চাঁদমালা ফুল কিংবা বইমেলার গল্প

শুভ্রদীপ চৌধুরী

 

দুপুর দুটো, মাথার উপরে গনগনে সূর্য, আমি হাঁটছি কলকাতা বইমেলায় আর ভাবছি চাঁদমালা ফুলে ভরা একটা বিলের কথা। যেন আমি আমার গ্রামে ফিরে গেছি। বিলের পাশে গিয়ে বসেছি। শাপলা শালুকের ফাঁকেফাঁকে অসংখ্য ছোট্ট ছোট্ট চাঁদমালা ফুল।

দুম করে কটকটে রোদ্দুরে ফুল ভরা একটা বিলের কথা মনে হওয়াতে নিজের প্রতি বিরক্ত হলাম। নিজেকে বকাঝকা করবার জন্য প্রস্তুত হলাম। বাংলাদেশ প্যাভেলিয়নের ছায়ায় গিয়ে নিজেকে অনেক বোঝালাম। সে কিছুতেই বোঝে না।

হইহই করে ছুটছে মানুষ বইয়ের কাছে। এক স্টল থেকে আরেক স্টল। বই ঝুলতে ঝুলতে চলে যাচ্ছে বাস ধরে, হাত ধরে, শহর থেকে শহরে, গ্রামে।

ঠিক এই মুহূর্তে মনে পড়ল জসীম উদ্দীনের চারটে লাইন,

মাঝখানেতে জলী বিলে জ্বলে কাজল জল,
বক্ষে তাহার জল-কুমুদী মেলছে শতদল।
এ-গাঁ ও-গাঁর দুধার হতে পথ দুখানি এসে,
জলীয় বিলে জলে তারা পদ্ম ভাসায় হেসে!

আমি আবার হাঁটতে লাগলাম। বুঝলাম একটা না-বোঝা ধাঁধাঁ আমি উদ্ধার করে ফেলেছি। বুঝে গেছি কেন বিলের কথা ভেবেছিলাম।

আমি হাঁটতে লাগলাম। পছন্দের বই একে একে হাতে আসছে, আহা কী আনন্দ। শান্তি। এমন শান্তি আছে সেই চাঁদমালা ফুল ভরা বিলের কাছে।

লিটল ম্যাগাজিন স্টলে গেলাম। একটু একটু করে যাচ্ছি আর তক্ষুনি একটা প্রচ্ছদ আমায় বলল, ময়দান বড় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে হে… তাকিয়ে দেখলাম ওর তলায় লেখা সঞ্জয় মৌলিক। হাতে তুলে নিলাম,

দুপুরের রোদ চড়া, শায়িত হাইরোড, দ্যাখো কারা
ডিঙা ভাসিয়েছে জলে।

আবার একটার পর একটা স্টল। কালিকলমে বসে ইজেলে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওদের এবারের সংখ্যা, অণুগল্প বিষয়ক প্রবন্ধ সংখ্যা। মাথার উপরে দুটো লাইন,

ভাবনা বড় হয়
কথা ছোট হয়ে আসে

অণুগল্প নিয়ে এমন নিবিড় কাজ এই বাংলায় দেখিনি। এমন বলেই গত কয়েকটি সংখ্যা সংগ্রহ করে ফেললাম। এসব বলবার নয় তবু বলি কারণ কথা কিছু কিছু বলে যেতে হয়..।

ছুটে এলাম অভিযানে, সাদিক হোসেনের রিফিউজি ক্যাম্পে। গতবারেরটা এক বন্ধু ঝেড়ে দিয়েছে। নিলাম। চোখে পড়ল, কৃষ্ণেন্দু পালিতের গল্প আর আনসারউদ্দিন।

বাংলাদেশের প্যাভেলিয়নে ছুটলাম অরিয়েন্টালিজমের খোঁজে। শুধু ওই বইটা পেয়েই থামলাম না, হাওলাদার প্রকাশনীতে পেলাম আল মাহমুদের শ্রেষ্ঠ কবিতা, পাঞ্জেরি পাব্লিকেশনের একশো রাজনৈতিক কবিতা, নির্মলেন্দু গুণ, ভাষাচিত্রে মানুষ জীবনানন্দ। একব্যাগ হুমায়ুন, হরিশংকর জলদাস আর শাহাদুজ্জামান।

এত অজস্র বই যেভাবে ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়েছিল তাতে আমার ভেতরটা ছ্যাঁক করে উঠল। যেন তেতে আসা তেলে কেউ হাত ঝেড়ে জল দিয়ে পরখ করছে। নিজেও বুঝতে পারলাম আমি লোকটা বড্ড গরীব। সব কিনবার সাধ হয় লোকটার। খুব নোলা। খুব।

এবার আর নিজেকে গাল দিই না।

আমার মেয়ের জন্য বই কেনা এখনও বাকি, আগামীকাল শুধু মেয়ের জন্য কিনব। ধার করে হলেও কিনব। চারশো সাঁইত্রিশ কিমি দূর থেকে এসে জুতোর শুকতাল ছিটকে যাবার মতো হাঁটার দিনে বই না কিনে থাকা যায়!

সাদাত হোসেইনের সঙ্গে দুম করে দেখা হল। কথা হল। হ্যাঁ, অন্দরমহল, আরশিনগর, মানবজনমের সাদাত।

দেখা হল বর্ধমানের খুব পড়ুয়া সার্বনী চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপ চট্টোপাধ্যায় আর তাদের মেয়ে কুর্চি’র সঙ্গে।

এসেছিলেন অণুগল্প বর্গের দুজন মানুষ, খালেদা খানুম আর সিদ্ধার্থ দাদা। দুজনের বই পেলাম।

ব্রতীদার বাঘ আদর করে বাড়ি নিয়ে যাব কিনলাম। ব্রতীদার লেখায় কারেন্ট আছে। মাঝে মাঝে সেই কারেন্টের শক খেতে ইচ্ছে করে। মানুষ এমনই অদ্ভুত। তা না হলে ঝনাৎ ঝনাৎ শব্দে যখন লোহার কোলাপসেবল টানছে ঠিক তখন মনে পড়ল। কাল সন্ধেতেই চলে যাব! আর কয়েকটা লাইন,

….নরম বিষণ্ণ গন্ধ পুকুরের জল থেকে উঠিতেছে ভাসি;
কান পেতে থাকি যদি, শোনা যায় সরপুঁটি চিতলের উদ্ভাসিত স্বর
মীন কন্যাদের মতো; সবুজ জলের ফাঁকে তাদের পাতালপুরীর ঘর
দেখা যায় রহস্যের কুয়াশার অপরূপ….

চাঁদমালা ফুলে ভরা বিল থেকে বেরিয়ে পড়ি। হাতে পিঠে, কাঁধঝোলা ব্যাগ থেকে বইয়েরা এবার আমায় বোঝাতে থাকে।

আমি তাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে হাঁটতে থাকি বালুরঘাট ভবনের দিকে। আগামীকাল আবার আসব। আসবই।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...