এই ফেব্রুয়ারি ওঁরা ভাষা পাক : দ্বিতীয় কিষান লং মার্চ; একটি আলোচনা

কিষান লং মার্চ

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

২১ ফেব্রুয়ারি। আম্বেওয়াড়ায় দুপুরের খাবারের জন্য থামলেন ওঁরা। ১৪ কিলোমিটার হেঁটেছেন। প্রথম দিন। এখনও দেড়শ’রও বেশি রাস্তা। এখনও কোনও মিডিয়া নেই। আলো নেই। প্রচার নেই। ক্যামেরা নেই? কী আছে? প্রতিশ্রুতিভঙ্গের সেই ট্র্যাডিশন। আছে জোর, মনের জোর। শেষমেশ আলোচনায় রাজি হলেন গিরিশ মহাজন। জয়কুমার রাওয়াল। মহারাষ্ট্র সরকারের যথাক্রমে জলসম্পদ উন্নয়ন এবং পর্যটন দপ্তরের মন্ত্রী। বলা হল দুমাস অন্তর কৃষকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তাঁরা। কৃষকদের আর আসতে হবে না এতটা রাস্তা। লিখিতভাবে বলা হল। মৌখিক আলোচনা চলছিল। অশোক ধাওয়ালে তবু কিষান মার্চ থেকে সরে আসেননি। লিখিত বয়ান দরকার। প্রতিশ্রুতিভঙ্গের বিরুদ্ধে জোরালো সওয়ালের জন্য কিছু লিখিত বয়ান। প্রমাণ। অবশেষে জয়। আপাতত। মাতৃভাষা দিবসে ওঁদের মা মাটি, ফসল আর শ্রমের জয়। আপাতত।

এ তো গেল শেষটা। নাকি মাঝেরটা। শেষটুকু তো ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু তার আগেরটা। কেন মাত্র ১১ মাস পর আবার একটা লং মার্চ। কী সেই প্রতিশ্রুতি? কোথায় খেলাপ?

ওঁদের দাবিগুলো কী ছিল? শুধুই ঋণ মকুব? এতই সহজ? ওই জলকষ্টগুলো? ওই পুড়ে যাওয়া পেঁয়াজের জমির ওপর দাঁড়িয়ে লোন শোধের ভয়গুলো? বাষট্টির ভীমাবাঈ দাম্বালে। নাসিকের পেইন্ট তালুকের নিরগুদ কারাঞ্জলি গ্রামের ভীমাবাঈ। রোজ চারবার করে দেড় কিলোমিটার দূরের কুয়ো থেকে জল আনেন। আট থেকে দশ কুইন্টাল ধান ফলাতেন জমিতে। জমি মানে অন্যের। তাঁর নামে নেই। বৃষ্টি নেই। কুয়োতে জল নেই। ধান, অড়হর হয় না আর। ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম থেকে আঙুর, টমাটো তুলে এনে বিক্রি। ১৫০ টাকা আয়। ৪০ টাকা খরচা। শেয়ার করা অটোতে লড়াই। পাশে অনেকেই। পঞ্চান্নর ইন্দুবাই পাওয়ার। বয়সটা একটু কম। গল্প একই। আমেদনগরের গোপীনাথ নাইকওয়াড়ি। পেঁয়াজের জমি গরমে পুড়ছে। গত বছরে ২২০০০ টাকা লোন নিলেন? কিভাবে শোধ করবেন? সঞ্জয় গান্ধী নিরাধার পেনশন স্কিমে মাসে ছ’শ টাকা পান। হ্যাঁ, ছ’শ টাকা। মাসে। মাথায় বাইশ হাজারের ঋণ। পোড়া ফসল। হাতে মাসকাবারির ছ’শ। “আমরা চাষ করতে করতে মরছি। এখন মুম্বই যাচ্ছি। মরতে হলে ওখানেই মরব।” নির্বিকার গোপীনাথ। বয়স? অষ্টআশি। বছর সত্তরের ভিতাল চৌধুরী নাসিকে যেদিন একরাত থেকেছিলেন মার্চ শুরুর আগে, কিভাবে যেন চশমা হারিয়ে ফেললেন। ভিতাল দিনে তবু কাজ চালিয়ে নেবেন, রাতে হাঁটবেন কিভাবে? হাত পেয়ে যাবেন হয়ত কারও? কিন্তু সরকার? ‘সরকারের চশমা হারিয়েছে? নাহলে দেখছে না কেন কিছু?’ প্রশ্ন ভিতালের।

ভীমাবাঈ। ইন্দুবাঈ। পালাঘারের গাঙ্গুতাই ওয়ারঘার। হরিলাল মোড়ে। নাসিক, থানে, মারাঠাওয়ারা, দাহানু, পালাঘার – মহারাষ্ট্রের এইসব জেলার অসংখ্য উপজাতিদের গল্প। মহাদেব কোলি তপশিলি উপজাতির চাষি এদের অনেকেই। ২০০৬ সালে ফরেস্ট রাইটস আইনে অরণ্যের উপজাতিদের জমির মালিকানা নিজেদের নামে নেই। অদ্ভুত এক ড্রাকোনিয়ান অ্যাক্টে। মাসে ছ’শ টাকা পেনশন। ঋণ মকুবের কথা বলা হয়েছিল ঐতিহাসিক বারোই মার্চ। তবে ২০১৭ থেকে আজ অব্দি প্রতিশ্রুতির ৮ মিলিয়নের ভেতর মাত্র সাড়ে তিন মিলিয়নের ভাগ্যে সেসব জুটেছে। ৩৪০০০ কোটি টাকার ঋণমকুবের কথা বলে আদপে হয়েছে ১৭৫০০ কোটি। এই হল প্রতিশ্রুতির ছবি। বুলেট ট্রেন। হাইওয়ে প্রোজেক্ট। কোপ চাষের জমিতে। দস্তখত। নাম কে ওয়াস্তে ক্ষতিপূরণ। আর জলকষ্ট? ছবিগুলো দেখলাম। ২০১৮র মহারাষ্ট্রে ২৬টি জেলার ১৫১টি ব্লকে খরা, যার মধ্যে ১১২টি সেভেয়্যারলি স্ট্রেসড। মানুষগুলো যাবে কোথায়? কার কাছে? জল নিয়ে এমন বীভৎস জলছবির যদিও আরও একটা দিক আছে। ওয়াটার প্রোজেক্ট। মহারাষ্ট্র এবং গুজরাট সরকারের ভেতর নিজস্ব হিসেবনিকেশ। বিজেপি সরকারের বেশ কিছু রাজ্যেই নিজেদের মধ্যে এমন গোপন আঁতাত। দামানগঙ্গা-পিঞ্জল রিভার লিঙ্ক। গুজরাটের দামানগঙ্গা বেসিন থেকে জল যাবে মহারাষ্ট্রের পিঞ্জল রিজার্ভারে। বদলে গুজরাটের দাবি পার-তাপ্তি-নর্মদা রিভার লিঙ্ক। মহারাষ্ট্রের পার-তাপ্তির জল নেবে গুজরাটের নর্মদা। পার-তাপ্তি। শিল্প অঞ্চলের দূষিত জলের যোগান দেওয়া পার-তাপ্তি। আর এই জলের যোগান দেওয়া রিভার লিঙ্ক প্রোজেক্ট রূপায়িত হলে ৭৫টি গ্রামের ১৪০০০ উপজাতি জনসংখ্যা উচ্ছেদ হবে। ২০০০০ কোটির এই প্রোজেক্ট বানিয়ে নিজের আদি, দরিদ্র রাজ্যবাসীকে শেষ করে মারাঠা সরকার কার সুবিধে তৈরি করছেন?

এসব নিয়েই লং মার্চ। আয়োজনে অল ইন্ডিয়া কিষান সভা। সাহায্যে সিপিআই(এম)। নেতৃত্বে এ.আই.কে.এস. প্রেসিডেন্ট অশোক ধাওয়ালে, রাজ্য সেক্রেটারি অজিত নাভালে, সিপিআই (এম) বিধায়ক জিভা পাণ্ডু গাভিত এবং আরও অনেকে। প্রসঙ্গত এই গাভিতের চাপেই নাসিকের একমাত্র সুরগনা তেহশিলেই উপজাতিদের অরণ্যের জমির মালিকানা পাওয়ার লড়াইতে একসময় পাট্টা দেওয়া শুরু করেছিল মহারাষ্ট্র সরকার। কিষান সভার নেতৃত্বের পরিকল্পনা ছিল কুড়ি তারিখ নাসিক থেকে যাত্রা শুরু করে আট দিন হেঁটে মুম্বইতে পৌঁছবে লং মার্চ। একশ আশি কিলোমিটারের কাছাকাছি রাস্তা। শেষ হবে সাতাশ তারিখ। রাজ্যের বাজেটের দিন। সমাপতন। অবশ্য তাঁর আগেই পুলিশি ব্যাঘাত। তেরো তারিখ আমেদনগরের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হল সৈনিক কল্যান হলে। পুলিশ তখন আপত্তি করল না। দেড় হাজার জনের এই সভা থেকে কয়েকজন মিলে ডিসট্রিক্ট কালেক্টরের কাছে মেমো দিলেন। পরের দিন গ্রেপ্তার রাজ্য কিষান সভার সেক্রেটারি অজিত নাভালে। কিংবা পিম্পালনার আর সাক্রি পুলিশ থানা থেকে কিশোর ধামালে, বাঞ্জি গায়েকয়াড়, সুভাষ কুকুস্টে। কোন অপরাধে? পুলিশ জানাল ১৪৪ ও ১৮৮ ধারায় গ্রেপ্তার তাঁরা। কারফিউ ঘোষণা করার পরেও অজিতরা সেসব না শুনেই কালেক্টরের অফিসে গেছিলেন। জনা দশেক মিলে নাকি হামলা করেছিলেন। অথচ ওই দিনই এনসিপি এবং আরও কিছু পার্টির ধর্মঘট চললেও ছাড় দেওয়া হল সেসব। যত দোষ কিষান সভার। জবরদখল। কৃষক আত্মার উপর প্রশাসনি গায়ের জোর। পিম্পালনার থেকে নাসিকের দিকে আসা আড়াইশ’র উপর কৃষককে আটকে দেওয়া হল। একদিন দেরি হয়ে গেল ওঁদের নাসিক আসতে। এই একদিন ওঁদের কাছে অনেক। এসব বাধা, অনুমতির অপেক্ষার মাঝেই অশোক ধাওয়ালে লং মার্চের জমায়েত চালিয়ে গেছিলেন। প্রশাসনের রাগ সেখানেও। শেষমেশ একদিন পিছিয়ে ২১ তারিখে শুরু মার্চ।

সেই লং মার্চ। দাবি, তাই, শুধু ঋণ মকুব নয়। দাবি বেঁচে থাকার। পেনশন ছ’শ টাকা থেকে বাড়ার দাবি সরকার একসময় মেনে নিয়েও ন’শ-র বেশি হয়নি এখনও। সেই টাকা অন্তত তিন হাজার করতে হবে। লড়াই তারও। আইনের বদল চেয়ে অরণ্যের অধিকার। ফরেস্ট রাইটে উপজাতিদের জমির অধিকারের দাবি। পুরনো রেশন কার্ড বদলে নতুন কার্ড। ছেলেমেয়েদের স্কুল কলেজের মাইনের ছাড়। অন্তত কিছুটা। চাষের ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ। ক্রপ ইন্সিওরেন্স। ৬ লাখ হেক্টর মন্দির এলাকায় কাজ করা ভাগচাষীদের মন্দিরের জমির মালিকানা দেওয়া। এবং অবশ্যই এই সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি— খরার ত্রাণ। আশ্বাস। জলকষ্ট থেকে মুক্তির উপায়।

কষ্টের, ইতিহাসের গল্পগুলো এমনই। আশার কথা, আপাতত জয়। আপাতত হাঁটতে হচ্ছে না আনন্দীবাইদের। কে আনন্দীবাই? স্বামী মারা গেছেন। ছেলেমেয়ে নেই। বয়স ৭০ পেরিয়েছে। একাই হেঁটেছেন গত মার্চে। এবারও হেঁটেছিলেন ওই ১৪ কিলোমিটার। বাকি ওঁরা। ভীমাভাই, গোপীনাথ, হরিলাল, ইন্দুবাই, গাঙ্গুতাই, ভিতাল— আর ওঁদের লড়াই করার রাস্তায় পাশে দাঁড়ানো অশোক, অজিত, গাভিত। এই ফেব্রুয়ারি ওঁরা ভাষা পাক…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...