যোগমায়া হালদার অন্তর্ধান রহস্য

যোগমায়া হালদার

কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়

 

যোগমায়া হালদার স্ট্রোকে মরতে পারেন, একাকিত্বের জ্বালা সইতে না পেরে গলায় দড়ি দিতে পারেন, ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলে কবিতা লিখতে শুরু করতে পারেন, এমনকি প্রেমেও পড়তে পারেন, এও লোকে কষ্টমষ্ট করে বিশ্বাস করতে পারত, কিন্তু যোগমায়া হালদার যে হারিয়ে যেতে পারেন এটা তাঁকে যারা চিনত, মরে গেলেও কল্পনা করতে পারত না।

কিন্তু বাস্তব ইজ মোর অবিশ্বাস্য দ্যান কল্পনা।

যোগমায়া হালদার কী করে হারিয়ে গেলেন সেই নিয়ে আজকের গল্প। কাজেই গল্পের শুরুও সেই মুহূর্ত থেকে হওয়া উচিত যে মুহূর্ত থেকে যোগমায়া হালদারের হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটা শুরু হল।

যে মুহূর্তে অসিত, অসিত সরকার, শহরের ‘সরণি সংরক্ষণ ও সংযোজন’ বিভাগের জুনিয়র অফিসার, সিটে বসে বসেই ষাঁড়ের মতো, ‘যোগমায়াদি!’ ‘যোগমায়াদি!’ চিৎকার শুরু করল।

না চেঁচিয়ে নিজের সিট ছেড়ে যোগমায়ার সিটের কাছে এসেও দরকারটা জানাতে পারত, জানাল না দুটো কারণে। এক, অসিতেরমাথা গরম ছিল। দুই, সরকারি অফিসে দরকার যারই থাকুক না কেন, কে সিটে বসে ডাকবে আর কে ডাক শুনে সিট পর্যন্ত উঠে যাবে তার সুস্পষ্ট নিয়ম আছে। আর অসিত নিয়মভাঙা টাইপ এ ওর অতি বড় শত্রুতেও দাবি করবে না।

চিৎকার শুনে তাড়াতাড়ি চেয়ার ঠেলে উঠতে গিয়ে পায়ায় শাড়ির পাড় আটকে গিয়ে হোঁচট খেলেন যোগমায়া। হাঁটু খিঁচ করে উঠল। এই রকম বাধা পড়ায় অনেকেই হয়তো সতর্ক হত কিন্তু যোগমায়া হালদার সংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন না বলে ব্যাপারটা তাঁকে ভাবাল না।

‘যোগমায়াদি!’ আবার চেঁচাল অসিত। এবার গলায় বেশ খানিকটা ঝাঁজ।

যোগমায়া ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সারি সারি ফাঁকা চেয়ারের সামনে কম্পিউটারের স্ক্রিন অন্ধকার। এ বার ভাইফোঁটা পড়েছে বৃহস্পতিবার। সবাই একেবারে সোমবার আসবে। অসিতকে আসতে হয়েছে কারণ সামার ভেকেশনে গুরদুংমার লেক করতে গিয়ে ছুটি শেষ। মাথাগরমের সেটা একটা কারণ। যোগমায়া অবশ্য যথেষ্ট ছুটি থাকা সত্ত্বেও এসেছেন। না এসেই বা কী করবেন। ছুটির মায়া যোগমায়ার কেটে গেছে। একসময় ছিল। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ছুটির সার্কুলারের ওপর ঝুঁকে পড়ে গুনতেন এ বছর কটা দীর্ঘ উইকেন্ড। কিংবা মঙ্গল, বৃহস্পতি ছুটি। এদিকে শুক্র কিংবা ওদিকে সোম গুঁজে চট করে কোথাও ঘুরে আসা যাবে। সিমলা কুলু মানালি অনেক দূর, গুরুদংমারের নামই শোনেননি যোগমায়া, এই বক্রেশ্বর, তারাপীঠ, কংকালীতলা। নয়তো মাকে নিয়ে তারকেশ্বরে টুনুমাসির বাড়ি। একবার মায়াপুর যাওয়া হয়েছিল। নাটমন্দিরে ন্যাড়া মাথায় টিকি দুলিয়ে সে কী নাচ।

ফিরে এসে কয়েকদিন ‘হরেকৃষ্ণ’ ‘হরেকৃষ্ণ’ বলে মাকে ঘুম থেকে তুলতেন যোগমায়া। মায়ের খয়েরছোপ হাসিটা মনে পড়ে এখনও।

এখন ফাঁকা বাড়িতে শনিরবিগুলোই ফুরোতে চায় না। শুক্র জুড়ে তিনটে দিন হাতপা কোলে করে বসে থাকলে পাগল হওয়ার জোগাড় হবে। অফিসে চলে আসাই ভালো।

‘দৌলতায়েব লেনটা কোন চুলোয়?’  স্ক্রিনে মেলা ম্যাপের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বলল অসিত। ‘পিন কোড তো নর্থেরই মনে হচ্ছে। দেখতে তো পাচ্ছি না।’

দৌলতায়েব লেন।

যোগমায়ার মাথার ভেতর নিউরনেরা জেগে ওঠে। চিড়িক চিড়িক করে আলো দৌড়য় এক শুঁড় থেকে আরেক শুঁড়। একটা পাখি চোখ মেলে। প্রকাণ্ড ডানা মেলে উড়ান নেয়। কম্পাসের কাঁটা কাঁপে থরথর। পাখি বাঁক নেয়। কুচকুচে কালো শরীরে দুটো সাদা মণি। তার প্রখর দৃষ্টির নিচে দ্রুতবেগে জুড়ে জুড়ে যায় রাস্তা, অলিগলি, লেন, বাইলেন, নীল রঙের চৌকো ডোবা, উঁহু, ওটা এইটটি নাইনের এডিশন, এখন ওখানে পাঁচতলা সুপারমার্কেট, দীননাথ ইন্সটিটিউশনের বিল্ডিং, সারি সারি জানালা… পাখি ডানা ঝাপটায়, আরও ওপরে ওঠে… শনিমন্দির, মন্দির থেকে এগিয়ে ডান… না ডান নয় বাঁ, বাঁ… বাঁয়ে ঘুরে সোজা।

নীল আলো এখন স্থির, উজ্জ্বল। পাখি ডানা মুড়ে মাথা গুঁজে শুয়েছে আবার। যোগমায়া এগিয়ে গিয়ে অসিতের মনিটরের একটা বিন্দুতে আঙুল রাখেন। অসিত নাক কুঁচকে মাথা প্রায় ঠেকিয়ে দেয়।

‘শালা, এই এক মিলিমিটার রাস্তায় হাঁটে কে যে নাম বদলাতে হবে? যত্তসব।’  কি-বোর্ড টেনে নিয়ে টাইপ করতে শুরু করে অসিত। যোগমায়া পেছন ফিরে নিজের টেবিলের দিকে রওনা দেন।

রাস্তা চেনায় তাঁর প্রতিভা প্রথম কবে আবিষ্কার হল মনে করতে পারেন না যোগমায়া। স্কুলকলেজের বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা গেলে, ঠাকুর দেখতে বেরোলে সবসময়েই বন্ধুরা তাঁর ওপর ভরসা করত। ‘জগা, কোনদিকে যাব?’ যে কোনও রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে যোগমায়া পাখি হয়ে যেতেন। অনেক ওপর থেকে দেখতে পেতেন গলিটার অভিমুখ। কোথায় কোন পুকুরের পাশ দিয়ে টুক করে বাঁক নিয়ে, বাড়ির পেছন দিয়ে চট করে গলে, পানের দোকানের পাশ দিয়ে বাসরাস্তায় নাক বার করেছে, সব ছবির মতো ফুটে উঠত। প্রথম কবে ফুটে উঠেছিল মনে নেই। সম্ভবত টুনুমাসির বাড়িতে বেড়াতে গিয়েই। চড়কের মেলা হত মাসির বাড়ির পাশের গ্রামে। মেলা থেকে ফেরার পথে মাসতুতো দাদার পাকামিতে জঙ্গল দিয়ে শর্টকাট করতে গিয়ে পথ হারাল। দাদার সাইকেলের সামনের রডে পা ঝুলিয়ে বসে ছিলেন যোগমায়া, আটও পেরোননি তখন। পেছনের ক্যারিয়ারে দশ বছর বয়সের মামাতো দিদি। ‘ঘাবড়াস না, আমি আছি তো’, বলতে বলতে যখন দাদার ভুরুতে ঘাম, দিদি ভ্যাঁ জোড়ে জোড়ে, অনুভূতিটা হয়েছিল প্রথম। দাদার কনফিডেন্স তখন তলানিতে, না হলে তিনি পুঁচকে বোনের কথায় অত দ্রুত কান দিতেন না। বোনের অবদানের কথা অবশ্য তিনি চেপে যাননি। বাড়ি ফিরে বলেছিলেন, ‘“তারপর তো জগা বলল, দাদা এই রাস্তাটা চেষ্টা করে দেখ, গেলেও যেতে পারে।”’

যোগমায়ার অবশ্য বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না যে পাওয়া যাবেই। আগের দিন বিকেলে বাজারের ভেতর দিয়ে রিকশা করে যেতে যেতে মেসো দেখিয়েছিলেন। মোড়ের মাথার হলদে দোতলা বাড়ির ওপর নীল সাদা বোর্ডে লেখা স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া। ‘ওটা আমার অফিস। গায়ের গলিটা দিয়ে পনেরো মিনিট সোজা গেলে জঙ্গল, জঙ্গলের ওপারে মেলার মাঠ। চড়কের সময় আসিস, নিয়ে যাব মেলায়।’

জঙ্গলের ভেতর সাইকেলে চড়ে ঘুরতে ঘুরতে দুটো বুড়ো বটগাছের পাশে এসে যোগমায়ার মাথার ভেতর চিড়িক চিড়িক হয়েছিল সেই প্রথম। সেই প্রথম মাথার ভেতর জ্যান্ত একটা কিছুর উপস্থিতি টের পেয়েছিলেন যোগমায়া। তিনি যেন আর মানুষ নন, একটা প্রকাণ্ড পাখি। চার ফুটের শরীরটা ছেড়ে ভাসতে ভাসতে ক্রমশ ওপরে উঠে যাচ্ছেন আর স্পষ্ট দেখছেন দুই গাছের মধ্যের ফোকরটা ঘুরতে ঘুরতে এঁকেবেঁকে, সরু থেকে মোটা হয়ে মেসোর অফিসের পাশের গলিটা দিয়ে বড়রাস্তায় পড়ছে।

তারপর চাকরি হল এই অফিসে। বেড়ালের নখে ধার দেওয়ার জন্য গাছের গুঁড়ির মতো, যোগমায়ার প্রতিভায় শান দেওয়ার জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেল গোটা শহর। জয়েন করে প্রথম দিন সিঁড়ির মাথায় টাঙানো দশ বাই বারো ফুট ম্যাপটার দিকে তাকালেন যোগমায়া; শহরের প্রতিটি গলি, হাসপাতাল, পুকুর, বন্ধ কারখানার দেওয়াল, মাথার ভেতর উঠে এল।

ক্রমে শহর অক্টোপাসের মতো শুঁড় ছড়াল। গ্রাস করল জলাজমি, বাঁশবন। ভাগ্যবান শহরতলির গায়ে চড়ল শহুরে পিনকোডের চকচকে জামা। রাস্তা নাম বদলাল। পুরোনো বস্তি ভেঙে চলে গেল মেট্রো লাইন। নদীর গলা টিপে গজাল নতুন বস্তি। পুকুর বুজিয়ে উঠল শপিং মল। যোগমায়া ডানা মেলে উড়তে লাগলেন নতুন শহরের নতুন অলিগলির ওপর।

গৌরাঙ্গদা বলতেন, ‘এ জিনিস পইড়্যালিইখ্যা হয় না। লইয়া জন্মাইতে হয়। আওয়ার যুগমায়া ইজ আ জিনিয়াস।’

অনেক প্রতিভাধরের মতো যোগমায়াও তাঁর এই প্রতিভাটিকে প্রতিভা বলে স্বীকার করতে যে শুধু অরাজি ছিলেন না তাই নয়, যত সময় যাচ্ছিল প্রতিভাটির প্রতি তাঁর একধরনের ক্ষোভ জন্মাচ্ছিল। এখন তাঁর সকালসন্ধে ঝিমুনি ভাঙিয়ে কারও সামনে রুটিতরকারির থালা ধরে দেওয়ার নেই, ঘণ্টা মেপে রাংতা ছিঁড়ে হাতের তেলোয় ট্যাবলেট ঢেলে দেওয়া নেই, দেখতে গেলে বাড়ি ফেরার কোনও দরকারই নেই যোগমায়ার, কিন্তু পালানোর রাস্তাও যে নেই। গোটা শহরে এমন একটা রাস্তাও নেই যা যোগমায়াকে নতুন কোনও গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। যে বাঁকই ঘোরেন না কেন সবই চেনা, যে রাস্তাই ধরুন না কেন সব রাস্তাই কড়া পাহারায় তাঁকে পৌঁছে দেয় হয় রংচটা ভাড়াবাড়ির দোরগোড়ায় নয় অফিসের গেটের সামনে।

চেনা রাস্তায় হারায় কী করে মানুষ?

অফিসে যোগমায়ার পদোন্নতি হল না কারণ যোগ্যতা ছিল না। ডিপার্টমেন্ট ডিজিটাল হয়ে গেল। যোগমায়া কম্পিউটারে সড়গড় হতে পারলেন না কিছুতেই, সাহস হল না। বাসি কাগজপত্র, অ্যানালগ মানচিত্রের ঢিপি অবশ্য ফেলে দেওয়া গেল না। সেই মর্মে কোনও সার্কুলার এল না। সবুজ রং করা সারি সারি গোদরেজ আলমারি, ফাইলিং ক্যাবিনেট, চালান করা হল কোণের একখানা বাড়তি ঘরে। যোগমায়ার চেয়ারটেবিলও গেল। যোগমায়া হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। কম্পিউটার থেকে যত দূরে যাওয়া যায়। পুরনো কাগজ আর ন্যাপথলিনের গন্ধওয়ালা ঘরে তাঁর আরাম হত।

গুরুত্ব কমল, কিন্তু অফিসে যোগমায়া একেবারে বাতিল হলেন না। টেবিলে টেবিলে ফাইল নিয়ে যাওয়ার লোক লাগেই। তাছাড়া রাস্তা চেনার প্রতিভাও যোগমায়ার কার্যকারিতা বজায় রাখল। ইন্টারনেট সর্বশক্তিমান, কিন্তু সার্ভার ডাউন থাকলে, যা মাঝেমাঝেই থাকে, মৃত সৈনিকের থেকেও অকেজো। তাছাড়া এ শহরে এখনও এমন অনেক গলি রয়ে গেছে যারা স্যাটেলাইটের থাবার বাইরে কিন্তু যোগমায়ার নখের আয়নার বাইরে নয়। এই যেমন দৌলতায়েব লেন। এই সব বিরল অলিগলিরাও যোগমায়াকে বাতিল হয়ে দিল না।

যোগমায়া ঘরে ফিরে এলেন। পুবদিকের দেওয়ালের পাশের বড় ক্যাবিনেটটার তৃতীয় তাকে ডি দিয়ে রাস্তার নামের কার্ডগুলো রাখা। দৌলতায়েব লেনের নাম বদলে দণ্ডকারণ্য সরণি করার সার্কুলার এসেছে। অসিতরা কম্পিউটারে নাম বদল করবে, তিনি ইনডেক্স কার্ডে বদল করবেন। হাতে লিখে। বেশ কয়েকবছর ধরে এটা করে আসছেন যোগমায়া। কার্ডে রাস্তার নাম পাল্টানো, পুরনো পিনকোড কেটে নতুন পিনকোড লেখা ইত্যাদি। কাজটা তাঁকে কেউ করতে বলেনি। বারণও করেনি। গোড়ার দিকে নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে করতে ভয় হত, কিন্তু যোগমায়া খুঁজে দেখেছেন, হাতে লিখে কার্ড আপডেট করা যাবে না মর্মে কোনও সার্কুলার আসেনি। কাজেই যোগমায়া কাজটা চালিয়ে গেছেন। যদি কোনওদিন দুম করে সব সার্ভার চিরকালের মতো ডাউন হয়ে যায়, কাজে লাগবে।

ডি লেবেল সাঁটা ড্রয়ারের জং ধরা হাতল ধরে টান মারলেন যোগমায়া। বেরিয়ে এল, পুরোটা না, আটকাল কিছুতে। আবার টানলেন যোগমায়া। আবার আটকাল। হাল ছেড়ে কার্ডগুলোর ওপর আঙুল চালাতে শুরু করলেন। যোগমায়ার বেঁটে কালো আঙুল অভ্যস্ত হাতে হলুদ, কোণা দোমড়ানো ইনডেক্স কার্ডের সারির ওপর দৌড়তে লাগল।

এই তো, দৌলতায়েব লেন। কার্ডটা টেবিলে এনে ধরে ধরে নতুন নাম লিখে ঠিক জায়গায় গুঁজে ড্রয়ারটা ঠেলতে গিয়ে আবার আটকাল। দুয়েকবার ঝাঁকুনি দিয়ে আগুপিছু করার চেষ্টা করে সুবিধে হল না। যোগমায়া ভুরু কোঁচকালেন।

মিনিট দশ পর স্কেল দিয়ে, ডট পেন দিয়ে, পেনসিল দিয়ে খোঁচাতে ড্রয়ারের খাঁজ থেকে কালপ্রিট বেরোল। দোমড়ানোমোচড়ানো একটা কার্ড। অন্য কার্ডের থেকে অনেক বেশি হলুদ। দৈর্ঘ্য প্রস্থে আলাদা। টাইপিং-এর ছাঁদ আলাদা, অক্ষরের ছাঁদ আলাদা, কালি ফ্যাকাসে। এ কার্ড যোগমায়ার আমলে বানানো হয়নি। যোগমায়ার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলছে, এ কার্ড গৌরাঙ্গদারও আগের সময়ের। চশমাটা হাত দিয়ে নাকের ওপর ঠেলে করে কার্ডটা চোখের কাছে তুলে আনলেন যোগমায়া।

দস্তুরিখানা স্ট্রিট।

যোগমায়া হালদার শব্দদুটোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। অপেক্ষা করলেন। ব্রেনে স্পার্ক জ্বলল না। পাখি চোখ মেলল না। উড়ল না। ডানায় মুখ গুঁজড়ে নিথর শুয়ে রইল।

সারাদিন কাজে মন বসাতে পারলেন না যোগমায়া। ম্যাপ বার করে খুঁজলেন। অধুনা সংস্করণ। আগের সংস্করণ, তার আগের, তারও আগের সংস্করণ। দস্তুরিখানা স্ট্রিট নেই কোনওটায়। ছিল না কোনওদিনও। যোগমায়ার মাথায় স্মৃতি নড়লচড়ল। বছর সত্তর আগে একবার অফিসের পুরনো বাড়িতে আগুন লেগেছিল। গৌরাঙ্গদার বড়বাবুর আমলেরও আগে। সে সাংঘাতিক আগুন, জানালা দরজা কড়িকাঠ দেওয়াল পুড়িয়েঝুরিয়ে বাড়ির খাঁচা বার করে দিয়েছিল। যা যা বেঁচেছিল নিয়ে গোটা ডিপার্টমেন্ট শিফট করতে হয়েছিল নতুন বাড়িতে। তখনই কি কার্ডটা ক্যাবিনেটের ফাঁকে আটকা পড়ে যায়? তারপর আর কোনওদিন কেউ খুঁজে পায়নি? কিন্তু কার্ড হারিয়ে গেলেও একটা গোটা রাস্তা কি হারিয়ে যেতে পারে?

চারটের সময় বুটে গটমট আওয়াজ তুলে চলে যাওয়ার আগে অসিত কী মনে করে একবার উঁকি মেরে দেখতে এল যোগমায়া আছেন না গেছেন। যোগমায়া খেয়াল করলেন না। তিনি তখন মেঝেতে কোটি কোটি ইনডেক্স কার্ড আর মানচিত্রের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

অসিত মাথা নেড়ে চলে গেল। ঠিক বয়সে বিয়ে না হলে মেয়েদের স্ক্রু ঢিলে হয়ে যায়, ও আগেও দেখেছে।

মাথাখারাপেরই জোগাড় হল যোগমায়ার। সারাদিন ম্যাপ ঘেঁটেও রাস্তাটাকে খুঁজে না পেয়ে সন্ধেবেলা যোগমায়ার মাথা ঘুরতে লাগল, গা গোলাতে লাগল। মনে রইল না, বাড়িতে চাল ফুরিয়ে গেছে, কিনতে হবে। অসুবিধে হল না কারণ খিদে ছিল না, বাড়ি ফিরে কোনওমতে জামাকাপড় ছেড়ে, চোখনাককানে জলের ঝাপটা দিয়ে, ঢকঢক করে প্লাস্টিকের বোতলের আধবোতল জল গলায় ঢেলে শুয়ে পড়লেন যোগমায়া। এমনিতে তিনি শীতকাতুরে মানুষ, কালীপুজোর পর জানালা খোলার পক্ষপাতী নন। আজ পাছে দমবন্ধ হয়ে যায়, অল্প ফাঁক রেখেই শুলেন।

রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোটা আকাশের কালো আড়াল করে দাঁড়িয়ে। যোগমায়া সে আলোর দিকে চোখ মেলে শুয়ে রইলেন। এতদিন ধরে, এত চেষ্টা করেও তিনি যা পারেননি, এই রাস্তাটা তা পেরেছে।

হারিয়ে যেতে।

*****

পরের সপ্তাহে অফিসে ভিড় বাড়ল, কাজের চাপ বাড়ল, টেবিলে টেবিলে ঘুরে যোগমায়ার হাঁটু টনটন করল। সোম থেকে শুক্র যোগমায়া একঘণ্টা আগে অফিসে পৌঁছে, একঘণ্টা লেটে অফিস থেকে বেরোলেন। বাড়তি সময়টা তিনি পুরনো ম্যাপ খুলে, ক্যাবিনেট ঝেড়ে দেখলেন, ওই হলুদ কার্ডটি ছাড়া দস্তুরিখানা স্ট্রিটের উল্লেখ আর কোথাও পেলেন না। লজ্জা ভেঙে নতুন জয়েন করা একটা শান্ত মতো মেয়েকে অনুরোধ করলেন, ডেটাবেস সার্চ করে দেখার জন্য, হয়তো অদ্ভুত কিছু ঘটেছে, হয়তো অতীতে ছিল না, হয়তো কল্পবিজ্ঞানের মতো ভবিষ্যৎ থেকে এসে উপস্থিত হয়েছে রাস্তাটা।

সেখানেও নেই।

যোগমায়া হালদার মেনে নিতে বাধ্য হলেন, কলকাতা শহরে এমন একটা রাস্তা আছে যেটা তিনি চেনেন না।

শনিবার সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে, চা খেয়ে, আটটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়লেন যোগমায়া। আজকাল যখনতখন বৃষ্টি নামছে। ব্যাগে ছাতা পুরে নিলেন। বাসে বসে থাকতে থাকতেই বৃষ্টি নামল। কার্ডে লেখা পিন কোড দেখে এরিয়াটা সম্পর্কে একটা ধারণা ছিল। শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ। আন্দাজ করে কাছাকাছি একটা বাসস্ট্যান্ডে নেমে এদিকওদিক তাকালেন যোগমায়া। রাস্তাঘাট ফাঁকা। দুটো দোকান। একটা পানের, একটা চায়ের। আশা নেই জেনেও চায়ের দোকানে একবার আলগোছে রাস্তার নামটা উচ্চারণ করলেন যোগমায়া। বিক্রেতা মাথা নাড়লেন।

যোগমায়া দমলেন না। বাস থেকে নামার পর থেকে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তাঁর। হলুদ কার্ডটা খুঁজে বার করার পর থেকে যে ধোঁয়াশাটা তাঁর চেতনা আচ্ছন্ন করে ছিল, ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। স্পার্ক এখনও জ্বলেনি, কিন্তু প্রাণের সাড়া টের পাচ্ছেন তিনি মাথার ভেতর।

যোগমায়া রাস্তা পেরোলেন। এইখানে একটা পুকুর থাকার কথা, এই তো আছে, আর ক’দিন বাদে বুজে যাবে। একটা গলি, দুটো গলি পেরোলেন যোগমায়া। বসতি ফুরোল, একটা উঁচু পাঁচিল শুরু হল। কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেছে বহুযুগ। জঙ্গল গজিয়েছে পাঁচিলের গা বেয়ে। শহরের এত কাছের একটা জায়গা এখনও ডেভেলপড হয়নি। যোগমায়া অবাক হলেন না। এই শহরের এমন অনেক পাড়া, অলিগলি আছে এখনও যাদের বর্তমান চেহারার সঙ্গে যা চেহারা হওয়া উচিত তার কোনও মিল নেই। দুই গলির সমান দূরত্ব দিয়ে মেট্রো রেল যায়, এক গলির চেহারা ফিরে যায়, অন্য গলির ল্যাম্পপোস্ট দপদপ করতে করতে নিভে যায়। প্রোমোটার এসে একটা গলির পুরনো বাড়ি ভেঙে দিয়ে ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাট বানিয়ে সবাইকে বড়লোক করে দিয়ে যায়, অন্য গলির বাড়িগুলো লজঝড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝরাত্তিরে গামছা দিয়ে হাওয়া খেতে খেতে লোডশেডিং-এর বাপবাপান্ত করে, বাগানে গাছের ডালে ডানা মুড়ে নিশ্চিন্তে ঘুম যায় কাকের ছানা।

গলিও মানুষের মতো। এক পিনকোডে জন্মালেও এক কপাল নিয়ে জন্মায় না সবাই।

এই জায়গাটারও কপাল ভালো নয় মনে হচ্ছে। বন্ধ কারখানার জমিটা এখনও ফাঁকা। এখানে কোনও রাস্তা নেই। থাকতে পারে না। থাকলেও বানে ভেসে গেছে। কিংবা ভূমিকম্পে ধসে গেছে। পিছু ফিরতে গিয়েও থমকালেন যোগমায়া। কারখানার পাঁচিলের গায়ে একটা বন্ধ দরজা।

যোগমায়ার মাথার ভেতর দুটো সাদা বিন্দু জেগে উঠল। পাল্লা ঠেলে খুলে দরজার ওপাশে পা রাখলেন যোগমায়া।

*****

একটা রাস্তা। কংক্রিট বাঁধাই, তকতকে। গেটের ডানদিকে একটা থামের গায়ে উঁচুতে বোর্ড, আবছা অক্ষরে রাস্তার নাম। যোগমায়া পড়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। হাঁটতে শুরু করলেন। দুপাশে সারি দিয়ে বাড়ি। একতলা। দোতলা। পুরোনো ছাঁদের। সবক’টা বাড়ির সামনেই অনেকটা করে জমি, বড় বড় গাছ। একসময় যেমন সবার বাড়িতে থাকত। একটা বাড়ির ছাদ অ্যাসবেসটসের। চকচকে সবুজ পাতার ঘন বেড়া। টুনুমাসির বাড়িতে এই বেড়া ছিল। আশেপাশে কেউ নেই দেখে একটা পাতা ছিঁড়ে মসৃণ সবুজে বুড়ো আঙুলের নখ বিঁধিয়ে নাকের কাছে তুলে আনলেন যোগমায়া। সেই কষটা গন্ধ অবিকল।

যোগমায়া যখন সবে ভাবতে শুরু করেছেন যে এই রাস্তাটা একটা কাল্পনিক কিংবা ভৌতিক জগতের অংশ, কারণ কোথাও মানুষ নেই অথচ বাড়িগুলোর দেওয়ালে অটুট প্লাস্টার, বাগান নিড়োনো, গাছের তলায় নিয়মিত ঝাঁট পড়ে, এমন সময় ডানদিকের তিন নম্বর বাড়ির বাগানে উবু হয়ে বসে থাকা পিঠটার দিকে নজর পড়ল।

বয়স্ক পিঠ। পরনে হাতাওয়ালা স্যান্ডো গেঞ্জি, লুঙ্গিতে চৌখুপি ছাপ। মুখ দেখা যাচ্ছে না, টাকের ওপর অগোছালো চুল। খুরপি চালানোর ঝাঁকুনিতে শরীর আগুপিছু দুলছে।

যোগমায়া ডাকলেন, ‘শুনছেন? এই যে?’

দুলুনি থামল না।

যোগমায়া আর ডাকলেন না। এগিয়ে গেলেন রাস্তা ধরে। বেশিদূর এগোতে হল না। রাস্তাটা গিয়ে ধাক্কা খেল একটা বাঁধানো ঘাটে। ঘাটের ধারে পুকুর। টলটল জল। কতদিন বাদে এমন স্বচ্ছ পুকুর দেখলেন যোগমায়া। ছোটবেলার হাওড়ার ভাড়াবাড়ির পাশে একটা পুকুর ছিল। বাড়ির জানালায় বসে সেই পুকুরের দিকে তাকিয়ে অনেক বিকেল কেটেছিল। জলের শান্তি যোগমায়ার ভালো লাগে খুব। তাঁর বর্তমান বাড়ির পেছনে একটা এঁদো ডোবা আছে। সারা পাড়ার যত জঞ্জাল সব ওই ডোবাতে। মাঝে মাঝেই পচা গন্ধ ছাড়ে। মৃত্যুযন্ত্রণায় ভুগছে। আর বেশিদিন ভুগবে না। সুটপ্যান্ট পরা কিছু লোকের আনাগোনা শুরু হয়েছে। ফ্ল্যাটবাড়িও এল বলে।

পুকুরের শোভা বেশিক্ষণ উপভোগ করতে পারলেন না যোগমায়া। ষষ্ঠেন্দ্রিয় অস্বস্তি বোধ করল। ঘাড় ঘোরাতেই চোখে চোখ।

সরু খয়েরিপাড় সাদা শাড়ি জড়ানো শরীর, সামান্য ভারির দিকে। হাতে একটা পেতলের ঘটি, ছোট ছোট থালা, বাটি, ঠাকুরের বাসন। কবজিতে সরু সোনার চুড়ি। ফরসা ভালোমানুষ মুখ ঘিরে সাদা এলোমেলো চুল। সাদা সিঁথি। বয়স সত্তরের এদিকওদিক।

যোগমায়া নিজের পরিচয় দিলেন। নিজের নামটুকু যথেষ্ট মনে না হওয়ায় অফিসের নামটাও জুড়ে দিলেন তাড়াতাড়ি।

ভদ্রমহিলার মুখের পরিবর্তিত ভাবটা চোখ এড়াল না, কিন্তু সে ভাবের কতখানি ভয়, কতখানি স্বস্তি ধরতে পারলেন না যোগমায়া। সবশেষে হাসি ফুটল। করুণ হাসি।

‘এতদিনে ধরা পড়ল? এবার কী করতে হবে?’

সামান্য সময় লাগল বুঝতে। ভদ্রমহিলা ভেবেছেন হারিয়ে যাওয়া দস্তুরিখানা স্ট্রিট অবশেষে আবিষ্কার হয়েছে, যোগমায়া কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এসেছেন পরবর্তী কর্মপদ্ধতির নিদান দিতে।

যোগমায়া ভুল ভাঙালেন। ঘাটের লাল সিমেন্টের বাঁধানো বেদিতে পাশাপাশি বসলেন দুজনে। যোগমায়া বললেন কী করে তিনি খোঁজ পেলেন দস্তুরিখানা স্ট্রিটের। বললেন, এক তিনি ছাড়া দস্তুরিখানা স্ট্রিট এখনও জগতের কাছে অনাবিষ্কৃত, যেমন রয়েছে গত সত্তর কি তারও বেশি বছর ধরে। অগ্নিকাণ্ডের কথা বললেন, সম্ভবত তখনই দস্তুরিখানা স্ট্রিটের অন্তর্ধান ঘটে।

‘আপনারা কবে টের পেলেন?’
‘আমি তখন কোথায়। শ্বশুরশাশুড়ির কাছে গল্প শুনেছি। যখন চিঠি আসা বন্ধ হল তখনই বোধহয়।’
‘ওঁরা দৌড়োদৌড়ি করেননি?’
‘করেনি আবার? সবাই দৌড়ে দৌড়ে পোস্টঅফিসে গেল, পোস্ট অফিস বলল, কী করে চিঠি যাবে, আপনাদের রাস্তাটা তো নেই। ট্যাক্স অফিসে যাওয়া হল, বলা হল আমাদের ট্যাক্স নাও, অফিস বলল, কী করে নেব, আপনারা তো নেই। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে পারল না। নেই কী করে? এই যে জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে আছি?’
‘ভয় করেনি?’
‘করেছিল নিশ্চয়। নেই হয়ে কী করে থাকে মানুষ সমাজে? দুঃখ হয়েছিল। মনে হয়েছিল সবাইকে চেঁচিয়ে বলি, এই যে দেখো আমরা আছি, জলজ্যান্ত মানুষ, আমাদের নাম আছে, ঠিকানা আছে, সুখ আছে, দুঃখ আছে, নেশা, পেশা, মতামত আছে। তারপর অভ্যেস হয়ে গেল। মনে হল এগুলো তো থেকেই যাবে। লোকে জানুক আর না জানুক। দস্তুরি স্ট্রিট থাকুক আর না থাকুক। ভয় কমে এল। তখন না থাকার ভালো দিকগুলোর মহিমা বুঝতে পারলাম। আমরা নেই বলে ভোটের প্রচার নেই, গুণ্ডার ভয় নেই, লৌকিকতার অত্যাচার নেই।’

যোগমায়া বিশ্বাস করতে চেয়েও যেন পারছেন না।

‘ছেলেমেয়েদের স্কুলকলেজ, পড়াশোনা?’
‘এইভাবেই হয়েছে সব। বড় হয়েছে সবাই। চাকরিবাকরি করেছে। এই তো গত সপ্তাহেই সিকদারবাবুর ছেলের চাকরি হল। খুব বড় কোম্পানি। অনেক মাইনে। হায়দেরাবাদে ছ’মাস ট্রেনিং তারপর কোথায় যেন পোস্টিং। ওই যে ঢোকার মুখে বাগানওয়ালা বাড়িখানা।’

যোগমায়া জানালেন তিনি দেখেছেন। সামান্য দ্বিধা কাটিয়ে ব্যর্থ ডাকাডাকির পর্বটারও উল্লেখ করলেন। মহিলা হাসলেন, খোলা হাসি।

‘সিকদারবাবু বদ্ধ কালা। কানের কাছে গিয়ে না চেঁচালে কিছু শুনতে পান না। ওদের বাড়ির সবার ওই জন্য চিৎকার করে কথা বলা স্বভাব। কাক চিল বসতে পায় না।’
‘এই সব ছেলেমেয়েদের বন্ধুরা কখনও আসেনি? জানতে চায়নি কোথায় থাকে?’

মাথার ওপর অশ্বত্থ গাছটা থেকে ঝরে পড়া একখানা ভেজা পাতা শাড়ির ওপর থেকে তুলে ফেলে দিয়ে মহিলা বললেন, ‘প্রথম প্রথম আসতে চাইত হয়তো, কিন্তু ঠিকানা বললে কেউ চিনতে পারত না। তারপর আমাদের ছেলেমেয়েরাও একা থাকতে শিখে গেল। লুকিয়ে থাকার একটা আরাম আছে। আমাদের ছেলেমেয়েরাও তাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল সম্ভবত।’

‘আত্মীয়স্বজন?’
‘অনেকদিন খবর না নিলে তারাও আর খবর নেয় না।’
‘অর্থাৎ কেউ জানতেই পারল না যে আপনারা আছেন?’
‘খাতায় কলমে না থাকলে আবার থাকা কীসের?’

যোগমায়া চুপ করে রইলেন। কথাটা খাঁটি। এই যেমন তিনি। থাকার কোনও কারণ নেই, ইচ্ছেও না, খালি খাতায়কলমে আছেন বলে থেকে যেতে হচ্ছে।

‘একেবারে পায়নি বললে অবশ্য ভুল বলা হবে। আপনি যেমন পেয়েছেন।’ যোগমায়ার চোখে চোখ রেখে হাসলেন মহিলা। ‘অনেকদিন আলাদা থাকতে থাকতে আমাদের ইন্দ্রিয় প্রখর হয়ে গেছে, আমরা মানুষ দেখলে বুঝতে পারি, কারা আমাদের অদ্ভুত ভাববে না, কিংবা ঢাক পিটিয়ে আমাদের শান্তি নষ্ট করবে না। বোসবাবুকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলেন আমার স্বামী। মুদির দোকানে আলাপ হয়েছিল। উনিও রকমসকম দেখে আপনার মতোই অবাক। তারপর যখন বিশ্বাস হল আমরা রক্তমাংসের মানুষ, ভূতপ্রেত নই, বলে বসলেন, “আমি এখানেই থাকব, যাব না কোথাও। যদি আপনারা অনুমতি দেন।” বললাম, অনুমতি কীসের, থাকুন না। শ্বশুর চলে যাওয়ার পর দোতলার ঘরটাতো ফাঁকাই আছে। প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করতেন, বেহালার দিকে কোথাও। বিয়ে করেননি, আত্মীয়স্বজনের টান নেই। আমাদের ভাড়ার কোনও দরকার ছিল না, পেনশনেই চলে যেত। কিন্তু বোসবাবু জোর করে ভাড়া দিয়েই থাকলেন। পাড়ার সবার সঙ্গে খুব ভাব জমিয়ে ফেললেন, সবার দরকারে যেতেন, বাচ্চাদের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াতেন, গল্প শোনাতেন। তারপর বছর পাঁচেক আগে আমার স্বামী চলে গেলেন, ঘুমের ভেতর হার্ট অ্যাটাক, কোনও কষ্ট নেই। তখন বোসবাবুই আমার সকালসন্ধে চা খাওয়ার সঙ্গী। মাসছয়েক আগে কোথাও কিছু নেই, আগের দিন বিকেলবেলা বাজার থেকে আমার জন্য সুপুরি পর্যন্ত এনে দিলেন, সকালবেলা সাড়া নেই। আধঘণ্টা অপেক্ষা করে পাশের বাড়ির রাণাকে ডাকলাম, দরজা ভেঙে ঢুকে দেখে সব শেষ।’

হাওয়া দিল এক দমক। পাতা থেকে টুপটাপ জল পড়ল পুকুরে। তিরতির ঢেউ উঠল।

‘সেই থেকে দোতলার ঘরটা খালিই পড়ে আছে। মোটামুটি বড়ই, লাগোয়া রান্নাঘর, বাথরুম। ছাদ আছে, কাপড়টাপড় মেলা যায়। ওই যে ওই ঘরটা।’

মহিলার সঙ্গে সঙ্গে যোগমায়াও ঘাড় ঘোরালেন। পুকুরের ধার ঘেঁষে নীল বর্ডার দেওয়া সাদারং দোতলা বাড়ি। দোতলার দেওয়ালে পুকুরের দিকে মুখ ফেরানো একটা জানালা, লম্বাটে শিক, হালকা রঙের ফুরফুরে পর্দা। গা ঘেঁষে উঠেছে একটা নারকেল গাছ। জানালার শিকে মাথা ঠেকিয়ে বসলে পুকুরটা দেখা যাবে। রাতে জানালা খুলে শুলে নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ঝলমলিয়ে উঠবে পূর্ণিমার চাঁদ।

*****

ভ্যাপসা গরম। এসি খারাপ হয়ে গেছে। একটা পেডেস্টাল ফ্যান ঘরঘরিয়ে চলছে বটে কিন্তু কাজ বিশেষ দিচ্ছে না। সিল্কের শাড়িটা না পরে এলেই হত। গলগল ঘামছেন যোগমায়া। গরমে, নার্ভাসনেসেও। গোটা অফিসের সামনে এই রকম দ্রষ্টব্য হয়ে বসার অভ্যেস নেই তো। পাশের চেয়ারেই বসে সর্বাণী সরখেল, ডিজি। রোজ নতুন নতুন সিল্কের শাড়ি পরে আসেন, আজও এসেছেন। কোনওদিনই ঘামেন না, আজও ঘামছেন না। লাল টুকটুকে ঠোঁটে অল্প হাসি মেখে তাকিয়ে আছেন।

অসিত উল্টোদিকের সারি সারি চেয়ারে বসা ভিড়কে উদ্দেশ্য করে বলছে, ‘আজ আমাদের যোগমায়াদি, সবার প্রিয় যোগমায়া হালদার অবসর নিচ্ছেন। আমাদের একান্ত নিজস্ব জলজ্যান্ত গুগল ম্যাপ…’ ভিড় হোহো হাসছে।

অসিত যোগমায়ার দু’হাত ভরে উপহার তুলে দিল। ফুলের তোড়া। শাড়ি। ডিপার্টমেন্টের নাম ছাপা দেওয়াল ঘড়ি। পেন। যোগমায়া সুতির রুমাল দিয়ে ঘাম আর চোখের জল একসঙ্গে মুছতে লাগলেন। যাদের সঙ্গে মুখচেনা, যাদের সেটুকুও নয়, অল্পবয়সি নতুন রিক্রুট সব, এসে নমস্কার করে গেল। আপনাকে কে না চেনে যোগমায়াদি। আপনি লিজেন্ড। খুব ভালো থাকবেন। আসবেন মাঝেমাঝে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। একেবারে ভুলে যাবেন না।

যোগমায়া উত্তর দিতে চেয়েও পারলেন না, গলার ভেতর কী যেন। সর্বাণী ম্যাডাম বললেন, ‘এত জিনিস নিয়ে যাবেন কী করে, আমার গাড়িতে ছেড়ে দিই?’ যোগমায়া নুয়ে পড়ে ম্যাডামের হাত ধরে ‘না’ বললেন। অসিতরা ট্যাক্সি ডেকে লটবহর তুলে দিল। ট্যাক্সি যখন গড়াতে শুরু করেছে চেঁচিয়ে বলল, ‘এবার একটা মোবাইল নিন যোগমায়াদি, পথ হারালে ডিরেকশন চাইব কী করে?’

*****

‘ইধারই?’ দুপাশে জঙ্গুলে জমির দিকে তাকিয়ে অল্পবয়সি ড্রাইভার ছেলেটা অবাক হল।

‘হ্যাঁ বাবা।’ খুচরো ফেরত নিতে নিতে বললেন যোগমায়া।

অল্পবয়সি ছেলে। চকচকে চোখ, ঝকঝকে হাসি। কথা বলতে ভালোবাসে। ওর বাবা ধানবাদের সরকারি অফিসের গাড়ি চালাতেন, তিনিও রিটায়ারমেন্টের সময় অনেক কিছু পেয়েছিলেন। ঘড়ি, পাঞ্জাবি, টাকা, মিঠাই। যোগমায়ার বাবা ধানবাদে পোস্টেড ছিলেন। বাবার মুখে শোনা কিছু রাস্তার নাম মনে ছিল, বললেন ছেলেটাকে, চিনতে পারল। এখন সন্তোষপুরে থাকে। কার সঙ্গে জিজ্ঞাসা করাতে বলল, ‘ওয়াইফ কে সাথ।’ ওয়াইফ শব্দটা উচ্চারণ করতে যে রকম হাসল, অনভ্যাসের আড় এখনও কাটেনি। ছ’মাস হল বিয়ে হয়েছে নাকি। হাতের বোঝা নিয়ে নামতে অস্থির হলেন যোগমায়া। ছেলেটা দৌড়ে এসে দরজা খুলে দাঁড়াল। ফুলের তোড়াটা ছেলেটার হাতে দিলেন যোগমায়া। ‘বউকে দিও। আর এটা খেও দুজনে মিলে।’ বড় মিষ্টির প্যাকেটটা ধরালেন অন্য হাতে। খুশিই হল মনে হয়। হাসিহাসি মুখ রঙচঙে ফুলের তোড়ার ওপর ফুটে আছে। গাড়িতে গিয়ে বসল। ফুলমিষ্টি রাখল সিটে যত্ন করে। যোগমায়া দাঁড়িয়ে রইলেন। ছেলেটা গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে তোড়াটা অল্প ঘুরিয়ে রাখল সাবধানে, যাতে পাপড়ি দুমড়ে না যায়।

ট্যাক্সিটা অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন যোগমায়া। তারপর খানিকটা হেঁটে গলিতে ঢুকলেন। এ গলি, ও গলি। কারখানার দেওয়াল। বন্ধ গেট খুলে পা রাখলেন যোগমায়া।

সন্ধের মুখে ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলে উঠেছে, বোর্ডের গায়ে টিমটিম করছে দস্তুরিখানা স্ট্রিট। সিকদারদের বাগানে কেউ কাজ করছে না। অ্যাসবেস্টসের চালের বাড়িটা থেকে শাঁখের শব্দ। মাসিমার মুখে শুনেছেন এটা হোড়েদের বাড়ি। আলাপ হয়নি এখনও। হয়ে যাবে। হেঁটে হেঁটে নীল বর্ডার দেওয়া সাদা দোতলা বাড়িটার সামনে পৌঁছলেন যোগমায়া। ভেতর থেকে টিভির শব্দ আসছে। এই সময় একটা সিরিয়াল হয়, খুব নাকি ভালো। পৃথিবী এধারওধার হয়ে গেলেও মাসিমা মিস করেন না। যোগমায়া ভাবছেন কাল থেকে মাসিমার সঙ্গে চা খেতে খেতে দেখবেন। গত কয়েকমাসে বারচারেক এ বাড়িতে এসেছেন যোগমায়া। ঘরে খাট, আলমারি, টেবিলচেয়ার ছিলই, যোগমায়া তোশক বেডকভার পেতেছেন, মাথার বালিশখানা নিয়ে এসেছেন। মায়ের পাশে বসে তোলা একখানা ছবি, টুনুমাসির মেয়ে বুনুর বিয়েতে কে তুলে দিয়েছিল মনে নেই, রেখেছেন বিছানার পাশের ছোট একখানা টুলে। গোপালও এসেছেন, যাঁকে রোজ সকালবিকেল জল দিতে পইপই করে বলে গিয়েছিলেন মা, এসে দেওয়ালের পেরেকে টাঙানো কাঠের তাকে চড়েছেন।

জানালা ঘেঁষে পাতা জংলাছাপ বেডকভার ঢাকা বিছানাটার কথা মনে পড়তে কোমর টনটন করে উঠল যোগমায়ার। মাথাটা দপদপ করছে। এত লোকের সঙ্গে কথা বলা, হাসার অভ্যেস নেই। দু’হাত ভর্তি বোঝাও এবার নামিয়ে রাখতে পারলে বাঁচেন। তারপর এই বাহারের শাড়ি ছেড়ে, চুল টেনে বেঁধে, গা ধুয়ে, গোপালকে জল দিয়েই বিছানায় লম্বা। আহ।

কিন্তু তার আগে একটা কাজ আছে। পুকুরঘাটের দিকে এগোলেন যোগমায়া। দু’হাতের বোঝা নামিয়ে রাখলেন লাল সিমেন্টের বেদীতে। কাঁধের ব্যাগখানা সামনে টেনে এনে চেন খুলে হাঁটকাতে লাগলেন।

এই যে। গত সাড়ে সাত মাস মোটা একটা বইয়ের তলায় চাপা দিয়ে রাখার ফলে আগের থেকে অনেক টানটান। কিন্তু তার আগের কে জানে কত বছর ক্যাবিনেটের ভাঁজে আটকা থাকার ক্ষত এখনও স্পষ্ট তুলোট কাগজের গায়ে।

কার্ডটার গায়ে আলতো আঙুল বোলালেন যোগমায়া হালদার। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নেমে জলে ভাসিয়ে দিলেন।

জল শুষে নিল, চুঁইয়ে গেল কার্ডের শরীরে, এক কোণা থেকে মাঝে, ওই কোণায়। জলের ছোঁয়ায় হলুদ রং বদলাল, ভারি হল। তারপর টুপ করে, সন্ধের কালো জলে ডুবে গেল দস্তুরিখানা স্ট্রিট।

আর হারিয়ে গেলেন যোগমায়া হালদার।

 

Patrick Waddington-এর ছোটগল্প ‘The Street That Got Mislaid’ অবলম্বনে

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. বিদেশী গল্প অবলম্বনে , বলছেন লেখক। আমি শুধুই ‘অনুপ্রাণিত’ বলব। লেখাটি আপন বৈশিষ্ট্যেই নজরে পড়ে। দুটি লেখা পাশাপাশি তুলনা করে দেখানো যায় এ লেখার আলাদা সৌন্দর্য। সময়াভাবে, আপাততঃ একটি উদাহরণ দিই-
    মূল গল্পের শেষে, চরিত্রটি কার্ডখানি কুচি কুচি করে জলপাত্রে ফেলছে-As far as he was concerned, Green Bottle Street would remain mislaid forever.
    এই গল্পের শেষে ‘কার্ডটার গায়ে আলতো আঙুল বোলালেন যোগমায়া হালদার। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নেমে জলে ভাসিয়ে দিলেন।
    জল শুষে নিল, চুঁইয়ে গেল কার্ডের শরীরে, এক কোণা থেকে মাঝে, ওই কোণায়। জলের ছোঁয়ায় হলুদ রং বদলাল, ভারি হল। তারপর টুপ করে, সন্ধের কালো জলে ডুবে গেল দস্তুরিখানা স্ট্রিট। আর হারিয়ে গেলেন যোগমায়া হালদার। ‘
    মূল গল্পে শেষ লাইনের অভিঘাত স্বীকার করে নিয়েই বলি, এই গল্পের একেবারে স্বতন্ত্র এক মায়া তৈরি হয়ে গেল শেষ ক’টি লাইনে।
    লেখককে নমস্কার।

আপনার মতামত...