কাশ্মির, যুদ্ধ এবং কিছু অপ্রিয় সত্য…

যুদ্ধ জিগির

পাঞ্চালী কর

 

সমস্যাটা শুরু হয়, আমরা কাশ্মির আর কাশ্মিরীদের কিভাবে দেখি, সেখান থেকে। প্রথমটা বরফের পাহাড়, ডাল লেক, সবুজ উপত্যকা, শান্ত, সুন্দর, আর দ্বিতীয়টা হিংস্র, শত্রু, বন্দুকধারী, বিশ্বাসঘাতক, সন্ত্রাসবাদী, এবং পাকিস্তানি। তাই কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ অথচ কাশ্মিরীরা ভারতের নয়, তাঁরা এন্টাগনিস্ট। তাঁদের দেখলেই পিটিয়ে মারা যায়, কেউ তাঁদের পক্ষ নিলে, তাঁকে দেশদ্রোহীর তকমা এঁটে বিব্রত করা যায়। আমরা অবলীলায় ভুলে যেতে পারি কুনান এবং পোশপোরার মতো ভয়াবহ ঘটনা, কারণ একটা জনজাতিকে দমিয়ে রাখতে গেলে তাঁদের মেয়েদেরকে ধর্ষণ করা শুধু মাত্র পার্ট অফ্ প্রসেস্ নয়, বরং শাসকের অধিকার; একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও সমাজের সম্মান নারীর যোনিতেই সীমিত।

আমরা সকলেই জানি ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯এ কাশ্মিরের পুলওয়ামা জেলার লেথপোরা অঞ্চলে একটি আরডিএক্স বোঝাই সুইসাইড বোম্বার গাড়ি সেনাবাহিনীর কনভয়ের সাথে সংঘর্ষ করে, এবং তাতে ৪৪জন সিআরপিএফ জওয়ানের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর সারা দেশে রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাতাবরণ যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে পরে, ধর্মীয় হিংসাকে সম্বল করে মৌলবাদী শক্তি যেভাবে দেশকে কার্যত অচল করে দেয়, তা অনেকগুলো প্রশ্নের সম্মুখীন দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের।

কাশ্মির সমস্যা একটি রাজনৈতিক টোকেন, যা জিইয়ে রাখা হয় বৃহত্তর স্বার্থে। সরকার বদলায়, নেতা বদলায়, প্রতিশ্রুতির রকম ফের বদলায়, কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরেও কাশ্মির সমস্যা যেই তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই থেকে যায়। আর শাসক যখন নিজেই ফ্যানাটিক, তখন মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগকে হাতিয়ার বানিয়ে দেশে অচলাবস্থা সৃষ্টি করার জন্য কাশ্মির অব্যর্থ দাওয়াই, যাতে একদল মানুষ ব্যস্ত থাকে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের রক্ষায়, এবং অন্য দল ব্যাস্ত থাকে মৌলবাদী শক্তির থেকে নিজেদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে, এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে মানুষ ভুলে যায়।

জওয়ানদের ওপর হওয়া হামলা নিন্দনীয় এবং দুঃখজনক। যেই মানুষগুলো প্রাণ হারালেন তাঁরা অধিকাংশই অর্থনৈতিক দিক থেকে সচ্ছল পরিবারের নন, কেউ কেউ অনগ্রসর জাতির, ৪৪টা প্রাণের সাথে ৪৪টা পরিবারও অথৈ জলে পড়ে যায়। বলাই বাহুল্য যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তরফে কাশ্মিরের সাধারণ নাগরিকদের প্রতি নূন্যতম সহমর্মিতা দেখানোর প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া বিরল, বরং কাশ্মিরের আমজনতার কাছে ইন্ডিয়ান আর্মি একটা ত্রাস। তবুও এই মৃত্যু মিছিল মর্মান্তিক। মাইনে করা গরিব ঘরের ছেলেরা, যাঁরা আর্মির হয়ে প্রাণপাত করছে, অথবা আর্মির পোশাক গায়ে চাপিয়ে সভ্যতার টুঁটি টিপে ধরছে, দুই ক্ষেত্রেই তাঁর সিস্টেমের শিকার। এই সিস্টেম নামক পিরামিডের শৃঙ্গে যাঁরা বসে আছেন, তাঁদের ঘিরে রয়েছে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুরক্ষা বলয়। তাই রোদ, বৃষ্টি, মহামারী, যুদ্ধ, সব অবস্থাতেই তাঁরা অবিচলিত।

পুলওয়ামা বিস্ফোরণের পরবর্তী দিনগুলো কোনও সভ্য, গণতান্ত্রিক দেশের নজির হতে পারে না, কিন্ত আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা এমন এমন মানুষদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে বেছেছি, তাঁরা সংবিধানের ধার ধারে না। একটি গণতান্ত্রিক দেশ হওয়ার দরুণ সংবিধান আমায় একই সাথে কোনও বিষয়ে কনসেন্ট এবং ডিসেন্ট জানানোর অধিকার দেয়, কিন্তু এক মৌলবাদী শক্তি যখন ক্ষমতার শীর্ষে বসে থাকে তখন গণতান্ত্রিক আওয়াজের মুখ বন্ধ করাকেই শাসক অগ্রাধিকার দেন। মেকি দেশভক্তির ধ্বজা ধরে দেশের প্রতিটি কোণা রক্তাক্ত করে দেয় বজরং দল, আরএসএস, ইত্যাদি উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তি। যেসব সংবেদনশীল মানুষ পাকিস্তানী মাত্রই জঙ্গি ভাবেনা, কাশ্মিরি মাত্রই সন্ত্রাসী ভাবে না, মানুষের অধিকারের লড়াই নিয়ে কথা বলে, সুষ্ঠু সমাধান চায় যুগ যুগ ধরে চলতে থাকা কাশ্মির সমস্যার, যাঁরা যুদ্ধ চায় না, সেনাবাহিনীর রক্ষকরূপী ভক্ষক সত্যকে কটাক্ষ করে, তাঁদের ওপর নেমে আসে উগ্রবাদী গণ-হিস্টিরিয়ার হামলা। যুক্তিবাদী মানুষদের মুখ বন্ধ করতে রাস্তায় নামে হাজারে হাজারে তরুণ, যাদের মগজধোলাই করা হয়েছে ধর্মের নামে। রক্তাক্ত হতে থাকে দেশের মাটি। “যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই” বললেই জোটে গণপ্রহার, মব-লিঞ্চিং। শান্তি মিছিলেও নেমে আসে অতর্কিত হামলা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশ এবং প্রশাসন নীরব দর্শক মাত্র। সোশাল মিডিয়ায় কেউ স্বাধীন মত প্রকাশ করলে তাঁরও জীবন দুর্বিষহ করে তোলে স্বঘোষিত ধর্মযুদ্ধের কাণ্ডারীরা। অকথ্য গালিগালাজ, রেপ থ্রেট, প্রোফাইল হ্যাক করা, স্টক করা, হুমকি, কিছুই বাদ যায়নি। যুদ্ধ ঘোষণা হওয়ার আগেই গোটা দেশটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ওঠে সেই দেশের নাগরিকদের জন্য। সরকারের নেকনজরে থাকতে কর্মক্ষেত্র থেকে প্রতিবাদী কর্মীদের বহিস্কার করেন বহু সংস্থা। সব চাইতে করুণ অবস্থা হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত কাশ্মিরি মানুষদের। উন্মত্ত রক্তপিপাসু জনরোষ নেমে আসে নিরীহ শালওয়ালা এবং অন্যান্য ব্যবসায়ীদের উপর, কারণ তাঁদের পরিচয়, তাঁরা কাশ্মিরী।

অদ্ভুত কথা যে যেই মানুষগুলোর অন্ধ ভক্তি আছে দেশের সেনাবাহিনীর ওপর, যাঁরা সেনাবাহিনীর দিকে আঙুল তুললে খুন করে দিতে মরিয়া, তাঁরা কেউ প্রশ্ন করে না: নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন আগাম সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়নি সেনা কনভয়ের জন্য? বছরের পর বছর সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করে চলা শাসক দলের অপদার্থতায় কেন হনুমান থাপার মত একজন মানুষকে অবলীলায় মরে যেতে হয়? রাফাল, ব্যাপমের মত কেলেঙ্কারির নায়ক কেন্দ্রীয় শাসক দল চারহাজার কোটির মূর্তি বানাতে পারেন অথচ সেনাদের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও নিরাপত্তা দেওয়ার পয়সা থাকে না কেন? উত্তর খুব সহজ, কারণ মূর্তিতে ভোট আছে। সেনারা বেশিরভাগই সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা, তাদের প্রাণের বদলে ভোট ব্যাংক সুনিশ্চিত হলে রাষ্ট্রের বিশেষ ক্ষতি নেই। এই সব অত্যন্ত সাধারণ এবং প্রাসঙ্গিক প্রশ্নেই টনক নড়েছে “ভোট যুদ্ধের নায়ক”দের আর তাদের গুণ্ডাবাহিনীকে এগিয়ে দিয়েছে মুখ বন্ধ করতে। যেই আর্মির নামে মৌলবাদী শক্তি জান নিতে বদ্ধপরিকর, সেই আর্মির একজন জওয়ানকে শ্মশানে দাহ করতে দেওয়া হয় না, কারণ সে নিচু জাতের। যেই “সিয়াচেন পে হমারে জওয়ান লড় রহেঁ হ্যাঁয়” বক্তব্য তুলে সব প্রশ্নের মুখ বন্ধ করে দেয় তথাকথিত সাচ্চা দেশভক্তরা, সেই সিয়াচেনে বছরের পর বছর সার্ভিস দেওয়া জওয়ানদের হিমশিম খেতে হয়, আসামের এনআরসিতে নাগরিকত্ত্বের প্রমাণ দিতে।

যখন রাফালে বিতর্ক প্রশ্নের শীর্ষে, যখন বেকারত্ব গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বাধিক ব’লে প্রমাণিত হয়, যখন ডিমনিটাইজে়শনের পর কালো টাকার কানাকড়িও ফেরত আসে না, যখন কৃষকদের আত্মহত্যা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে ঋণের ভারে, অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে কিছু মানুষ দেশ থেকে বেপাত্তা হয়ে যেতে পারে, যখন দেশের লাখো লাখো কৃষক পা মেলায় নিজেদের দাবি জানিয়ে, যখন সমাজকর্মী, সাহিত্যিক, আইনজীবীদের অধিকারের লড়াইয়ের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বন্দি করা হয় ইউএপিএর মত অগণতান্ত্রিক আইনের আওতায়, যখন কোন মানুষের বাড়ির ফ্রিজে কিসের মাংস আছে, সেই প্রশ্নে তাকে প্রাণ দিতে হয়, যখন দেশের একটা বড় অংশের মানুষকে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতে হয় কারণ তাঁরা মুসলমান, যখন দেশের উপজাতিদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, যাতে মানবসম্পদ কর্পোরেটদের হাতে বেচে দেওয়া যায়, তখন এত প্রশ্নের থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে একটা বৃহৎ যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিবেশ আবশ্যিক। মানুষ বাধ্য হয় অন্যান্য প্রশ্ন থেকে নজর ঘোরাতে এবং কাশ্মির সমস্যা তথা মৌলবাদ নিধনে মনোনিবেশ করতে। ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হাসিমুখে জানান, তিনি যুদ্ধ নয়, শান্তি আলোচনায় আগ্রহী। যবনিকা পতন। হ্যাপি এন্ডিংস।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1180 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*