজাংটিভাইটিস, আমি বাজি রেখে বলতে পারি রোজ সকালে ওকে চোখ টেনে টেনে বেসিনের কাছে যেতে হয়।

আজ, একের পর এক পথচারীর সাথে দেখা হয়ে যাচ্ছে, যেন তারা অদৃশ্য এক সুতোয় একসাথে বাঁধা; দশটা লোক দেখলাম মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, এক ডজন লোক যাদের ভুঁরু অদ্ভুত ভাবে কুঁচকে আছে, দেখে মনে হয় যেন তারা আমাকে কিছু বলতে চাইছে, সাতজন লোক দেখলাম চোখে ঠুলি পড়ে আছে…

তবে আমি বেশি লক্ষ্য করছিলাম মেয়েদের। এই যে নতুন সব ফ্যাশন উঠেছে তা আমাকে পাগল করার জন্যে যথেষ্ট। প্রত্যেককে দেখে মনে হচ্ছে যেন তারা এইমাত্র আদর খেতে খেতে বিছানা থেকে উঠে এসেছে। কি আছে ওদের ব্লাউসের নিচে? কোনও ভারা বাঁধা, না কি কোনও তিমিমাছের হাড় দিয়ে বানানো কাঠামো যে তাদের বুক দেখলেই মনে হচ্ছে সোজা চোখে এসে খোঁচা মারলো? আর যে ভাবে তারা হাঁটছে! বড় শহরের পুরুষদের উচিত সবসময় এক আলমারি ভরতি ফ্যান্টাসি নিজের জন্যে রাখা যাতে তারা অন্তত এইসব ফাঁপিয়ে তোলা সুন্দরীদের দেখতে দেখতে একটা প্রণয়জাত খুন টুন না করে ফেলে। ঠিক এমন সময় একটা লোক কোথা থেকে আমার পাশে চলে আসে আর সে সারা জীবনে যত অদ্ভুত চাকরি করেছে তাই নিয়ে গল্প শুরু করে – প্রাগের প্রথম অটোমেটিক কাফেটেরিয়া, করুনায়, যখন সে কাজ করত,তাকে লুকিয়ে বসতে হত একটা খাঁচার ভেতরে আর এক ক্রাউনের কয়েনগুলো লোকে যখন স্লট মেশিনে ফেলত তখন এক এক করে গুনতে হত সেগুলোকে, আর যদি সেটা জালি না হত তাহলে একটা স্যান্ডুইচ একটা প্লেট’এ রেখে মেশিনটাকে ঘোরাতে হত হাত দিয়ে, আর ওখানে বসে বসে সে লোকেদের এই অসাধারন আবিষ্কার দেখে তাজ্জব হয়ে যাওয়া উফফফ আর আহাহাহা শুনত; অথবা সেই আর একবার যখন তার কাজ ছিল একটা এক্সিবিশনে একটা বিশাল ঘড়ির ভেতরে বসে থাকা আর তার নিজের পকেট ঘড়ি এক হাতে ধরে অন্য হাতে সেই বিশাল ঘড়িটার বড় কাঁটাটাকে প্রতি মিনিটে একবার করে ঠ্যালা মেরে এগিয়ে দেওয়া। এইসব বলতে বলতে লোকটা আমার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে, যেন সে নিজেই নিজের আজব জীবন দেখে হতবাক হয়ে গেছে।

“কে তুমি?” আমি তাকে জিগ্যেস করি।

“আমি একজন প্র্যাকটিকাল দার্শনিক।” সে বলে।

“বেশ, তাহলে দয়া করে আমাকে একটু কান্টের ক্রিটিক অফ প্র্যাকটিকাল রিজন লেখাটা একটু বুঝিয়ে দেবেন,” আমি বলি।

স্টেপান্সকায়া স্ট্রিট ধরে আমরা হাঁটতে থাকি। প্রাগ শহর, যেন একটা হাইড্রলিক লিফট তাকে ধরে আছে এইভাবে আরও নিচে ডুবতে থাকে, আর প্র্যাকটিকাল দার্শনিক’এর মাথার চুল যেখানে তারাদের জন্ম হয় সেই জায়গাটা স্পর্শ করে থাকে। এবারে লোকটা আমাকে গ্রিলড সসেজ খাওয়াবে বলে, আর সেখানে যাওয়ার পথে, রিবনিকা স্ট্রিটে, সে আমাকে কান্টের দর্শন বোঝায়। তারপর নিজের প্যান্টের জিপের সামনে হঠাৎ ক্রস চিহ্ণ আঁকে আর নিজের কপালে এমন একটা রাম থাপ্পড় মারে যে রাস্তার আলোগুলো অবধি কেঁপে ওঠে।

“ওই যে বুড়ি মহিলা ওনার সসেজ বেশ ভালো হয়”, আমি বলি।

হ্যাজাকের আলো এসে পড়েছে বুড়ির মুখে, আর মনে হচ্ছে মৃতদের দেশ থেকে যেন উঠে এসেছেন রেমব্রান্ট। নিজের পেটের ওপর বুড়ি এমন ভাবে হাতটা রেখেছে যেন সে ঘরে ফেরা ছেলের পিঠে হাত রেখে আছে। তার মুখে একটাই দাঁত চকচক করছে।

“এই যে বাবুরা”, সে বলে, “বারোটা বেজেছে?”

প্র্যাকটিকাল দার্শনিক আকাশের দিকে একটা আঙুল তোলে, আর সেই মুহূর্তে তাকে রাব্বি লোইউ কিম্বা ভিনসেন্টের কাটা কানের মত সুন্দর দেখতে লাগে। আজকের রাতটা ভরে আছে ধাতুর গুঁড়ো, রুপোর কাঁটা, নাটবল্টুতে। অ্যামোনিয়া, টকে যাওয়া দুধ, মেয়েদের নিভৃত কসমেটিকস, সুরভী তেল আর লিপস্টিকের সৌরভে ভরে আছে আজকের রাতটা। স্টেপান্সকায়া স্ট্রিট’এর ঘড়িতে রাত বারোটার ঘন্টাধ্বনি ওঠে, প্রাগের অনান্য ঘড়িগুলোও একসাথে বাজতে শুরু করে, আর তার পরে পরেই যেগুলো একটু স্লো চলছে সেগুলো। প্র্যাকটিকাল দার্শনিক গোগ্রাসে গ্রিলড সসেজ খায়, আর তারপর বিদায় না জানিয়েই চুপচাপ হাঁটা মারে।

একটা বেশ্যা এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়, সাদা পোষাকে তাকে চমৎকার লাগছে, যেন এক দেবদূত; সে ঘুরে তাকায়, তার ঠোঁটের দুই কোয়া খোলে আর তার ফাঁকে একসারি সাদা মটরশুঁটি ঝিলিক দিয়ে ওঠে। আমার প্রবল ইচ্ছে করে অনেক রঙিন শব্দ তার হাসিতে খোদাই করে রাখতে, ইচ্ছে করে কাল সকালে মেয়েটা যখন আয়নার সামনে দাঁড়াবে,যখন তার হাতে শুধু একটা টুথব্রাশ, তখন সে যেন ওই শব্দদের পড়ে নিতে পারে।

“ম্যাম”, আমি বুড়ি সসেজওয়ালি কে বলি, “আপনি ফ্রানজ কাফকা বলে কাউকে চিনতেন?”

“হায় ভগবান!” বুড়ি লাফিয়ে ওঠে, “আমার নাম তো ফ্রানতিসকা কাফকোভা, আর-আমার বাবা, ঘোড়ার মাংস বেচত, তার নাম ছিল ফ্রানতিসেক কাফকা। আর বাইদজোভ স্টেশনের রেস্তোঁরার এক হেড বেয়ারাকে আমি চিনতাম তাকেও সবাই কাফকা বলে ডাকত”, বুড়ি থামে না, বলতেই থাকে, ঝুঁকে পড়ে আমার দিকে, তার একমাত্র দাঁত ঝিকিয়ে ওঠে ঠিক কোনও জ্যোতিষীর মত। “কিন্তু স্যার, আপনি যদি আরও কিছু শুনতে চান তাহলে আমি বলব, আপনার স্বাভাবিক মৃত্যু হবে না। নিজেকে চিতায় পোড়ান, আপনার ভস্ম দান করে যান আমায়, আর আমি সেই ভস্ম দিয়ে আমার কাঁটা চামচ পালিশ করি আর তাহলে দেখবেন একটা দারুণ কিছু বেরিয়ে আসবে আপনার মধ্যে থেকে, যেন একটা দৈব উপহার, কিম্বা কিছু একটা যা ভয়ঙ্কর কষ্টের মত, কিম্বা ধরুন প্রেমের মতন কিছু, হি হি হি …” আর এই বলতে বলতে বুড়ি তার ধোঁয়া ওঠা সসেজগুলোকে একটা কাঁটা দিয়ে ওল্টাতে পাল্টাতে থাকে।

“আমি কার্ড পড়তেও জানি”, বুড়ি বলে চলে, “আর স্যার, আপনার চারপাশের এই কুয়াশার ঢাকাটা যদি না থাকত তাহলে আপনি আরও অনেক সুন্দর কিছু সৃষ্টি করতে পারতেন… কিন্তু ঠিক আছে! এগিয়ে চলুন আপনি। কেটে পড়ুন এখান থেকে!… ওই ওই আবার এসে পড়েছে সে!” বুড়ি চিৎকার করে, নিজের স্কার্ট ঝাড়তে থাকে, আর এক লাথি মেরে কী একটা যেন সরিয়ে দেয়।

“কী ওটা?” আমি জিগ্যেস করি।

“কিছু না। ওই হেডভিকা, কাউন্টেসের মেয়ে, যে ডুবে গিয়েছিল। ওটা ওর ভুত… দেখতে পাচ্ছ না? ও সবসময় আমার সাথে থাকে, আর এখন আমার অ্যাপ্রন ধরে টানছিল। কিসু বুঝছো?”

“হ্যাঁ বুঝেছি,” আমি বলি, হ্যাজাকের আলোর বৃত্ত থেকে পেছিয়ে আসতে আসতে।

এবার বাড়ির রাস্তা ধরি। তুরান্দোটের সামনের গেটে দেখি এক মক্কেল দারোয়ান কে খুবসে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে তার পকেটে অনেক টাকা আছে। স্মেলহাউসের নিচের সেলার থেকে গানের আওয়াজ ভেসে আসে, আর তার সাথে দুটো বুড়োর হাসির আওয়াজ। কোযনা স্ট্রিটে শুধু অশ্লীল সাইনবোর্ড আর চলাফেরা দেখি। নর্দমার পাশে দেখি একটা গোলাপ ফুল পড়ে আছে, মনে হয় কোনও বোকে থেকে ঝরে পড়েছে। আমি পুরনো টাউন স্কোয়ারের ফোয়ারাটার পাশে গিয়ে বসি আর আমার ছায়াটা দেখি সবুজ আর তার আউটলাইনটা কেমন পার্পল রঙের হয়ে গেছে। একটা লোক একটা বড় ক্যাকটাস নিয়ে যাচ্ছে, তার প্রতিটা গাঁটে লাল ফিতে বাঁধা। এক মহিলাকে দেখে মনে হল যেন ইবসেনের কোন নাটক থেকে বেরিয়ে এসে পাজামার ওপর একটা ওভারকোট পরে প্যারিসের রাস্তায় হাঁটছেন। বোঝাই যাচ্ছে ঘুমোতে পারছেন না তাই নদীর ধারে গিয়ে রেলিঙে ঝুঁকে জলের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকবেন। রাস্তার লাইটপোস্টের পাশে এক্ষুনি একটা লোক কোথা থেকে উদয় হল, যেন সে খুব মন দিয়ে সিরিয়াস কোনও গান শুনছে, আর তারপরেই সে বমি করল আর বমিটা এমন ভাবে গড়িয়ে পড়ল তার মুখ থেকে যেন একটা চেনে বাঁধা পকেট ঘড়ি এইমাত্র পড়ে গেছে। আমার জানলায় আলো জ্বলে আছে দেখতে পাচ্ছি, পর্দা উড়ছে হাওয়ায়, আমার বাড়িওয়ালিকে দেখতে পাচ্ছি বুকে ক্রস চিহ্ন আঁকতে আঁকতে একবার সামনে, একবার পেছনে হাঁটাহাঁটি করছেন। কোনও সন্দেহ নেই তার রান্নার কড়াইয়ের পাশের টেবিলে এখন তার বাইবেলটা খোলা আছে। একটা ট্রাফিক পুলিশ দলুহা স্ট্রিট থেকে এখনি সামনে বেরিয়ে এল, দেখে মনে হচ্ছে ওর দুটো হাতই যেন প্লাস্টার অফ প্যারিসে চোবানো।

আমি এখন তোমার কথাই ভাবছি, আমার পোলডিঙ্কা, মনে করার চেষ্টা করছি কেমন ভাবে তুমি আমাকে বলেছিলে, “তোমাকেই আমি সবচেয়ে কম ঘেন্না করি। তোমার লালায়, আমি ভালোবাসা দিয়ে খনন করা একটা গভীর খাদের স্বাদ পাই। তোমার দাঁতে, আমি একটা দেয়াল কে ছুঁতে পারি যার থেকে বিষন্নতা চুঁইয়ে পড়ছে। প্রিয়তম, আমি বুঝি, রাতে তুমি শুধু সালামি খেয়ে আছ, কারণ আমার ঠোঁটে আমি এক কুচি মাংসের স্বাদ পেয়েছি, কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না; চুমু খাও, বারবার চুমু খাও আমায়, আর আমার আঁখি কোটরের চারপাশে যে মাংস তাকেও চেবাও, চেবাও আমার মুখগহ্বরের চারপাশকেও। আর আমাকে আবার বল, এমন কি সলোমনও তাঁর গৌরবের চূড়ায় পৌঁছে এমন নিবিষ্ট হতে পারেননি, বাতাসের পাখিরাও পারেনি, মাঠে যত লিলি ফুল তারাও আমার মত এত ভরিয়ে দিতে পারে না, বল আমায়। বলো আমাকে, বারবার বলো। নিবেদন করো তোমার আগুনের আহুতি আমার দু পায়ের ফাঁকে, আগুন জ্বালাও আমার জঙ্ঘায়। আর সকালবেলায় তুমি যখন বাড়ি চলে যাবে, তখন যদি দেখ আমার জানলায় বাসি কাপড় মেলে দেওয়া আছে, একবারও কিছু ভেবো না তাই নিয়ে। ওটা তো আসলে আমার এই বাড়িটাকে আদর করা, যে কিছু আগের কয়েকটা সুন্দর মুহূর্তকে নিয়ে এখনও ভরে আছে। লোকে বলে চাইলে সূর্যাস্তের হারানো সুঁচগুলোকে রেলিং এর ওপরে ঠিকই খুঁজে পাওয়া যায়।”

এসব কথা পোলডিঙ্কা বলেছিল আমায়, সেই সময়। শহর যেখানে হাতে ভর দিয়ে চলে আমরা সেই নদীর দিকের রাস্তায় হাঁটছিলাম, আমি তখন ভাবতাম নদীর ধার দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়িগুলো হেঁটমুন্ড উর্ধপদ হয়ে চলে কেন, তাদের চাকা থাকে ওপর দিকে, যেন তারা তাদের ছাদে ভর করে স্লাইড করে যাচ্ছে, আর কেনই বা পাশ দিয়ে যাওয়া লোকজন তাদের এমনভাবে অভিবাদন জানায় যেন তারা আঁজলা ভরে তাদের টুপিতে জল তুলছে।

পোলডিঙ্কা বলত, “ওই বোকা বোকা খেলনা, টুথব্রাশ, আর চিরুনিগুলো সারাদিন ধরে ঘাঁটবার পরেও এরকম সব উন্মাদ স্বপ্ন দেখার এনার্জি কি করে পাও বলো তো?”

আমি বলতাম, “পোলডিঙ্কা, শুধু তুমিই আমার এই সব কথার মানে বুঝতে পারো, যা দিয়ে আমি উপচে ভরিয়ে দিই তোমার মুখ, তোমার চুল, তোমার ফুসফুসের বাতাস; এসব আসলে খুদে খুদে সব শব্দ যা আমি তুলে আনি সান্ধ্য দৈনিকের পাতা থেকে। পোলডিঙ্কা, শুধু তুমি জানো কখন আমার চোখের দীপ্তি নিভে আসে, কেবল তুমি বোঝ আমি চলে গেলে কী পড়ে থাকবে, আমার মুখ কখন ধাতুর মত শক্ত আর কালা হয়ে যায়, কারণ তোমার মতই, আমিও তো কখনও চাইনি বইপত্তরের অলীক জগৎ থেকে সুখ আহরণ করে নিতে; তোমার মতই আমিও কখনও চাইনি ব্যথা আর দুঃখের অধিকার থেকে নিজেকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে… কিন্তু তাও তুমি, পোলডিঙ্কা, বিকারগ্রস্থ, ছেনাল, খারাপ মেয়েছেলে একটা, কেন তুমি আমাকে এত ভয় আর কষ্ট দিলে বলো তো, একটা ঝুলতে থাকা ধারালো বরফের টুকরোর মত, একটা রক্তচোষা বাদুড়ের মতন?”

পুরনো টাউন স্কোয়ারের বেঞ্চি থেকে আমি লাফ মেরে উঠি। একটা পুলিশ দু পা ফাঁক করে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার জামার হাতাদুটো যেন চুনে ডোবানো। আশেপাশে আর কেউ নেই, তাই তাকেই ভরসা করে আমি এইসব বলি। আজ থেকে, বুঝলে, আর কোনদিন আমার অট্টহাসির আরমাইক প্রফেসরের সঙ্গ ছাড়তে ইচ্ছে করবে না। এই এখন থেকে, আমার মগজের ফাটল থেকে আমি আর মুক্তি চাইবো না, কেননা মুক্ত থাকা মানেই হল খুশিতে থাকা। আার তাই আমি এখন আনন্দের মধ্যে ডুবে যাচ্ছি – বিবাহের মধ্যে, সুখের মধ্যে- যেমন আমি চাকরি করি জিন্নার ব্রাদারসের অফিসে, এক এক করে মেলাই টার্টল ডভ, ইস্টার এগস, সু্ভ্যেনির চ্যাপেল, অ্যানজেল হেয়ার, ক্রিসমাসের হাবিজাবি আরও সাজানোর জিনিস, আর খেলনা। আপনি কি বুঝতে পারছেন? আমরা সকলে ভাই ভাই, আর্ট ফর আর্টস সেকের জন্যে আমরা সবাই একে অপরের সাথী, অবক্ষয়ী শিল্পের মতই সুন্দর আমরা সকলে, একটা কোকিলের মতই সত্যবাদী, গোলাপের মতই বিকারগ্রস্থ। আমি কী বলছি তুমি কি সত্যিই দেখতে পাচ্ছ? মাথায় ছিট না থাকলে তুমি সত্যিই বাঁচতে পারবে না। উকুন বাছার মত অত সহজে তুমি স্বাধীন থাকার কুটকুটানি থেকে মুক্তি পাবে না ভাই, বুঝলে! বুঝতে পারছ আমি কী বলছি?”

পুলিশটা খুব খেঁচিয়ে বলল, “যথেষ্ট হয়েছে মিস্টার কাফকা। ফালতু চেল্লাচ্ছ কেন? শান্তি বিঘ্নিত করবার জন্যে এবার কিন্তু ফাইন করতে বাধ্য হব।”

 

শেষ

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...