রণে-বনে-পাকিস্তানে, দেশ ভেসে যায় দেশপ্রেমে

যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা

শৈলেন সরকার

 

সম্ভাবনাটা ছিলই। না, ফিসফাস ঘুসঘাস নয়, কাগজ বা বিভিন্ন আলোচনায় কথাটা বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। হ্যাঁ, ’১৯-এর নির্বাচনের আগে পাক-ভারত যুদ্ধ বা যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার কথাই। আর সেই যুদ্ধ বা যুদ্ধের সম্ভাবনা এখন শুধু কথার মধ্যে নেই, আমাদের চর্মচক্ষে বা একেবারে দেখার মধ্যেই। ভগবান বা গোমাতা নিয়ে তো আর এমনি এমনি মাতামাতি করে না কেউ, ভক্তকে তিনি দেখেন। আর দেখলেনও, একেবারে মোক্ষম সময়ে তিনি হাত তুললেন। এই হাত বরাভয়ের, এই হাত আশীর্বাদের, ‘যাও বাবা, এই আমি পাকিস্তানকে এনে দিলাম, এবার করে খাও।’

যুদ্ধ অবশ্যই উপকারী অনেকের কাছে, যারা অস্ত্র-ব্যবসায়ী— তাদের কাছে তো বটেই। আর রাজনীতির কারবারিদের কাছেও। রাজনীতির পাশে কারবারি শব্দটা অনেকের খারাপ লাগতে পারে, কেননা রাজনীতির লোকেরা অতি সহজেই মহামানবও হয়ে যান, তখন আর তাঁদের কোনও সমালোচনা করা যায় না। আর ভারত তো মহামানবদেরই দেশ। ধরা যাক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, রাসবিহারী বসু। এঁদের নামের আগে কারও মহাত্মা, কারও নেতাজি তো কারও বা ঋষি কারও বা মহানায়ক। মোট কথা মহামানব না করে আমরা ছাড়িনি। কিন্তু এঁরা সবাই সাতচল্লিশের আগেকার। এঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামী। এঁরা সবাই অস্ত্র নিয়ে হোক বা না নিয়ে লড়াই করেছেন। লড়েছেন স্বাধীনতার যুদ্ধ। সাতচল্লিশের পর কি যুদ্ধ হয়নি? হয়েছে। দারিদ্র, জাতপাত, শিক্ষা নিয়ে যুদ্ধ তো ছিলই, ছিল মানে আছে এখনও। আছে মানে এই যুদ্ধের অভিমুখটা এখন অবশ্য পাল্টে গেছে। আমরা এখন জাতপাত, দারিদ্র বা অশিক্ষার পক্ষে লড়ছি। আমরা এখন গোমাংস বিক্রির অভিযোগে দলিত হত্যা করছি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী মুম্বইয়ের এক হাসপাতালে চিকিৎসকদের এক সম্মেলনে বলেছেন, “We all read about Karna in the Mahabharata. If we think a little more, we realise that the Mahabharata says Karna was not born from his mother’s womb. This means that genetic science was present at that time. That is why Karna could be born outside his mother’s womb.” তাঁর আরও অমৃত বাণী, “We worship Lord Ganesha. There must have been some plastic surgeon at that time who got an elephant’s head on the body of a human being and began the practice of plastic surgery.” এছাড়া তাঁর ন্যাওটা বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞান সম্মেলনে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদকে বা নিউটনকে বৈদিক আলোকে মিথ্যাবাদ বলে ঘোষণা করে, বেদের আলোকে নতুন করে আপেক্ষিকতাবাদকে ‘Modi Wave’ নামে প্রচারিত করতে চাইছেন। আর কী চাই! জয় বিজ্ঞান! আমাদের বিজ্ঞানসম্মত প্রধানমন্ত্রী তাঁর ও তাঁর দলের মন্ত্রী-সান্ত্রীদের বিজ্ঞানের আলোতে এখন ঝলমল করছেন। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সেই ’৬৫-র ভারত-পাক যুদ্ধের স্লোগান ‘জয় জোয়ান, জয় কিষান’কে ২০১৯-এর নির্বাচনে জেতার জন্য হতে যাওয়া ভারত-পাক যুদ্ধ বা যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার প্রয়োজনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীজী আরও উন্নততর স্লোগানে পরিণত করেছেন। তিনি এখন বলছেন, না, ‘জয় জোয়ান, জয় কিষান’-এর সঙ্গে ‘জয় হনুমান’ বা ‘জয় গোমাতা’ যোগ করেননি, বলেছেন ‘জয় বিজ্ঞান’। তাঁর মতো বিজ্ঞান-মনস্ক মানুষ ‘জয় শ্রীরাম’ বা ‘জয় হনুমান’ বা ‘জয় গোমাতা’ না বলে কেন ‘জয় বিজ্ঞান’ বললেন তা নিয়ে আমাদের প্রযুক্তিমন্ত্রীকে আইনস্টাইনের চেয়ে বড় বিজ্ঞানী বলে কীর্তিমান হওয়া ন্যাওটা বিজ্ঞানীরা নিশ্চয়ই গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করবেন। আমাদের লড়াই সুতরাং এগিয়ে যাওয়ার নয়, কত দ্রুত আমরা আরও পিছিয়ে যেতে পারি, হ্যাঁ, পাকিস্তানের চেয়েও দ্রুততায়। আমরা তাই যুদ্ধ বলতে অশিক্ষা, দারিদ্র, জাতিভেদ, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ বলতে এখন সবদিক দিয়ে একেবারে পিছিয়ে পড়া একটা রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধই বুঝি। আমাদের বাস চলছে হু-হু করে, আর কন্ডাক্টর শুধু বলছে, জায়গা করা আছে, যান, পিছনের দিকে এগিয়ে যান।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ পুলওয়ামায় যে ঘটনাটা ঘটল, খুবই কষ্টদায়ক ও দুঃখের ঘটনা, এক ভারতীয় নাগরিক নিজেকে মানববোমা সাজিয়ে সেনাবাহিনীর কনভয়ে আঘাত করলে মৃত্যু হল ৪২ জন সিআরপিএফ জওয়ানের। ‘মানববোমা’ আদিল আহমেদ দার এক কাশ্মিরী যুবক। কাশ্মির আমাদের ভারতেরই একটি রাজ্য, আর যে ৩০০ কিলো বিস্ফোরক সে ব্যবহার করেছে, তা বাইরে থেকে মানে সীমানার ওপারের দেশ পাকিস্তান থেকে আনা হয়নি। লেফটেনান্ট জেনারেল হুডা জানিয়েছেন, আদিল আহমেদ ওই বিস্ফোরক জোগার করেছে সম্ভবত এ দেশেরই কোনও ‘কনস্ট্রাকশন’ চলছে এমন কোনও স্থান থেকে। বলা হচ্ছে ছেলেটি কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন জৈশ ই মহম্মদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। বিস্ফোরণের পর জৈশ একটি ভিডিও প্রচার করে সগৌরবে তা প্রচার করেছে। আর পাকিস্তান নাকি এই কাজে জৈশকে মদত দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই গোটা দেশে ক্ষোভ তৈরি হল। এই ক্ষোভের সঙ্গে কিছু প্রশ্নও উঠল। উঠল কনভয়ের আকার নিয়ে, ওইভাবে সাধারণ যাত্রীদের জন্য পথ উন্মুক্ত রেখে কনভয়ের নিরাপত্তার দিকটি অবহেলা করা নিয়ে, এমনকি সন্ত্রাসী আক্রমণের সম্ভাবনার গোয়েন্দা খবর থাকা সত্ত্বেও কনভয়ের যাওয়া নিয়ে কেন অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হল না— তা নিয়েও। সবচেয়ে বড় কথা, আদিল আহমেদ দার তাঁর বাড়ি থেকে উধাও হয়ে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরে গেল, সেখানে জৈশের কাছে শিক্ষা নিল, এরপর দেশে ফিরল বা আমাদের দেশের কারও কাছ থেকে বা কোথাও বিস্ফোরক সংগ্রহ করল, আর আমাদের ঝানু গোয়েন্দারা জানল না কিছু, তা হতেই পারে না। বিশেষ করে কাশ্মিরের মতো জায়গায় একটি যুবক বাড়ি থেকে উধাও হলে তাঁর খবর পুলিশের কাছে থাকবেই। আদিল আহমেদ দারের এই বিস্ফোরণ ভারতকে একটি যুদ্ধের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। কিন্তু সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, তাহলে কি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আদিল আহমেদ দারকে মানব বোমা হতে দিল? না কি যুদ্ধ তৈরির সুযোগ পেয়ে তা কাজে লাগাল? সুযোগ পেয়ে যুদ্ধ মানে ‘যুদ্ধ’ নয় অবশ্যই, কেননা এই দু’ দেশের কারওই একটি পুরোদস্তুর যুদ্ধ চালানোর মতো কোমরে জোর নেই। তাহলে যা হবে তা হল ‘যুদ্ধ-যুদ্ধ’ খেলা। এই যুদ্ধ বা যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার কথা অনেক দিন ধরেই সম্ভাবনার মধ্যে ছিল। আর ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামার ঘটনা সরকারে আসীন রাজনৈতিক দলের কাছে একেবারে পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা হয়ে দাঁড়াল। শেয়ার বাজারের ওঠানামার অনুকরণে এই কিছুদিন আগেকার তাদের নামতে থাকা দর দেশপ্রেমের জোয়ারে হঠাৎ করে চড়চড় করে বাড়তে শুরু করল। টিভিতে বসে মোচে তা দিয়ে ভাঙা বাংলায় প্রাক্তন আর অভিজ্ঞ বাঙালি সেনা কর্মীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক শুরু হল। এবং অবিলম্বে পারলে যে পাকিস্তানের ঘাড় মটকে দেওয়া উচিত তা নিয়ে দর্শক, শ্রোতা বা অনুষ্ঠানগুলির অ্যাঙ্করেরা সবাই তাঁদের সঙ্গে একমত হল। যুদ্ধের পবিত্রতা নিয়ে বেদ বা গীতা থেকে শ্লোক উঠে আসতে লাগল। অর্জুনের বাণী, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ভারতীয় সেনাবাহিনীর শৌর্য-বীর্য। কিন্তু একটি ভারতীয় যুবক কেন প্রাণের মায়া ছেড়ে নিজের দেশের বিরুদ্ধে মানব-বোমা হতে গেল— এই প্রশ্ন কেউই তুলল না। কারও মাথায় এলই না। এল না, কেননা, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবিলম্বে যুদ্ধ না হলেও ‘যুদ্ধ-যুদ্ধ’ ভাবটা জরুরি খুবই। দেড়-দু’মাস পরে নির্বাচন। সবে বিরোধীরা এককাট্টা হতে শুরু করেছিল, আর কী চমৎকার ঘটনা ভাবুন, ১৪ এপ্রিলের পুলওয়ামা ঘটনার পর কোথায় ‘ডিমানিটাইজেশন’, কোথায় ‘রাফায়েল’ দুর্নীতি, কোথায় বেকার সমস্যা, কোথায় কী? আমাদের কন্ডাকটর রাজস্থানের চুরুতে নির্বাচনী বক্তৃতায় বললেন, ‘Today is a day to pay homage to India’s bravehearts. I want to assure you that the country is in safe hand.’ সঙ্গে কবিতার আবৃত্তি, যার বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘আমি দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে শপথ করছি যে, আমি জাতিকে ধ্বংস হতে দেব না।’ অর্থাৎ ‘আমিই সেই’,  ‘ওই মহামানব আসে’। আসে? নাকি এসে গেছে? পাকিস্তানে এয়ার-স্ট্রাইক করছি, হ্যাঁ, এই এয়ার স্ট্রাইকে ওদের তরফে মানে জৈশ ই মহম্মদের জঙ্গিদের ‘নিকেশ’-এর (‘নিকেশ’ বা ‘খতম’ শব্দের এই ব্যবহার অবশ্যই ‘দেশপ্রেম’-এর বন্যায় ভাসা উন্নত এক ভাষাগোষ্ঠীর ‘ভাষা’ অপব্যবহারের একটি নমুনা মাত্র) সংখ্যা আমাদের মাটিতে ওদের করা ৪২ এর অনেক বেশি।

ভোর চারটেয় হওয়া এয়ার স্ট্রাইকের কিছুক্ষণের মধ্যেই দুনিয়ার লোক জানল ১০০০ কেজি বোম ফেলা হয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মিরের আকাশ সীমায় ৮০ কিমি ঢুকে, আর মৃত্যু হয়েছে ৩০০ জঙ্গির। কিছু পরে মৃত জঙ্গির সংখ্যাটা হল ৩২৫, এর মধ্যে ২৫ জন নাকি প্রশিক্ষক। আরও কিছুক্ষণ পর সংখ্যাটা হল ৩৫০। টিভি আর খবরের কাগজ দেশপ্রেমের কম্পিটিশন শুরু করল। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক পদাধিকারীদের চাহিদা তুঙ্গে। এই চ্যানেল সেরে বেরোতে না বেরোতেই আর এক চ্যানেল। এই চ্যানেলের অ্যাঙ্করের ফোন নামিয়ে রাখতে না রাখতেই আর এক চ্যানেল। এক অফিসার তো কার্যত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের বিরুদ্ধে ক্ষোভই প্রকাশ করে ফেললেন, কেন মনমোহন ২০০৮-এর ‘মুম্বই অ্যাটাক’ ঘটনার পর পাকিস্তানকে সামরিক আঘাতে রাজী হননি। যাই হোক দেশপ্রেমের তাড়নায় একটা সাধারণ প্রশ্ন তুলতে কিন্তু এই সব অবসরপ্রাপ্ত অফিসার বা টিভি-অ্যঙ্কর বা খবরের কাগজের প্রতিবেদকেরা ভুলে গেলেন, তা হল, ভোর চারটেয় এয়ার স্ট্রাইক ঘটার ঘণ্টা দেড়-দুইয়ের মধ্যেই মৃতের সংখ্যা, তাদের নাম একেবারে— পদাধিকারী হিসাবে আলাদা করে জানা গেল কীভাবে? হ্যাঁ, এয়ার স্ট্রাইক মানে তো পদাতিক সেনার ব্যাপার নয়, যে তাঁরা শত্রু শিবির ধ্বংস করে মৃত সেনাদের সংখ্যা বা নামধাম বা কয়জন প্রশিক্ষক বা কয়জন সাধারণ জঙ্গি তা ডেডবডি আলাদা করে গুণে গুণে হিসাব করার সুযোগ পাবে। শব্দের কয়েকগুণ গতিতে ছোটা যুদ্ধবিমান মাত্র ২১ মিনিটের অর্ধেক সময়ে ভারত সরকারের কথামতো লাইন অব কন্ট্রোল পেরিয়ে ৮০ কিমি দুরে গিয়ে জঙ্গিশিবিরে বোমা ফেলে তো বিমানের পাইলট বিমান ছেড়ে নিচে মাটিতে নেমে কী হল বা কয়জন গেল দেখার সুযোগ পায়নি, পরের সাড়ে ১০ মিনিটে তাকে প্রাণ ও বিমান হাতে করে ঘরে ফিরতে হবে। কিন্তু না, দেশপ্রেমীদের সন্তুষ্টির বালাই আছে। তাঁরা এখন দেশপ্রেমের ছদ্মবেশে ‘উগ্র সেনাবাহিনীকেন্দ্রিক’ জাতীয়তাবাদে ভাসছে, তাঁরা এখন গণহিস্টিরিয়ায়। তাঁরা কেউ এখন মানুষ নামক বোধবুদ্ধি সম্পন্ন জীব নয়, আসন্ন মহামানবের কৃপায় তারা এখন পবিত্র গোমাতার সন্তান। মৃতের সংখ্যাটাকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামা ঘটনার অন্তত ১০ গুণ করতে হবে।

যে সরকার ‘ডিমানিটাইজেশন’ নিয়ে, ‘রাফায়েল’ নিয়ে, বেকার সমস্যা থেকে সাংবিধানিক সংস্থাগুলি নিয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যা বলতে পারে তাদের কাছে নিজেদের পক্ষে ঢেউ তুলতে মৃতের সংখ্যা ৩০০-সাড়ে ৩০০ বা ৪০০ বলাটা পবিত্র দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা ছাড়া অন্য কিছুই নয়। যাদের নেতার কাছে গণেশের হস্তিমুণ্ডের ব্যাখ্যায় বা কর্ণের জন্মবৃত্তান্ত ব্যাখ্যায় প্রাচীন ভারত ‘টেস্ট টিউব বেবি’ বা ‘প্লাস্টিক সার্জারি’র কথা আসে তাদের কাছে তো আর যুক্তিবুদ্ধি আশা করা যায় না। কিন্তু স্মার্টফোনের যুগে আমাদের তো যে কোনও কথা যাচাই করার সুযোগ আছে। পাকিস্তানের দাবি, ক্ষতি হয়নি কোনও, ভারতীয় বিমান পাকিস্তানি বিমানের তাড়া খেয়ে পালাবার সময় বিমানের ‘পেলোড’ যেখানে পেরেছে ফেলে চলে গেছে। কিন্তু পাক সরকারের কথাই বা আমরা বিশ্বাস করব কেন? এবার দেখি বিভিন্ন সংবাদ সংস্থাগুলি কী বলে? বিবিসি, আল জাজিরা বা রয়টারের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলের কাছে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান নিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, ভোরের দিকে তাঁরা বিকট শব্দ শুনেছেন। তাঁরা এমনকী সেনাবাহিনী আসার আগে ঘটনাস্থলের কাছেও গেছেন। তাঁদের কথায় বেশ বড়সড় গর্ত তৈরি হয়েছে সেখানে। গাছপালা ভেঙেছে অনেক। একটি বাড়ি ভেঙেছে, তবে মারা যায়নি কেউ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা জানিয়েছেন, জৈশ ই মহম্মদের আড্ডা এখানে এককালে ছিল, তবে তা অনেক আগেকার ব্যাপার। একজন নিজের নাম গোপন রাখতে বলে জানিয়েছে, জৈশ ই মহম্মদ এখানে মাদ্রাসা কলেজ চালাত একটি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের এই বিবরণে আমরা অবশ্য খুশি হতে পারি না, আমরা মৃত্যু সংখ্যা চাই। আমরা যারা যুদ্ধে যাওয়া তো দূরের কথা, সিনেমায় ছাড়া যুদ্ধ কোথাও দেখিইনি কোনও দিন, আমাদের কাছে যুদ্ধ বেশ পবিত্র একটা ব্যাপার, আর যুদ্ধ মানেই বিরুদ্ধ দেশের মৃত্যুসংখ্যা। সেই সংখ্যা যেন হুড়মুড়িয়ে বাড়ে। তাদের মৃত্যু আমাদের কাছে ‘নিকেশ’ বা ‘খতম’ আর আমাদের সৈন্যদের বেলায় ‘দেশের জন্য প্রাণ বলিদান’। আমরা বরং একবার ফরাসি পরিচালক জ্যঁ পিয়ের জ্যুনেত পরিচালিত অড্রে তৌতৌ অভিনীত বিখ্যাত সিনেমা ‘এ ভেরি লং এনগেজমেন্ট’ সিনেমাটা দেখি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উপর এই সিনেমায় দেখা যাবে কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে ঘরে ফেরার সুযোগ পাওয়ার জন্য সৈন্যরা নিজেদের হাতের চেটোয় বা আঙুলে নিজেরাই নিজেদের বন্দুক দিয়ে গুলি করে ক্ষতবিক্ষত করছে। অর্থাৎ সৈন্যরা কোনও অন্য গ্রহের প্রাণী নয়, আমাদের পাঁচজনেরই মতো, আমাদেরই মতো তাঁদেরও প্রাণের ভয় আছে, সবারই ঘরের জন্য মন কেমন করা আছে, সবারই প্রিয়জনদের কাছে ফেরার আকাঙ্খা আছে। অর্থাৎ কোনও উন্মাদনা দিয়ে প্রাণের মায়াকে ভুলিয়ে রাখা গেলেও তা সাময়িক। যুদ্ধক্ষেত্রে সবাই যায় পেটের তাগিদেই। আর যাঁরা ‘নিকেশ’ বা ‘খতম’ হয় বা যাঁদের ‘দেশের জন্য প্রাণ বলিদান’ হয় তাঁরা যে কোনও দেশেরই হোক না কেন, আসলে একই লোক। ‘একই লোক’ অর্থে সবাইই একেবারে বাধ্য হয়ে রুজি-রোজগারের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া শুধু আম-আদমি বলা ভুল, একেবারেই নিচের সারির লোক। যে আপনি মৃত যে শহিদের শোকে কেঁদে আকুল হচ্ছেন, জীবিত থাকলে সেই লোকের ছোঁয়াই হয়তো বাঁচিয়ে চলতেন। যেমন দেখিয়েছেন ইলিনয় ইউনিভার্সিটির স্টিফেন পি কোহেন তাঁর ‘দ্য আনটাচেবল সোলজার : কাস্ট, পলিটিক্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান আর্মি’ গ্রন্থে। তাহলে একটা সত্যি ঘটনার কথাই বলা যাক, ২০১৬-র জুলাইয়ের কথা। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের ফিরোজাবাদের ‘নট’ সম্প্রদায়ের একজন সিআরপিএফ জওয়ান হরি সিং মারা গেছেন। মারা গেছেন সন্ত্রাসী দমন করতে গিয়ে তাঁদের হাতেই। মনে রাখবেন, আধাসামরিক বাহিনীর কেউ মারা গেলে প্রতিরক্ষাবাহিনীর নিয়ম অনুসারে তিনি কিন্তু ‘শহিদ’-এর মর্যাদা পান না। (এই সত্যি কথাটা বলার জন্য মাত্র কিছুদিন আগে বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত বাঙালির দেশপ্রেমের চোটে হাবরার এক শিক্ষককে বাড়িছাড়া হতে হল এমনকি তাঁর চাকরিও গেল)। অর্থাৎ যতই শুনতে খারাপ লাগুক সরকারি নিয়মেই পুলওয়ামায় নিহত সিআরপিএফ জওয়ানরা কিন্তু ‘শহিদ’ নন। হরি সিং-ও সরকারিভাবে ‘শহিদ’ নন। কিন্তু ‘শহিদ’ হোন বা না হোন গ্রামে তাঁর শেষকৃত্য তো হবে। না, হবে না। শুধুমাত্র দলিত হওয়ার কারণে গ্রামের মাতব্বর ব্যক্তিরা হরি সিং-এর শেষকৃত্য গ্রামে সবার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে তাঁর শেষকৃত্য করতে দিতে চায়নি। দেশপ্রেমের কী হাল? অর্থাৎ দেশপ্রেমীদের কাছে তাহলে বড় কে হল, জাত না দেশ? জাত, জাত, জাত। হ্যাঁ, পুলওয়ামার আধাসেনারা আসলে প্রায় সবাইই সমাজে নিম্ন শ্রেণির মানুষ। বলা যেতে পারে একমাত্র সে কারণেই তাঁদের মরতে হল। সন্ত্রাসী আক্রমণের আগাম গোয়েন্দা রিপোর্ট থাকা সত্ত্বেও, একেবারে নিরাপত্তাহীন অবস্থায় নিয়মবহির্ভুত সংখ্যা ও উপায়ে কনভয় পাঠানো হল। এই মৃত্যু কার স্বার্থে? দেশের না কি কোনও ব্যক্তির রাজনৈতিক স্বার্থে? বুঝ লোক যে জান সন্ধান।

পাক-প্রধানমন্ত্রী শান্তির সুযোগ চেয়েছিলেন, বা আমাদের দেশের বিরোধী দলগুলিও সরকারের সঙ্গে আলোচনায় সশস্ত্র হামলার পরিবর্তে পাকিস্তানের উপর অন্যভাবে চাপ সৃষ্টি বা পারস্পরিক আলোচনার পথে এগোতেই বলেছিলেন। কিন্তু আমাদের যুদ্ধ দরকার, দরকার দেশপ্রেমের অছিলায় সেনাবাহিনীকেন্দ্রিক উগ্র জাতীয়তাবাদ। আমাদের দেশকে ভালোবাসলে হবে না, ঘৃণা করতে হবে পাকিস্তানকে। অন্য কোনও দেশ নয়। তথাকথিত ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ আমরা পাকিস্তান ছাড়া অন্য দেশেও ঘটিয়েছি। কে মনে রেখেছে সে দেশের কথা? মায়ানমারের কথা মনেই নেই কারও। মনে নেই, কেন না মায়ানমার পাকিস্তান নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ-যুদ্ধ হুঙ্কারের ব্যাপারটা মিলে যাওয়ায় ভয় হচ্ছে নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে দাঙ্গা ঘটানোর আশঙ্কাটা না মিলে যায়। মনে রাখতে হবে কেন পাকিস্তান? গোমাতা সেবকদের কাছে পাকিস্তান আর মুসলমান একেবারে সমার্থক। এদের রাজনীতির জাতি আর ধর্মভিত্তিক ঘৃণার ব্যাপারটা আর আস্তিনে লুকনো নেই। একেবারে খোলামেলা।

ইউটিউবে একটা মন্তব্য দেখলাম, ভারতের যতই উন্নত অস্ত্র, যতই রাফায়েল বা মিরাজ বা পারমাণবিক বোমা বা পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন, আধুনিক অস্ত্র ও শিক্ষায় শিক্ষিত সৈন্য বা সম্পদ থাক না কেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের কোনও ভাবেই জয়ের সম্ভাবনা নেই কোনও। কেন? কেন মানে? গোটা প্রক্রিয়াটাই অতি সোজা এবং প্রায় নিখরচায়। পাকিস্তান তার সীমানা জুড়ে বা ভারত পাকিস্তানের যে যে স্থানে মিসাইল হানা দিতে পারে সর্বত্র পবিত্র গোমাতাকে এক বা একাধিক সংখ্যায় ছেড়ে দেবে, ব্যস!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1180 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*