মিতা সাঁতরা : যুদ্ধের বাজারে স্থিতধী কণ্ঠস্বর

মিতা সাঁতরা

আশীষ লাহিড়ী

 

একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই শুরু করা যাক। ২৬ শে ফেব্রুয়ারি সন্ধেয় আমার এক বন্ধু, যিনি হাওড়ায় থাকেন, আমাকে ফোন করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ, তাই তিনি সকাল থেকে বালাকোট এয়ারস্ট্রাইকের খবরটা শোনেননি, এই ঘটনার বিষয়ে তাঁর কাছে কোনও সংবাদ ছিল না। তিনি প্রথমবার বিকেলবেলা রাস্তায় বেরোন ওষুধ কেনবার জন্য। বেরিয়ে দেখেন যে লোকে প্রায় উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করছে। পরিচিত লোকজনের মুখে প্রথমবার খবরটা শোনেন তিনি। তাঁকে বলা হয়, এই যুদ্ধটা অনেকদিন আগেই শুরু করা উচিত ছিল, এইবার একটা বীরোচিত কাজ হয়েছে, লোকটার বুকের পাটা আছে, সে বাপের ব্যাটা ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার বন্ধু শুনেটুনে বড় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। প্রায় কথা-কাটাকাটি বেধে যায়। বন্ধুটি পরে আমাকে ফোনে বলছেন, আমরা কীই বা করতে পারি, বড়জোর একটা প্রবন্ধ লিখব, দুটো কবিতার কোটেশন দেব, নিজেদের মধ্যে নানা কথা বলব, রাগারাগি করব, কিন্তু একেবারে সামনে গিয়ে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, দরকার হলে একটু হাতাহাতি করার সাহসটা আমাদের নেই। আমরা সবাই ভদ্রলোক, এই ভদ্রলোকের জীবনটা যাপন করার লোভটা তো আমরা ছাড়তে পারব না৷ তাই এক অর্থে আমরা অসহায়। সত্যিই তাই! আমরা যারা যুক্তির দিক থেকে বিষয়গুলো বিচার করছি, তারা এইরকম সময়ে বেশ কিছুটা একা এবং বিচ্ছিন্ন। এখানে যুক্তি নিজেই অসহায়। কারণ শুধু যুক্তির ব্যাপার আর এটা নয়। আমরা এই মুহূর্তে যে কথাগুলো বলছি, বাইরের উন্মত্ত জনতার সামনে গিয়ে এই কথাগুলো বলতে পারব? আদৌ তাদের কানে ঢুকবে? আমার তো তাই মনে হয় এখন একটু শারীরিকভাবেই এই জিনিসগুলোকে প্রতিরোধ করা দরকার, অন্তত রাস্তায় নেমে একজোট হয়ে কিছু করা খুব প্রয়োজন। যুক্তিবাদীদের সংখ্যাটা যে নেহাত কম নয়, তার একটা সম্মিলিত প্রদর্শন করা কি যায় না?

যুক্তি বলছে, এই পুরো পরিস্থিতিটার দিকে তাকালে মনে হয় গোটাটাই যেন দারুণভাবে ছকে ফেলা। প্রত্যেকটা জিনিশ এত নিখুঁত, দুইয়ে দুইয়ে চারের মতো। পুলওয়ামায় এমন একটা ঘটনা ঘটবে, সারা দেশ শোক ও আবেগে ভাসবে। কয়েকটা দিন অপেক্ষা করব। ঠিক দশ বারোদিন পর সেটাকে কাউন্টার করে আরেকটা ঘটনা ঘটানো হবে৷ আজ দশ দিন পর ঠান্ডা মাথায় ঘটনাপরম্পরা দেখলে ও বিভিন্ন সূত্রের খবর মিলিয়ে পড়লে এটা বোঝা যায় যে পুলওয়ামার ঘটনাটার আভাস আগে থেকেই ছিল। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পর্যাপ্ত খবরও ছিল। পুলওয়ামাতেই দু’বছর আগে একইভাবে সিআরপিএফ কনভয়ের ওপর আক্রমণ ও হত্যার ইতিহাস ছিল। জওয়ানদের আকাশপথে স্থানান্তরিত করার অনুরোধও ছিল। তা সত্ত্বেও তাদের প্রায় যেন ধরে বেঁধে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া হল। তার মানে পঞ্চাশটি মানুষের প্রাণ নিয়ে ও কয়েক লক্ষ গ্যালন তেল পুড়িয়ে একটা ইলেকশন জেতা সুনিশ্চিত করা হল। এই কি তাহলে আমাদের গণতন্ত্রের আসল রূপ? যে গণতন্ত্র নিয়ে আমাদের এত গর্ব, তাকে তাহলে এত সহজে কিনে নেওয়া যায়? গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জেতার জন্য একটা দল, একটা পার্টির নেতা, একজন প্রধানমন্ত্রী তাঁর দেশের মানুষকে নিয়ে এমন একটা মারণখেলা খেলতে পারেন? অর্থমন্ত্রী পোঁ ধরে বলতে পারেন, আমেরিকা যদি ওসামাকে ‘খুঁচিয়ে’ বার করে আনতে পারে, আমরাই বা পারব না কেন? এই যদি গণতন্ত্র হয়, সে গণতন্ত্র থাকল কি গেল, তাতে সত্যিই কি আর খুব একটা কিছু এসে যায়?

আরও একটা ব্যাপার আমার আশ্চর্য লাগছে, যাঁরা ইন্টারনেটে বা অন্যান্য মাধ্যমে মোদি সরকারের স্ট্যান্ডটাকে সমর্থন করছেন, তাঁদের একটা অংশ বলার চেষ্টা করছেন যে দেখুন, যা ঘটছে সেগুলো তো আসল সমস্যা নয়। সবকিছুর মূল তো আসলে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা। দেশভাগের সময়ই যদি পাকিস্তানকে মুসলিম রাষ্ট্র ঘোষণা করার পাশাপাশি ভারতকে পুরোপুরি হিন্দু রাষ্ট্র করে দেওয়া হত, তাহলে আজ আর এই দিন দেখতে হত না। আর কোনও ঝঞ্ঝাট থাকত না। আজ এই ২০১৯ সালে দাঁড়িয়েও এরা যে এমন একটা যুক্তি দিতে পারছে, তা থেকে বোঝা যায় মানুষ সম্পর্কে এদের ধ্যানধারণা কতখানি নিম্নমানের! নিজেদের ধর্মীয় এজেন্ডায় গণতন্ত্রের মুখোশ পরিয়ে তা দিয়ে ক্ষমতা দখল— খুব সোজা এই হিসেব, একটু ভাবলেই বোঝা যায়। ধর্ম, গণতন্ত্র বা গণতন্ত্রের ভান, নির্বাচন আর ক্ষমতা— এই চারটে অক্ষের মধ্যেই পুরো জিনিসটা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ কী ভয়াবহ অবস্থা হল?

তথ্য বলছে, আদিল আহমদ দর নামক যে-কিশোরটি পুলওয়ামায় সিআরপি কনভয়ের ওপর আত্মঘাতী গাড়ি চালাল, তাকে নাকি কাশ্মিরের নিরাপত্তা কর্মীরা একদিন ইস্কুল থেকে ফেরার পথে ধরে মাটিতে আক্ষরিক অর্থে নাক খত দিতে বাধ্য করেছিল। এরকম ঘটনা কাশ্মিরের সাধারণ মানুষের ওপর এত বেশি ঘটছে যে আদিলের মতো অনেক অল্পবয়সী কাশ্মিরী সত্যি-সত্যিই ইসলামি সন্ত্রাসবাদীদের দলে নাম লেখাচ্ছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকরা এ নিয়ে অনেক দিন ধরেই অনেক তথ্য উদ্‌ঘাটন করে আসছেন, যদিও সেসব তথ্য বড় মিডিয়াতে আসে না। প্রশ্ন হচ্ছে, এগুলো নিয়ে কি আমাদের ‘সাধারণ মানুষের’ কোনও বক্তব্য নেই? কেবল যখন কোনও বড় ঘটনা ঘটবে, যখন বাবলু সাঁতরার মতো সাধারণ সেনারা বেঘোরে প্রাণ দেবেন, কেবল তখনই তাঁরা সক্রিয় হয়ে কাশ্মিরের বাইরের কাশ্মিরী ছাত্র আর শালওয়ালা আর ডাক্তার পিটিয়ে নিজেদের ‘দেশপ্রেমে’র পরিচয় দেবেন? আশ্চর্য, এইসব কাশ্মিরীরা কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে, ব্যাবসাবাণিজ্যে, পেশাদারি কাজে প্রতিনিয়ত প্রমাণ দিয়ে চলেছেন যে তাঁরা আর পাঁচজন ভারতীয়েরই মতো ভারত রাষ্ট্রের অঙ্গ, আর অ-কাশ্মিরী বীরপুরুষরা নিরাপদ দূরত্ব থেকে তাঁদের পিটিয়ে প্রমাণ করে চলেছেন যে কাশ্মিরীরা ভারতের অঙ্গ নন, কাশ্মিরী মাত্রেই ভারতের শত্রু, সুতরাং নিখরচায় পিটুনিই তাদের একমাত্র পাওনা। এমন অবলীলায় কতকগুলো নির্দোষ মানুষের ওপর অত্যাচার করবার প্রবৃত্তি আসে কোথা থেকে? এও কি সন্ত্রাসবাদ নয়? এঁরা কি বোঝেন না যে এর দ্বারা তাঁরাই কাশ্মিরীদের ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছেন? এবং এঁদের আশা, এতসব কাণ্ডর পরেও কাশ্মিরীদের দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে চলতে হবে। দেশ মানে কী? কেবল হিন্দি সিনেমা, টিভি আর ক্রিকেট? খেয়াল করব, এই তিনটেই ‘বিগ মানি’র সঙ্গে যুক্ত।

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসবাদের প্রত্যক্ষ শিকার বাবলু সাঁতরার স্ত্রী মিতা সাঁতরার প্রতিক্রিয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।  বাবলু সাঁতরাদের মর্মান্তিক মৃত্যুর বদলা হিসেবে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ নিয়ে চারপাশে সমস্ত দেশ যখন পাগলের মতো নাচছে, হইহই করছে (ঠিক ভারত ক্রিকেট খেলায় জিতলে যেমন হয়), তখন মিতা বলছেন— আমার কী এসে যায়? আমার কোনও উচ্ছ্বাস নেই। এরপরে উনি যে কথাটা বলেছেন, সেটা মারাত্মক। “মোদি যা ভালো বুঝেছেন, করেছেন, করবেন। কিন্তু কোনও উপযুক্ত সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াই ওরকম একটা “ঝরঝরে” (“ঝরঝরে”, ঠিক এই শব্দটা মিতা ব্যবহার করেছেন) বাসে করে জওয়ানদের ঐভাবে প্রায় ঠেলে দেওয়া হল কেন?” আশ্চর্য হয়ে দেখছি, যে-জওয়ান ক’দিন আগে এইভাবে মারা গেছেন, যাঁদের ‘শোকে’ সারা দেশ এই হইচইটা বাধাচ্ছে, তাঁরই স্ত্রী নিজে সম্পূর্ণ শান্ত, লেভেল-হেডেড, ব্যাপারটা তাঁর কাছে পরিষ্কার। সৈনিকদের যে কামানের বারুদ হিসেবে ব্যবহার করা হল, তা কিন্তু তিনি ধরে ফেলেছেন। এইরকম পরিস্থিতিতে ঠান্ডা মাথায় যুক্তিবোধ ও স্থৈর্যর পরিচয় দিয়ে ক’জন এইভাবে কথা বলতে পারে? সেলাম জানাই মিতা সাঁতরার স্থিতধী বাস্তববোধকে। অবাক হব না ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদী দেশপ্রেমিকরা যদি এই স্থিতধী মহিলার পতিপ্রেম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে পড়ে গেল আসানসোলের সেই ইমামসাহেবের কথা যিনি নিজের পুত্রশোকের সময়েও প্রতিশোধে উন্মত্ত জনতাকে নিরস্ত করেছিলেন। আমাদের দেশে যেখানে মানুষ খুব সহজে আবেগে ভেসে যায়, সেখানে এই ধরনের মানুষ যাঁরা ব্যক্তিগত শোককে ছাপিয়ে এমন অবস্থান নিতে পারেন, তাঁরাই আমাদের বড় ভরসার জায়গা। এঁদের কথা ভেবেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। এই দু-চারজন যে স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলতে পারছেন, আশার জায়গা এটাই।

এরকম নিশ্চয়ই আরও অনেকে আছেন। কিন্তু সংবাদমাধ্যম ও তাদের মগজধোলাই যন্ত্র দেশের সংখ্যাগুরু মানুষকে একেবারে হাতের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের যে প্রতিষ্ঠানবিরোধী একটা স্বাধীন চরিত্র ছিল সেটা প্রায় পুরোপুরি মুছে গেছে। টিভি খুললে কোথাও কোনও বিপরীত স্বর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে আরেকটা চিন্তার কারণ। এই জরুরি সময়ে মিডিয়ার এইভাবে বিক্রি হয়ে যাওয়ার অর্থ হল তথাকথিত দেশপ্রেম, ধর্ম, এবং মিডিয়া, সবাই সরাসরি একটা মুনাফা চক্রের সঙ্গে যুক্ত। আর যারা এই মুনাফা চক্রকে ব্যবহার করছে, তারা সবাই একটা বিরাট অর্থনৈতিক শোষণপ্রক্রিয়ার চূড়ায় বসে আছে। লুকোনো হিসেবগুলো একেবারে সামনে চলে এসেছে, খুব সহজ হয়ে যাচ্ছে। এত সহজই বা হয়ে গেল কেন? তাহলে আমাদের গণতন্ত্রের আর কী রইল, যে গণতন্ত্রের সম্পর্কে বলা হত যে এর অনেক ত্রুটি আছে, বেশ নড়বড়ে এই গণতন্ত্র, তবু একটা গণতান্ত্রিক কাঠামো তো আছে। সত্যিই কি আছে? এবার একটু পরিষ্কার করে বলা হোক না, আমাদের দেশ আর গণতান্ত্রিক নয়। গণতন্ত্র থাকলে তার স্বার্থে কি মিলিটারিকে এরকমভাবে নির্বাচনের স্বার্থে ব্যবহার করা যায়?

এই মুহূর্তে আরেকটা ভয়, এই উন্মত্ত পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা হবে না তো। অবশ্য এসবের মধ্যেও আশার দিক আছে। টিপু সুলতান মসজিদের সামনে দেখলাম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ রীতিমতো সভা করে সাম্প্রদায়িক ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানালেন। পাশাপাশি জানালেন, এই দেশের নাগরিক হিসেবে তাঁরা দরকারে দেশের জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। সম্ভবত, রাজ্যের শাসক দলের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হল সেই সভা। কিন্তু যার উদ্যোগেই হোক না কেন, এই মুহূর্তে একসাথে থাকার সংকল্পটা খুব জরুরি। কেউ যেন ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের হিন্দুমুসলমানের মধ্যে বিভেদ ঘটাতে সক্ষম না হয়। জানি না, হয়তো একটু বেশি ভয় পাচ্ছি৷ তবে যাদের হাতে এই মুহূর্তে দেশের ক্ষমতা, তারা আসন্ন ভোটের স্বার্থে এই ধরনের কোনও গোলমাল পাকাতে চেষ্টা করলে আশ্চর্য হব না।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1925 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...