ভিজে যাওয়া শব্দগুলো

মা - ভিজে যাওয়া শব্দগুলো

মোজাফ্‌ফর হোসেন

 

সেদিন পাড়াজুড়ে তুমুল বৃষ্টি। থেকে থেকে বজ্রপাত। অন্ধকার নামলেই আমরা শ্যাওলা পড়া পিচ্ছিল উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরে খেতে যেতাম। বৃষ্টিদিনে ছাতা ভাগাভাগি করে যেতে হত। কিংবা কারও ওপর দায়িত্ব পড়ত একলা মাঝির মতো একে একে সবাইকে রান্নাঘরে আনার ও আবার রান্নাঘর থেকে শোবার ঘরে রেখে আসার। সেদিন দায়িত্বটা আমার ওপরেই পড়ল। আমি একজন একজন করে রেখে আসছিলাম আর একজন একজন করে নিয়ে আসছিলাম। একধরনের অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছিল। অন্যসব দিন এই দায়িত্বটা এড়ানোর জন্য সকলেই নানান টালবাহানা করে। আমিও করি। আজ যেচে দায়িত্বটা নিয়েছি ভেবে নিজেকেই নিজে ধন্যবাদ দিলাম। সেদিন ঐ ছাতা হাতে মনে হল, আমারও কিছু দায়িত্ব আছে। আমিও কিছু করবার জন্য জন্মেছি। তারপর বহুদিন আর এমনটি মনে হয়নি।

একদিকে মা সবাইকে বেড়ে বেড়ে খাওয়াচ্ছে আর অন্যদিকে আমি চারণের মতো পারাপারের জন্য অপেক্ষা করছি। অপেক্ষা করতে ভালো লাগছে। কারও আসতে দেরি হলে, কিংবা যেতে দেরি হলে আমি ছাতাটা কিঞ্চিৎ সরিয়ে বৃষ্টির ছাটে চোখের পাতাজাড়া ভিজিয়ে বৃষ্টির খসে-পড়া অনুভব করবার চেষ্টা করি। আকাশটা জুড়ে অন্ধকার, একটা খাদের ভেতর পড়ে গেছে যেন সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্র। পৃথিবীটা পড়েছে সবার নিচে— একটা গজব। এই গজবের ভেতর সবাই কেমন নির্বিঘ্নে খাচ্ছে! ওরা কেউ দায়ী নয় এই গজবের জন্য। মা বলছিল— পৃথিবীতে পাপীদের জন্য গজব নামে, আর সেই গজব শুধু টের পায় পাপীরা, মাঝে মাঝে সকলে। আজ কেবল টের পাচ্ছি আমিই। নিজের পাপগুলো একটা একটা করে স্মরণ করবার চেষ্টা করি। একদিন টাকা গুনতে গুনতে মার পাঁচশো টাকার একটা নোট নেই করে দিয়েছিলাম। এত টাকা কী করব বুঝে উঠতে না পেরে আবার একদিন টাকা গণনার সময় মার টাকার ভেতর সেঁধিয়ে দিয়েছিলাম। মা বকা দিয়ে বলেছিল— তোকে গুনতে দিলে হয় বাড়ে না-হলে কমে, ঠিক হয় না কখনও। এই স্বেচ্ছায় ভুল করাটা ছিল আমার অপরাধ। লুকিয়ে লুকিয়ে একবার এক মেয়েকে ন্যাংটো দেখেছিলাম। ন্যাংটো দেখাটা হয়তো অপরাধ না, কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে দেখাটা নিশ্চয় অপরাধ। তার ওপর আবার সম্পর্কে চাচী। আর একবার মসজিদে ঢুকে নামাজ না পড়েই বেরিয়ে এসেছিলাম। নামাজ না পড়াটা কতটা পাপ আমি জানি না; অনেকেই তো নামাজ পড়ে না। কিন্তু কেউ মসজিদে ঢুকে নামাজ না পড়ে বেরিয়ে এসেছে এমনটি শুনিনি, এতে নিশ্চয় অনেক পাপ হয়। গজবের হেতু হিসেবে সর্বসাকুল্যে আমার কিছু পাপ বের করে আরাম পাই। এই ভেবে যে, আমার মতো অতি নগণ্য একজনেরও হিসাব জমা হচ্ছে কোথাও। আমার পাপের জেরে এতবড় একটা আয়োজনও হয়ে যায়!

সবশেষে খেতে বসলাম আমি আর মা। সচরাচর এমনটি হয় না। আমি সবার আগে খেয়ে পড়ার ঘরে চলে যাই, মা খান সবার পরে। আর সকালে-দুপুরে মা কখন খান, আদৌ খান কিনা তার হিসেব আমি দিতে পারব না। এতটা বছরে মাকে কবে কখন খেতে দেখেছি মনে পড়ে না। দেখলেও হয়তো খেয়াল করিনি। আজ করলাম। মা খেলেন, আর পাঁচটা কাজ করার মতো বেশ গুরুত্ব দিয়েই। একজন মানুষের কাছে সব কাজ এত গুরুত্ব পায় কী করে আমি ভেবে পাই না। আমার সব কাজে দুম করে করে-ফেলার মতো একটা ব্যাপার থাকে। খাওয়া শেষ হলে মা বলল— ঘরে যা। আজ আর বৃষ্টি কমবে না। হারকেনটা টিপ দি শুয়ি পড়গে। আমাদের গাঁয়ে তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। আসি আসি করছে। রাস্তায় খানিক পরপর থাম পোঁতা হয়েছে। আমরা প্রতিটা থামের কাছে দাঁড়াই আর বিদ্যুৎ আসছে ভেবে শিহরিত হই। আমি শহরে এক বাড়িতে কোনও একদিন কালো ডিম্বাকৃতির সুইস টিপেছিলাম— কটাশ কটাশ শব্দ হয়েছিল— থামের কাছে দাঁড়ালে সেই শব্দটা কানে এসে বাড়ি মারে। সাহস করে আমাদের কেউ কেউ থামে চড়ে বসে। কাছ থেকে দাঁড়িয়ে আমি দেখি। সাহস হয় না ছুঁয়ে দেখতে— দপ করে যদি বিদ্যুৎ চলে আসে। যারা ওঠে বিদ্যুৎ সম্পর্কে জানে না বলেই সাহস পায়। আমি কিঞ্চিৎ জানি এবং সেটা ওদের জানালে ওরাও ভয় পেতে শুরু করে। ভয় থেকে শিহরিত হতে থাকে সকলেই। সে সব কথা আজ থাক। আমি মাকে বললাম— আমি নিচে ঘুমাই? রাতে শব্দ করে আকাশে বিদ্যুৎ ফুটলে খুব ভয় করত। মা আর না করেনি। আমাদের খাওয়া শেষ করে মার আরও ঘণ্টা দুয়েক লাগল বিছানায় যেতে। বাসন-কোসন মাজামাজি, রান্নাঘর ঝাড়ু দেওয়া, উপরি খাবার সিঁকিতে ঝোলানো— কাজের কি আর শেষ আছে! আমি আর বাড়ির কুকুরটা চারিদিক থেকে উদোম ঢেঁকি ঘরের নিচে বসে বসে মার কাজ গোছানো দেখছিলাম। কুকুরটা এ বাড়িতে বহুদিন থেকে আছে। বাড়ির অনেক ঘটনার সাক্ষী সে। বাড়ির কেউ যে তাকে খুব পছন্দ করে তা না। বাবা হাতের কাছে ইট-পাটকেল যা পান তা দিয়ে ছুঁড়ে মারেন। কুকুরের দোষে নয়, ছুঁড়ে মারাটা বাবার অভ্যেস। অজুহাত হিসেবে বলেন, বাড়িতে কুকুর থাকলে ফেরেশতা আসতে পারবে না। ফেরেশতাদের কুকুরে কেন এলার্জি সে প্রশ্ন করেছিলাম বলে বাবা আমাকে কুকুরের সামনে দাঁড় করিয়ে কান ধরিয়ে উঠবোস করিয়েছিলেন। এমন সরল প্রশ্নের এমন ত্যাড়া উত্তরে বুঝে গেছি, এর উত্তর বাবাও ঠিকঠাক জানেন না। একমাত্র মা-ই কুকুরটার দেখভাল করে, কুকুরটাও যতটা পারে মাকে সাহায্য করে। চুলা পাহারা দেয়, রান্নাঘর পাহারা দেয়। কেউ না থাকলে মার সঙ্গে কথা বলে।

বৃষ্টি কিছুটা কমলে আমি আর কুকুরটা মার পাশে গিয়ে দাঁড়াই।

তুই আবার ভিজতি আলি কেনে? যা, গুলাঘরের নিচে যা। আমি না-হয় ঘরে গি শুকনু কাপুড় পরবু; তুই কি পরবি? মা থাল মাজতে মাজতে কুকুরটাকে বলে। কুকুরটা অমনি উল্টোদিকে গোলার নিচে শরীর চুবিয়ে বসে। এশার আযান শেষ হয়। মা আমাকে বলে, যা তোর বাবার সাথে নামাজটা পড়ি আয়। না হলি আবার ঘরে এসি চিল্লাবে। আমি কোনও কথা না বাড়িয়ে মসজিদের দিকে পা বাড়াই। জানি নামাজের বিষয়ে আপত্তি তুললে নিজেরই ক্ষতি। আল্লাহ গোসসা তো দুনিয়া গোসসা। আর তাছাড়া আমাকে যে ফলো করা হচ্ছে তা তো আজ হাতেনাতে টের পেয়েছি। ছাতাটা হাতে নিয়ে বাবার পেছন পেছন হাঁটা দিই। গোঁড়ালির ওপর পর্যন্ত ডুবে যায় কাঁদায়। কোনও রকম আঙুল টিপে টিপে মসজিদে হাজির হই। কুয়ো থেকে পানি তুলে হাঁটু অবধি ধুয়ে নিই। মসজিদের ভেতর চার কোণায় চারটি হারিকেন জ্বলছে। ছায়ার মতো মানুষগুলো বসে আছে। হালকা বাতাসে ছায়াগুলো দুলছে। মানুষগুলো থির গাছের মতো। জামাতে দাঁড়াতে তখনও মিনিট পাঁচেক বাকি। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেবুগাছ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টিপড়া দেখি। অন্যসব দিন লেবুগাছ জুড়ে থাকে জোনাকির দল। ওরা সব ফিসফাস করে মিটিং করে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের সব কথা শুনি। ওরা লেজের আলো দিয়ে আমাকে ইশারা করে কাউকে কিছু না বলতে। আমিও বলি না। আজও কথার বরখেলাপ করব না। আজ ওদের হটিয়ে বৃষ্টি এসে জায়গা দখল করেছে। বৃষ্টিরাও একটা কথা বলছে আর টুপ করে ঝরে পড়ছে। ঝরে পড়ার আগ মুহূর্তে আমাকে ইশারা করে যাচ্ছে ওদের কথা বলার বিষয়ে কাউকে কিছু না বলতে। আমি ভেঙচি কেটে বলছি, বলে দেব! ওরা আর কিছু বলার আগেই মাটিতে পড়ে মিশে যাচ্ছে জলে-মাটিতে। আকামতের শব্দ শুনে লাইনে দাঁড়াই। ইমাম সুরা ফাতিহা শুরু করে আর আমি সঙ্গে সঙ্গে বাংলা তর্জমা করা শুরু করি— মনে মনে। কিছুদিন আগেই বাংলাটা মুখস্থ করেছি। বাংলায় পড়লে কী এমন ক্ষতি হয়? হুজুরের কাছে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম। হুজুর বলেছিলেন, আরবি নবীজীর ভাষা। আর নবীজীর ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তুললে আল্লাহ পাপ দেবে। এখুনি তিন তওবা করো। আচ্ছা তওবার বাংলা কি? আমি আবারও জিজ্ঞাসা করি। হুজুর বিরক্ত হয়ে উঠে যান। আমি তওবা করার কথা ভুলে যাই। তার মানে সেদিনও পাপ করেছিলাম। আরও একটা পাপ যোগ হয় হিসাবের খাতায়। এক রাকাত নামাজ শেষ করতেই মনে পড়ে যায়, আমার তো ওজুই করা হয়নি! তার মানে, এত কষ্ট করে যে নামাজ পড়তে এলাম, সব কষ্ট জলে গেল! তারপর পুরো নামাজজুড়ে সুরা বাদ দিয়ে খালি আল্লাহকে বলেছি— আজকের মতো ওজুবিহীন নামাজ কবুল করে নাও প্লিজ! আর কোনওদিন এ ভুল হবে না। এই কান ধরছি। তারপর রুকু করার সময় হাত তোলার ছলে কানদুটো একবার ছুঁয়ে আসি। নামাজ শেষ হলে হুজুর মোনাজাত ধরেন করুণকণ্ঠে। বাইরে তখনও মৃদুমন্দ বৃষ্টির শব্দ। কেঁপে কেঁপে উঠছে হারিকেনের আলো। তখনই দূর থেকে ভেসে আসে মজ্জেলের বাঁশির সুর। বাঁশি বাজানোর আর সময় পেল না, বলেই মোনাজাতের মধ্যেই রাগ দেখান বাবা। আমি হাতদুটো জড়ো করে মজ্জেলের বাঁশি আর হুজুরের কণ্ঠ মেলাতে চেষ্টা করি, কী অনায়াসে মিলেও যায়!

মোনাজাত শেষ হলে বাবার পেছন পেছন উঠে আসি। মসজিদে যাতায়াতের বাইরে বাবার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। কোনওদিনই ছিল না। ঘরে উঠে এক বিছানায় দুদিকে মুখ করে দুপ্রান্তে শুয়ে পড়ি আমি আর বাবা। বাবা কানের কাছে তার সন্তোষ রেডিওখানা ছেড়ে দেন। এটা তার কততম রেডিও তা তিনি নিজেও জানেন না। একটু শঁ শঁ করলেই ছুড়ে মারেন বাঁশবাগানে। বাঁশের কঞ্চিতে বেঁধে শঁ শঁ শব্দ আরও বেড়ে যায়। এক সপ্তাহের মধ্যে ভারতের বর্ডার ঘুরে নতুন রেডিও ঘরে ওঠে। আর আমরা তখন পুরোনো রেডিওটা নামিয়ে ভালো থাকলে পাড়ার কাউকে দিয়ে দিই, না হলে খুলে কঙ্কাল ঘেঁটে দেখি। নাটক হচ্ছে বেতারে। মা তখন নামাজ শেষ করে কুরআন শরিফ নিয়ে বসে। মজ্জেলের বাঁশির শব্দে দেয়ালে হারিকেনের আলোয় মার ছায়া দোলে কুরআন শরিফ সামনে পেতে। ঘুম কখন চলে আসে টের পাই না।

কী যেন একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। চোখের পাতা জোড়া হালকা আলাদা করতেই যা দেখলাম তাতে না পারি চোখ বন্ধ করতে না পারি খোলা রাখতে! বাবার হাতে হুড়কো, হুড়কোর অন্যপ্রান্ত ধরে না-মারার জন্য আকুতি মিনতি করছে মা। উঠোনে গোলাঘরের টিনের চালে তালগাছ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ার শব্দ আসে— ঘড়ির কাঁটার মতো মেপে। আমি পাশেই ঘটে যাওয়া দৃশ্যে মনোযোগ দিতে চাই আর বৃষ্টি পতনের শব্দ এসে আমার চিন্তায় বাড়ি মারে। এখনও নীরব রাতে বৃষ্টিপতনের শব্দ শুনলে দৃশ্যটি সিনেমার ফ্লাশব্যাকের মতো স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। আমি বোকার মতো বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখি দেয়ালে সেটে থাকা বাবা-মায়ের ছায়ার শরীরে। মা বুকের উপর থেকে শাড়ি সরিয়ে পা-দুটো উপরে তুলে ধরে, বাবা হাত থেকে হুড়কোটা নামিয়ে উপরে চেপে বসে। ছায়ার ভেতর জমাট বেঁধে যায় দুজনে। সম্পর্ককে তখন বেজায় ভারী মনে হয়। মার কথা মনে হয়, বাবার কথা মনে হয়। আর একটা শূন্যতার কথা মনে হয়। কিছু কিছু শব্দের কথা মনে হয়।

 

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1180 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

5 Comments

  1. পুরো গল্পটা জুড়েই বৃষ্টির জলের লেবুপাতার গা বেয়ে টুপটাপ ঝড়ে পড়ার শব্দ।

    • ধন্যবাদ শ্রদ্ধেয় দাদা। আপনার ব্যক্তিহত্যার সপক্ষে পড়া শেষ হলো। খুব ভাল লাগলো। পাঠের অনুভূতি লেখার ইচ্ছা আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*