মৌমাছিদের বাঁচতে হবে… মানুষকেও…

মৌমাছিদের

চার নম্বর নিউজডেস্ক

ফেসবুকে অনেক রেডিমেড উদ্ধৃতির দেখা মেলে। বেশ লাগসই মনে হলে সেসব উদ্ধৃতি অনেকেই শেয়ার করেন সত্যাসত্য যাচাই না করেই। আইনস্টাইনের নাম জুড়ে দেওয়া তেমনই এক উদ্ধৃতি গত এক দশক জুড়ে বারবার শেয়ার হচ্ছে পরিবেশপ্রেমী মহলে– “মৌমাছি বিলুপ্ত হলে মানুষও তার অনুগমন করবে বছর চারেকের মধ্যেই”। আইনস্টাইন এরকম কিছু কোথাও বলেছিলেন বা লিখেছিলেন এমন প্রমাণ নেই, কিন্তু তাঁর নামের মহিমায় এবং বেশ লাগসই হওয়ায় কথাটা প্রায় অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতই সভ্যতার তেলকলে ঠুলি পরা বলদের মত পাক খাই না কেন, মনের ভেতর আশঙ্কার শিরশির থাকবেই। ‘আইনস্টাইন’ এর ভবিষ্যৎবাণী আবেদন করে সেখানেই।

আইনস্টাইন না হয় নাই বললেন, কথাটার মাঝে কি তাই বলে সত্যির ছিটেফোঁটা নেই? এর নিশ্চিত উত্তর দেওয়ার মত বিদ্যা বর্তমান লেখকের নেই। তবে মনে হয় প্রজাতি হিসেবে মৌমাছিদের একদম পিছু পিছু মানুষের অবলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। প্রথমত, ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের পরাগমিলন ঘটায় হাওয়া; অর্থাৎ, মানুষের খাদ্যভাণ্ডারের একটা বড় অংশ মৌমাছিদের অস্তিত্বের ওপর নির্ভর করে না। তাছাড়া গোটা আমেরিকা মহাদেশে যত স্থানীয় উদ্ভিদ তারা কেউ পরাগমিলনের জন্য মৌমাছি নির্ভর নয়, কারণ মৌমাছি আমেরিকাতে নিয়ে এসেছে ইওরোপীয়রা মাত্র কয়েকশো বছর আগে। উল্টোদিকে এটাও সত্যি যে পৃথিবীর বেশিরভাগ ফলের উৎপাদন মৌমাছি-নির্ভর। বিশেষ করে এপিস মেলিফেরা বা ইওরোপীয় মৌমাছি। এক বিরাট বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে ইওরোপীয় মৌমাছির ডানার ওপর। আর গত দশক থেকে এই ইওরোপীয় মৌমাছিদের মাঝেই লেগেছে এক অদ্ভুত মড়ক।

মৌমাছিদের

এখানে মনে রাখা দরকার যে মৌমাছিদের অনেক জাতের মধ্যে এপিস মেলিফেরা আর এপিস সেরানা ইন্ডিকাস–ইওরোপের আর ভারতের মৌমাছি–এই দুই প্রজাতিই মূলত পোষা হয়। তো, ২০০৬ এর শেষদিকে আমেরিকার কিছু মৌ-পালক লক্ষ্য করেন  ব্যাপারটা। কোনও কোনও চাক থেকে মৌমাছিরা বিলকুল উধাও হয়ে যাচ্ছে। পরিত্যক্ত চাকে মধু বোঝাই, সব কিছু ঠিকঠাক, কিন্তু কর্মী মাছিদের গুঞ্জন থেমে গেছে। সারি সারি খালি কুঠরি পড়ে আছে শুধু। আর পড়ে আছে রাণী স্বয়ং, এবং কাচ্চাবাচ্চা সহ ক’জন নার্স। এরকম চাক ফেলে পালানো একদম অশ্রুতপূর্ব ছিল তা নয়, মৌ-পালকদের আসলে চিন্তায় ফেলেছিল এই মড়কের ব্যাপ্তি। দলে দলে মৌমাছি চাক ছেড়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে, আর ফিরে আসছে না। আশপাশের চাক থেকে যে পরিত্যক্ত, মৌ ভরা চাক লুঠ হবে, তাও হচ্ছে না। এই ফেনোমেননের নাম হয়ে গেল কলোনি কোলাপ্স ডিজঅর্ডার। ইওরোপে এই সমস্যা দেখা যাচ্ছিল নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকেই, গত দশকের শেষের দিকে CCD এশিয়া আর আফ্রিকার কিছু দেশেও দেখা দিল, হয়ে উঠল একটি বিশ্বজনীন প্রশ্ন। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৬ থেকে ২০১৩ সময়কালের মধ্যেই CCD প্রায় ১০ মিলিয়ন মৌমাছি-কলোনি খালি করেছে।

সিসিডি-র কারণ প্রশ্নাতীতভাবে নির্দিষ্ট করা না গেলেও গবেষকদের একটা বড় অংশের কাছে প্রধান অভিযুক্ত হল এক ধরণের কীটনাশক যাদের বলা হচ্ছে নিও-নিকোটিনয়েডস। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকেই ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় এদের। সময়টা ইওরোপে সিসিডি-র আবির্ভাবের সাথে দিব্যি মিলে যায়। পরবর্তী গবেষণা থেকে জানা গেছে এই রাসায়নিকগুলি মৌমাছিদের নেশাগ্রস্ত করতে পারে, যার ফলে তারা হারিয়ে ফেলতে পারে তাদের চাকে ফিরে যাওয়ার ক্ষমতা।

মৌমাছিদের ওপর নিও-নিকোটিনয়েডের প্রভাব খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৮ থেকে। এদের বাতিল করতে চেয়ে পরিবেশবিদ ও মৌ-পালকদের চাপ বাড়তে থাকে ও ২০১২ সালে ইওরোপীয়ান ইউনিয়ন এ ব্যাপারে রিপোর্ট তলব করে ইওরোপীয়ান ফুড সেফটি অথরিটি (EFSA)র কাছে। এই রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয় নিও-নিকোটিনয়েড মৌমাছিদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক, এবং এই কীটনাশক গ্রুপটির নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রস্তুতকারক সংস্থার (যাদের মাঝে বেয়ার ছিল) পেশ করা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের তথ্যের মাঝে আছে প্রচুর ফাঁক। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০১৩ সালে ইওরোপীয়ান ইউনিয়ন নিও-নিকোটিনয়েডের ব্যবহার সীমিত করার ব্যবস্থা নেয়। এরপর চলতে থাকে টানাপোড়েন। বেয়ার বুক ঠুকে দাবি করে তাদের প্রোডাক্ট মৌমাছিদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু লবিবাজি সত্ত্বেও ২০১৮-র এপ্রিলে ইওরোপীয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলি প্রধান তিনরকম নিও-নিকোটিনয়েড পুরোপুরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আরও একটি ভালো খবর হল, ইওরোপের বাকি দেশগুলোর ওপর এক কাঠি এগিয়ে থেকে ফ্রান্স সমস্তরকম নিও-নিকোটিনয়েডেরই ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ই.ইউ. কর্তৃক নিষিদ্ধ তিনটে তো বটেই, তার সাথে অ্যাসিটামিপ্রিড আর থায়াক্লোপ্রিডও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ফ্রান্স গত বছরের অক্টোবর মাসে, এবং সেটা শুধু খোলা মাঠে চাষের ক্ষেত্রে নয়, গ্রিনহাউসের মধ্যেও। ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্তে অনেক চাষি এবং বেয়ারের মত কীটনাশক প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি স্পষ্টতই ক্ষুব্ধ। কিন্তু মৌ-পালক আর পরিবেশকর্মীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সদর্থক বলে মনে হতে বাধ্য। মানুষ টিকে থাক প্রজাতি হিসেবে–এটা না চেয়ে উপায় নেই। সাথে মৌমাছিরাও টিকে থাকুক না হয়। আইনস্টাইনের ভবিষ্যৎবাণীর সত্যতা যাচাই যেন আমাদের হাতেকলমে না করতে হয়।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...