শুভাঞ্জন বসুর লেখা

শুভাঞ্জন বসু

 

বাড়ি যাওয়ার আগে

 

কলকাতা লোকালে ভেন্ডার হচ্ছে একটা অলিখিত স্মোকিং জোন। যা শুরু হয় শিয়ালদা জাস্ট পেরিয়ে গেলে আর শেষ অন্তিম স্টেশনে।

বিড়ি সিগারেট খাওয়ার লোভে আমিও বরাবর ভেন্ডারেই উঠি। ছানার গন্ধ, মাছের আঁশটে সুবাস মিলিয়ে বেশ একটা অলৌকিক মায়া বিচরণ করে গোটা কামরায়। তার মধ্যে বিড়ি, সিগারেট আর গাঁজার গন্ধে বেশ একটা ক্লাব ক্লাব ব্যাপার চারদিকে।

গ্রুপ গ্রুপ করে টোয়েন্টি নাইন আর ব্রিজ চলছে আশেপাশে। ঘর ফেরা ব্যস্ততা সবার মধ্যে। আমি এই at Home ভাবটা বড় ভালোবাসি। তাই মাঝে মাঝে অকারণেই ভেন্ডারে চেপে এপাশ ওপাশ ঘুরে আসি।

আজ যদিও কারণেই যাওয়া। পায়রাডাঙ্গায় মামাবাড়িতে। গেদে লোকাল ধরেছি। আপাতত কোনও কাজ নেই, এমন ভিড় যে হাত নাড়ানোর ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলেছি। একটা অতীব জঘন্য গান চলছে হেডফোনে। কিন্তু ফোনটা পকেট থেকে বের করে পাল্টানোর মতো অবস্থায় নেই। অগত্যা উৎপটাং ভাবনা ভাবতে ভাবতে লোকালের অলিখিত সূত্র আবিষ্কার করে ফেললাম একটা—

‘সিট পাওয়া মানুষের সংখ্যা, অতিক্রান্ত স্টেশনের সংখ্যার সাথে ব্যস্তানুপাতিক।’

মানে স্টেশন যত পেরোবে সিটে থাকা পাবলিক তত কমবে। শিয়ালদা থেকে বেলঘরিয়া অব্দি সংখ্যাটা গ্রীষ্মে চার, শীতে পাঁচ। তারপর কয়েকটা স্টেশন তিন, শেষের দিকে একা পা এলিয়ে আদম পোজে শয়ন।

ঘণ্টাখানেক এভাবেই স্ট্যাচুর মতো কেটেছে। আমি বর্তমানে আধশোয়া অবস্থায় একপ্রকার পরে আছি বলা ভালো। বিড়ি খাচ্ছি আর আকাশ পাতাল ভাবছি।

‘এ জীবন নিয়ে আমি কী করব?’

হঠাৎ পাশ থেকে শুনলাম— ‘দাদা একটু চাইপা বসেন না।’

বিরক্তি ভরে তাকালাম। এ কি আপদ। চুপ চুপ মটকা মেরে পড়ে ছিলাম সুন্দর, পোষাল না। সারাদিন অফিস করে মামাবাড়ি যাচ্ছি। বসার জায়গায় মোটামুটি ফাঁকাই। অন্য জায়গায় গেলে হত না!

বললাম— ‘ওদিকটায় গিয়ে বসুন না।’

সত্যি আজ শরীরের অবস্থা ভালো নেই। সকাল সাড়ে সাতটায় বাস ধরি, দেড় ঘণ্টার জার্নির পর সারাদিন অফিস। তারপর ফিরে ওই ভিড় ঠেঙিয়ে শুতে পেরেছি একটু। এক ফোঁটা ওঠার ইচ্ছে নেই এখন। ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। পরনে লুঙ্গি, গায়ে সাদা গেঞ্জি, হাতে সিগারেট। আয়েশ করে টানছেন। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন— ‘নাহ, ওই সানলার হওয়া খেইতাম আর কি? তা, দাদার কি শরীর খারাপ নাকি?’

–‘হ্যাঁ দাদা। বড্ড টায়ার্ড…’

–‘আচ্ছা তবে শুইয়া থাকেন।’

বলে ভদ্রলোক নিচে রাখা তার সবজির ঝুড়ি উল্টো করে তার ওপরেই বসে পড়লেন। আমি নিজের পাঁচ দিনের কথা ভেবে দুঃখ-কষ্ট-হতাশায় ঠায় পড়েই আছি। ভাবনার রেশটা কেটে গেছে পুরো। ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। উনি তখন বাংলার একটা বোতল খুলে আরও একটা বিড়ি ধরিয়ে বসলেন। লুঙ্গির ভাঁজ থেকে চিপসের প্যাকেট বের করে অন্য এক ব্যক্তির দিকে এগিয়ে দিলেন। দুজনেই বাংলা খাচ্ছে। পাশ ফিরে শুলাম। ওদের গল্পই শুনি।

–‘আজ কেমন হইলো?’

–‘ওই আর কি। তেমন কিসু না। এত দাম পইড়া গেল।’

–‘আমি আজ গেসিলাম বড়বাজারের দিকটায়। একটা আলমারি কিনবো ভাবসি।’

–‘কত রেট এখন?’

–‘ওই পাঁচ হাজার মতো বলছে। দেখি হয় কিনা। অতদূর নিয়ে যাওয়া চাট্টে খানে কথা। কোন লোকালে এলেন আজ?’

–‘চারটা বারো…’

কানে লাগল কথাটা। চারটে বারোর লোকাল! মানে! লোকটা বাড়ি থেকে বেরিয়েছে নিশ্চয়ই সাড়ে তিনটের দিকে! মানে, ঘুম থেকে উঠেছে কমপক্ষে তিনটের দিকে!

তিনটের সময় ঘুম থেকে ওঠা যায়! এখনই তো সাড়ে ন’টা বাজে। ওনার ঘর পৌঁছে খাওয়াদাওয়া করে শুতে নিশ্চয়ই বারোটা থেকে একটা বাজবে! মাত্র তিন ঘণ্টা বাড়িতে থাকেন এই সবজিওয়ালা! মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমোন!

আর ভাবতে পারছি না। ওনাদের কথায় মন দিলাম আবার।

–‘কোথায় কোথায় গেসিলেন আজ বিক্রি কত্তে?’

–‘শ্যামবাজার গেসিলাম আর ওই খান্না গেলাম সুব্রতর বাড়ি। ওখান থেকে বালিগঞ্জ হয়ে ফিচ্ছি।’

বাংলাটা দিলেন পাশের ভদ্রলোককে। তিনিও নির্বিকারে খেতে শুরু করলেন। যেন কি আরামেই না দিন কাটছে। বাংলা খেতে খেতেই পাশের ভদ্রলোক বললেন—

‘চিন্তা করবেন না। আসছে বৈশাকে আবার দাম উঠবে।’

–‘হ্যাঁ। সেই আশায় বইস্যা আসি আর কি। সারাদিন ঘুইরে ঘুইরে পারি না। বয়েসটা তো বাইরাই চলসে।’

বাংলার সাথে গল্প চলছিল পাশে। শুনতে শুনতেই ভাবলাম গতকাল রাত একটায় ঘুমিয়েছি, উঠেছি সকাল সাতটায়। ব্রেকফাস্ট করে চা খেয়ে ৭:৪৫-এর AC বাস ধরে অফিসে এসেছি। সারাদিন AC-তে বসেই কাজ করেছি অফিসে। হ্যাঁ, চেয়ার ছেড়ে বাথরুম, সেখান থেকে ক্যান্টিন, সেখান থেকে আবার চেয়ার। এর বেশি কোথাও যাইনি আমি।

তারপর আমি টায়ার্ড! শুয়ে আছি কোন অধিকারে?

এই মানুষগুলো হঠাৎ যেন চোখের সামনে এসে দেখিয়ে দিল আমার ছোট ছোট সুবিধাগুলো যা কোনওদিন ভেবে দেখার বা আনন্দে থাকার উপাদান হিসেবে ভাবিনি। আপেক্ষিকতার কাছে হেরে গেলাম খুব। সামনের এই দুজন নিজেকে মানুষ হিসেবে মানিয়ে নিয়েছেন এভাবেই। অনেকদিন আগেই পেয়ে গেছেন বাড়ি, ঘর আর লোকাল জীবনের মেলবন্ধন সেতু। তাই সারাদিন তিন চার ঘন্টা ঘুমিয়ে, এই চাঁদিফাটা গরমে ঘুরেও কি খোশমেজাজে বাংলা-বিড়ি আর আড্ডায় মাতিয়ে রেখেছে নিজেদের। কী অলৌকিক একটা সুখী জীবন দেখছি চোখের সামনে। এভাবেও ভালো থাকা যায়। এভাবেও খুশি হওয়া যায়।

উঠে বসলাম আমি। আশ্চর্য চোখে তাকালাম ওনার দিকে। বললাম— ‘কাকা উঠে আসুন ওপরে।’

ওপরে, অনেক ওপরে তার স্থান। এতটা নিচে নয়, তাই না?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2331 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. শেষ লাইনটা কেমন জ্ঞানদান মতো হয়ে সুর কেটে দিচ্ছে। এমনি ভালো লেখা…

আপনার মতামত...