‘চলল মেয়ে রণে চলল’ — একটি গৌরবময় যাত্রা

গরিমা যাত্রা

শতাব্দী দাশ

 

নিজের নাম এবং ধাম বলতে তাঁদের আটকাচ্ছে না আর। বরং সাংবাদিকরাই তাঁদের পরিচয় গোপন রাখছেন, সুপ্রিম কোর্টের আদেশের প্রতি প্রথামাফিক সম্মান দেখিয়ে। ধর্ষিতার পরিচয় গোপন রাখার নির্দেশ দিয়েছিল মহামান্য সর্বোচ্চ আদালত। তাই জ্যোতি সিং-কে আমরা ‘নির্ভয়া’ বলে ডেকেছি৷ কিন্তু ২০১৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি ভারতবর্ষের রাজধানী শহরে যাঁরা এসে পৌঁছলেন পঁয়ষট্টি দিনের সুদীর্ঘ ‘গরিমা যাত্রা’-র শেষে, তাঁরা প্রতি ইঞ্চিতে বিলক্ষণ নির্ভীক ও অদম্য। এই ‘যাত্রা’ দৃশ্যমান করল তাঁদের, যাঁরা নিজেদের ‘মুখ পুড়িয়েছেন’ ও সেই পোড়ামুখ লুকিয়ে রাখার নিদান পেয়েছেন সমাজের থেকে। ভিক্টিম না বলে তাঁদের সার্ভাইভার বলাই বাঞ্ছনীয়। এঁরা উত্তীর্ণা।

দফায় দফায় রাজধানী সহ দেশের নানা প্রান্তে কৃষকদের মিছিল আছড়ে পড়ছে। আগামী ৩রা মার্চ ন্যূনতম মজুরির দাবিতে রাজধানী শহরেই আছে শ্রমিকদের র‍্যালি। তার মাঝখানেই দিল্লিতে এসে পৌছল আরেক মিছিল। প্রায় পাঁচ হাজার যৌন নির্যাতনের শিকার মহিলাদের, তাঁদের আত্মীয়দের মিছিল৷ অধিকাংশ ভারতবাসী যখন পুলওয়ামার ঘটনার পর ডন কিহোতের মতো উইন্ডমিল বা কাশ্মিরী শালওয়ালার দিকে তেড়ে যাচ্ছিলেন ‘পাকিস্তানি, পাকিস্তানি’ বলে, তখন তাঁরা পা রাখলেন নতুন দিল্লিতে৷

২০ ডিসেম্বর, ২০১৮তে তাঁরা জড়ো হয়েছিলেন মুম্বাই-এর সোমাইয়া ময়দানে৷ তাঁরা মূলত প্রত্যন্ত ভারতের নিম্নবর্ণ, দলিত, আদিবাসী মহিলা। শুরুর সেই দিনে অ্যাসিড-আক্রমণ অ্যাক্টিভিস্ট লক্ষ্মী আগরওয়াল ছিলেন। ছিলেন প্রবাদপ্রতিম ভাঁওয়ারি দেবী, যাঁর ধর্ষণ ছিল জাতীয় লজ্জা। ভাঁওয়ারি দেবী মুম্বাই থেকে দিল্লির সুদীর্ঘ যাত্রাপথও অতিক্রম করেছেন মিছিলের মেয়েদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। তাঁর নিজের ধর্ষণ মামলাটিও তো এখনও ফয়সালার অপেক্ষায়, অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকেই যদিও আদালতের দীর্ঘসূত্রী রায়ের অপেক্ষা না করে ইহলোক ত্যাগ করেছেন!

জনজোয়ারের সঙ্গে পথে এসে মিশেছেন আরও মেয়েরা। হেঁটেছেন দুই, তিন বা চার দিন। তারপর ঘরে ফিরে গেছেন কেউ কেউ৷ বাকিরা এগিয়ে গেছেন। চব্বিশটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের দুশোটি জেলা অতিক্রম করে অবশেষে এই মিছিল দিল্লিতে পৌঁছল ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯। পেরিয়ে এল দশ হাজার কিলোমিটার পথ৷

ব্যাঙ্গালোর, গোয়া, রায়পুরের মতো নানা শহর অতিক্রম করেছে মিছিল। পশ্চিমবঙ্গেও খড়্গপুর হয়ে কলকাতাকে ছুঁয়েছিল মিছিল। আন্দোলনকারীরা সমর্থন পেয়েছেন দেশবাসীর। আবার ভাঁওয়ারি দেবীর নিজের গ্রামে যখন মিছিল প্রবেশ করেছে, তখন যোগ দিতে কেউ এগিয়ে আসেনি, এমন ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু দমেননি কেউ। কারণ জানতেন, পিছিয়ে আসার উপায় আর নেই, হারাবারও আর কিছু নেই৷ দাবি করা হচ্ছে, যদিও দিল্লিতে এসে পৌঁছেছেন কম-বেশি পাঁচহাজার জন, কিন্তু পথে যুক্ত-বিযুক্ত সব অংশগ্রহণকারীকে ধরলে মিছিলকারীর সংখ্যা পঁচিশ হাজার ছোঁবে। যোগ দিয়েছিলেন সমাজকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী দেশবাসীও। দিল্লির রামলীলা ময়দানে আজীবন লড়াই-এর অঙ্গীকার নিয়ে সে মিছিল আপাতত শেষ হল।

বিভিন্ন বেসরকারি সমাজসেবী সংস্থার উদ্যোগে এই যাত্রার আয়োজন। এই মিছিলের ঘোষিত লক্ষ্য হল মহিলা ও শিশুদের উপর ঘটে চলা যৌন নির্যাতন নির্মূল করা।

লক্ষ্য আপামর দেশবাসীকে যৌন নির্যাতনের ভুক্তভোগীদের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করাও বটে। আন্দোলনকারী মহিলারা চান, যৌন নির্যাতন আরও বেশি আলোচিত হোক। চান, যৌন নির্যাতন নিয়ে স্থানীয়, রাজ্য বা জাতীয় স্তরে নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদেরও স্বর থাকুক।

‘গরিমা যাত্রা’-য় ছিলেন রাজস্থানের ধর্ষিতা বধূ। ছিলেন মহারাষ্ট্রের গ্রাম থেকে পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েটি। ছিলেন মধ্যপ্রদেশ-মহারাষ্ট্রের সীমানায় অবস্থিত গ্রামের যুবতী, যিনি পুলিশের দ্বারাই ধর্ষিত। ছিলেন মান্দাসৌরের আদিবাসী মহিলা, যাঁকে ১৫ বছর বয়সে বাধ্য করা হয়েছিল দেহ-ব্যবসায়।  রাজস্থানের ভাঁওয়ারি দেবী নিজে তো ছিলেনই। তিনি সরকারি দায়িত্ব পেয়েই গেছিলেন সদ্যোজাত মেয়েদের ‘বিয়ে’ রুখতে। তারপর সেই ‘অপরাধে’ গণধর্ষিত হন৷ তাঁর জীবন বহুচর্চিত, এমনকি চলচ্চিত্রায়িতও বটে। তাঁর সংগ্রামের ফলেই ভারতের মেয়েরা কর্মক্ষেত্রে যৌন সুরক্ষা-সংক্রান্ত ‘বিশাখা গাইডলাইন’ পেয়েছে।  তিনি বললেন, তাঁকেও পুলিশি লাঞ্চনা ও অপমান কম সহ্য করতে হয়নি। বললেন, এই ‘যাত্রা’ মানুষকে বোঝাবে, নির্যাতিতকে বেশ্যা, ডাইনি, নষ্ট মেয়েমানুষ হিসেবে দেগে দেওয়া যায় না।

এই ‘যাত্রা’-র আহ্বায়ক আসিফ খান একে একে মেলে ধরেন নথি। বলেন, ২০১৮ সালের ‘স্পিক আউট’ সার্ভে অনুযায়ী ১৫০০০ জনের মধ্যে ১১৫০ জন বলেছিলেন, তাঁরা যৌন নির্যাতনের শিকার, ৬৪% বলেছিলেন নির্যাতক পূর্বপরিচিত, ২৮% বলেছিলেন যৌন নির্যাতন ঘটেছে নিজের বাড়ির মধ্যেই, ১০% বলেছিলেন, যৌন নির্যাতন ঘটেছে আত্মীয় বন্ধু বা প্রতিবেশির বাড়িতে। এছাড়া ৬২% বলেছিলেন, তাঁরা যৌন অত্যাচারের পর মুখে রা-টি কাড়েননি। কাউকেই জানতে দেননি, তিনি ধর্ষিতা।

এই মহিলারা বা তাঁদের আত্মীয়রা শুধু ধর্ষণের ঘটনার শিকার নন। তাঁরা শিকার হয়েছেন ধর্ষণোত্তর সামাজিক বৈরিতার। তাঁদের সাহায্য করতে চায়নি পুলিশ। মুখ দেখতে চায়নি শ্বশুরবাড়ি৷ আদালতে গিয়ে পৌঁছলে মামলা ঝুলেছে দিনের পর দিন৷ তাঁরা একঘরে হয়েছেন। ধর্ষক ছাতি চিতিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। তাঁরা অনেকদিন ধরে জেনেছেন ও মেনেছেন যে তাঁদের উপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের জন্য কোনো না কোনো ভাবে দায়ী ছিলেন তাঁরা নিজেরাই। ক্রমশ এঁরা বিভিন্ন সংস্থার সাহায্যে সংগঠিত হয়েছেন। একজনের গল্প শুনেছেন অন্যজন। বুঝেছেন, যৌন অত্যাচারের এক বিশ্বজনীন মাত্রা আছে। বুঝেছেন, তথাকথিত দ্বিতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে জন্মানো ছাড়া তাঁরা আর কোনো অপরাধ করেননি, বরং নৃশংস অপরাধের শিকার হয়েছেন৷ সংগঠন করতে গিয়েই তাঁরা প্রথম সমমর্মী কাঁধ পেয়েছেন। এভাবেই অলক্ষ্যে লেখা হয়েছে ‘রাষ্ট্রীয় গরিমা অভিযান’-এর খসড়া। তাঁরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, এ’ লড়াই শুধু তাঁদের নিজেদের জন্য ন্যায় ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই নয়, এ’ লড়াই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার লড়াই-ও বটে। ভাঁওয়ারি দেবী যেমন বললেন, “ন্যায় লেকে ছোড়োগো। মোনে না মিলোগো ন্যায়, তো মোরো বহেনোকো না মিলোগো, বেটিয়োকো না মিলোগো।”

আবার মিছিলের নামেই বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁরা, শুধু আইনিভাবে ন্যায় পেলেই সন্তুষ্ট হবেন না। বরং দাবি হল ‘গরিমা’ বা আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার অধিকার। ধর্ষিতা হিসেবে মাথা নিচু করে বাঁচতে আর রাজি নন কেউ।

শহুরে ভারতের মেয়েদের হাতে ছিল অ্যান্ড্রয়েড, ল্যাপটপ, প্রযুক্তি, আন্তর্জাল। তবু তাদের #মিটু মুভমেন্ট শুরু করতে দেরি হয়েছে, অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব জয় করতে হয়েছে। ‘মিটু মুভমেন্ট’-এর ফলে আজ নাহয় এমজে আকবর কাঠগড়ায়, বলিউড থরথর। কিন্তু তার পাশে এই মিছিলকে কী বলব আমরা? দলিত, সংখ্যালঘু, নিম্নবর্ণের ‘মিটু আন্দোলন’? গ্রামীণ ভারতের উৎস হতে উৎসারিত ‘স্লাট-ওয়াক’?

মধ্যপ্রদেশের পঁয়ত্রিশ বছর বললেন,

এক সভায় এক স্কুলের হেডমাস্টার আমাদের মুখে ‘বালাৎকার’ শব্দটা শুনেই রেগে গেলেন, কি আশ্চর্য! অথচ আমরা তো সেই যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে গেছি।

বছর পঁচিশের তরুণী উত্তর দিলেন,

আমাদের ওখানে তো সবাই ভাবে, খারাপ জামাকাপড় পরলে রেপ করা হয়। অথচ আমি তো শাড়িই পরে ছিলাম।

উজ্জ্বয়িনীর এক বধূ বললেন,

তখন সদ্য মা হয়েছি। মেয়ের বয়স দেড়। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ একটা গাড়ি এল৷ আমার মেয়েটার গলার নলিতে ছুরি ঠেকাল ওরা। বলল আমি গাড়িতে না উঠলে ওকে মেরে ফেলবে। আমি গাড়িতে উঠলাম৷ টুঁ শব্দও করতে পারলাম না৷ সাতদিন ধরে লাগাতার গণধর্ষণ করে  আমাকে ওরা ছেড়ে দিল।

তারপর?

স্বামীর বাড়ি ফিরলাম। খিস্তি, অপমান জুটল। আমি নাকি মিথ্যে বলছি। নাকি ইচ্ছে করেই চলে গেছিলাম কারও সঙ্গে। হাতে-পায়ে ধরে বরকে রাজি করেছিলাম এফআইআর করতে৷ প্রায় বিশ-পঁচিশ দিন পর থানায় যাওয়া হল। দেখা গেল, ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে আগাম জামিন নিয়ে রেখেছে আমার ধর্ষকরা৷ এখন এফআইআর করতে পঞ্চাশ হাজার খরচ পড়বে।

স্বামী আর বেশিদিন পাশে থাকেনি তাঁর। নিজের লড়াই তিনি নিজেই লড়ছেন এখন। পাশে পেয়েছেন সহ-ভুক্তভোগীদের, সহ-যোদ্ধাদের। তিনি এখন নিষিদ্ধ টু-ফিঙ্গার টেস্ট নিয়ে দৃঢ় বক্তব্য রাখতে পারেন। জানেন, তাঁর যে টু-ফিঙ্গার টেস্ট হয়েছিল, তা প্রকারান্তরে দ্বিতীয় ধর্ষণ। তিনি এখন মতামত রাখেন—

চুপ রহোগি তো গন্দেগি অউর ফ্যায়লেগি৷ আওয়াজ উঠাওগি তো গন্দেগি দূর হোয়েগি।

আরেকটি মেয়ে ধর্ষিত হয়েছিল স্কুলে, শিক্ষকের দ্বারা। বাড়িতে বলতে পারেনি নাবালিকা। একদিকে স্কুলে যাওয়ার ভয়, অন্যদিকে স্কুলে না যাওয়ার জন্য বাড়ির লোকের গঞ্জনা! বাচ্চা মেয়েটি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে। মিছিলে ছিলেন তার মা-ও। ন্যায় চাই তাঁর, মৃত মেয়ের জন্য।

এসেছিলেন এক ধর্ষিতার তরুণ ভাই। এঁদের পরিবারে ছয় বোন ও এক ভাই। ছোটবোনটি ছাড়া সকলেই নিরক্ষর বা স্কুলছুট। দশ ক্লাসের বোর্ড এক্সামের জন্য এডমিট কার্ড আনতে গেল সেই ছোটবোন। সেদিনই অপহৃত আর ধর্ষিত হল সে। ভায়ের লড়াই শুরু হয়েছে সেদিন থেকে।

ছিলেন কোনও ধর্ষিতার বাবা-ও, যে বাবা নিজের মেয়েকেই অচ্ছুৎ করে রেখেছিলেন পরিবারে ৷ তিনি বললেন, “গরিমা যাত্রা আমার চোখ খুলে দিয়েছে। মেয়েটাকে চোখের সামনে দেখলেই রাগ হত, হতাশা হত। ওকে আপদ মনে হত! আজ বুঝছি, আমার মেয়েটা নির্দোষ, অসহায়। আমি ভুল করেছি। অপরাধীরা শাস্তি পাক!”

হাতে তাঁদের বাঁধা গোলাপি বা বেগনি  ফিতে। ক্যামেরার সামনে আসছেন তাঁরা ঘোমটায় মুখ ঢেকে। কিন্তু যখন স্লোগান দিচ্ছেন বা গান ধরছেন- ‘চলো সখি আজ হাম সংগঠন বানায়েঙ্গে’, তখন তাঁরা বে-পর্দা, বেহায়া, বেপরোয়া। তখন হাততালি আর ঢোলকের তালে আশ্চর্য ছন্দোময় যূথবদ্ধতা। চ্যানেলগুলো বরং স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে  আবছা করে দিচ্ছে তাঁদের মুখ! দেশ বুঝি লজ্জা পেল তাঁদের চোখে চোখ রাখতে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1320 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...