আল মাহমুদ : যে নদী মরুপথে

আল মাহমুদ

সরদার ফারুক

 

কবি আল মাহমুদকে নিয়ে লিখতে গেলে  তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের বিবর্তন বা রূপান্তরের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। লোক লোকান্তর, সোনালী কাবিন, কালের কলস লিখে যিনি বাংলা কবিতার ঐতিহ্যের ধারাকে পুষ্ট করেছেন, সেই কবিই আবার ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ থেকে বদলে যেতে থাকেন। একসময় এই যাত্রা ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’-তে এসে অন্য এক গন্তব্যে গিয়ে থেমে যায়।

যে কবি একদা লিখেছিলেন:

আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণির উচ্ছেদ,
এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ
যেন না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ।

সেই একই কবি ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’য় লেখেন:

মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে
মনে হয় রক্তই সমাধান
বারুদই অন্তিম তৃপ্তি
আমি তখন স্বপ্নের ভেতর জিহাদ জিহাদ বলে জেগে উঠি।

একটি প্রাণোচ্ছল নদী বাংলার জনপদ, মাঠ, মায়াবী নিসর্গের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে হতে কী করে মধ্যপ্রাচ্যের মরুপথে হারিয়ে গেল— সে কথা ভেবে পাঠককুল বিস্মিত ও ব্যথিত না হয়ে পারেন না।

আল মাহমুদ

অবশ্য আরেকটি গোষ্ঠী কবিকে তাদের চিন্তাজগতের নিকটবর্তী হতে দেখে উল্লসিত হন, তবে তারা আদৌ কবিতার পাঠক নন। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন একজন কবি কি আস্তিক বা ধর্মবিশ্বাসী হতে পারেন না? এই প্রশ্নের জবাবে বলা যায়– অবশ্যই পারেন, তবে তিনি সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় উগ্রবাদী হতে পারেন না। আল মাহমুদের সার্থক কবিতাগুলি তাঁর সাম্যবাদী পর্যায়ের লেখা। সোনালী কাবিনের সনেটগুচ্ছের প্রতিটি পঙক্তিতে কৌমসমাজ, নারীর প্রতি বৈষম্যহীন সমাজ এবং আনন্দের দিকে যাত্রার কথা লেখা আছে।

চর্যাপদ, মধ্যযুগের গীতিকবিতা থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের কবিতার যে ঐতিহ্যিক ধারা, আল মাহমুদ তাঁর সাম্যবাদী পর্বে সেই ধারাটির একজন সফল রূপকার। বাংলার লোকাচার ও লোকধর্মকে তিনি যেভাবে কবিতায় তুলে ধরেছেন, তার তুলনা সমগ্র বাংলাসাহিত্যেই বিরল। একদিকে গ্রামীণ শব্দের ব্যবহার, অন্যদিকে আধুনিক কবিভাষা তাঁকে অনেকটাই অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে।

পরবর্তীতে তাঁর সাম্প্রদায়িক পর্যায়ের কবিতা ঘৃণা ও বিদ্বেষে পরিপূর্ণ, ফলে পাঠক সেসব লেখার কথা ভুলে যেতে চান। একটা কবিতাংশ উদ্ধৃত করা যায়:

আমাদের রাজ-রাজড়াদের পাপে তুমি যেন আমাদের ধ্বংস করে দিও না।
কেন এক প্রাচীন তৌহীদবাদী জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার রজ্জু
তুমি পরাক্রান্ত পৌত্তলিকদের হাতে তুলে দিতে চাও?
আমরা কি বংশানুক্রমে তোমার দাস নই?
আমরা তোমার নামের কোনো জেহাদেই অতীতে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিনি।
……

আমরা তো চুপ করেই আছি, তবু হে পরোয়ারদিগার
জানতে সাধ জাগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি ডাকাতদের গ্রাম?
বাল্যে যেমন কোনো গাঁয়ের পাশ দিয়ে নাও বেয়ে ফিরতে গেলে
মুরুব্বীরা বলতেন, ওপথে যেও না অমুকটা হলো ডাকাতের গ্রাম।

(কদর রাত্রির প্রার্থনা/একচক্ষু হরিণ)

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে প্রতিটি সামরিক স্বৈরাচারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে, এবং স্বাধীনতাবিরোধী জামাতকে নৈতিক সমর্থন দিয়ে কবি আল মাহমুদ নিজেকে বিতর্কিত করে তোলেন। এভাবেই এই শক্তিমান কবি মরুভূমির চোরাবালিতে ডুবে গিয়ে আমাদের আশাহত করেন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1371 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...