সুশীল চৌধুরী (১৯৩৭-২০১৯)

সুশীল চৌধুরী

হাসিবুর রহমান

 

খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ভারতীয় ইতিহাস জগতের কয়েকজন খ্যাতনামা ইতিহাসবিদদের জীবন-পাতা ঝরে পড়ল; মুশিরুল হাসান, অনিরুদ্ধ রায় ও অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী। প্রায় সকলের চোখের অন্তরালে এক অভিমানী মন নিয়ে গত ২৩শে জানুয়ারি গভীর রাতে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী চলে গেলেন। সন্দেহ নেই তিনি বর্তমান সময়ের একজন আন্তজার্তিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশিষ্ট অর্থনীতিক ইতিহাসবিদ।

প্রাক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির সময়ে ১৯৩৭ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর তৎকালীন বর্মার ছোট্ট বন্দর শহর আকিয়াবে জন্মগ্রহণ করেন। যদিও খাতায় কলমে অবিভক্ত চট্টগ্রামের রাউজানের সুলতানপুর গ্রামে তাঁর জন্মস্থান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর পিতা নগেন্দ্রনাথ চৌধুরী বর্মার কাস্টমস অফিসে হেডক্লার্ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাতা ইন্দুবালা চৌধুরী ছিলেন গৃহবধূ। তাঁর জন্মের তিন দশক আগে থেকে পিতার কর্মসূত্রে তাঁদের পরিবার আকিয়াব শহরে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে অনেক পরিবারই বর্মার বিভিন্ন শহরে কর্মসূত্রে থাকতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর পরিবারকে খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে ফিরতে হয়। সুলতানপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করে স্থানীয় রাউজান হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে বৃত্তি পরীক্ষায় সমগ্র চট্টগ্রাম জেলায় প্রথম স্থানাধিকার করেন। এই স্কুলেই তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাসে প্রথম স্থান দখল করেছিলেন। দেশভাগের কুপ্রভাব থেকেও তাঁর পরিবার রক্ষা পায়নি, ফলে ১৯৪৭ সালে দ্বিতীয়বার জন্মভূমির বাঁধন ছিঁড়ে কলকাতায় পাড়ি দেন। কলকাতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৫০-১৯৫১ ‘ম্যাট্রিকুলেশন’ পরীক্ষায় সারা বাংলায় স্ট্যান্ড করলেন, প্রেসিডেন্সিতে আইএসসি গণিতে দুশোয় একশো নিরানব্বই পেয়ে সেরা ছাত্র হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। ইতিহাস নিয়ে বিএ তে প্রথম শ্রেণি পান। প্রথম বর্ষে প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র নির্বাচনে তিনি প্রার্থী  হন, এবং জয়লাভ করেন। অবশ্যই এই নির্বাচনে তিনি  বিশেষ আগ্রহীও ছিলেন না। আজকের নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র, ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র হিসেবে অমর্ত্যবাবু সুশীলবাবুকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন।

যাই হোক, ১৯৫৬ সালে সুশীল চৌধুরী ইতিহাসে এমএ ক্লাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। তাঁর সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ-তে ক্লাস করতেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিনহা,  ত্রিপুরারি চক্রবর্তী, মাখনলাল রায়চৌধুরী, অনিল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ খ্যাতনামা অধ্যাপকরা। ১৯৫৬ সালে হুগলি মহসিন কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবনে শুরু করেন, পরে সাময়িক কালের জন্য মহসিন কলেজ ছেড়ে কলকাতার আশুতোষ কলেজ, এবং অবশেষে এক বছরের মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক রূপে যোগদান করেন। দীর্ঘ চারদশকের অধিক সময় অধ্যাপনা করেছেন আর তার পাশপাশি ইতিহাসের মৌলিক গবেষণা  করেছেন।

অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে বিভাগীয় প্রধান ছাড়াও উক্ত বিভাগে চেয়ার প্রফেসর পদে আসীন ছিলেন।

উনিশ ষাটের দশকে লন্ডন ইউনিভর্সিটিতে অধীন ঐতিহাসিক কেন এন চৌধুরীর কাছে ‘স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ’-র (সোয়াস) ‘মধ্যযুগে বাংলার ব্যবসা বাণিজ্য ইতিহাস’ নিয়ে তাঁর গবেষণা। পরবর্তীকালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পড়িয়েছেন, অংশ নিয়েছেন অসংখ্য ন্যাশনাল ইন্টারন্যাশনাল সেমিনারে। প্যারিসে দু’বার আন্তর্জার্তিক সম্মেলের আয়োজক ছিলেন। গবেষণার সুবাদে দেশে ও বিদেশে খ্যাতনামা ঐতিহাসিকদের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করেছিলেন। রমেশ চন্দ্র মজুমদার, ইরফান হাবিব, নুরুল হাসান, শিরিন মুশাভি, সতীশ চন্দ্র, হরবংশ মুখিয়া, ওমপ্রকাশ, সুমিত সরকার, তপন রায়চৌধুরী, বাংলাদেশের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মমতাজুর রহমান তরফদার, আব্দুল করিম, সিরাজুল ইসলাম, ইউরোপে কে এন চৌধুরী, মরিস এমার, ডগলাস নর্থ, এ এল বাশাম, পিটার মার্শাল, নিল গার্ডস, রিচার্ড এম ইটন সহ অসংখ্য স্কলারদের সঙ্গে কাজ করেছেন।

এছাড়াও দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিক ইতিহাসবিদ হিসেবে আর্জেন্টিনার বুয়েনস এয়ারসে ভারতীয় প্রতিনিধিত্ব করেন। রয়াল হিস্টরিকাল সোসাইটি ইংল্যান্ডের ফেলো এবং ভারতের ইউজিসি এমিরেটাস ফেলো। ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় তাঁর গবেষণামূলক প্রায় কুড়িটি গ্রন্থ আন্তর্জাতিক মহলে সমাদৃত। এগুলির অন্যতম হল ‘ফ্রম প্রসপারিটি টু ডিক্লাইন : এইটটিন সেঞ্চুরি বেঙ্গল’ ‘প্রিলুডটু এম্পোয়ার :প্ল্যাসি রেভ্যঅবলিউশন 1757’, ‘কোম্পনিজ কমার্স এ্যান্ড মার্চেন্টস : বেঙ্গল ইন প্রিকোলোনিয়াল এরা’, ‘সোসাইটি পলিটিক্স ট্রেড’, প্রোফাইল অব এ্যা ফরগটন ক্যাপিটল: মুর্শিদাবাদ’, ‘নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ’, ‘পলাশির অজানা কাহিনী’, ‘সমুদ্র বাণিজ্যের প্রেক্ষিতে স্থলবাণিজ্য’, ‘পৃথিবীর তাঁত ঘর বাংলার বস্ত্র শিল্প ও বাণিজ্য’, ‘অকপট’ প্রমুখ। ধর্মনিরপেক্ষ, আপোষহীন ইতিহাস চর্চায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

সুশীল চৌধুরী

এশীয়, বা ভারত মহাসাগরে সমুদ্র বাণিজ্যের ইতিহাস নিয়ে সুশীল চৌধুরীর কাজ উচ্চ প্রশংসাযোগ্য, সেইসঙ্গে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস ইতিহাসের নতুন কিছু দিক তিনি উম্মোচিত করেন।

প্রথাগতভাবে জনমানসে এমনকি ঐতিহাসিক মহলে অবিচল ধারণা যে পলাশির যড়যন্ত্র ভারতীয়দের তৈরি, বাংলার নবাবদের বিরুদ্ধে দেশীয় অমাত্যরা লিপ্ত হয়ে ক্ষমতার অপসারণ চেয়েছিলেন, ইংরেজরা সুযোগ বুঝে যড়যন্ত্রে লিপ্ত হন মাত্র। ইংরেজ বণিকদের ‘পলাশি বিপ্লবে’ কোনও পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না।

কিন্তু অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী ইন্ডিয়া হাউসের রেকর্ড, ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিঠিপত্র, হল্যান্ড-এর আলখামেইন রেকস আরখিফে’ মহাফেজখানায় সপ্তদশ, অষ্টাদশ শতকের ডাচ রেকর্ড দিয়ে বলেন যে পলাশি বিপ্লব ছিল ইংরেজদের পূর্বপরিকল্পিত কর্মসূচি, বাংলার অমাত্যরা অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বিপ্লবের শেষ মুহূর্তে যোগদান করেছেন। নবাবের দরবারি অমাত্যরা স্বতস্ফুর্তভাবে যড়যন্ত্রে লিপ্ত না হলেও ইংরেজ বণিকরা ছলে বলে কৌশলে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেনই।

তাছাড়া সিরাজ চরিত্রে কলঙ্কলেপনের জন্য শুধু ইংরেজ ঐতিহাসিকরাই নন, কোম্পানির তদানীন্তন পর্যবেক্ষকরাও সিরাজের চরিত্রকে জঘন্যভাবে উপস্থাপিত করেছেন। পলাশির পঁচিশ ত্রিশ বছর পর কোম্পানির ভারতীয় কর্মচারী গোলাম হুসেন সেলিমকে মোটা অর্থের বিনিময়ে ‘রিয়াজুস সলাতিন’, ও গোলাম হুসেন তাবতাইকে দিয়ে ‘সিয়ার উল মুতাক্ষারীন’ গ্রন্থ রচিত করলেন। লিউক স্ক্রাফটন, কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠি প্রধান জাঁ ল প্রমুখ কর্তাব্যক্তির লেখনীতে সিরাজ চরিতের কদর্য রূপ ফুটে উঠেছে। প্রত্যেকটা লেখনীতে সত্য মিথ্যার জাল এমনভাবে বোনা হয়েছে যে ব্যক্তি সিরাজ ও নবাব সিরাজকে অনুধাবন করতে সাধারণ পাঠক থেকে ঐতিহাসিকদের দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে।

অক্ষয় কুমার মৈত্র, শচীন সেনগুপ্ত সিরাজের অপবাদ ঘোচাতে যা লিখেছেন তা জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষিতে দেশীয় ভাবাবেগ। উনিশো ষাটের দশকে ব্রিজেন গুপ্ত উপরের বক্তব্য খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তিনি সব প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হননি। যতদূর মনে হয় তাঁদের পক্ষে বিদেশের আর্কাইভসে গবেষণা করাও সম্ভব ছিল না। কিন্তু এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সুশীল চৌধুরী ব্যতিক্রমীভাবে সিরাজউদ্দৌলার নামে এই অপবাদগুলি যথাযথ প্রমাণ সাপেক্ষে খণ্ডন করেছেন। সুশীলবাবুর যুক্তি হল ইংরেজরা বেশ পরিকল্পিতভাবেই মুর্শিদাবাদের দরবারি অমাত্য, ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে নানা প্রলোভন ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে পরিকল্পনায় সামিল করে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে নবাবের দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একটা অংশ সিরাজের উপর বিরূপ হয়ে চক্রান্তে হাত মিলিয়েছিল। কিন্তু সুশীলবাবুর স্পষ্ট বক্তব্য যে ইংরেজদের নেতৃত্বেই পলাশি চক্রান্ত পূর্ণ অবয়ব পেয়েছিল এবং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই চক্রান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না বা বাংলার নবাবের পতন ঘটত না।

সাম্প্রতিক কালে ২০১২ সালে ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে রচিত “সিরাজের পুত্র ও বংশধরদের সন্ধানে” গ্রন্থটিতে  সিরাজ চরিত্রের এক অন্ধকার দিকের কথা বলা হয়েছে যে যুগল কিশোর দে নামে তাঁর এক অবৈধ সন্তান ছিল। সাধারণ পাঠক সমাবেশেও এই তথ্যটি এক বিভ্রান্তির সূচনা করে।

গ্রন্থটি ঐতিহাসিক সুশীল চৌধুরীর নজরে এলে তিনি স্তম্ভিত ও বিস্মিত হন। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, পুস্তকটি প্রামাণ্য ইতিহাস বলে বিবেচিত নয়।

নিখিল নাথ রায় কিংবা যদুনাথ সরকারের গ্রন্থেও সিরাজের বংশধরের নিয়ে কোনও তথ্য প্রদান করা হয়নি। কিন্তু অধ্যাপক দে সেকেন্ডারি কিছু অনির্ভরযোগ্য তথ্য ব্যবহার করে বিকৃত ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

কে এই যুগল কিশোর? যদি তথ্য যথার্থভাবে যাচাই না করে ইতিহাস রচনা করা হয় তবে তা  বিকৃত হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেবে নানা উপকথার, তাঁকে ঘিরে তৈরি হবে থ্রিলার বা রোমাঞ্চকর কাহিনী।

দ্বিতীয়ত বাংলার নবাব সিরাজকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন- আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে সিরাজ অপরিণত বয়সে সিংহাসনে আসীন হন, এবং নবাব হওয়ার পর তাঁর মধ্যে চারিত্রিক কলুষতা দেখা যায়নি। বিবেচক পাঠক হিসেবে তাঁর নবাব হওয়ার আগের নৈতিক চরিত্র নিয়ে তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত নয়। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই নবাবি পদে আসীন হওয়ার পরবর্তী সিরাজ ক্ষমার অযোগ্য্য অপরাধ করেছেন তবে তা ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায় বিবেচিত হবে। ওই সময়ে তাঁর চারিত্রিক দোষত্রুটি সমকালীন বাংলার জনমানসে কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে বলে কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। সর্বোপরি তিনি চৌদ্দ মাসের শাসনামলে সর্বশক্তি দিয়ে ইংরেজ বণিকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। প্রিয় দেশভূমির তাঁর ত্যাগ, জীবনদান মানুষ তাঁকে যুগে যুগে সম্মান, মর্যদা দিয়ে এসেছে। তাই নবরূপে নিষ্কলুষ সিরাজকে বাংলার ইতিহাসে তিনি স্বমর্যাদায় আসীন করে অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী বিকৃতির বলয় ভেদ করে ইতিহাসকে রক্ষা করেছেন। এই অনন্য কৃতিত্ব ইতিহাসবিদ সুশীল চৌধুরীর প্রাপ্য আছে বৈকি, যার জন্য দেশবাসী তাঁকে চিরকাল মনে রাখবেন।

অ্যাকাডেমিক সুশীল চৌধুরী, আর ব্যক্তি সুশীল চৌধুরীর মধ্যে মিল অমিল দুইই আছে। বাইরের থেকে দেখলে মনে হতো তিনি এক বজ্রকঠিন স্বভাবের অধ্যাপক কিংবা একজন দক্ষ পেশাদার ঐতিহাসিক। আমরা তাঁকে চাকরি জীবনের প্রায় শেষ লগ্নে পেয়েছিলাম, তখনও যেন তিনি আমাদের মতোই যুবা। চালচলন, কথাবার্তায় এক অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পেত। ডিপার্টমেন্টে কোনও অনুষ্ঠান হলে তিনি সর্বদা ছাত্রদের পক্ষ নিতেন যে কারণে ছাত্রছাত্রী মহলে একটা বাড়তি জনপ্রিয়তা সবসময়ই ছিল। স্যারের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কাউকে বাইরে ঘুরতে কখনও দেখিনি, যদিও তিনি এসব নিয়ে আমাদের বিশেষ কিছু বলতেন না। মঞ্চে সর্বদা ঝড়ো বক্তৃতা দিতেন, ঠোঁটের ডগায় ইংরেজি বলতেন, শব্দ উচ্চারণেও একটা বিলেতি ভাব লক্ষ করা যেত, যদিও বা ইতিহাসচর্চায় তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ ঘরানার প্রবল বিরোধী।

আমাদের ভাল লাগত যে ডিপার্টমেন্টের অনুষ্ঠান ঘিরে মাঝেমাঝেই মজলিসী আড্ডা জমে যেত, আর তখন রাশভারী সুশীল চৌধুরী একটার পর একটা গল্পে আসর জমিয়ে দিতেন। সুশীলবাবু ভীষণই বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ ছিলেন। ছাত্রছাত্রীদের দেহের ভাষা, মনের ভাষা দুই-ই এক পলকে বুঝতে পারতেন।

তাঁকে সামনে রেখে আমরা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে সেমিনার সিম্পোজিয়াম, পিকনিক, ট্যুর, সবই করেছি। ২০০০ সালে আমরা ডিপার্টমেন্ট থেকে সে বছর শিক্ষামূলক ভ্রমণে গিয়েছিলাম, যদিও বা সুশীলবাবু আমাদের সঙ্গে ওই সময়ে ছিলেন না। উনি তখন প্যারিসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক হিষ্ট্রি কংগ্রেসের দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত, আবার ফিরে এসেই কলকাতায় ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেসে যোগ দিলেন। কয়েকদিন পরে আমাদের ট্যুরের কিছুটা সাশ্রয় হওয়া অর্থে গড়িয়াহাটের বেদুইন রেস্টুরেন্টে বিরিয়ানি খেতে গেলাম। আমাদের সঙ্গে স্যারকে যেতে রাজি করলাম, উনিও এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। সুশীলবাবু খুব খেতে ভালবাসতেন, উনি বলতেন লোকে বাঁচার জন্য খায়, আর আমি খাওয়ার জন্য বাঁচি। সেদিন উনি আমাদের সাথে দু’প্লেট বিরিয়ানি খেলেন। পরের বছর শীতে আমরা ডিপার্টমেন্টে দুই বর্ষের ছাত্রছাত্রী ও স্যাররা মিলে হইহই করতে করতে ফলতায় পিকনিকে গেলাম। গঙ্গার ধার, ভীষণ মনোরম জায়গা। উনি খাদ্যরসিক, সেইসঙ্গে গল্প রসিকও, দিনভর নানা মজার মজার গল্পে দিনটা উপভোগ্য করে তুললেন।

বাঙালিরা চাকরি থেকে অবসর নিলে মানসিকভাবে সাধারণত বুড়িয়ে যায়, কিন্তু সুশীলবাবুকে দেখেছি অবসরের পর তাঁর অধিকাংশ সেরা বইগুলো রচনা করেছেন, তাঁর কাছে বয়স ছিল নিতান্তই একটা গাণিতিক সংখ্যা মাত্র। আমি তাঁকে বহুবার মুর্শিদাবাদে নিয়ে গেছি বিভিন্ন সেমিনারে বক্তৃতা করার জন্য। শেষবার ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারিতে বহরমপুরে ‘মুর্শিদাবাদ ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রে’ বার্ষিক সভায় বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন। আমি ওনাকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, স্যার আপনার যথেষ্ট বয়স হয়েছে, আপনি চাইলে কলকাতা থেকে আমি সঙ্গে থাকতে পারি। উনি বললেন: না ..না .. ওসব কোনও দরকার নেই, আমি একাই আসতে পারব, কিছু ভেব না। ইদানিং কলকাতার বাইরে গেলে খুব পরিমিত আহার করতেন, একটা সিদ্ধ, মাছ ভাজা আর একটু ডাল হলেই খুশি হতেন। মধ্যাহ্ন আহারের পর একটু পাকা পেঁপে খেতে পছন্দ করতেন। সত্যি কথা বলতে কী, শেষ জীবনে মুর্শিদাবাদে মানুষের আবদারে বার তিনি এসেছেন। একজন লব্ধ ঐতিহাসিক হিসেবে নিজের শত কাজ জলাঞ্জলি দিয়ে বারবার মুর্শিদাবাদে পা রেখেছেন, তাই মুর্শিদাবাদের প্রতি তাঁর যে একটা বিশেষ দূর্বলতা ছিল তা বোঝা যায়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে জেলার ইতিহাস বলয়ের বাইরের সাধারণ মানুষও তাঁকে এক কথায় চিনতেন। মুর্শিদাবাদ জেলাবাসী তাঁকে সেই অর্থে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে কুণ্ঠিত হননি। বহরমপুর শহরের বিশিষ্টজনদের মাঝে উজ্জ্বল উপস্থিতিতে তিনি সর্বদা সম্মানিতবোধ করেছেন। আবার স্যারের ইউরোপের বন্ধুরা কেউ ভারতে এলে তাঁদের মুর্শিদাবাদে বেড়াতে আসার জন্য পীড়াপীড়ি করতেন। মুর্শিদাবাদের মাটি, মুর্শিদাবাদ তথা স্বাধীন বাংলার ইতিহাস তাঁকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কুর্নিশ করেছে এবং চিরকাল করবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1249 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...