গোথাম কুইজমেলা ২০১৯

সৌমিত দেব

 

“তারপর তো একটা হস্তশিল্প মেলায় ঢুকে দেখলাম, ওমা, অনেক বইও আছে!” — সক্রেটিস

তবে আমাদের সময় সঙ্গে আছে প্যামফ্লেট, লিফলেট, ক্রিকেট ওয়ার্ল্ডকাপ, ক্রিকেট ওয়ার্ল্ডকাপের মতো দেখতেই ছোট্ট ছোট্ট শিডিউল, মেনু, ইস্তেহার, আহ্বান, ইত্যাদি। আমার আবার শিল্পী মন তো, কেউ এমন কোনও কাগজ হাতে দিলেই নৌকো, প্লেন ইত্যাদি বানিয়ে ফেলি। আজকে টোটাল চৌষট্টিটা বানিয়েছি। তবে হ্যাঁ এ কথা বলতেই হবে যে মেলা একদম পরিষ্কার, ঝকঝকে তকতকে! কেবলমাত্র একবার সস ভত্তি প্লেটে পা পড়ে গেসলো নিজের দোষে! আরে খাওয়ার পর দাদা সদ্য কেনা হ্যান্ডমেড রবীন্দ্র-লাইটশেড সামলাবেন না এঁটো থালা! এত ট্যালা না আমি!

এদিকে গতকাল থেকেই গোথামের মাকে দেখে পাড়ার লোক ছড়া কাটছে, গোথাম গোথাম করে মায়, গোথাম গ্যাছে কলকাতায়! আমার আবার ছোট থেকেই ব্যাটম্যান হওয়ার দিকে প্রবল ন্যাক। এ সুযোগ তাই সপাৎ করে ধইরে নিলাম! তাপ্পর ইউটিলিটি বেল্টে জিনট্যাক আর আঁখো মে স্বপ্নে লিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের মিশনে, ৪/০২/২০১৯ তাং-এ, কল… ইয়ে থুড়ি, গোথাম বইমেলা নিয়ে একটা প্রতিবেদন লিখব বলে। তারই ফলশ্রুতি ওপরের চার্লাইন।

তা মেলায় ঢোকার মুখে দেখলাম বেশ পুলিশ পুলিশ পরিবেশ৷ দেখেই মনটা ভালো হয়ে গ্যালো। যাক, আমরা সুরক্ষিত! তারপর দু’পা যেতে না যেতেই মন বারবার ভালো হয়ে যাচ্ছিল। মাঝে তো এমনও হল যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, বাইকে করে একরাশ করে মনভালো পাশ দিয়ে চলে গ্যালো। যাহারা “আমরা কেবলই বিপ্লব করিব, কিন্তু মিছিল কদ্দপি করিব না” মর্মে মুচলেকিয়েছিলেন তারা অবশ্য এসবের তোয়াক্কা করেননি। প্রবল বিপ্লবই করেছেন৷ তা আমি পকেটে হাত দিয়ে হাঁ করে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে (বেসক্যালি বলদ তো) এসব দেখতে অবাক হচ্ছি, তার মধ্যেই হল একটা মজা! ও দলেরই এক রেবেলভাই, আরেক পোটেনশিয়াল কাস্টমার (মানে যাকে দেখে বোঝা যায় ‘দয়স্তোভোস্কি’ বানানটা ইংরিজিতে লিখতে জানেন) দেখতে পেয়ে– ‘এ ভাই ধর না’ বলল! আজ্ঞে না! এরপর মোটেই আমি ধর্ণা ফর্না বলব না। হুঁহুঁ বাওয়া! অত প্রেডিক্টেবল হলে চলে! আমি কি পিরামিড না ইয়্যাব্বড় মঞ্চ যে আগে থেকে কোনওরকম প্রিপেরেশন ছাড়াই, জাস্ট দশ মিনিটের মাথায়, মালপত্র সমেত চলে এসে, নিজে থেকে তৈরি হয়ে যাব! অত সোজা না! তবে দাঁড়ান আগে মজাটা বলি। তো ওরা ‘ধর না’ নামের ভদ্রলোককে ধরল। তারপর লোকটাও ওদের ধরল। এবং ঝোলা থেকে একটা কবিতার বই বের করল।

এর পরের মর্মান্তিক দৃশ্য অবশ্য আমি এড়িয়ে সামনের দিকে চলে গেলাম আপেল, আদম, হবা এসব খুঁজতে খুঁজতে। আমি এত ত্যাঁদড় না যে ইচ্ছে করে সেখান দিয়ে যাই যেখানে ‘ফ্রি-গিফটের’ নাম করে হাতে বাইবেল গুঁজে দেয়! আসলে কী বলুন তো কপি, পাঞ্চলাইন এ সমস্ত লিখে খেতে হলে সারাটাক্ষণ একটা বদামোর প্র‍্যাকটিসে থাকতে হয়। তাই আমি করি কী এদের প্রতিবার আলাদা আলাদা উত্তর দিই। আজ তিনবার পড়েছেন সামনে। কী কী বলেছি বলে দিই–

“না দাদা আমি রোমানদের পক্ষে”
“কাল ব্রিগেড যাইনি, এখন আবার বাইবেলও নেব?”
“না দাদা আমাদের পেরেকের ব্যবসা”

কিন্তু এইবার এইটুকু পড়ে যারা ভাবছেন–

সিনিকভাই সিনিকভাই তোমার বাড়ি যাব না
সিনিকভাই সত্যি তুমি কারওর কথা ভাব না

তাদের বলি… হ্যাঁ আমি কেমন একটা অখাদ্য মার্কা যেন! গতকাল ‘আনন্দ’কে ‘জলসা’ বলে ডাকছিলাম রাতে! অসামান্য স্ক্রিপ্ট! টানটান অভিনয়! কিন্তু স্টার এতটা খারাপ কী বলব! এই মেলার যে কোনও প্রান্তে দাঁড়ালে, যে কোনও, মানে র‍্যান্ডম যে কোনও প্রান্তে দাঁড়ালেই আপনি দেখবেন আপনার চারপাশে শুধুমাত্র কুইজেরই স্টল! আমি একটাও প্রাইজ পাইনি! এই স্টলে আছে একটা সোফা, একটা গিটার, আর প্রচুর আশ্বাস। কুইজের মাঝে মাঝে ‘হৃদমাঝারে রাখব’ তারপর ‘তোমার ঘরে’ এসে খেপ খেলে যায়। মেলার সর্বত্র এই এক টেমপ্লেটে, সংস্থা অনুযায়ী বদলে যাচ্ছে প্রশ্ন।

“আমাদের পরের প্রশ্ন– বাদুড় ক্যানো সজারুকে ওরে ও ভাই বলে ডাকল?” বা, “ম্যাডাগ্যাস্করের রাজধানী দিয়ে যে নদী বয়ে যায়নি তার নাব্যতা কত?” বা “মানুষকে এরা কত বোকা_দা ভাবে যে এই লেভেলে একটা থ্রিলার পুল অফ করে দেয়?”। বলতে পারলেই প্রাইজ! টি-শার্ট, থালা, ডেমোক্রেসি ফ্লেভারের আইওয়াশ, কী নেই সে লিস্টে! আর আছে বিখ্যাত কিছু সেলফি দেওয়াল। টানটান বইয়ের ছবিতে ভরপুর কোলাজ ব্যাকগ্রাউন্ড, গুপিবাঘা, এলিডি ইত্যাদি! লাইন দিতে হচ্ছে রীতিমতো!

-মিতিন মাসিকে পেছন রেখেই ছবি তুলব!
-আমি আবীরকে!
-আবীর কে?
-ভিইওমকেশ!

আজ দেখলাম মেলাটা মোটামুটি দু’দলে বিভক্ত। এক, যাদের বই নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই, এবং সেটা বলতেও ভয় নেই। দুই, যাদের বই নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই, এবং সেটা বলতে ভয় আছে ষোলো আনা। এঁরা ভালো লোক। খেয়ে দেয়ে হাত টিসুতেই মোছেন আর মাদুরটা মোছা হাতেই পরখ করে তবে কেনেন। বাহ, বইমেলা থেকে স্যুভিনিয়র নিয়ে ফিরবে না!

তবে এঁদের মধ্যই নিশানদা, কণিষ্কদা, কুহু, ঋত্বিকদা, শুদ্ধদা, বুনো, আর আমার সর্বসমস্যারসমাধান রায়াদির মতো কিছু পাষণ্ড ‘মাল’ লুকিয়ে থাকে। এঁরা অকারণে লিটলম্যাগ, তার পেছনটায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারে, পাগলের মতো বই কেনে, বই কিনে দেয়, লেখা নিয়ে আলোচনা করে, খাওয়ায়, শেখায়। বা শালিনীর মতো অসুস্থ অবস্থায় কোনও স্টেক ছাড়া অন্যের বই করে তা বিক্রি করে, বা অন্বেষার মতো দশদিন অফিস ছুটি নিয়ে নেয় উইদাউট পে। এঁরা অনিমেষ, মাধুরী, নির্মাল্য, বাবির মতোই বদ। এঁদের এড়িয়ে চলুন। এঁরাই আমাকে দিয়ে

“সব বুঝলাম, কিন্তু একটা কথা বলুন তো, পি.ডি.এফে গুঁজে প্রেমপত্তর দিতে পেরেছে আজ পর্যন্ত কেউ?”

মার্কা লাইন লিখিয়ে নেয়। যদিও এবারের মতো কোনওবারই মেলার আমার জীবনে প্রেম থাকে না তাও ওই চন্দ্রবিন্দু বলে গ্যাছে না–

সে হাসি ছুটে যেত গোধূলি মিছিলে…

সেটুকুর টানেই এই ছুটে ছুটে যাওয়া। এই আড্ডা, এই বই, এই লিটলম্যাগ। বাকি সারাবছর তো সবই ওই, উটের পাকস্থলী।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. মেলার বাইরে থাকে তৃতীয়, থুড়ি চতুর্থ আরেকটা দল, যাদের বই নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই, সেটা বলতে বিন্দুমাত্র ভয় নেই এবং পাড়ার মোড়ে উচ্চমানের এগরোলের দোকান আছে। তারা বছরের পর বছর স্রেফ বইমেলায় যায় না। এবারেও গেলাম না।

    সুন্দর লেখাটা। সত্যি লেখা।

আপনার মতামত...