ধনের বিকট অসাম্য ও একটি বর্ণান্ধ রাক্ষসের ছায়া

ধনের অসাম্য

দেবব্রত শ্যামরায়  

 

…. Caste System is not merely division of labour. It is also a divison of labourers. Civilized society undoubtedly needs division of labour. But in no civilized society is division of labour accompanied by this unnatural division of labourers into watertight compartments… In no other country is the division of labour accompanied by this gradation of labourers.

[Annihilation of Caste. B. R. Ambedkar. 1936.]

গত দশ দিনের অধিকাংশ সময় জুড়ে সংবাদমাধ্যম, সোশাল মিডিয়া এবং জনপরিসর দখল করে ছিল পুলওয়ামায় সৈনিকদের নিধনের দুঃসংবাদ ও তৎপরবর্তী চাপানউতোর। সাম্প্রতিক তথ্যপ্রমাণের দিকে তাকালে মনে হয়, পুলওয়ামা, জম্মু ও কাশ্মিরের এই সীমান্তবর্তী জেলাটি সম্ভবত ভারতের দুর্বলতম ও সর্বাধিক হামলাপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে একটি। আমাদের হয়তো মনে থাকবে, অন্তত মনে থাকার কথা ছিল, আজ থেকে দু’বছর আগে, কাশ্মিরের এই পুলওয়ামা জেলাতেই, পাম্পোরে, একই ধরনের জঙ্গি হামলায় মৃত্যু হয়েছিল আট সিআরপিএফ জওয়ানের।

সেদিনও একইভাবে শোকে, বিপন্নতায় কেঁপে উঠেছিল গোটা দেশ। কিন্তু আমাদের যা চট করে মনে পড়বে না, এই আট জওয়ানদের মধ্যে একজন ছিলেন— কনস্টেবল বীর সিং। উত্তরপ্রদেশের ফিরোজাবাদ জেলার বাসিন্দা। বীর সিং-এর নাম আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর অন্য সহযোদ্ধাদের মতো শহিদের মর্যাদাপ্রাপ্তিতে তাঁর গল্পটা শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর পরিবার ও গ্রামবাসীরা গ্রামেরই একখণ্ড জমিতে শেষকৃত্য সম্পাদন করতে গেলে তাঁদেরকে বাধা দেওয়া হয়। বাধা দেয় গ্রামের উচ্চবর্ণরা। বীর সিং ছোট জাত, গ্রামের জমিতে তাঁর সৎকার সম্ভব নয়৷ যাই হোক, দীর্ঘ টালবাহানা, কাকুতিমিনতি, কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ইত্যাদির পরে বীর সিং-এর মরদেহ সৎকারের ‘অনুমতি’ মেলে।

বর্ণব্যবস্থার চর্চা কতটা গর্হিত, বর্ণভেদই হিন্দু ভারতের আত্মা কিনা, এই অনুশাসন ভারতবর্ষকে কতযুগ ধরে পেছনে টেনে রেখেছে– এসব বিষয়ে হাজার হাজার শব্দ ইতিপূর্বে লেখা হয়ে গেছে, তাই নতুন করে গল্পগাছা করার ইচ্ছে নেই৷ বরং আমরা সরাসরি কিছু তথ্য ও পরিসংখ্যানের কাছে যাব, দেখে নেব, বর্তমান ভারতে সম্পদের জাতভিত্তিক বণ্টনের রূপরেখাটা ঠিক কেমন?

অবশ্য এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, নিম্নবর্ণের উপরে উচ্চবর্ণ দ্বারা নামিয়ে আনা অপরাধের ইতিহাস নাকচ করার জন্য স্বাধীনতার পর থেকেই নিম্নবর্ণের মানুষজনকে সরকারি কাজের ক্ষেত্রে জাতভিত্তিক সংরক্ষণ দেওয়া হচ্ছে৷ শুধুমাত্র শিডিউলড কাস্ট ও শিডিউলড ট্রাইব যে সুবিধা পেত, নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে প্রায় একই সুবিধা চালু হয়েছে অন্যান্য কিছু পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষদের (অর্থাৎ ওবিসি) জন্যেও। উদ্দেশ্য, সকলের জন্য ক্রমে ক্রমে একটা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা— যেখানে পিছিয়ে পড়া শ্রেণিগুলি গণতান্ত্রিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রের সামান্য সহযোগিতা পেলে আর্থসামাজিক উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উপরে উঠে আসতে পারবে। তারপর একটা সময় আসবে, যখন আর সংরক্ষণের দরকার হবে না, প্রত্যেকেই মোটামুটি সমান আর্থসামাজিক অবস্থানে থেকে নিজেদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটাবে ও রাষ্ট্রনির্মাণে অংশ নেবে।

সত্যিই কি তাই? সত্তর বছরের সমাজবান্ধব সংরক্ষণ কি আদৌ ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা শ্রেণির মানুষগুলোকে সামনের দিকে প্রয়োজনীয় ‘পুশ’টুকু দিতে পেরেছে? আর্থিক ও সামাজিক অসাম্য কমাতে পেরেছে? দেখা যাক।

সাবিত্রীবাই ফুলে পুণে বিশ্ববিদ্যালয়, জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ দলিত স্টাডিজ— এই তিনটি সংস্থা দেশজুড়ে জাতভিত্তিক সম্পদ বণ্টনের ওপর একটি যৌথ সমীক্ষা চালিয়েছিল, যার রিপোর্ট সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে। এই সমীক্ষায় দেশের কুড়িটি জেলার শহর ও গ্রামের মোট ১,১০,৮০০টি বাড়িকে নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই বাড়িগুলির মধ্যে ৫৬% বাড়ি শহরাঞ্চলের, বাকিগুলি গ্রামের। সমীক্ষাটি চলেছিল ২০১৫ থেকে ২০১৭, এই দু’বছর ধরে এবং সমীক্ষায় যে তথ্যগুলি বেরিয়ে এল, তা এইরকম—

১। ভারতের জনসংখ্যার ২২.২৮% উচ্চবর্ণের হিন্দু, তারা দেশের মোট সম্পদের ৪১% অধিকার করে রয়েছে৷

২। জনসংখ্যার ৩৫.৬% হিন্দু ওবিসি, তারা জাতীয় সম্পদের ৩১% অধিকার করে আছে।

৩। শিডিউলড কাস্ট ও শিডিউলড ট্রাইবরা সম্মিলিতভাবে জনসংখ্যার ২৭%, তাদের হাতে সম্পদের অধিকার ১১.৩%।

৪। জনসংখ্যার ৭.৮% শিডিউলড ট্রাইব, যারা বর্ণব্যবস্থার সবচেয়ে নিচের ধাপে অবস্থান করছে, দেশের সম্পদের মাত্র ৩.৭% তাদের অধিকারে আছে।

উপরের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, বেদ-পরবর্তী যুগে বর্ণাশ্রমকে ব্যক্তির উৎকর্ষ-কেন্দ্রিক থেকে বংশানুক্রমিক করে দেওয়ার যে সুবিধাবাদী অনুশাসন চালু হল, তার ‘সুফল’ উচ্চবর্ণ হিন্দু এখনও ভোগ করে চলেছেন৷ বর্ণব্যবস্থাকে ক্রমে তামাদি করে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারি সমস্ত প্রচেষ্টা, সাংবিধানিক ব্যবস্থাপত্র সবই এখনও অবধি সমস্যার উপরিতলে কয়েকটা আঁচড় কাটতে পেরেছে মাত্র৷ উচ্চবর্ণের অধিকৃত সম্পদের বৃদ্ধির হার শিডিউলড কাস্ট ও ট্রাইবদের সম্পদ বৃদ্ধির হারের থেকে কম না হলে সেই কাঙ্ক্ষিত সাম্যে পৌঁছোনো সম্ভব নয়, এবং স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও বর্ণব্যবস্থার উপর ছোটবড় আঘাত সত্ত্বেও যার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দুর্ভাগ্যজনক, এই দেশে এখনও একজন ব্যক্তির ‘জাত’ ঠিক করে দিচ্ছে, সে কতটা শিক্ষা পাবে, কী ধরনের কাজ করবে, ও সারাজীবন ধরে কতটা সম্পদ আহরণ করবে৷ আদৌ করবে কিনা৷ উল্টোদিকে দেশের সরকার সম্প্রতি ‘দরিদ্র’ জেনারেল কোটার জন্য ১০% সংরক্ষণ ঘোষণা করেছেন, তার জন্য সংবিধানও সংশোধন করেছেন, অথচ এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনও পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নেই, প্রাপ্ত আর্থসামাজিক তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতি নেই, প্রয়োগগত স্বচ্ছতা নেই, শুধু উচ্চবর্ণ হিন্দুকে বোকা বানিয়ে দু-দশটা ভোট টানার অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে।

ধনের এই অসম বণ্টনের পেছনে বর্ণব্যবস্থার ভূমিকা জটিল ও বহুস্তর, নানা দিক থেকে তার আলোচনা হতে পারে। তবে পরিসংখ্যান থেকে এই বিকট অসাম্যের একটা বড় কারণ স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া যায়। সংরক্ষণ যে নিম্নবর্ণকে কাঙ্ক্ষিত স্তরে নিয়ে আসতে পারছে না, তার প্রধানতম কারণ বুনিয়াদি স্তর থেকে শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতা৷ সাধারণত স্নাতক স্তর অবধি পড়াশুনো না করলে ঠিকঠাকভাবে সংরক্ষণের আওতায় আসা যায় না। ২০১১-এর আদমশুমারী অনুযায়ী নিম্নতমবর্ণের (শিডিউলড ট্রাইব) মধ্যে মাত্র ১৩.৪% স্নাতক, অর্থাৎ জনজাতিদের প্রায় বেশিরভাগ মানুষই সংরক্ষণের সুবিধার আওতায় পৌঁছতেই পারছেন না। যদিও এই হার ক্রমশ বাড়ছে, কিন্তু তার গতি কচ্ছপের।

সমীক্ষাটি পরিসংখ্যানকে আরও বিস্তারে শহর ও গ্রামের সম্পদের ভিত্তিতেও ভেঙেছে।

৫। শহরে বসবাসকারী হিন্দু উচ্চবর্ণের হাতে শহরের সম্পদের ৩৪.৯%। গ্রামে বসবাসকারী হিন্দু উচ্চবর্ণের হাতে গ্রামীণ সম্পদের ১৬.৭%।

৬। অন্যদিকে, গ্রামে বসবাসকারী হিন্দু শিডিউলড ট্রাইবরা শহরের শিডিউল্ড ট্রাইবদের চেয়ে ধনী। গ্রামে বসবাসকারী শিডিউলড ট্রাইবরা গ্রামের ১০.৪% সম্পদ ভোগ করছেন, সেখানে শহরে বসবাসকারীদের হাতে সম্পদ মাত্র ২.৮%।

জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুখদেও থোরাট ব্যাখা করলেন এই অসাম্যের। শহরের উচ্চবর্ণ হিন্দুরা ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষাদীক্ষার দিক থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি এগিয়ে থাকা গোষ্ঠী। শুধুমাত্র এই শিক্ষার কারণেই চাকরি, ব্যবসা ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা বেশি করে তাদের নাগালে রয়েছে। অন্যদিকে, শহরাঞ্চলে যেসব হিন্দু শিডিউলড ট্রাইব রয়েছেন, তারা প্রকৃত অর্থেই প্রান্তিক। গ্রামে তাদের কোনও জমিজমা নেই, গ্রাসাচ্ছাদন চলছিল না বলে তাদের শহরে চলে আসতে হয়েছে, শহরে এসে বিভিন্ন অসংগঠিত ক্ষেত্রে নানারকম ছোটখাটো কাজ করে তাদের দিন চলে, গ্রামে থেকে যেতে পারা হিন্দু নিম্নবর্ণের তুলনায় তাদের আর্থিক অবস্থা অনেক বেশি খারাপ।

তথ্যের ভারে লেখাটি আর বেশি ভারাক্রান্ত করে লাভ নেই। মোটের ওপর একটা কথা পরিষ্কার, জাতভিত্তিক সামাজিক অসাম্যকে দূর করার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রকল্পগুলির আশানুরূপ ফল ফলছে না, তার প্রধান কারণ ভারতবর্ষের প্রান্তিক মানুষটির কাছে শিক্ষাকে পৌঁছে দেওয়া যায়নি৷ কবে যাবে তাও জানা নেই। স্কুলে ড্রপ আউটের সংখ্যা একটা বড়সড়ো চিন্তার কারণ। অনেক ক্ষেত্রে, নিম্নবর্ণের শিশুটি নিজের ভাষায় পড়াশুনো না করতে পারায় মাঝপথে উৎসাহ হারাচ্ছে। ক্লাসে শিক্ষক পড়ানোর সময় সে অন্যমনস্ক হয়ে দূর থেকে ভেসে আসা পাখির ডাক শোনার চেষ্টা করে, কারণ শিক্ষক যে প্রমিত ভাষায় কথা বলছেন, বাড়িতে তারা সেই ভাষায় কথা বলে না। দুপুরে যে গরম ভাতটুকু পাবার বাসনায় সে স্কুলে আসত, সেখানেও সরকারি অনুদান ক্রমশ অপ্রতুল, মাসে একবার একটা গোটা ডিম জোটে কিনা সন্দেহ। হয়তো আর্থিক চাপে তাকে শিগগির পড়াশুনো ফেলে দূরের শহরের কোনও চায়ের দোকানে কাজে লাগতে হবে, অথবা পাশের গ্রামের ইটভাঁটায়, যেখানে তার মামাতো দাদা দু-বছর ধরে কাজ করে। সে টেরটিও পাচ্ছে না, তার সব দিন ও রাতের পাশে, রুটির টুকরো অথবা কিছু না খেয়ে কাটানো সময়টার ভেতর, এমনকি উত্তরপ্রদেশের সেই গ্রামে শহিদ কনস্টেবল বীর সিং-এর মরদেহের পেছনে সবসময় দাঁড়িয়ে আছে এক অপদেবতার অদৃশ্য ছায়া। যে অপদেবতা বিগত ১৫০০ বছর ধরে বর্ণান্ধ। যার ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1180 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*