অযোধ্যা পাহাড়ে উন্নয়ন, মিথ্যাচার ও মূলনিবাসীর অধিকার

অযোধ্যা পাহাড়

সৌরভ প্রকৃতিবাদী

 

জানুয়ারি ২০১৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ এই চার বছরে ৫৫,০০০ হেক্টর, একরের হিসেবে ১,৩৮,০০০ একর বনভূমি ধংসে শীলমোহর পড়েছে। বনধ্বংসের শীলমোহর লাগানোর ঠেকা রাষ্ট্রের। বিকাশ এবং উন্নয়নের ঠিকাও রাষ্ট্রের। প্রায় ২,৮০০টি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য দরকার হয়েছে এই বিপুল ধ্বংস যজ্ঞের। নিশ্চিত দেশবাসী ভালো আছেন অনেক। কারণ ক্ষুধা সূচকে দেশ সেঞ্চুরি করেছে ১১৯টি দেশের মধ্যে! আর খানিক বিকাশ হলেই আরও ১৯ রান নিয়ে ফেলা যেত! দেশবাসী ভালো আছেন কারণ বেকারত্ব চরম সীমা অতিক্রম করেছে! দেশবাসী ভালো আছেন কারণ দেশের ৭৩% স্থাবর অস্থাবর সম্পদ ১% মানুষ দখলে পেয়েছে। দেশ ভালো আছে কারণ কৃষক আত্মহত্যায় ভারত নিজের বিশ্বরেকর্ড নিজেই ভেঙে দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়েতে, কন্যা ভ্রূণ হত্যায়, নারী পাচারে জয়যাত্রা বজায় রেখেছে। সৈনিক আত্মহত্যায় আমেরিকার পর দ্বিতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। সমস্ত ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষার প্রকল্প চুকেবুকে গিয়েছে!

হ্যাঁ দেশ খুব ভালো আছে। কারণ সুপ্রিম কোর্টে চলা একটি মামলায় রায় বেরিয়েছে ১৬টি রাজ্যের অন্তত ১১ লক্ষ আদিবাসী মানুষকে উচ্ছেদ করে জঙ্গল বাঁচাতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৮০০০০ আদিবাসী মানুষ উচ্ছেদ হতে চলেছেন। আদিবাসী উচ্ছেদ হলে জঙ্গলের মালিকানা যাবে সরকারের কাছে। হাত ঘুরে গিয়ে পড়বে কর্পোরেটের কাছে। আরও আরও জোরদার হবে জঙ্গল নিধন। পাহাড় ঝরনা জঙ্গল সব বলি চড়বে অতি মুনাফার যন্ত্রের চুল্লিতে। আদিবাসী উচ্ছেদ না করে বনাধিকার কেড়ে না নিয়ে জঙ্গল ধ্বংস দখল সহজ হয় না একথা সরকার বাহাদুর থেকে কর্পোরেট সকলেরই জানা। জানা কারণ চিপকো থেকে নিয়মগিরি সর্বত্র বারে বারে জঙ্গলবাসী মানুষই রুখে দিয়েছেন জঙ্গল ধ্বংসের ষড়যন্ত্র। আর তাই সরাসরি আদিবাসীদেরই উচ্ছেদ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রাষ্ট্রের।

এদিকে অযোধ্যা পাহাড়ের আদিবাসীরা লড়ছেন জঙ্গল বাঁচাতে। ঠুড়গা, কাঁঠলাজোল, বান্দু নদী বাঁচাতে। নিজেদের পাশাপাশি হাতি ভাল্লুক খরগোশের মহুল কেন্দ ভেলার আবাস বাঁচাতে। জমিতে লড়াই ক্রমশ দানা বাঁধছে। আদিবাসী মহিলারা ক্রমশ এগিয়ে আসছেন আন্দোলনে সামিল হতে। আর অন্যদিকে অযোধ্যা গ্রামবাসীদের করা রিট পিটিশন-এ কোলকাতা হাইকোর্ট গত ১৬ই জানুয়ারি স্থগিতাদেশ জারি করেছেন জঙ্গল কাটার উপর। যদিও চোরাগোপ্তা প্রায় ৫০০টি গাছ কেটে নিয়েছে বন দফতর। কার যেন বন বাঁচানোর দায়? আদিবাসীরা যখন এই গাছ কাটার কথা জানতে পারেন তারাই আটকান বন দফতরের কর্মীদের। সরকার দাবি করছে তারা নাকি নিয়ম নীতি মেনে বনাধিকার আইন লাগু করেছেন অযোধ্যায়। কিন্তু আসল কথা মিথ্যে বলে মাত্র ২৪ জনকে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আর বনাধিকার আইনে সম্মতি নিয়ে গাছ কাটতে লাগে অন্তত ৫০% মানুষের স্বাক্ষর। কেবল রাঙ্গা গ্রামটির সাবালক জনসংখ্যা ৪৫৬ জন। অর্থাৎ কেবল এই গ্রামের সম্মতি নিতেই অন্তত ২২৯ জন মানুষের সম্মতিসূচক স্বাক্ষর লাগবে। তাহলেই বুঝুন মিথ্যাচারের ধরনটি কতখানি উলঙ্গ! অযধ্যা পাহাড়ে অন্তত ২৭টি গ্রামের মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কেবল ঠুড়গা ড্যাম হলে। বান্দু কাঁঠলাজোল ধরলে অন্তত ৮২টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কোর্টে মিথ্যাচারের পাশাপাশি চলছে রেডিও আকাশবাণী, ছাপা খবরের কাগজ সর্বত্র মিথ্যা প্রচারণা।

দৈনিক যুগশঙ্খ রিপোর্টের হেডিং করেছে গাছ কেটে জলবিদ্যু প্রকল্পে না গ্রামবাসীর, অথৈ জলে কাজ।

অযোধ্যা পাহাড়

‘জলবিদ্যুৎ’ প্রকল্প এটি নয়। এটি একটি বিদ্যুৎ মজুতদারি প্রকল্প। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ মজুত করা হবে। মজুত করার জন্য সরকার ঘোষিত অক্ষমতা ২৪%! অর্থাৎ ১০০০ মেগাওয়াট মজুতের জন্য খরচ হবে প্রায় ১২৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এই অতিরিক্ত পরিমাণ বিদ্যুৎ অন্যত্র কোথাও কয়লা পুড়িয়ে তৈরি হবে! এবার সরকারি হিসেবের মা বাবা আপনাদের জানা, আসলে কতখানি বিদ্যুৎ নষ্ট হবে তার আন্দাজ লাগান। কী হবে এই বিদ্যুৎ দিয়ে? যখন রাজ্যে বিদ্যুৎ অতিরিক্ত তখন কেন আরও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে কয়লা পুড়িয়ে? কেবলই জাপানের ১১০ বছরের পুরানো পচা ধ্বসা একটা প্রযুক্তির ডাম্পিং গ্রাউন্ড বানাতে? লক্ষ লক্ষ (অন্তত ১২ লক্ষ গাছ তিনটি প্রকল্প মিলিয়ে) শালের লগ ভ্যালু পকেটে পোরার জন্য? নাকি অযোধ্যার ব্লাকমাইকার জন্য? নাকি তিন প্রকল্পে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণের কাটামাঠা খাওয়ার জন্য? একটা উদ্দেশ্য তো বোঝা যাচ্ছে, কোম্পানি প্রভুদের তুষ্টিবিধান করা, ‘না প্রভু না যা চাইবেন তার বেশি পাবেন… ঢেলে দেব বিদ্যুৎ, এবং বিনে পয়সাতে, তাতে যা ক্ষতি হওয়ার হোক’— উন্নয়ন ও বিকাশ।

কর্মসংস্থান? বলছি গাছ কেটে করা উন্নয়ন প্রকল্পে, বিকাশ পরিযোজনা দিয়ে কর্মসংস্থান হলে গত ৪ বছরে ২৮১০টি প্রকল্পের জন্য ৫৫০০০ হেক্টর বন কেটে ফেলার পরও বেকারত্ব চড়চড়িয়ে বাড়ল কেমনে?

শহুরে মানবাধিকারের ধারণায় বোধয় জঙ্গল জলাজমি আর তার সাথে জড়িয়ে বাঁচা মানুষের কোনও স্থান নেই? পলিটিক্যালি রাইট থাকতে গিয়ে কেউই উন্নয়ন আর বিকাশের থেকে স্বাধীনতার দাবি তোলার কথা ভাবতেও ভয় পান! এমনই পলিটিক্যালি রাইট এমনকি কোলকাত্তাইয়া লেফটরাও!

অযোধ্যার মানুষ বলার সময় অন্তত আপনাদের সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা বক্তব্য রাখছেন। লেখার কথা এলে গুলিয়ে যাচ্ছে খানিক! তাও যা লিখছেন সেও আপনার সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা বক্তব্য।

প্রাণ প্রকৃতির প্রবাহমানতার আন্দোলন যেখানে যা চলছে দেশ-বিশ্ব জুড়ে জুড়ে যান, নিজেদের বিবর্তিত হতে সাহায্য করুন নিজেই। এই রিপোর্টের মতন মিথ্যাচার করতে হবে নইলে। কারণ বাস্তবত আউটডেটেড সভ্যতায় নিজেদের আটকে রাখলে এছাড়া আর উপায় নেই।

আনন্দবাজারের রিপোর্টার ‘খবর’ করেছেন ঠুড়গা পাম্পড স্টোরেজ প্রোজেক্ট ও অযোধ্যাবাসীর আন্দোলন বিষয়ে।

হেডিং— “গাছ কাটায় বাধা থমকে টুরগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প”। হেডিং এর ভেতরে নানা লোকের টুকরো মন্তব্যের সারি। পুরুলিয়ার মন্ত্রীর মন্তব্য, বিডিও ও জেলাশাসকের মন্তব্য, একজন আন্দোলনকারী গ্রামবাসীর মন্তব্যও ছেপেছেন! সাথে দুইজন পরিবেশকর্মীর মন্তব্য। হেডিং-এর ‘আন্দোলন করার আর জায়গা পায় না এরা যত্তসব’ মার্কা হেজেমনিক সেন্সমেকারের ভূমিকা সাবস্টান্সিয়েট করার মতন করে সমস্ত মন্তব্যকেই টুকরো করে নেওয়া হয়েছে। সেসব এদের বাজার তোষণগত কমপালসিভ অবলিগেশন। এসমস্তই এদের থেকে আশা করা যায়।

কিন্তু চোখ বিশ্রীরকম করকর করে যখন একটা পাওয়ার পাম্প স্টোরেজ প্রকল্পকে ”জলবিদ্যুৎ প্রকল্প” ঘোষণা দেওয়া হয়।

দুটোর মধ্যে তফাৎ?  জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। আর পাম্প স্টোরেজ প্রকল্পে? অন্যত্র উৎপাদিত বিদ্যুত মজুত করা হয়। এই মজুতকরণে নেট লস হয় অন্তত ২০% বিদ্যুৎ। অর্থাৎ এটি আসলে বিদ্যুৎ ভোক্তা, উৎপাদক নয়।

শচীনকে সচিন বানিয়ে ফেলার মতন ঠুড়গাকে টুরগা বানানোও সচেতন বাজারিই।

ঠুড়গা নদী, ঠুড়গা নদীর জঙ্গল, মারাংবুরু পাহাড়, এবং ২৭টি গ্রামের রুজি-রুটি, সারাদেশের সাঁওতাল মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিসর রক্ষার লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। লড়াই হাজার হাজার কোটির লোভ লালসার বিরুদ্ধে। লড়াই জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির মতন কর্পোরেট জায়েন্টের বিরুদ্ধে। রাজ্য সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে। কেন্দ্রীয় অর্থনীতির বিরুদ্ধে। আমলাতান্ত্রিক নির্লজ্জ মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে উন্নয়নের ফসলভোগী ২৯% মধ্যবিত্তের স্বার্থপর উন্নাসিকতার বিরুদ্ধেও। অন্তত এই শেষ বিরুদ্ধতাটি আশাহত করেই, বারে বারে। তবু লড়তে তো হয়ই, অন্য বিরুদ্ধতাগুলির সাথে এটিও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যায়। মধ্যবিত্তের উন্নাসিক উন্নয়ন লোলুপতা প্রায় সর্বক্ষেত্রেই কর্পোরেট-রাষ্ট্র আঁতাতের সমস্ত নেগেটিভিটির জাস্টিফিকেশন হয়ে দাঁড়ায়। মনে করুন সিঙ্গুরের কথা। কেমন করে টাটার কারখানার বাইরে চা-সিগারেটের দোকানকে ‘অনুসারী’ শিল্পের ক্যাপসুলে মুড়ে গেলানো গিয়েছিল! কেমন করে ‘চাকরি হবে, বিনিয়োগ হবে, ১ লাখি গাড়ি চড়বে হিরো হন্ডার মালিক, অর্থাৎ বৃহত্তর স্বার্থ সুরক্ষিত হবে আর এই চাষার ব্যাটাবেটিরা ব্যাগড়া দিচ্ছে’ এই বয়ানের মাল্টিভিটামিন গপ করে গিলে খেয়েছিল মধ্যবিত্তের উন্নয়ন নোলা! আমার বন্ধুদের মনে আছে নিশ্চিত সেসব দশক খানেক আগের বাজারি রিপোর্টিংগুলি।

ক্যাপসুল ট্যাবলেট মাল্টিভিটামিন সিরাপ সব রেডি রয়েছে বাজারে, কেবল গুপগাপ গেলানো শুরু হল বলে। ইতিমধ্যেই আকাশবাণীর খবরে সেসবের প্রাইমারি ডোজ প্রেসক্রাইবড।

অযোধ্যা পাহাড়

তেলিয়াভাসার শুভম অথবা বারেলহরের মিতা হাতিনাদার ছবিদের স্বপ্নে প্রবাহমান জীবনের, ঠুড়গার জলের, ঠুড়গার কোলে দুলতে থাকা নতুন ফসলের অর্গ্যানিক রিনরিন ক্যাপসুল ট্যাবলেটের থোড়াই কেয়ার করে আজ রাতেও বাজতে থাকবে, যেমন বাজত আবহমান সময় থেকে….

নিয়মগিরির ভগবান মাঝির গাঁও ছোড়াব নাহির মতন অযোধ্যাও গেয়ে উঠবে প্রবাহমানতার গান…..

অযোধ্যায় তৈরি হয়েছে অযোদিয়া বুরু রক্ষা প্রচার কমিটি। আগামীদিনে অযোদিয়া বুরু নতুন ভগবান মাঝিদের জন্ম দেবে এই আশায় প্রকৃতি মা বুক বেঁধেছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে মারাংবুরু টিলা থেকে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1180 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*