রাফখাতার পাতা থেকে

সরিতা আহমেদ

 

বেলাশেষের সূর্যটার আজও গোলাপি রং, কালকেও এমন ছিল। শেষ বিকেলের ট্রেনে যখন মাঠঘাট নয়ানজুলি পেরোচ্ছি তখনও ঈদ, ইলিশ আর ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি নিয়ে কারা যেন তুমুল ব্যস্ত লেডিস কামরায়। ঘটিগরম আর বাদাম বিক্রেতার গলার সেই চেনা ভঙ্গির ডাক শুনে যেই না হেডফোন খুলে তাকাই, ওম্মা ! দেখি ঈদের ইস্তেহার দেওয়া গলাগুলো কাকে যেন ‘হ্যাট হ্যাট’ করে তাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঝালমুড়িওয়ালা কাকুটার কাকুতিমিনতি কানে যাচ্ছে না ওদের। কি হয়েছে দেখতে ঘাড় বেঁকিয়ে যখন তাকালাম, দেখি বছর ষোল-সতেরোর এক ‘জেন্টস’ কে ঘিরে চলছে বিস্তর চেঁচামেচি। ট্রেন ছাড়ার পূর্ব মূহুর্তে ঝাঁপিয়ে এসে লেডিস কামরার হাতল ধরার খেসারত যে এইভাবে তাকে দিতে হবে সে বেচারা কি জানত! ফাঁকা কামরার ভেতর জেন্ডার সংরক্ষণটা সে হয়তো সত্যি বোঝে নি। কপাল দিয়ে গড়িয়ে আসা ঘাম আর শুকিয়ে যাওয়া জিভের তালমিল ঠিক করার সাথে সাথে হাত পা নেড়ে সে বোঝাতেই ব্যস্ত ছিল তার ভুল করে ভুল করার কথা। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির কাব্য করা লেডিসরা যখন প্রায় তাকে ফেলেই দিচ্ছিল, দোলাচল কাটিয়ে উঠে ধরতে যাব ঠিক তখন বছর ষাটের এক বৃদ্ধ তাকে টেনে পাশের কামরায় নিয়ে গেল।
” কখন থেকে বলচি প্রতিবন্ধীতে যাও, ফাকা আচে, ব্যাটা শুনবেই না। ”
” আরে, শুনলে তবে তো – কালা কিনা দেখ ! মুখেও তো গোঁ গোঁ – বোবা কি না কে জানে! প্রতিবন্ধী বললে বুঝবে কি করে ! ”
— খুশির ঈদের আলোচকরা হাসির খোরাক পেয়ে যায়। এই আড়াই ঘন্টার ট্রেন যাত্রায় চাট্টি খুশিরও খোরাক জোটে!
ঘটিগরমওয়ালা না হেঁকেই ফিরে যায়। দরজার পাশে দাঁড়ানো সাবুরপাঁপড়ওয়ালাকে চাপা স্বরে বলে ” ভাইগ্যে নুলো লোকটা টেইনে নিলে, নইলে ছেলেটার আজ খবর ছিল। ”

আমি ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটার মানে খুঁজতে বসি।

টিকিটের লেডিস লাইন যেন আস্তাকু্ঁড়। শুধু মহিলা বা বয়স্কই নয়, বেশিরভাগ মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আট থেকে আশি নানা বয়সের পুংলিঙ্গ। একমাত্র এই লাইনেই তারা নির্ভয়ে অন্যায্য দাবীদাওয়া করতে পারে এইভেবে যে মেয়েরা মায়ের জাত – সামান্য অনুরোধে হয়তো বিনা লাইনের টিকিটও ‘মা-মাসি’রা কেটে দেবেন হাসিমুখে ! কেউ আবার খুচরো পয়সা বন্ধুকে, স্ত্রীকে, বৌদিকে দেবেন বলে দাঁড়িয়ে পড়েন পাশেই। একমাত্র মহিলা কাউন্টারে চলে লাইন নিয়ে গুঁতোগুঁতি। প্রতিদিন ছবিটা এক। বাকি জেনারেল লাইন দিব্যি এগোয় হেলেদুলে। কিন্তু পুলিশ ডাকার দরকার হয় ওই সংরক্ষিত কাউন্টারে।

‘প্রতিবন্ধী’ আর ‘লেডিস কামরা’ কেমন কমিক-রিলিফের মত পাশাপাশি থাকে পুরো একঘেয়ে যাত্রাপথে। গা থেকে টপ টপ করে ঝরে পড়া স্বেদবিন্দুর মত থোকা থোকা ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে এই দুই কামরার যাত্রীদের নিয়ে। প্রতিনিয়ত নিজেদের মধ্যে বালখিল্য আকচাআকচিতে জড়িয়ে জেনারেল বগির যাত্রীদের খুচরো আমোদ যোগায় এই দুই সেফ প্যাসাজ – ওই বিজ্ঞাপনী লাইনের মত ” যাত্রা কি বোরিয়াত সে ছুটকারা পাঁয়ে। ”

আমি আবারও ‘সংরক্ষণ’ আর ‘সুরক্ষা’ শব্দদ্বয় নিয়ে ভাবতে বসি।

ভাবতে ভাবতে যখন কয়লাঞ্চল এসে যায় তখন হঠাৎ চোখ যায় জানলার পাশের সবুজ ক্ষেতে – রেল লাইনের পাশের ধান জমির মধ্যে দুটো শিশু হাত নেড়ে টা-টা করছে । চোখে তাদের প্রথম ট্রেন দেখার অপার বিস্ময় ! মুহুর্তের ‘অপু-দুর্গা’কে পালটা হাত নাড়ার আগেই দৃশ্যপট বদলে যায়। সবুজের মধ্যে সবুজ শৈশবের এক নিষ্পাপ স্থিরচিত্রকে হেলায় ঠেলে ট্রেন ছুটে চলে নিজ নিশানায়। দ্রুত বদলে যায় পাশের ছবিগুলো।
এক স্টেশানে মায়ের হাত ধরে ওঠে ছোট্ট নয় বছর । মুখটা দেখেই মন বলে ওঠে ” আয় আমার পাশে বস”।
কি আশ্চর্য ! নাস্তিকের মনের কথাও মাঝেমাঝে অলৌকিক প্রাধান্য পায় – সে আমার কোল ঘেঁষে বসে হাতে এক গোছা বোগেনভ্যালিয়া নিয়ে। মিটিমিটি চেয়ে যখন সে একটা পাপড়ি ছিঁড়ে আমার দিকে তাকায় — সমস্ত অসুন্দর পলকে মুছে পুরো কামরায় যেন হাজার ভোল্টের ঝাড়বাতি জ্বলে ওঠে।

লোকাল ট্রেনের আড়াইঘন্টার টুকরো কোলাজে আমার রাফখাতা ভরে ওঠে কানায় কানায়।
আরেকটা দিন দেখব বলে আমি কাল হয়তো আবারও টিকিট কাটব – বলা তো যায় না, আবার কেউ ফুল হাতে টা-টা করে যদি ! সে দৃশ্য তো আমার মিস করলে চলবে না, তাই না !

Be the first to comment

আপনার মতামত...