চিচিং ফাঁক

যোহান - চিচিং ফাঁক

আলেকজান্ডার রোমানোভিচ বেলিয়ায়েভ

আলেকজান্ডার রোমানোভিচ বেলিয়ায়েভ (১৮৮৪-১৯৪২) 'চিচিং ফাঁক' গল্পটির মূল রুশ লেখক। বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞানী। ১৭টি উপন‍্যাস, অসংখ‍্য ছোট গল্প ও বহু প্রবন্ধের রচয়িতা। জনপ্রিয়তম ও শ্রেষ্ঠ গল্প 'উভচর'। এছাড়া 'প্রফেসর ডাওয়েলের মাথা' 'বিশ্বের প্রভু' 'এরিয়েল' 'মহাশূন‍্যে ঝাঁপ' প্রভৃতিও অত‍্যন্ত জনপ্রিয় রচনা। 'চিচিং ফাঁক' গল্পটি ১৯২৮ সাল নাগাদ রচিত।

তর্জমা : লীলা সরকার

লীলা সরকারের জন্ম ১৯৩৫-এ, জলপাইগুড়িতে। কেন্দ্রীয় সরকারের অবসরপ্রাপ্ত গেজেটেড অফিসার।

১৯৬৫ সালে কলকাতার Indo Soviet Cultural Society (ISCUS) থেকে রুশভাষায়  ডিপ্লোমা পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার। ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত ISCUS-এর বিভিন্ন কেন্দ্রে এবং অন‍্যান‍্য রুশভাষা শিক্ষাকেন্দ্রে  শিক্ষকতা।

মূল রুশভাষা থেকে বাংলায় গল্প অনুবাদের শুরু ISCUS-এ শিক্ষকতাকালীন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। পরবর্তীকালে কর্মজীবন থেকে অবসরলাভের পর এই কাজে পরিপূর্ণভাবে আত্মমগ্ন। সেরিব্রাল অ্যাটাকে স্বাধীন চলাফেরা ব‍্যাহত হলেও তাঁর অদম‍্য মানসিক উৎসাহকে সেই অসুস্থতা দমিয়ে রাখতে পারেনি। বিছানায় বসে বসেই হাতের কাছে খাতা বই অভিধান সাজিয়ে নিয়ে অনুবাদের ধারা বয়েই চলেছে।

 

স্পর্শকাতর স্থান

“যোহান, তুমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছ”— আরামকেদারাটা সরিয়ে এডওইয়ার্ড গানে একটু রাগতভাবে বললেন।

দীর্ঘশ্বাস চেপে চাকরটি অতি কষ্টে হাঁটু মুড়ে বসল এবং ট্রে থেকে পড়ে যাওয়া কফির পাত্র, রুপোর দুধদানি এবং কাপ তুলতে লাগল।

“কার্পেটের কোণায় পা বেধে গিয়েছিল”— ধীরে ধীরে উঠতে উঠতে একটু বিভ্রান্তভাবে সে বলল।

কফির দাগের দিকে অসন্তুষ্টভাবে তাকিয়ে এডওইয়ার্ড গানে আরও একবার জোর দিয়ে বললেন— “যোহান, তুমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছ। আজ সকালে পোশাক পরাবার সময়ে তুমি কিছুতেই জামার হাতাটার মধ্যে আমার হাতটা ঢোকাতে পারলে না। গতকাল তুমি আমার দাড়ি কামানোর জল ফেলে দিয়েছিলে।”

যোহানের পাথরের মতো মুখে দুঃখের ছায়া ঘনিয়ে এল। গানে যা বললেন, তা সত্যিই। যোহান বুড়ো হয়ে যাচ্ছে, এমনকি জরাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। অবশ্য ছিয়াত্তর বছর বয়স মোটেই ঠাট্টার ব্যাপার নয়। তার মধ্যে পঞ্চান্ন বছর এডওইয়ার্ডের সেবাতেই কেটে গেল, যে কিনা তার চাইতে মাত্র ছ বছরের ছোট। না, যোহানের এখন অবসর নেওয়ার সময় এসেছে। সামান্য কিছু সঞ্চয় আছে, এতেই তার জীবন কেটে যাবে। কিন্তু চাকরি ছেড়ে সে কী করবে? তার এই জীর্ণ শরীর সেবায় অভ্যস্ত কেউ যন্ত্রের মতো চালিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু যোহান জানে যে নিজের জন্য কাজ করার শক্তি তার নেই। সে এই বুড়ো আর খিটখিটে এডওইয়ার্ড গানের সেবাতেই অভ্যস্ত। হ্যানোভারে থাকতেই সে গানের সেবায় লেগেছে— সেখান থেকে তারা পঞ্চাশ বছর আগে এই নতুন দুনিয়ায় এসেছে শান্তির আশায়। এখানে এসে এডওইয়ার্ড গানের ভাগ্য খুলে গেল, তিনি বেশ কিছু মূলধনের অধিকারী হলেন। দশ বৎসর পূর্বে একটা মৃদু হার্ট অ্যাটাকের পর তিনি তাঁর টেক্সটাইল ফ্যাক্টরি বিক্রি করে দিয়ে ফিলাদেলফিয়ার উপকণ্ঠে জার্মান প্রাসাদের অনুকরণে একটি ভিলা তৈরি করে কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন। পঞ্চাশ বছরের আমেরিকান জীবনে তাঁর কোনও পরিবর্তন হয়নি। নিজস্ব রুচি ও অভ্যাস অনুযায়ী তিনি জার্মান-ই রয়ে গিয়েছেন। বাড়িতে যোহানের সঙ্গে তিনি শুধু জার্মান ভাষাতেই কথা বলেন। যোহানের প্রকৃত নাম ছিল রবার্ট, কিন্তু গানে তাঁর চাকরের শুধু ডাকনাম যোহানকেই স্বীকৃতি দিলেন এবং কালক্রমে বৃদ্ধ চাকরটি তাঁর প্রথম নামটিই ভুলে গেল।

অন্য অনেক চিরকুমারদের মতো এডওইয়ার্ড গানেরও কিছু অস্বাভাবিকতা ছিল। সাংসারিক জীবনে তিনি নূতনত্বের বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর দুর্গে সময় যেন থেমে ছিল। গানে কোনও বিদ্যুতের আলো ব্যবহার করতেন না, তাঁর মতে এতে চোখের দৃষ্টি খারাপ হয়ে যায়। প্রত্যেকটা ঘরে কেরোসিনের বাতিই শুধু জ্বলে, কেবল পড়ার ঘরে টেবিলের ওপরে সবুজ ল্যাম্পশেডের নীচে মোমবাতি থাকে। রেডিওর কথা গানে শুনতেই চান না। “আমার মধ্যে দিয়ে বেতার-তরঙ্গ প্রবাহিত হচ্ছে— এই-ই যথেষ্ট”, তিনি বলতেন, “এতে মনে হয় আমার শরীরের ব্যথা বেদনা বেড়ে যায়, শীঘ্রই আমার বাড়ির দেওয়াল ও ছাদ এমনভাবে মেরামত কড়া হবে, যাতে রেডিওর শব্দ না আসে। আমি চাই না যে বাইরে থেকে কোনও শব্দ আসবার সম্ভাবনা আমার বাড়িতে থাকে।” মোটরগাড়িতে বেড়ানোও তিনি সেইজন্য পছন্দ করেন না। তাঁর আস্তাবলে বাইরে বেড়াবার জন্য একজোড়া ঘোড়া থাকে। শহরে তিনি খুব কমই যেতেন, যখন যেতেন তখন খুব পুরনো গাড়িতেই বেরোতেন আর পথচারীরা আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে থাকত। এইভাবে বেড়াতে বছরে দু’বারের বেশি তিনি যেতেন না। জার্মানসুলভ নিয়মানুবর্তিতায় প্রতিদিন সকালে যোহানের হাত ধরে প্রতিদিন সকালে তিনি বাগানে ঘুরে বেড়ান।

যখন তাঁরা হাত ধরাধরি করে কালো ছড়ি হাতে নিয়ে সরু গলিতে হেঁটে বেড়াতেন— তখন অপরিচিত লোকে সহজে বুঝতে পারত না কে গৃহস্বামী আর কে ভৃত্য। দীর্ঘদিনের সাহচর্যে যোহান গানের অভ্যাসগুলো রপ্ত করে যেন গানের ডুপ্লিকেট হয়ে উঠেছিল। এদের দুজনের মধ্যে যোহানকেই বিশিষ্ট মনে হত কারণ, ও বয়সে বড় ছিল আর প্রকৃত আমেরিকানদের মতো মাথা মুড়নো ছিল। শুধু খুব মনোনিবেশ করে দেখলে পোষাকেই গৃহস্বামীকে চেনা যেত। কারণ, গাড়ির বনেট ছিল উল্লেখযোগ্য রূপে মূল্যবান।

যোহান এই বেড়ানোটা খুব ভালবাসত। সত্যিই কি একদিন সব শেষ হয়ে যাবে? না, এ হতে পারে না। এডওইয়ার্ড গানের অভ্যেসগুলো যোহানের চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। গানের বৃদ্ধ বয়সের খিটখিটে স্বভাবকেও আর কেউ সহ্য করবে না।

এই চিন্তা যোহানকে খানিকটা শান্ত করল। ওর শুকনো ঠোঁটে হাসি খেলে গেল কিন্তু বাহ্যত নম্রভাবে জিজ্ঞাসা করল— “মি. গানে, এই পরিস্থিতিতে আমার পরিবর্তে অন্য একজন লোকের প্রয়োজন, বেশ অল্পবয়সী, অবশ্যই আমার চাইতে ভালো কাজ করবে!”

“কী? অল্পবয়সী? যোহান, আজ তুমি আমাকে কষ্ট দেবে ঠিক করেছ। যাও আমার কফি নিয়ে এস।”

যদিও পা কাঁপছিল, তবুও উদ্দীপিত চলনে যোহান ঘরের বাইরে এল। বাইরে এসেই ওর মুখের পাথরের মতো ভঙ্গি অদৃশ্য হয়ে গেল। অনিন্দ্যনীয় শুভ্র বাঁধানো দাঁতগুলি দৃশ্যমান করে তার সারা মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। এডওইয়ার্ড গানের জীবনে যোহান এক স্পর্শকাতর স্থান অধিকার করে আছে। গানে সাধারণত চাকর-বাকর একদম সহ্য করতে পারেন না— অল্পবয়সী তো একদমই নয়। তাঁর ভিলাতে শুধু প্রয়োজনীয় সংখ্যক চাকর ছিল। যে মালি, একইসঙ্গে সে ড্রাইভারও। আর ছিল চিনে রাঁধুনি। দুজনেই বছর পঞ্চাশের। কোনও মহিলা কাজের লোক ছিল না। পাশের ফার্মে কাপড়-চোপড় কাচতে পাঠানো হত। ঘরদোর যখন পরিষ্কার করার দরকার হত, তখন সেখান থেকে একজন বৃদ্ধা মহিলা এসে কাজ করে যেত। রাঁধুনি আর মালি ভিলা সংলগ্ন ছোট কুঠুরিতে থাকত। আর যোহান নিজে গানের শোবার ঘরের পাশে একটি মাঝারি ঘরে থাকত, যাতে দিনেরাতে গৃহস্বামী যখনই ডাকবেন, তখনই সাড়া দিতে পারে।

 

অবিশ্বাস্য প্রস্তাব

সকালবেলা কফি পান করার পর এডওইয়ার্ড গানে ও যোহান বাগানে তাদের প্রাত্যাহিক ভ্রমণ সেরে ফেলল। পরস্পর পরস্পরের ওপর ভর দিয়ে তাঁরা বাগানের সরু রাস্তা দিয়ে চলছিল আর মাঝে মাঝে আরামপ্রদ বেঞ্চগুলিতে বিশ্রাম নিচ্ছিল।

“যোহান, তুমি একজন অল্পবয়সী নতুন চাকর রাখতে বলছ। তোমার কি মনে নেই বছরখানেক আগে এরকম একটা চেষ্টা আমরা করেছিলাম? তাতে কী ফল হল? সেই অল্পবয়সী লোকটার হাত থেকে যে কী করে রেহাই পেলাম জানি না। অবশ্য সত্যি কথাই সে বাসনপত্র ভাঙেনি, আর পোষাক পরাবার সময়ে তাড়াতাড়ি করেই জামার হাতায় আমার হাত ঢুকিয়েছিল। কার্পেটে ওর পা আটকেও যায়নি আর তোমার মতো আমার মূল্যবান কার্পেটও নষ্ট করেনি।”

যোহান ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করতে লাগল কখন ‘কিন্তু’ কথাটা উচ্চারিত হবে। “লোকটা খুব তাড়াতাড়ি বেশ ভালোভাবেই সব কাজ করত। কিন্তু এরা সব অসম্ভব লোক – আধুনিক চাকর, অল্পবয়সী। তোমাকে ওজন করে কথা বলতে হবে যাতে তাদের মনে আঘাত না লাগে। পরিবর্তে তুমি উদ্ধত উত্তর পাবে। রাত্রে আমার বাতের ব্যথাটা বেড়ে গেল। ডাকলাম ওকে, সাড়াই দিল না। রবিবারে তাকে ছুটি দিতে হবে। এসবের ফল কী হল? অশান্তি করে চলে গেল। তবু ভালো সে আমাকে মেরে ফেলেনি, বা জিনিসপত্র চুরি করেনি। এসো, বসি যোহান। পা-টা আমার ব্যথা করছে। …বোধহয় বৃষ্টি হবে।”

বেঞ্চের ওপর বসে গানে গভীরভাবে শ্বাস নিল।

“ভালো চাকর পাওয়া যায় না যোহান। ওরা শেষ হয়ে গিয়েছে। ভালো চাকর যন্ত্রের মতো হবে। বসতে বসলে বসবে, উঠতে বললে উঠবে, দিতে বললে দেবে। এইসব কিছুই করবে নীরবে, নিপুণভাবে। কোনও কিছুতেই দোষ দেখবে না, বা নিজের ব্যক্তিত্ব জাহির করবে না। একজন বৃদ্ধ মানুষ শরীর অসুস্থ হলে অনেক কিছুই বলতে পারে। … না যোহান, এটা কোনও উপায় নয়।”

“একটু বয়স্ক দেখে রাখা যেতে পারে”, নিজের কথা না ভেবে যোহান উপদেশ দিল। “এই বছর পঞ্চাশেক বয়সের— শক্ত শরীর হবে অথচ অল্পবয়সের দুষ্টু বুদ্ধি থাকবে না।”

“হ্যাঁ, কিন্তু কোথায় পাবে এরকম? এমন চাকর দুর্লভ। মনে করো, তোমার পঞ্চাশ বছর বয়সে কেউ যদি তোমাকে প্ররোচিত করত তার কাছে কাজ করার জন্য, আমি কিন্তু তোমাকে যেতে দিতাম না। এইরকমই সব গৃহস্বামী। তাছাড়া নতুন লোকের কাছে অভ্যস্ত হওয়া বড় কঠিন, তারও, আমারও।”

এই নিরুপায় অবস্থার চাপে দুজনেই চুপ করে রইল।

“আচ্ছা, যদি একজন বয়স্কা মহিলা পাওয়া যায়?”

“তুমি নিশ্চয়ই আমাকে মেরে ফেলবে ঠিক করেছ যোহান। তুমি ঠিকই জানো যে, একজন মহিলা যদি কোনও বৃদ্ধ অবিবাহিত পুরুষের চাকরিতে লাগে তবে উদ্দেশ্যই হবে পুরুষটিকে নিজের মুঠোয় নিয়ে এসে বিয়ে করতে বাধ্য করা। তারপর তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া এবং একজন অল্পবয়সী পুরুষকে বিয়ে করা। না না, ভগবান রক্ষা করুন। আমি এখনও অনেকদিন বাঁচতে চাই। আমি এখনও অনেকদিন তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে চাই যোহান।”

যোহানের মন হালকা হয়ে গেল। জানে না, সামনে তার এক নতুন পরীক্ষা আসছে।

বাগানের রাস্তায় এক ভারী কিন্তু সে পদক্ষেপের শব্দ শোনা গেল। গানে ও যোহান সতর্ক হল। গানে কোনও অতিথি-অভ্যাগতকে পছন্দ করতেন না। যখন তিনি বেড়াচ্ছেন, তখনই কারও আসবার দরকার হল? বাড়িতে থাকলে তিনি কখনওই দেখা করতেন না, কিন্তু এখানে অবাঞ্ছিত অতিথির সামনে তিনি একেবারেই অসহায়। বাড়ি থেকে দূরত্বটা গানে মনে মনে মেপে নিলেন, না বাড়ি পৌঁছনো সম্ভব নয়। রাস্তার অপর পাড়ে ইতিমধ্যেই একটা টুপিপরা মাথা দেখা যাচ্ছে। কয়েক পা এগিয়েই অপরিচিত লোকটি গানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকটি বেশ শক্তসমর্থ, চল্লিশের মতো বয়স। নিখুঁত পোষাক, নিখুঁত ব্যবহার।

“আমি কি মিঃ এডওইয়ার্ড গানের সঙ্গে দেখা করতে পারি?”— আগন্তুক জিজ্ঞাসা করল এবং উপবিষ্ট লোকদুটির দিকে তাকিয়ে অনুমান করতে চেষ্টা করল— কে গানে? আগন্তুকের এই অপ্রস্তুত অবস্থার জন্য যোহান যেন নিজেকেই দায়ী করে নতচক্ষু হল।

“আমিই এডওইয়ার্ড গানে। আপনার জন্য কী করতে পারি?” আগন্তুককে বসতে না বলে গানে জিজ্ঞাসা করলেন।

টুপিটি খুলে বিনীতভাবে আগন্তুক বলল, “আমার নাম জন মিচেল। আমি একটি ইলেক্ট্রোমেকানিক কোম্পানির প্রতিনিধি। একটি বিশেষ প্রস্তাব দেবার জন্যই আমি আপনাদের বিরক্ত করলাম।”

“আপনি যদি স্বয়ং ফোর্ডেরও প্রতিনিধি হন, তাহলেও আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করব না”, রাগে গরগর করতে করতে গানে তাকে বাধা দিয়ে বললেন। “আজ দশ বছর হল আমি সবরকমের ব্যবসায়িক কাজকর্ম থেকে সরে এসেছি, এখন আর কোনও ইচ্ছাই করি না…।”

“না, কোনও কাজে নিযুক্ত হবার জন্য আপনাকে আমি প্রস্তাব দিচ্ছি না”, আগন্তুক এবার বাধা দিয়ে বলল, “আমার প্রস্তাব সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের। আপনি যদি একমিনিট ধৈর্য ধরে আমার কথা শোনেন…”

এডওইয়ার্ড গানে অসহায়ভাবে স্ফুটনোন্মুখ উইস্টেরিয়া গোলাপ ঝোপের দিকে তাকালেন, অবশেষে সামনের দিকে তাকালেন। তারপর বেঞ্চে একটু সরে এসে শুষ্ক সৌজন্য দেখিয়ে বললেন, “বসুন, আমি শুনছি।”

অপরিচিত টুপিটি হাতে নিয়ে বেশ মর্যাদাভরে বেঞ্চে বসলেন। আর সেই সময়েই এক আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। আগন্তুক কথা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই গানে ও যোহান তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হলেন।

“অবস্থাপন্ন বয়স্ক ভদ্রলোকদের পরিচারিকা ভিন্ন চলা অসম্ভব। আর এই শতাব্দীতে ভালো চাকর পাওয়া কী কষ্টকর। বৃদ্ধ বিশ্বস্ত চাকরেরা প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে জরাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।” জন মিচেল বেশ অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে যোহানের দিকে তাকালেন। “আর পৃথিবীতে এদের স্থান কেউ নিতে পাড়ে না। নতুন ছেলেদের ট্রেড ইউনিয়ন পার্টি আর ফেডারেশন একেবারে করাপ্ট করেছে। তাদের লোভ, তাদের দাবী এত বেশি যে সহ্য করা যায় না। এইজন্য আপনি কখনওই গ্যারান্টি দিতে পারেন না যে এইরকম একজন যুবক এই সুন্দর রাত্রিতে আপনার গলা কাটবে না এবং আপনার মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যাবে না। এমনকি মহিলারাও অবিবাহিত পুরুষদের পক্ষে কম বিপজ্জনক নয়। বুঝবার আগেই আপনি তার মুঠোর ভেতর চলে যাবেন।”

গানে চিন্তা করলেন, এ কীরকম শয়তানি! যা তিনি শুনলেন তা কি একেবারে সব বয়স্কদেরই সমস্যা?

মিচেল তাঁর রহস্যময় বক্তব্য বলতে লাগলেন, “হ্যাঁ, নতুন চাকর খুঁজতে গেলে এইসব মনে রাখতে হবে। এইসঙ্গে এও মনে রাখতে হবে চাকর ছাড়া চলবে না। বাড়ির আরাম নষ্ট হয়ে যাবে, সব জায়গায় ধুলো, কোণে কোণে মাকড়সা, মাকড়সার জাল। কিন্তু এটাই সব নয়। মিঃ গানে, আপনি কি চিন্তা করেছেন, সেই দুঃখজনক সময়ের কথা, যখন আপনার পুরনো ভৃত্য— আমি নিশ্চয়ই ভুল করছি না যে তিনি আপনার সঙ্গেই বসে আছেন— তিনি একদিন আপনার ডাকে আসতে পারবেন না কারণ বার্ধক্য ও দুর্বলতায় তিনি বিছানা থেকে উঠতেই পারবেন না। আপনি একাই পড়ে থাকবেন সাহায্যহীন ও করুণ অবস্থায়।”

গানে নিজেই এসব ভেবেছেন। প্রতি রাত্রেই এই চিন্তাটা তাঁকে দুঃস্বপ্নের মতো কুরে কুরে খেত। গানে একবারও রাত্রিতে যোহানকে ডাকতেন না এটা নিশ্চিন্ত হতে যে যোহান এখনও বিছানা থেকে উঠতে হাঁফাবে না।

“আপনাকে কেউ একপাত্র জলও দেবে না, কফিও নিয়ে আসবে না”, আগন্তুক বলে চললেন। “আপনি আপনার বিছানায় শুয়ে থাকবেন আর বিরক্তিকর কুৎসিত মাকড়সা সোজা এসে আপনার মাথায় পড়বে, কদাকার ইঁদুরগুলো পোষাকের ওপর নাচতে থাকবে।”

গানে টুপিটা খুলে কপালটা মুছলেন। এটা একধরনের প্রলাপ। “আপনি কী চান?” হতাশা ও দুঃখমিশ্রিত স্বরে গানে জিজ্ঞাসা করলেন। “কেন আপনি এই ভয়ঙ্কর কথাগুলি বলছেন?”

মিচেল চোখের কোণা দিয়ে গানের দিকে তাকালেন ও সন্তুষ্ট হলেন। তিনি যেন প্রশ্নটা বুঝতেই পারলেন না। তাড়াহুড়ো না করে সিগারেট খেয়েই চললেন এবং অন্যমনস্কভাবে বাগানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার ভিলাটা চমৎকার। আরামপ্রদ বাগানটা। এখানে বেশ শান্তিতে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটানো যায় যদি শুধু…”

“আমি যেন আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আপনার এখানে আসার উদ্দেশ্য কী?” অধৈর্যভাবে গানে বলে উঠলেন।

“যদি আপনার ভালো, আশানুরূপ চাকর লাগে, যে আপনার বাধ্য হবে, মাছের মতো চুপ করে থাকবে এবং আপনার সব কথার অর্থ বুঝে চলবে…” এই পর্যন্ত বুঝে মিচেল থামলেন এবং গানের দিকে ফিরে বললেন, “আমি আপনাকে এইরকম আদর্শ চাকরের খোঁজ দিচ্ছি। এই কথা বলার জন্য আপনার কাছে এসেছি।”

এইসময় একটা কুকুরের আবির্ভাবে অপ্রত্যাশিতভাবে কথাবার্তা বাধাপ্রাপ্ত হল। কালো রঙের একটা কুকুর মালির ঘর থেকে দৌড়ে এল। কুকুরটা গানের দিকে এগিয়ে গেল কিন্তু একজন আগন্তুককে দেখে দাঁত বার করে গরগর করতে লাগল।

গানে চিৎকার করে বললেন, “জিপসি, তোমার জায়গায় যাও।” কুকুরটা আস্তে আস্তে বেঞ্চের নিচে গুটিয়ে বসল। মিচেল বিরক্ত মুখে বললেন, “ছোটবেলা থেকে কুকুর সহ্য করতে পারি না। একদিন ওর জন্য আমি খুব কষ্টভোগ করেছিলাম। আপনার আর কুকুর নেই তো?”

“কেবল এইটা। চিন্তা করবেন না। ও কামড়াবে না। আপনি যেমন বলছিলেন। নিশ্চয়ই আমাকে ভালো চাকরের কথা বলবেন। কিন্তু আমি যদি ভুল না করি আপনি নিজেকে ‘ভিস্তিনগাউজ’ ফার্মের প্রতিনিধি বলেছিলেন। এবং সেই সঙ্গে আপনি চাকরদেরও এজেন্ট?”

“সেই সঙ্গে সেই ফার্মেরই।”

“কবে থেকে এই ফার্ম ভিস্তিনগাউজ চালু হয়েছে?”

“সেই সময় থেকেই যখন এটা চাকর তৈরি করতে আরম্ভ করেছে— আদর্শ চাকর।”

“এটা কোন পাগলের কাজ?” গানে নতুন উদ্বেগের সঙ্গে আগন্তুকের দিকে তাকালেন।

মিচেল গানের চোখে উদ্বেগ দেখে হেসে উত্তর দিলেন, “হয়ত আপনার কাছে আশ্চর্য মনে হচ্ছে কিন্তু এটা এরকমই। ফার্ম ভিস্তিনগাউজ যান্ত্রিক চাকর তৈরি করছে। বেতার টেলিগ্রাফের সঙ্গে টেলিফোনকে যোগ করা হয়েছে— এই হল ব্যাপার। আপনার আদেশে সেকেন্ডে সাতশো বার এমনকি এক হাজার চারশো বার আসবে। এই গতিটা বোঝা যায় বিশেষরকম কাটার সাহায্যে। কাঁটাটি যান্ত্রিক চাকরের খাঁজটা পরিবর্তন করে এবং তখন চাকরটি আপনার কাজ সম্পন্ন করে। থাক, টেকনিকাল বর্ণনা দিয়ে আপনাকে বিরক্ত করব না। সবচেয়ে বড় কথা যান্ত্রিক চাকরগুলি আপনার সব আদেশ পালন করতে সক্ষম।”

“ওরা কি মানুষের মতো দেখতে?” গানে জিজ্ঞাসা করলেন।

মিচেল উত্তর দিলেন, “অনেক রকমের আছে। ওর মধ্যে কিছু কিছু নিজেদের শুধু যন্ত্র মনে করে। আপনাকে শুধু আদেশ করতে হবে। এইরকম যন্ত্র ইলেকট্রিক আলো জ্বালিয়ে দেয়। ইলেকট্রিক ফ্যান চলতে থাকবে, প্রজেক্টর দ্বারা ঘরে ঘরে ইলেকট্রিক আলো জ্বলতে থাকবে, সিগনালের আলো জ্বালিয়ে দেবে অথবা ইলেকট্রিক ঝাঁটা বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার নিয়ে আসবে। অবশেষে আপনার দরজাগুলি খুলে দেবে। আপনাকে শুধু বলতে হবে চিচিং ফাঁক আর দরজা আস্তে আস্তে খুলে যাবে। আপনাকে ঢুকতে দেবে। তারপরেই দরজাটা বন্ধ হয়ে যাবে।”

যেমন গল্পে হয়। “আপনি নিজে এসব গল্প জানেন?” গানে জিজ্ঞাসা করলেন।

“সত্যি কথা বলতে কি, ভুলে গিয়েছি”— মিচেল উত্তর দিলেন।

“আমি যদি ভুলে না গিয়ে থাকি”, গানে বললেন, “এই গল্পে একজন লোকের সম্বন্ধে বলা হয়েছে, যে চিচিং ফাঁক বলামাত্র গুহা খুলে গেল। সে টাকাপয়সা তুলে নিল কিন্তু ঢুকবার পরেই বাইরে যাবার মন্ত্রটা ভুলে গেল। আর ও বেরোতে পারল না। ডাকাতরা এসে তাকে মেরে ফেলল।”

“তার মানে ফার্ম ‘ভেস্তিনগাউজ’ আরব গল্পটিকে শেষ করেছে। আপনি যদি ম্যাজিক শব্দটি ভুলে যান, তবে ইলেকট্রিক সুইচটা টিপবেন, তাহলেই দরজা খুলে যাবে। এটা অবশ্য আপনি ভুলে যাবেন না। কোম্পানি আপনাকে যান্ত্রিক চাকরের ব্যাপারে পূর্ণ গ্যারান্টি দেবে। এর সমস্ত খরচই আমরা বহন করব। চাকরটা যদি না আপনাকে সন্তুষ্ট করে, আমরা একটা পয়সাও চাইব না। আমাদের কাছে অর্ডার নিতে রাজি আছেন কি?”

“এত তাড়াতাড়ি স্থির করতে পারছি না। আমার কাছে এটা একটা অভাবনীয় প্রস্তাব।”

“তাহলে আপনি আমাদের অন্তত কতকগুলি যান্ত্রিক চাকর দেখাতে আপত্তি করবেন না। এতে আপনার কোনও খরচ হবে না।”

“আমি ঠিক জানি না আপনাকে কী বলব…”

ব্যাপারটা যেন মিটে গেছে এমনভাবে মিচেল উঠে বিদায় নিয়ে বললেন— “কাল সকালে আপনার অনুমতি নিয়ে আপনার কাছে আসব।” কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করতে করতে বেঞ্চের নিচ থেকে বেরিয়ে এল।

যোহানের কষ্ট এখনও শেষ হল না। এই রাত্রিতে যোহান আর তার প্রভু খুব খারাপ ঘুমোলেন। মিচেলের প্রস্তাব খুবই আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু এডওইয়ার্ড গানে সব ধরনের নূতনত্বের বিরোধী ছিলেন। একাকিত্বের কল্পনাতে আরও ভয় পেলেন। তিনি অশান্তিতে ঘুম ভুলে গেলেন। তাঁর মনে হল, তিনি চাকর ব্যতীত একাই শুয়ে আছেন, মাকড়সা তাঁর মাথার ওপর পড়ছে, আর বিছানায় ইঁদুর দৌড়ে বেড়াচ্ছে। যোহান ভীষণ দুঃস্বপ্ন দেখতে লাগল। ডানদিকে ইলেকট্রিক ভেন্টিলেটরে ঠান্ডা বাতাস বইতে লাগল, তারপরে হঠাৎ কোথা থেকে একটা মেকানিক্যাল ঝ্যাঁটা বের হয়ে এল এবং তাকে ঘর থেকে বের করতে চাইল। যোহান ঝ্যাঁটাটা থেকে দৌড়ে সরে গেল, কিন্তু দরজাটা খুলতে পারল না এবং ভয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘চিচিং ফাঁক’।

সকালে ব্রেকফাস্টের পরে মিচেল কয়েকজন শ্রমিককে নিয়ে এল, তারা মেকানিক্যাল চাকরের বাক্সগুলি কাজ করবার জন্য নিয়ে এল।

মিচেল গানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি কি দয়া করে আপনার বাড়ির অবস্থানটা বুঝিয়ে দেবেন?”

গৃহকর্তা বললেন, “এই ড্রয়িংরুম থেকে দরজা গিয়েছে আমার শোবার ঘরে, পড়ার ঘরে এবং বাঁদিকে দুটো দরজা— একটা যোহানের ঘরে আর একটা বাথরুমে।”

“খুব ভালো। এই দরজা থেকেই আপনার বাড়ির ইলেক্ট্রিফিকেশন শুরু করব। সন্ধ্যার মধ্যেই সব তৈরি হয়ে যাবে।”

যখন শ্রমিকরা দরজা ধরে দেওয়ালে যন্ত্রগুলি বসাচ্ছিল মিচেল তখন অন্য যন্ত্রগুলি সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করলেন, “এই বাক্সটা ব্রাশসহ চাকার উপরে, ওর শেষে যান্ত্রিক ঝাঁটা আছে। আপনি এটাকে এইভাবে রাখুন তাহলে ঝাঁটাটা কাজ করার জন্য প্রস্তুত হবে। আপনি ওকে বলুন, ‘পরিষ্কার করো’।”

গানে উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন, কিন্তু ঝাঁটাটা নড়ল না।

“এরা শব্দটা নীচু হলে সাড়া দেয়”, মিচেল ব্যাখ্যা করলেন।

“আপনি কি একটু নীচু স্বরে বলতে পারেন না?”

“পরিষ্কার করো।”

“আরও নীচু স্বরে।”

“পরিষ্কার করো”— গানে খুব নীচু স্বরে বললেন আর ঝাঁটাটা কাজ করতে শুরু করল। বাক্সটার চাকাগুলি ঝাঁটাটার সঙ্গেই ঘুরতে লাগল। মাঠে যেমন ট্র্যাক্টর ঘোরে সেইভাবে বাক্সটা ঘুরতে ঘুরতে বড় ঘোরে ঢুকে সাবধানে সব বাধাগুলি অতিক্রম করে দেওয়াল পর্যন্ত গেল এবং নিজেই ঘুরে এসে অন্য দিকে গেল।

“ঝাঁটার নিচেই ভ্যাকুয়াম ক্লিনার আছে। এইভাবে সব ধুলো বাক্সের ভেতর জড়ো হয়, তারপরে ফেলে দেয়”— মিচেল ব্যাখ্যা করতে থাকলেন।

ঝাঁটাটা ঘরের অর্ধেকটা পরিষ্কার করেছে এমন সময়ে একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল। জিপসি ঘরে এসেই ঝাঁটাটাকে দেখতে পেয়ে ভীষণভাবে চেঁচাতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে ঝাঁটার চাকাগুলি অপ্রত্যাশিত দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে লাগল আর ঝাঁটাটা কুকুরের থেকে রক্ষা পাবার জন্য আটের আকৃতি এঁকে এঁকে কুকুরের পিছে পিছে ঘর পরিষ্কার করতে লাগল। যোহান এবং তার প্রভু ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঘুরন্ত যন্ত্রগুলির সঙ্গে ধাক্কার ভয়ে যেন চল্লিশ বছর বয়সী হয়ে গেলেন এবং তাড়াতাড়ি যান্ত্রিক শত্রু থেকে সরে যেতে লাগলেন। কয়েকবার ঝাঁটাটা তাঁদের উপর এসে পড়ল, কিন্তু তাঁরা বিখ্যাত ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কসের মতো লাফিয়ে রক্ষা পেলেন। একবার উল্টোদিকে ঘুরতে গিয়ে ঝাঁটাটা যোহানকে ধাক্কা দিলে যোহান পড়ে গেল। এইরকম অদ্ভুত অবস্থা থেকে ও মেঝে থেকে উঠে সোফার দিকে গেল, যেখানে তার প্রভু তখনও দাঁড়িয়েছিলেন। মিচেল হাত দোলাতে দোলাতে কুকুরের পেছনে দৌড়চ্ছিলেন এবং রেগে চিৎকার করছিলেন, “কুকুরটাকে সরিয়ে নিন, কুকুরটাকে সরিয়ে নিন।” এই অ্যাডভেঞ্চার যেমন অপ্রত্যাশিতভাবে শুরু হয়েছিল তেমনভাবেই শেষ হল। বৃত্তের আকৃতিতে ঝাঁটাটা ঘরের চারদিকে ঘুরে থেমে গেল।

মিচেল কপাল মুছে গানের দিকে ঘুরে বললেন, “আমার খুব খারাপ লাগছে। এইখানে সব ব্যাপারে কুকুরটাই দোষী। ঘটনা হল যে, ঝাঁটাটার কার্যপ্রণালী শব্দের দ্বারাই চালিত হয়, একথা আমি আগেই বলেছিলাম। কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক ছোট কাটাগুলিকে একটু জোরে ঘুরতে বাধ্য করে এবং এরজন্যই এইরকম অভাবনীয় ঘটনা ঘটে। কুকুরটাকে নিয়ে যেতে হবে, যাতে ঝাঁটার ব্যাপারে সংশোধন এখনই করতে পারি। ফিটার ঝাঁটার দিকে এগিয়ে গিয়ে বাক্সের দরজাটা খুলল, কিছুক্ষণ সেখানে কাজ করল, এবং ঝাঁটা আবার আগের মতোই কাজ করতে লাগল। যোহান জিপসিকে নিয়ে দূরের একটা ঘরে বন্ধ করে রাখল আর ঝাঁটাটা শান্তভাবে ঘরটা পরিষ্কার করে ফেলল।

মিচেল বলল, “দেখুন, এটা কেমন আরামদায়ক। আপনার বৃদ্ধ এবং বিশ্বস্ত যোহান যান্ত্রিক চাকরকে চালনা করবে এবং দীর্ঘদিন আপনার সেবা করতে পারবে।” ধূর্ত মিচেল যোহানকে শান্ত করবার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারলেন যাতে ও ওর প্রভুর প্রতি দুশ্চিন্তা না করে। খাটের এবং লেখার টেবিলের উপর গানেকে ইলেকট্রিক পাখা দেওয়া হল, যেগুলি একবার বলাতেই কাজ করতে লাগল।

সন্ধ্যার দিকে সব তৈরি হয়ে গেল। দরজাগুলো নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে যাবার ব্যাপারটাতে গানে এতই সন্তুষ্ট হলেন যে ঝাঁটা নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনাটা ভুলেই গেলেন।

“আপনার যান্ত্রিক চাকরের দিকে মন দিয়ে তাকাবেন”— বিদায় নেবার সময়ে মিচেল বললেন, “আপনি যখন নতুনত্বে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন তখন আপনি নিশ্চিন্ত হবেন যে, এগুলি আপনার জন্য অত্যাবশ্যক। আপনি আশ্চর্য হবেন যে, এগুলি ছাড়া আগে আপনি কীভাবে বেঁচেছেন! কয়েকদিন পরেই আমি আবার আসব।” দরজার কাছে গিয়ে কুকুরকে বাড়ি থেকে সরিয়ে নেবার প্রয়োজনীয়তা আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন। “শুধুমাত্র এইরকম পরিস্থিতিতে যন্ত্রগুলি ঠিক চলবে।”

নতুন যান্ত্রিক চাকরের অভাবনীয় সুবিধাতে গানের নতুনত্বের প্রতি বিরূপতা কমে গেল। মিচেল এবং শ্রমিকেরা চলে গেলে গানে পরীক্ষা করতে লাগলেন।

“পরিষ্কার করো”— তিনি ঝাঁটাকে আদেশ করলেন এবং ঝাঁটাটি নিখুঁতভাবে তার কাজ সম্পন্ন করল। বিছানার উপর রাখা ছোট প্রপেলারকে বললেন, “হাওয়া করো।” দরজাগুলি আর পাখাগুলি ঘরের ইলেকট্রিক কারেন্ট দ্বারা চালিত হয়ে ঘুমপাড়ানি মৃদু শব্দ করে তার বিশেষ কাজটি করে ফেলল। কিন্তু বিশেষত গানেকে আনন্দ দিল অন্য একটি ঘটনা। সন্ধের দিকে তিনি একঘর থেকে আর এক ঘরে গেলেন এবং বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “চিচিং ফাঁক”।

আর দরজাগুলি তাঁর কথা শুনে নিঃশব্দে খুলে গেল এবং তাঁর পিছনে বন্ধ হয়ে গেল।

“আরে এটা গল্পে যেরকম ঠিক সেরকমই ঘটছে”— গানে প্রশংসা করে বললেন, “মিচেল ঠকায়নি।” তুমি কীরকম ভাবছ যোহান?”

“হ্যাঁ, এটা খারাপ নয় মিস্টার গানে”, বৃদ্ধ যোহান আন্তরিকভাবে বলল। বাড়িতে যান্ত্রিক চাকরের উপস্থিতি সে ইতিমধ্যেই মেনে নিয়েছে। তাঁর কাজের সুবিধে হবে, কিন্তু তার নিজের কাজ থেকে সরে যেতে হবে না। কফি আনা আর হাতে তুলে দেওয়া এই কাজগুলি আর যাই হোক এরা করতে পারবে না। যোহান ভাবল এবং আনন্দিত হল এই ভেবে যে যান্ত্রিক চাকরগুলি সম্পূর্ণভাবে জীবন্ত চাকরের পরিপূরক হতে পারবে না। সে জানত না তার বিচার এখনও শেষ হয়নি। সন্ধ্যায় বিছানায় শুয়ে গানে ফ্যানগুলিকে আদেশ করলেন তাকে ঠান্ডা বাতাস দিতে এবং তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে বললেন, “এখন অন্তত মাকড়সা আমায় জ্বালাবে না।”

 

আগামী সংখ্যায় সমাপ্য

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1252 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...