ফিওনা

ফিওনা

হারুণ রশিদ

 

১.

পাহাড়ের ঢালটা যেখানে কাত হয়ে নদীর দিকে নেমে গেছে ওদিকটায় কেবল বুনো জঙ্গল। হাঁটতে হাঁটতে ফিওনা ওদিকে চলে গেছে। ৭ বছরের ফুটফুটে মেয়েটি। হঠাৎ তার উল্লসিত চিৎকার— বাবা বাবা দেখে যাও, কী সুন্দর একটা ফুল এখানে!

আরিল মুখ ফিরিয়ে মেয়ের আঙুলকে অনুসরণ করে কাছে গিয়ে দেখল সত্যি চমৎকার একটা ফুল। তার এত বছরের ফুলের ব্যবসা কিন্তু কখনওই এত সুন্দর ফুল দেখেনি। ফুলটা লাল বেগুনি হলুদ এই তিনটা রঙের অপূর্ব সমন্বয়। এই বেগুনিটা ঠিক বেগুনিও নয়। কেমন অদ্ভুত উজ্জ্বল। অন্য রংগুলো ছাড়িয়ে বেগুনিটার উপর একটু বেশি আলো পড়েছে। যেন মুগ্ধতা ছড়ানোর জন্যই ফুলটির জন্ম! কাছে গিয়ে আলতো করে ফুলটিকে স্পর্শ করল আরিল। দারুণ একটা সুগন্ধী আবেশ নাকের ঠিক সামনে এসে মৌ মৌ করতে থাকে। আরিল অবাক বিস্ময়ে গাছটার দিকে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করছে কোথায় দেখেছে আগে। নাহ্ এই গাছ আগে কোথাও দেখেনি। কোন দেশি ফুল এটা? এত সুন্দর ফুল এখানে কি করে এল? গতকালও তো ওদিকে কোনও ফুল দেখেনি।

জাত ব্যবসায়ী আরিল। ফুলটা ছুঁয়েই বুঝে গেল এই ফুলকে যত্ন করে চাষ করতে পারলে একচেটিয়া ব্যবসা হবে। ফুলের পাপড়িগুলো অর্কিডের মতো দৃঢ়। তার মানে এই ফুল দীর্ঘক্ষণ তাজা থাকবে এবং সংরক্ষণের উপযোগী। ফুল ব্যবসার অন্যতম প্রধান সুযোগ হল এই জাতীয় শক্ত ফুলগুলি। বাড়তি পাওনা এর সুগন্ধ। আরিল ভাবল এই ফুলের চাষ করা শুরু করতে হবে। আলতো করে ফুলের চারাটা নিয়ে একটা টবের মধ্যে স্থাপন করল। বাড়ি ফেরার পথে নিয়ে এল টবটাকে।

বিকেলে কফির কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনে তাকিয়ে অবাক হল আরিল। ফুলটার রং শুধুই বেগুনি এখন। আশ্চর্য। রং বদলায় এই ফুল? দিনে কয়বার বদলায় দেখতে হবে। টবটাকে বারান্দায় তুলে আনল। রাতের বেলা আরও অবাক হয়ে দেখল ফুলটা গাঢ় খয়েরি হয়ে গেছে। পরদিন ভোরে উঠে দেখল ফুলটা লাল। রোদ বাড়তেই রঙ বাড়ছে। দশটার দিকে হলুদ আর লাল। দুপুরের আগে আগে লাল, হলুদ আর বেগুনির চমৎকার একটা মিশ্রণ দেখা গেল। আবার বিকেল হলে পুরোটা বেগুনি। কয়েকদিন রেখে দেখল এক সপ্তাহেও ফুলটি পচছে না। কেবল শুকিয়ে যায়।

আরিল ভীষণ আশাবাদী হল এবার। এই ফুলের চাষ করতে পারলে সে একাই ফুল সম্রাট হয়ে যাবে দুনিয়ায়।

পাপুয়া নিউগিনির পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত মরোবি প্রদেশের প্রধানতম শহর লেই। মাত্র লাখ দেড়েক লোকের বসবাস এই শহরে। শহরের উত্তরের উপত্যকার উল্টোদিকের ঢালে কয়েক একর জায়গা নিয়ে একটা ফুলের খামার আছে। তারপর একটা আদিম জঙ্গল। হাজারো গাছপালা ওখানে। এই উপত্যকাটার ঢালটা আরিল লিজ দিয়েছে ৯৯ বছরের জন্য। খামারের মাইল খানেক সামনে দিয়ে বয়ে গেছে একটা নদীর ধারা। দুই পাহাড়ের মাঝে বয়ে যাওয়া নদীটার মধ্যে চর জেগে আছে। ওখানে পাখির ঝাঁক নামে কোনও কোনও বিকেলে। দুপাশের পাহাড় চিরে বেরিয়ে সাগরে পড়েছে ধারাটা। এখানে একটা পুরনো কাঠের বাড়ি আছে।

খামারের এই বাড়িতেই আরিলের সপ্তাহের পাঁচদিন কাটে। স্ত্রী সুসি আর কন্যা ফিওনা থাকে নিকটস্থ শহরে। মাঝে মাঝে আরিলের কাছে এসে থাকে যখন ফিওনার স্কুল বন্ধ থাকে। বর্তমানে এই দেশের নাগরিক হলেও আদতে সে অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা। পূর্বপুরুষের ভিটে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে। কিন্তু লেই শহরের প্রেমে পড়ে এখানেই স্থায়ী বসতি করেছে। শহরটি অপূর্ব সুন্দর। শহর ছাড়িয়ে উত্তরে গেলে যে সবুজ পর্বতমালা চোখে পড়বে তার উল্টোদিকে আরিলের খামারবাড়ি।

প্রাকৃতিকভাবেই মোরোবি প্রদেশটি বৈচিত্রময় একটা জায়গা। সবুজ পাহাড় জঙ্গলের সাথে প্রশান্ত মহাসাগরের এত সুন্দর সমন্বয় এই অঞ্চলে খুব কমই আছে। কেবল এই প্রদেশেই ৭০০-১০০০ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে এবং  ১২০০০-১৫০০০ জাতের উদ্ভিদ পাওয়া গেছে। অঞ্চলটা প্রকৃতিবিজ্ঞানীদের স্বর্গ বিশেষ। এত বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক উপাদানের সমাহার পৃথিবীর আর কোনও এলাকায় নেই। এরকম অদ্ভুত প্রাকৃতিক বৈচিত্রের মেলায় বুনোফুলের আবিষ্কার তেমন বিস্ময়ের কিছু না হলেও আরিলকে হতবাক করল ফুলের রঙ পরিবর্তনের ব্যাপারটা।

২.

আরিল সে রাতেই সুসিকে খুলে বলল ব্যাপারটা। সুসি ব্যবসা বোঝে না। সে স্কুলে চাকরি করে। তবু মতামত দিল এই ফুলের আবিষ্কারের কথাটা আপাতত গোপন রাখতে। চাষাবাদ করে রপ্তানিযোগ্য পরিমাণ উৎপাদন করার পরই জানান দেওয়া হোক। এই ফুলের একচেটিয়া অধিকার তাদের।

ফুলটির নাম কী দেওয়া যায়?

আরিল বলল, ফিওনার নামে দিলে কেমন হয়? সুসি রাজী। ঠিক হল, ফুলটাকে ‘ফিওনা’ বলেই ডাকবে।

আরও এক বছর কেটে গেছে।

ফিওনার চাষ করা খুব সহজ। মাটিতে পুঁতে দিলেই হয় কোনও একটা ডাল। সপ্তাহান্তেই ফুল। পুরো উপত্যকা ভরিয়ে ফেলল এই ফুল দিয়ে। সুগন্ধে মৌ মৌ সমস্ত উপত্যকা। আরিল ইতিমধ্যে তার আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে এই ফুলের মালিকানা নিয়ে নিয়েছে পেটেন্ট করে। সমস্ত লেই শহরে ফিওনার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ল। এই জনপ্রিয়তা পোর্ট মোর্সবি ছাড়িয়ে অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ডেও ছড়িয়ে গেল। সারা দুনিয়া লেই শহরকে ফিওনা সিটি ডাকতে শুরু করেছে।

লেই শহর ১৯৩৭ সালের পর আর কখনও বিশ্বমিডিয়ায় এতটা খ্যাতি পায়নি। ১৯৩৭ সালে বিশ্বখ্যাত পাইলট এমেলিয়া ইয়ারহার্টের রহস্যময় নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছিল লেই এয়ারপোর্ট থেকে ওড়ার পরেই। আমেরিকান নাগরিক এমেলিয়া মহিলা পাইলটদের কিংবদন্তী। যিনি বিমানের সেই আদিম যুগে বিশ্বভ্রমণ করতে চেয়েছিলেন লকহিড কোম্পানির তৈরি ছোট্ট একটা বিমান নিয়ে। এমেলিয়া প্রথম মহিলা বৈমানিক যিনি একা আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল আকাশপথে। সেই এমেলিয়া ছিল আরিলের নানীর প্রিয় বান্ধবী। লেই শহরে বসতি স্থাপন করার পেছনে আরিলের মায়ের মুখে শোনা এমেলিয়ার গল্পটাও কাজ করেছিল। এমেলিয়া নিখোঁজ রহস্য নিয়ে সে বেশ কিছুদিন গবেষণাও করেছিল। জাপানিদের কোনও হাত ছিল কিনা সেটা খুঁজতে খুঁজতে করতে গিয়ে এই খামারের জায়গাটা আবিষ্কার করে, সাথে কাঠের এই বাড়িটাও। পছন্দ হল, আর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল এখানে বপন করবে ছোট্ট একটা স্বপ্নের বীজ। এমেলিয়া রহস্য উদঘাটন করা হল না তার।

কিন্তু সেই স্বপ্নটা যে এত বড় মহীরূহ হয়ে যাবে সেটা সে কল্পনাও করেনি। পরের দুই বছরে আরিলের আয় দুই কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেল। বাগানে আর কোনও ফুল নেই। কয়েকশো একর জায়গা জুড়ে কেবল ফুল আর ফুল। ফিওনার রাজত্ব উপত্যকা জুড়ে। যেন কেউ এক চিলতে স্বর্গের চাদরে ঢেকে দিয়েছে এলাকাটা। ফুল রপ্তানি করলেও ভুলেও সেই ফুলের চারা বা ডালপালা বেচে না কারও কাছে ব্যবসা হাতছাড়া হয়ে যাবে বলে।

দুবছর নির্বিঘ্নে যাবার পর তৃতীয় বছর ছোট্ট একটা ঘটনা ঘটল। এক রাতে আরিল খামারবাড়ির অন্ধকার বারান্দায় বসে দূরে বয়ে যাওয়া নদীর দিকে তাকিয়ে আনমনে পাইপ টানছিল। হঠাৎ খেয়াল করল বাগান থেকে ক্ষুদে একটা আলোকরশ্মি সুতোর মতো আকাশের সাথে সেতু রচনা করেছে। বেগুনি রঙটা ঠিক যেন তার বাগানের ফুলের রঙ। এরকম অদ্ভুত ঘটনা আগে দেখেনি। আলোর উৎস খোঁজার জন্য বাগানে নামল আরিল। ঢাল বেয়ে কাছাকাছি যেতেই আলোটা অদৃশ্য হয়ে গেল। যেখান থেকে আলোটা উৎসারিত হচ্ছিল সেই জায়গাটা চিহ্নিত করে রাখল।

পরদিন সকালে সূর্য ওঠার সাথে সাথে আরিল বাগানে গেল। ওই জায়গায় গিয়ে কোনও সূত্র পাওয়া যায় কিনা দেখল। কিচ্ছু নেই। ফুলগুলি রক্তলাল হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসছে। আরিল ভাবল রাতে ভুল দেখল কিনা।

কয়েকদিন পর একই দৃশ্য আবারও। এইবার উত্তরপূর্ব কোণে। এবার একটি নয়, তিন চারটি আলোর সুতো আকাশ ছুঁয়েছে। আরিলের মাথায় ঢুকছে না, কী ওই আলোর উৎস। ভূতপ্রেতে বিশ্বাসী নয় সে। এবারও কাছে যেতেই নিভে গেল সুতোগুলি। কাউকে বলল না ঘটনাটি। চেপে যাবার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু চিহ্নিত করে রাখল জায়গাটা।

মাসখানেক পর এক রাতে ঘুম ভেঙে গেল তার ফিসফিস শব্দে। ঝোড়ো বাতাসের মতো হিসহসানি। বাইরে কি ঝড় হচ্ছে নাকি? জানালা খুলল আরিল। না সেরকম কিছু নেই। তাহলে শব্দের উৎস কী? হঠাৎ ডানদিকের জঙ্গলে চোখ যেতেই বুকটা ধ্বক করে উঠল তার। ওখানে বিশাল ঘন এক জঙ্গল ছিল। প্রাচীন সব বৃক্ষের মেলা। ওই বিশাল বিশাল গাছগুলো প্রচণ্ডবেগে দুলছে। দুলতে দুলতে প্রায় মাটির সাথে শুয়ে পড়ছে। আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে। অত মোটা গাছ কি করে নুইয়ে যায় এরকম। এবার সত্যি সত্যি ভয় পেল আরিল। সুসি আর ফিওনা শহরে। ফোন করে জাগাল সুসিকে। বলল ভয়ানক কিছু ঘটছে এখানে। দৃশ্যটার বর্ণনা দিয়ে ফোন কেটে দিল।

সুসি ফোনটা নামিয়ে রেখে চিন্তিত হয়ে ভাবছে কার কাছে বলা যায় ব্যাপারটা। ঘুমন্ত ফিওনার দিকে তাকাল। তারপর তাকাল ঘরের কোণে রাখা ফিওনা ফুলের টবের দিকে। আশ্চর্য! ফুলটা লাল হয়ে আছে কেন? এইসময় তো ওর কালচে খয়েরি থাকার কথা। সুসি টেলিফোন নিয়ে পরিচিত সিটি কাউন্সিলের ফোন ডায়াল করল। আশ্চর্য ফোন যাচ্ছে না। মোবাইল ফোনে ধরল। মোবাইলে দেখাল নেটওয়ার্ক বিজি। আসলে আরিল তখন ফোন রাখার আগেই লাইনটা কেটে গিয়েছিল। কথা বলতে বলতে হঠাৎ লাইনটা জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। ওরা দুজনেই বোঝেনি জ্যাম হল কেন।

ঘুমন্ত লেই শহরের কেউ জানল না উপত্যকা থেকে লক্ষ কোটি আলোর সুতো মহাকাশের দিকে ছুটে যাচ্ছে। কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় সবরকম যোগাযোগ বন্ধ ছিল কয়েক মিনিট। না মোবাইল, না টেলিভিশন, না রেডিও।

আরিল ঘরে ঢুকে আবারও ফোন করার চেষ্টা করল অন্য বন্ধুবান্ধবকে। কিন্তু কিছুতেই গেল না ফোনটা। নেটওয়ার্কের এরকম সমস্যা আর কখনও হয়নি।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই। ভোরে পাখপাখালির ডাকে ঘুম ভাঙল। দৌড়ে জানালার কাছে গেল। এই দৃশ্যের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে।

সম্মুখের উপত্যকা জুড়ে ফিওনা ফুলের বাগান ছিল গতরাত পর্যন্তও। আজ একটা ফিওনা ফুলের অস্তিত্বও নেই। সমস্ত উপত্যকা ধবধবে সাদা। যেন তুষারে ঢেকে দিয়েছে কেউ। ভীত হয়ে আরিল ফোন করল সুসিকে। রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ ধরছে না।

ধরবে কী করে? রাত ভোর হবার আগে সুসির ঘুম ভাঙলে সুসি দেখতে পায় ফিওনার টবটা যেখানে রাখা ছিল, সেখান থেকে বেগুনি সুতোর আলোক রশ্মি জানালা দিয়ে দূর আকাশে ছুটে যাচ্ছে। ওটা দেখেই সুসি যে জ্ঞান হারাল, এখনও সে জ্ঞান ফেরেনি।

পাশের ঘরে ফিওনার ঘুম ভেঙে গেল ফোনের শব্দে। গুটিগুটি পায়ে মার কাছে এসে ডাকল, “মা ওঠো, বাবা ফোন করেছে।” মার ঘুম ভাঙছে না দেখে ফিওনা নিজেই মোবাইল হাতে নিয়ে বাবার সাথে কথা বলল।

“ফিওনা, তোমার মায়ের ঘরের কোণে যে ফুলের টবটা আছে ওটা ঠিক আছে কিনা দেখো তো?”
“বাবা, ফুল তো নাই, ওখানে সাদা পাউডার পড়ে আছে।”

আরিলের হাত থেকে ফোনটা পড়ে যাবার দশা হল। বলল, “তোমার মাকে ডেকে তোলো তাড়াতাড়ি। ওই টবটা বাইরে ফেলে দিতে বলো এক্ষুণি।”

নার্ভাস আরিল মোবাইল ফোনটা রাখতে না রাখতে ঘরের কোণে রাখা ল্যান্ডফোনটা বাজতে শুরু করে। ভীত চোখে ফোনের দিকে তাকাল। সারা দুনিয়া থেকে আরিলের কাছে ফোন আসবে এখন। সবগুলো বিক্রিত ফুলই নিশ্চয়ই পাউডার হয়ে গেছে। যেখানে যেখানে এই ফুল রপ্তানি করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা, প্যারিস, লন্ডন… সবগুলো নিশ্চয়ই এখন সাদা পাউডার।

ক্রেতারা টাকা ফেরত চাইতে আসবে, দেউলিয়া মামলা হবে, আরিল সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে… কল্পনা এগোল না আর। বেলা বাড়তে বাড়তে এসব ঘটনার সূত্রপাত হবে। তার আগেই পালাতে হবে। ছোট একটা ব্যাগে মূল্যবান সবকিছু ভরে নিয়ে বাইরে দাঁড়ানো জিপটাতে উঠে স্টার্ট দিয়ে শেষবারের মতো বাগানটার দিকে তাকাল আরিল।

গাড়ি চালাতে চালাতে সুসিকে ফোন দিল আবার। জ্ঞান ফিরেছে সুসির। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে কী যেন বলতে চাইলে থামিয়ে দিয়ে সংক্ষেপে পুরো ব্যাপারটা বোঝাল ও। সবশেষে বলল, “কান্নাকাটি করার সময় অনেক পাবে। এখন ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ো। ডোমেস্টিক ফ্লাইটে চলে যাও পোর্ট মোর্সবি, তারপর ওখান থেকে পরদিন পার্থের ফ্লাইট ধরবে। কেউ খোঁজ শুরু করার আগেই। কাউকে কিচ্ছু বলবে না। আমি কোথায় যাচ্ছি জিজ্ঞেস কোরো না। কয়েকমাস দেখা হবে না আমাদের। পার্থে তোমার ভালো থাকবে।”

মাথা ঠান্ডা করে সুসি পরিস্থিতি আন্দাজ করার চেষ্টা করল। ওদের এত আদরের চাষ করা ফুল পাউডার হয়ে গেছে, ফুল থেকে বেগুনি রশ্মি বেরিয়ে আকাশের দিকে ছুটে গেছে ওই রহস্য উদঘাটন পরে হলেও চলবে। আগে পাওনাদারের আক্রমণ থেকে বাঁচতে হবে।

পিএনজি এয়ারলাইন্সের নাম্বারে ফোন করে দুটো টিকেটের বুকিং দিল লেই থেকে পোর্ট মোর্সবি পর্যন্ত। দুপুরের পর একটা ফ্লাইট আছে। প্রিয় ঘরটা আর ফিরে পাবে কিনা ভেবে কষ্ট লাগলেও চেপে রাখল। ফিওনা আরও বেশি কষ্ট পাবে। এই শহরের সবকিছু প্রিয় তার। গাড়ি ছুটছে নাজ্জাব এয়ারপোর্টের দিকে।

আরিল গাড়িটা একটা নিকটস্থ আশ্রয়ে রেখে তার নিজস্ব বোটটি নিয়ে মারকাম নদীর উজানের দিকে রওনা দিল। ওখান থেকে ইউফিন নদী ধরে পুবদিকে দশ মাইল মতো গেলে পর্বতের মধ্যে তার একটা নিরাপদ হাইডআউট আছে। নির্জনে বসে পাখির গান শোনার জন্য বানিয়েছিল ঘরটি অনেকদিন আগে। ওখানে কেউ খুঁজে পাবে না তাকে। সভ্য জগত থেকে বিচ্ছিন্ন একটা জায়গা। মোরোবি প্রদেশের সবচে ঘন জঙ্গলাকীর্ণ স্থান। এরকম দুর্দিনে কাজে লাগবে ভাবেনি।

৩.

বহু দূরবর্তী গ্যালাক্সির ‘নিউক’ গ্রহের আদি বাসিন্দা ‘সেল’ সমাজের নমুনা সভা বসেছে। মহাবিশ্বের কোথায় কোথায় সেলদের বসতি আছে তা আবিষ্কার করতে গিয়ে ওদের একটি নবীন গবেষক সেল সম্পূর্ণ নতুন জাতের এক আজব জীবের সন্ধান পেয়েছে। তার গবেষণা রিপোর্টের সৌজন্যেই আজকের সভা।

ওদের নিজেদের গ্যালাক্সির মধ্যে দুশো পঁচিশটা ‘সেল-বাস-যোগ্য’ গ্রহ আছে। তার মধ্যে নিউক হল সবচেয়ে বড় এবং আদিম। ‘সেল’ উদ্ভিদ প্রজাতির জীব হলেও জীব-জড় উভয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান তার মধ্যে। তাদের নিউক্লিয়াসে ইলেক্ট্রনের মতো এক উপাদান আছে যা থেকে শক্তিশালী রশ্মি উৎপন্ন হয়। এটাই সেলদের সকল শক্তির আধার। এদের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হল দুর্দান্ত অভিযোজন ক্ষমতা, আলোর চেয়েও দ্রুত ছুটবার যোগ্যতা এবং যে কোন ধরনের জীবের সাথে যোগাযোগ করার দক্ষতা।

গ্যালাক্সি ব্যাপী ছোটাছুটি করার জন্য পুরো শরীর নিয়ে ভ্রমণ করতে হয় না তাদের। শরীরের যে কোন একটা সেলকে সেই রশ্মি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে ছুঁড়ে দেয়া হয়। গন্তব্যে পৌঁছেই অতি ক্ষুদ্রতম সেলটি দ্রুততম সময়ে পূর্ণাঙ্গ শরীর নিয়ে বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে যেতে পারে সেখানে। এই ক্ষমতা তারা অর্জন করেছে কোটি বছরের বিবর্তনের ফসল হিসেবে। ধারণা করা হয় এদের পূর্বপুরুষ একসময় সাধারণ বৃক্ষই ছিল।

বক্তা সেলটি শুরু করল:

“উপস্থিত সেল সমাজ, দীর্ঘ দুই লগ (পৃথিবীর হিসেবে দুই বছর) ধরে খুঁজতে খুঁজতে নতুন যে গ্রহটি আবিষ্কার করেছি সেখানে লুকিয়ে আছে এক অপার বিস্ময়। এতদিন আমরা জানতাম মহাবিশ্বের মধ্যে সেল বাদে অন্য কোনও জাতের জীব নেই। কিন্তু সেল প্রজাতির পাশাপাশি সেই গ্রহে পাওয়া গেছে নতুন এক প্রজাতি। প্রাণী বলে পরিচিত সেই আজব জীবদের বৈশিষ্ট আমাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। বহু জাতের প্রাণী থাকলেও আজ আমাদের সভার মূল বিষয় সেই গ্রহের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ। এরা আকারে তেমন বড় না হলেও প্রযুক্তি জ্ঞানের কারণে ওই গ্রহের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।

“নতুন প্রজাতির জীবের সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হল ওদের খাদ্য গ্রহণ এবং বর্জ্য ত্যাগ। অদ্ভুত সব কাজকারবার তাদের। ওরা আহার করে শরীরের একটা গর্ত দিয়ে, আবার অন্য একটা গর্ত দিয়ে খাবারগুলো পচিয়ে বের করে দেয়। এরকম আজিব কান্ডের পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে আমি বুঝিনি।

“সেখানে অনেক জাতের প্রাণী থাকলেও যে দলটা মানুষ নামে যারা পরিচিত, তাদের হাতেই ওই গ্রহের নিয়ন্ত্রণ। তারা পুরো গ্রহে সবচেয়ে শক্তিমান ও বুদ্ধিমান প্রাণী। তাতে আমাদের কিছু এসে যায় না। কিন্তু গবেষণা করতে গিয়ে ওই গ্রহের উদ্ভিদ সেল সমাজের অবস্থা সম্পর্কে যা জানলাম তা খুবই দুঃখজনক। মানুষের দল সভ্যতার নামে, প্রযুক্তির নামে, শিল্পায়নের নামে, আরও নানা বাহানায় সেল সমাজের উপর আঘাত হেনে চলেছে বহু যুগ ধরে। বায়ুমণ্ডলে কালো কালো ধোঁয়া ছেড়ে সেল সমাজের আহারের মধ্যে ধ্বংসাত্মক উপাদান ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সেলরা যেখানে বসতি করত সেখানকার মাটিকে সেল শূন্য করে তাদের ভিটেয় ঘুঘু চরাচ্ছে।

“আপনারা জানেন সেল সমাজই মহাবিশ্বের মালিক, কিন্তু মানুষ নামের ওই নোংরা জীব ছোট্ট ওই গ্রহে সেল সমাজের উপর যে অত্যাচার করছে তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।

“মানুষের সমাজ একদিকে আমাদের স্বজাতির কিছু সেলকে বন্দি করে ব্যবহার করছে দাসের মতো, যথেচ্ছ কাজে লাগাচ্ছে তাদের খাদ্য বাসস্থান ইত্যাদির জন্য, আবার তাদের হাতেই ধ্বংস হচ্ছে অন্যান্য সেল প্রজাতি। সংখ্যায় সেলগণ অনেক বেশি হলেও সেলদের কোনও কর্তৃত্ব নেই ওই গ্রহে।

“মানুষ নামের নোংরা প্রাণীদের অত্যাচার প্রতিরোধ করতে না পারার মূল কারণ তাদের প্রযুক্তিজ্ঞানহীনতা। এই উত্তরাধুনিক যুগেও ওখানকার উদ্ভিদ সেলগুলো আমাদের কোটি বছর আগের পূর্বপুরুষের মতো নির্বোধ রয়ে গেছে। তাদের প্রযুক্তিজ্ঞান একেবারে শূন্যের কোটায়। একটা উদ্ভিদ সেলকে কেটেকুটে জ্বালিয়ে দিলেও বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ গড়তে পারে না।

“এই জগতে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হল যোগাযোগ রশ্মি। যা দিয়ে আমরা নিমেষেই বিশ্বের যে কোনও জায়গায় যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি। আমাদের যে কোনও সেলকে যে কোনও দূরত্বে নিয়ে স্থাপন করতে পারি। এই সুবিধাটা ওদের কারও নেই। ওরা জানেই না এরকম কোনও ব্যবস্থা থাকতে পারে। যা কিছু প্রযুক্তি আছে তা মানব সমাজের দখলে। তবে মানুষেরা যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগ করে ওদের সভ্যতার শীর্ষে উঠেছে বলে দাবী করে তা আমাদের কাছে হাস্যকর। তারা উদ্ভিদ সেলদের মতো স্থির নয়। ক্রমাগত নড়াচড়া করতে হয় তাদের। ভ্রমণ করার জন্য ওরা নিজেদের আস্ত শরীরকে তো নেয়ই, সাথে আরও বিশাল যন্ত্র বহন করে। যাকে ওরা জাহাজ, গাড়ি, বিমান এরকম বিদঘুটে নামে ডাকে।

“ওদের সর্বোচ্চ গতির যন্ত্রের (রকেট) গতি দেখলে আপনি হাসতে হাসতে খুন হবেন। তাছাড়া ওই বিশাল যন্ত্রগুলোকে ভূমি থেকে আকাশে ভাসাতে এমন ভীষণ ঘোঁত ঘোঁত শব্দ করতে হয়, এত আগুন পোড়াতে হয় যে তাতে কয়েক কোটি সেল পুড়ে যাবে। ওরকম হাস্যকর জিনিস নিয়ে ওরা নাকি গ্রহে গ্রহে বিচরণ করবে। মজার ব্যাপার হল নিকটস্থ নক্ষত্রে পৌঁছাতেও তাদের কয়েক লক্ষ বছর লেগে যাবে। অথচ ওদের গড় আয়ু মাত্র ৭০ লগ (বছর)। তাদের নক্ষত্র ভ্রমণ অনেক দূরের অসম্ভব স্বপ্ন। আমাদের জগত নিয়ে কল্পকাহিনী লেখার মগজও নেই ওদের।

“যাক সে কথা, ওখানকার সেল সমাজের কথায় ফিরে আসি। এত অনাচার সত্ত্বেও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা একটা উদ্ভিদ সেল অন্যটাকে সাহায্য করতে পারে না। বহু বছর ধরেই চলছে এমন দশা। ওরা দেখতে পায় নিজেদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া, কিন্তু প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠার কোনও ভাষা জানা নেই। আমার দুই বছরের গবেষণায় আমি চেষ্টা করছি তাদেরকে কোনও একটা রাস্তা খুঁজে দিতে যাতে তারা নিজেদের ধ্বংস ঠেকিয়ে দুষ্ট প্রাণীদের হাত থেকে গ্রহটাকে রক্ষা করতে পারে। এটা আমাদের আন্তঃনীহারিকা সেল সমিতির অঙ্গীকারও বটে।

“আমি যোগাযোগ রশ্মির মাধ্যমে আমার একটা সেল ওদের ভূমিতে পুঁতে দিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য আরও বিস্তারিত জ্ঞানলাভ করা ওই গ্রহের বিভিন্ন বিষয়ে। যেখানে আমি পুঁতেছিলাম, সেই প্রাণীটা সেল চাষ করে। রঙিন সেলদের বন্দি করে কুপিয়ে হাত পা কেটে নানান জায়গায় চালান করে। ওরকম অদ্ভুত খেয়াল কেন প্রথমে বুঝতে পারিনি আমি। পরে জেনেছি ওই প্রক্রিয়াটাকে ওরা বলে বাণিজ্য। সেই প্রাণীটা আমার সেলকেও বন্দি করে। আমি চাইলে তখুনি চলে আসতে পারতাম। কিন্তু আসিনি অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। সেলগণ নিজেদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আমরা চাইলে আমাদের বৃদ্ধিকে নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। আমাকে বন্দি করার পর মানুষটা আমার কাছ থেকে আরও সেল আশা করে। আমি আরও সেল বাড়ালাম। সেলগুলো খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে তাকে বাণিজ্যে উৎসাহ দিল।

“মানুষটা আমার বর্ধিত সেলগুলোর হাত পা মুণ্ডু কেটে বস্তাবন্দি করে নানা জায়গায় পাঠাল। ব্যাপারটা আমার জন্য ভালো হয়েছে। আমার সুযোগ হল সমস্ত গ্রহের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ার। আমি জানলাম পুরো গ্রহের প্রাণীজগতের বিচিত্র সব তথ্য। মোটামুটি দুই বছর পর্যবেক্ষণের পর আমি সেল ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিলাম। নিউকের কাছ থেকে পরবর্তী নির্দেশ নিয়ে যাবার জন্য এক রাতে আমার সবগুলো সেলকে উপড়ে নিয়ে চলে এলাম।

“ইতিমধ্যে যা জেনেছি তাতে মনে হয়েছে মানুষ নামক প্রাণীটা সেল সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পুরো গ্রহের সেল সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে এই মানুষের দল। তাই নিউকের অনুমতি নিয়ে আমি আবার মাঠে নামতে চাই সেল সমাজকে রক্ষা করার জন্য। আমি এখানকার সমাজকল্যাণ সেল প্রধানকে অনুরোধ করব আমার জন্য কয়েক লক্ষ শক্তিমান সেল বরাদ্দ করা হোক পৃথিবীকে লক্ষ করে নতুন প্রজাতি নিক্ষেপ করার জন্য। প্রতিটি ভূখণ্ডে সেলগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হবে যারা এক বছরের মধ্যেই সারা পৃথিবীর সমস্ত সেলগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করবে এবং অনিষ্টকর প্রাণীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশানে যাবে।

“অশুভদের হাত থেকে, নষ্টদের হাত থেকে বিশ্বকে মুক্ত রাখার অঙ্গীকার করে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।”

৪.

যে বক্তা তার বক্তব্য শেষ করল তার একটি নাম সেল-ফিওনা। বক্তব্য শেষ হতে না হতেই উপস্থিত সেলদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। ভিন্ন জগতের সেল সমাজের অপমানে ক্ষেপে উঠে কেউ কেউ তক্ষুণি যুদ্ধযাত্রা করতে চাইল। কেউ কেউ স্বেচ্ছায় শহিদ হবার বাসনা প্রকাশ করল। সভাপতি নিউক লাল রশ্মি জ্বালিয়ে চুপ থাকার সিগন্যাল দিল। সবাই চুপ করল। মহামান্য নিউক তার বক্তব্যে বলল:

“আমাদের ক্ষুদে সেল-ফিওনা যে আবিষ্কার করেছে সেটা তার জন্য বিরল সম্মানস্বরূপ সে নিজের জন্য একটা নাম অর্জন করল। এর আগে এই গ্যালাক্সিতে মাত্র ২২৫ জন এই সম্মান পেয়েছে। সেল সমাজের জন্য উপকারী একটা কাজ করেছে তার গবেষণা দিয়ে ও প্রতিকারের উপায় বলে। কিন্তু আমাদের কয়েকটা জিনিস মনে রাখতে হবে। এখুনি আমরা এমন কিছু করতে পারি না যা ওই গ্রহের শাসক প্রাণীদের ক্ষেপিয়ে দেয়। আমাদের কোনও পরিকল্পনা টের পেলে হিংস্র হয়ে উঠতে পারে ওই প্রাণীরা। তাতে করে নিরস্ত্র সেল ভায়েরা বেঘোরে মারা পড়বে। তাই ভয় ভীতিজনিত কোনও কাজ করা যাবে না। বরং আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

“ফিওনার রিপোর্ট দেখে ওই জীবদের সম্পর্কে অনেককিছু জানা গেলেও একটা ব্যাপার বোঝা যায়নি। ওরা আহার করে আবার সেই আহারকে পচিয়ে পরিত্যাগ করে কেন? এতে তাদের কী উপকার হয়? আমরা সেল সমাজ যে খাবার গ্রহণ করি তার পুরোটাই শরীর গঠনে ব্যয় করি। কিন্তু কিম্ভুতাকার প্রাণী সমাজ তা করে না। সেল সমাজের জন্য ওটা অস্বাভাবিক নোংরা একটা ব্যাপার। তবে ওই প্রক্রিয়ার পুরো চক্রটা জানতে হবে। তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে কি করে ওই জীবগুলোকে ধ্বংস করা যাবে। তাছাড়া আরও জানা গেছে কেবলমাত্র এক জাতের প্রাণীর উৎপাতেই অতিষ্ঠ পুরো সেল সমাজ। মানুষ নামের ওই প্রজাতিকে ধ্বংস করতে পারলেই চলবে আমাদের। বাকী প্রাণীদের হাতে ক্ষতিকর কোনও প্রযুক্তি দেখা যায়নি। আমি ফিওনাকে আরও এক লগ সময় দিলাম মানুষের বিস্তারিত জীবন চক্র জেনে নেয়ার জন্য।”

ফিওনা সানন্দে রাজী হল। “মাননীয় নিউক। আপনার সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। যথাসময়ে রিপোর্ট দেওয়া হবে।”

পরের এক লগ ফিওনা ব্যস্ত রইল পৃথিবীর প্রাণীজগতের জীবনচক্র পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষার কাজে।

***

ফিওনার মন খারাপ। আজ কয়েক মাস বাবাকে ছেড়ে পার্থে দাদার বাড়িতে উঠেছে মাকে নিয়ে। এখানে সবকিছু আছে, তবু তার শূন্যতা কোথাও।

তার দশম জন্মবার্ষিকী পালন করা হল কোনও আয়োজন ছাড়াই। বাবা থাকলে কত মজা হত! বাবা এখন কোথায়? ফিওনা ফুলগুলো কোথায় উধাও হয়ে গেল? প্রথম দেখার পর থেকে ফুলটার সাথে কেমন এক বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। বাগানে গিয়ে বিড়বিড় করে কথা বলত ফুলগুলোর সাথে। ওরাও দুলে দুলে জবাব দিত। গান শোনালে গানের ফিরতি জবাব দিত। কিন্তু কেউ শুনত না।

ফিওনার মনে হত সে আজগুবি চিন্তা করছে।

ফুলেরা কি কথা বলতে পারে?

কিন্তু তাহলে ফুলগুলো তাকে ডাকছে মনে হত কেন মাঝে মাঝে। লুকিয়ে কাঁদে ফিওনা সেই হারানো ফুলের জন্য।

মা বলেন ওগুলো অশুভ ফুল, ওদের জন্য কাঁদতে নেই।

৫.

গবেষণা শেষে সেল-ফিওনা বিস্ময়কর কিছু তথ্য পেল। আবার নতুন রিপোর্ট দিল।

“পৃথিবীর প্রাণীকূল শরীরের বৃদ্ধি ও জীবন ধারনের জন্য নির্ভর করে যেসব খাদ্যের উপর তার পুরোটাই সেল সমাজের অবদান। কয়েক লক্ষ জীবের মধ্যে মাত্র একটা জীব পুরো গ্রহের অধিকাংশ খাদ্য ভক্ষণ করে। বাকি প্রাণীদের ওই মানুষের আহার্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে হয়। শাসক জীবেরা নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ প্রাণী বলে দাবি করলেও তাদের কর্মকাণ্ডগুলো সেল সমাজ তো বটেই অন্যন্য প্রাণীদের জন্যও ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়েছে। আমি আরও কয়েক জাতের প্রাণীদের সাথে যোগাযোগ করেছি, জানতে পেরেছি মানব সমাজের ধ্বংসের ব্যাপারে ওদের সানন্দ সম্মতি আছে।

মানুষেরা খাদ্যের জন্য ধান গম ভুট্টা ইত্যাদি নানান জাতের সেলের চাষ করে। ওইসব উদ্ভিদের নিজেদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নাই। যাকে যে খোয়াড়ে চাষ করা হয় তাকে সেই খোয়াড়ে থাকতে হয়। মানুষ সেল সমাজের উপর যেরকম অত্যাচার করে, তেমনি অন্যান্য কিছু প্রাণীকেও সেরকম অত্যাচার করে তাদেরকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে। কেবল খাদ্য নয়, ওদের পোষাক নামক একরকম বস্তু শরীরের উপর পেঁচিয়ে পরতে হয়। নইলে নাকি ইজ্জত থাকে না। ওই পোষাক বস্তুও উৎপাদিত হয় সেল ও প্রাণী সমাজের একাংশ থেকে। শাসক জীবগণ সেল সমাজের উপর এত নির্ভর করার পরও কৃতজ্ঞতা বলে কিছু দেখায় তো না-ই, বরং তারা সেলদের উপর স্বেচ্ছাচারী কায়দায় অত্যাচার করে। কাজ শেষ হলে ওই এলাকার সেল সমাজকে নির্বংশ করে দেয় নির্বিচারে জ্বালিয়ে কিংবা মাড়িয়ে।

“আগেই বলা হয়েছে সেল সমাজের প্রধান দুর্বলতা ওদের যোগাযোগ অক্ষমতা ও প্রযুক্তি বিস্তার। কয়েক লক্ষ লগ পূর্বে এখানে সেল সমাজ যেরকম অক্ষম ও দুর্বল ছিল, বর্তমানে পৃথিবীর সেল সমাজ সেই আদিম দুর্বলতার ভেতর রয়ে গেছে। এই দুর্বলতা কাটিয়ে প্রযুক্তির বিবর্তনে সামিল হতে পৃথিবীর সেল সমাজেরও কয়েক লক্ষ বছর টিকে থাকতে হবে। কিন্তু মানুষ নামের নোংরা প্রাণীদের অত্যাচারে সেল সমাজ বিলুপ্ত হয়ে যাবে কয়েক হাজার লগের মধ্যে। সুতরাং যা করার এখুনি করতে চাই।”

ফিওনা তার বক্তব্যের প্রথমাংশ শেষ করল।

চিন্তিত কণ্ঠে নিউক জানাল, “হুমমম… এখুনি করতে হবে? কী করতে চাও তুমি?”

ফিওনা বলল, “উপায় আমার আছে। আমি তিনটি বিকল্প রাস্তার কথা ভেবেছি। আপনি অনুমতি দিলেই বলতে পারি।”

নিউক বলল, “তোমার প্রস্তাব বলো।”

ফিওনা আবার শুরু করল।

“১. পৃথিবীতে সেল সমাজকে প্রযুক্তির আওতায় আনতে হবে সর্বপ্রথমে। মানুষের কূটচালে প্রচুর প্রজাতির সেল মানব প্রদত্ত খাদ্যের উপর নির্ভর হয়ে পড়েছে। কৃত্রিম খাদ্য সেল সমাজের জীবনক্রিয়াকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করলেও তারা বিনা প্রতিবাদে মেনে নিচ্ছে। নয়তো তাদের মৃত্যু অনিবার্য। দুঃখজনকভাবে কিছু কিছু সেল নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে মানুষ ও অন্যন্য জীব নিঃসৃত ঘৃণিত বর্জ্যের উপর। সেই নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে বিকল্প খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প খাদ্যের প্রতি মনোযোগী করার জন্য সেল সমাজে আমাদের জেনেটিক কোড প্রবেশ করিয়ে দিতে হবে। ওই গ্রহের বায়ুমণ্ডলে পরিবর্তন আনা ছাড়া খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা যাবে না। প্রযুক্তির আওতায় আনলে মানুষের উপর নিজেরাই আঘাত হানতে পারবে।

“২. ওদের বায়ুমণ্ডলে ২১% অক্সিজেনকে বাড়িয়ে ২৩% করে দিতে হবে। তাহলে ওই আবহাওয়ায় মানুষ বা অন্য কোনও প্রাণী বেঁচে থাকতে পারবে না। বেঁচে থাকবে কেবল আমাদের সেল সমাজ। সেল সমাজকে পরিবর্তিত বায়ুমণ্ডলে টিকে থাকার মতো সেল দিয়ে অভিযোজিত করে রাখা হবে। কাজটা সূক্ষ্ম এবং সময়সাপেক্ষ। পৃথিবীতে যতটা সেল জীবিত আছে তার নির্ভুল তালিকা করে, তাদের নির্ভুল অবস্থান নির্ণয় করে প্রত্যেকের জন্য একেকটি পূর্ণাঙ্গ সেল বরাদ্দ করতে হবে। ওখানকার একেকটি বৃক্ষের মধ্যে লক্ষকোটি সেল আছে। তার মধ্যে যে কোনও একটা সেলকে বদলে দিতে হবে আমাদের নতুন প্রতিরক্ষা সেল দিয়ে। নতুন সেলগুলোকে প্রোগ্রাম করে দিতে হবে যাতে ওই বৃক্ষকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে।

“৩. মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করবে আত্মনিবেদিত সেল সমাজ। ওদের সকল খাদ্যের ভেতর সূক্ষ্ম ধ্বংসাত্মক সেলকে প্রতিস্থাপন করা হবে। পৃথিবীর সবগুলো উদ্ভিদ যেদিন আমাদের সেলের আওতায় আসবে সেদিন আমরা বিজয়ের পথে হাঁটব। হয়তো কোটি কোটি সেলের বিনাশ ঘটবে। কিন্তু তার বিনিময়ে গ্রহটি হবে সবুজ সুন্দর এবং গ্রহটি হবে আমাদের।”

ফিওনা তার বক্তব্য শেষ করল। নিউক দুটি নীল রশ্মি জ্বালাল আকাশের দিকে। তার মানে তার ভাবতে হবে আরও।

বেশ অনেকক্ষণ ভাবার পর প্রথম দুটো প্রস্তাবকে নাকচ করে দিল। প্রথম প্রস্তাবে ওই সেল সমাজের ভেতর আমাদের জেনেটিক কোড প্রবেশ করিয়ে বুদ্ধিমান করে তুললে তাদের সাথে আমাদের সেলের সংঘাত লেগে যেতে পারে গ্রহের দখল নিয়ে। জেনেটিক কোড বদলানো বহুত ঝক্কির কাজ।

দ্বিতীয় প্রস্তাবও অনেক ব্যয়বহুল। এত কোটি সেল বরাদ্দ করা সম্ভব নয়। কারণ পুরোটাই অপচয় হবে। তাছাড়া তাতে করে অন্য নিরীহ প্রাণীগুলো মারা পড়বে। আমরা তো কেবল একটা প্রজাতি ধ্বংস করতে চাই।

সব হিসেব করে দেখলে তৃতীয় প্রস্তাবটিই গ্রহণযোগ্য মনে হয়। কারণ ওতে খুব বেশি সেল খরচ হবে না। মাত্র কয়েকটা শস্যের সেল বদলে দিলেই হবে। দ্রুত বাড়িয়ে দেয়া যাবে উৎপাদন। এটা গ্রহণ করা যেতে পারে। বেগুনি রশ্মি দিয়ে সম্মতি জানাল নিউক।

নিউকের সম্মতি পাবার পর ফিওনা বলল, “তবে একটা কথা আছে আমার।”

“কী কথা?” নিউক জিজ্ঞেস করল।

“ওই গ্রহের সব মানুষ ধ্বংস হয়ে গেলেও আমি একটা পরিবারকে বাঁচাতে চাই।”

“কাকে?” নিউক অবাক একটু।

“ফিওনার পরিবারকে।”

“ফিওনা?”

“সেই একমাত্র প্রাণী যাকে প্রথম নেমেই মুগ্ধ হয়ে দেখেছি, সেও আমাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছে। সেই প্রথম মুগ্ধতার ভালোবাসার স্মৃতিকে আমি বাঁচিয়ে রাখতে চাই। ওদেরকে আমি বিশেষ সেল দিয়ে বদলে দেব যাতে বিকল্প খাদ্যের জন্য অভিযোজিত হতে পারে।”

“তুমি সত্যি চাও একটা বিপদজনক প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখতে?” নিউক চিন্তিত সুরে বলল।

“আমি চাই। কারণ ফিওনাকে আমি পছন্দ করেছি।”

নিউক এবারো দুটো বেগুনি রশ্মি জ্বালিয়ে সম্মতি দিল।

৬.

কয়েক বছর পরের কথা।

ইতিমধ্যে পৃথিবীতে নতুন জাতের কিছু শস্য আবিষ্কৃত হল। নতুন জাতের ধান, গম, ভুট্টা, ডাল। নতুন জাতের ফল। নতুন জাতের সবজি। অতি সুস্বাদু, ভিটামিনে ভরপুর। প্রোটিন শর্করা সব ওই শস্যসমূহে পাওয়া গেল। প্রাণীজ চর্বির উপর নির্ভরতা কমে গেল। পৃথিবীতে খাদ্যসমস্যার আপাত সমাধান হয়ে গেল। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যে দুজন বিজ্ঞানী এই জাতের আবিষ্কার করলো, তারা পরপর দুবছর নোবেল পেল। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও তারা কাউকে জানাল না কোন ফরমুলায় তারা ওই জাত তৈরি করতে পেরেছে। যেন স্বপ্নে পাওয়া ঔষধ। পৃথিবীটা সবুজে সবুজ হয়ে যেতে থাকে। মানুষেরা আনন্দে দিন কাটাতে থাকে। পরিবেশে প্রচুর অক্সিজেন। আকাশে বাতাসে অক্সিজেন।

চতুর্থ বছরে এসে পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা বায়ুমণ্ডলের একটা অদ্ভুত সমস্যা দেখতে পেল। বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্যে কোথাও গণ্ডগোল হয়েছে। এখানে ওখানে প্রচুর মানুষ অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মারা যেতে শুরু করেছে ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে অনেক মানুষ। হাসপাতাল ডাক্তারে কুলোচ্ছে না। কোনও রোগ নেই। কেবল রক্ত শুকিয়ে যাচ্ছে শরীর থেকে। কেন শুকিয়ে যাচ্ছে তার কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া গেল না। উন্নত দেশে বেশি ঘটতে লাগল। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশে কম এখনও। যেখানে খাদ্যের প্রাচুর্য সেখানে বেশি মৃত্যু। সবচে কম মারা গেছে আফ্রিকাতে।

গত কবছরে বিশ্বের সর্বত্র জঙ্গল বেড়ে গেছে। পুরো পৃথিবীটা আমাজন হয়ে যাচ্ছে। যেখান ছোট চারা লাগানো হোক, দুমাসে তা লকলক করে বেড়ে দাঁড়িয়ে যায়। নিউইয়র্কের মতো শহরের আনাচে কানাচে সবুজ জঙ্গল। দেখতে ভীষণ সুন্দর। পৃথিবীটা হঠাৎ করে যেন স্বর্গের রূপ লাভ করেছে। কিন্তু স্বর্গের সুধা পান করার মতো মানুষের সংখ্যা কমতে লাগল।

পঞ্চম বছরে গিয়ে অবস্থা এত খারাপ হল যে হাসপাতালে নেওয়াই গেল না। কেউ কাউকে দেখার রইল না। বাসার বেডরুমেই শুকিয়ে মারা গেল প্রচুর লোক।

পৃথিবীর সবগুলো বড় বড় দেশ সভা করল। ধনীদেশগুলো বিশেষ ব্যবস্থা নিতে চাইল নিজেদের রক্ষায়। রক্ত কিনে কিনে ট্যাঙ্কি ভর্তি করে ফেলছে লোকজন। গাড়ি বাড়ি জমিজমা সব বিক্রি করে রক্ত কিনছে মানুষ। মানুষের রক্ত শেষ। এরপর পশুপাখির রক্ত সংগ্রহ শুরু হল। গরু ছাগল শুয়োর কাক চড়ুই পাখিও বাদ গেল না। বাঁচতে হলে রক্ত লাগবে। তবু শেষরক্ষা হল না। মরতে শুরু করেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকায়, এশিয়ায়…………….।

ওই গোলযোগে আরিলের দেউলিয়া মামলার কথা ভুলে গেল সবাই। আরিল সুসি আর ফিওনাকে নিয়ে এসেছিল পার্থ থেকে ওর গোপন আস্তানায়। অবশ্য তার আগেই ওদের শরীরে এক রাতে তিনটা রশ্মি প্রবেশ করেছিল তা ওরা কেউ জানে না। আরিল ভাবল এই জায়গা মানব সমাজ থেকে দূরে, তাই মহামারী থেকে এই অঞ্চলে নিরাপদে থাকতে পারবে। খাদ্যের মজুতও আছে প্রচুর। কিন্তু জীবিত মানুষের সংখ্যা একেবারে নেই বললেই চলে। জীবিত মানুষকে আরিল ভয় পায় এখনও। তাই আপাতত সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্জনেই থাকার সিদ্ধান্ত নিল আরিল।

জনবিচ্ছিন্ন ওই জায়গায় থেকে আরিল জানতেও পারল না পৃথিবীতে তারা তিনজনই জীবিত মানব। বাকী সাড়ে ছয়শো কোটি মানুষ শুকিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। যখন জানবে তখন খুব দেরি হয়ে গেছে। পৃথিবীতে মানব সভ্যতা ধ্বংস হয়ে বৃক্ষদের রাজত্ব শুরু হয়েছে। গাছে গাছে পাখি ডাকে নির্ভয়ে। অরণ্যে বাঘ হরিণের অবাধ ছুটোছুটি শিকার। দুবছর পর শহরের দিকে গিয়ে দেখে চমকে ওঠে। এসব কী দেখছে? মানুষজন সব কোথায়। এত নির্জনতা কেন এখানে?

বড় বড় দালানের উপর উঠে গেছে বৃক্ষলতা। বাড়ি গাড়ি সব জঙ্গলের ভেতর হারিয়ে গেছে। পথঘাট সব কংক্রিট হারিয়ে ঘাসের জঙ্গলে রূপ নিয়েছে। কোথাও একটা আগ্রাসন ঘটে গেছে আরিল আন্দাজ করল। কাদের আগ্রাসন? মাত্র দু বছর আড়ালে ছিল শহর থেকে দূরে, এতেই একটা শহরের মানুষ সবগুলো হারিয়ে গেল? এটা কি সেই রোগের প্রভাব? জীবাণু আক্রমণ ঘটেছে? জীবাণুরা সব মানুষ মেরে ফেলল শহরের? অথচ গাছেদের কিছু হয়নি। গাছেরা আরও সবুজ হয়েছে, পল্লবিত হয়েছে, পুষ্ট হয়েছে।

নাহ এই দেশে থাকবে না আর। জনশূন্য শহরে বসবাস করার কোন মানে হয় না। অস্ট্রেলিয়া নয়তো ইউরোপ চলে যাবে। জিপ গাড়িটা চালিয়ে বিষণ্ণ মনে বাড়ি ফিরছে আরিল। বাড়ির কাছাকাছি যেতেই ফিওনার চিৎকার— “বাবা বাবা দেখো, সেই ফুলটা আবারও ফুটেছে আমাদের বাগানে।”

সেই অভিশপ্ত ফুলটা আবারও ফিরে এসেছে কেন? ভয়ে ভয়ে ফুলটার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ করে হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে ফুলটার পাশে ভাঙাচোরা মানুষ হয়ে বসে পড়ল আরিল।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1180 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*