যুবরাজ ও বঙ্গললনা

যুবরাজ ও বঙ্গলললনা

স্বাতী মৈত্র

 

আগের পর্বের পর

যুবরাজ-বঙ্গললনা অধ্যায় সম্পর্কে অধ্যাপিকা জয়িতা দাস তাঁর পর্দাপুরাণ গ্রন্থে লিখেছেন,

…ভদ্রলোককে [অর্থাৎ, জগদানন্দ মুখার্জি] সাহসী বলতে হবে। এই পরিস্থিতিতেও তিনি ভয় না পেয়ে যুবরাজকে আমন্ত্রণ জানালেন তাঁর অন্তঃপুরে। সমস্ত শহরে হইরই কাণ্ড। মুখার্জিদের অন্তঃপুরেও এর আগে অনাত্মীয় পুরুষ তো দূরের কথা, বাড়ির অবিবাহিত পুরুষরা প্রবেশ করেননি। সেই অন্তঃপুরে কি না এবার পা পড়বে এক বিধর্মীর। তা হলই বা রাজারাজড়ার বংশধর। ঘোর কলি না হলে এমন হয়!

দলাদলির টানাপোড়েন-সমাজ ও সংস্কারের ভীতি, এই সমস্ত কাটিয়ে বাবু জগদানন্দ তাঁর পরিবারের জেনানা মহলে যে এ হেন কাণ্ড ঘটাতে পেরেছিলেন, সেটা তাঁর সাহসের পরিচয় নিশ্চয়। ক্ষমতার অলিন্দের আরও কাছাকাছি আসবার লোভেই যদি তিনি এতে সম্মতি দিয়ে থাকেন, তাহলেও বাংলায় পর্দা প্রথা (ও প্রথাভঙ্গের) ইতিহাসে এ ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই।

জয়িতা দাসের কলমে আমরা মুখার্জি বাড়িতে বার্টি-অভ্যর্থনার একটি সুন্দর চিত্র পাই। তিনি লিখেছেন,

এসব আলোচনায় [পড়ুন, সমালোচনা] তখন কান দেবার সময় ছিল না জগদানন্দের। পনেরো দিনের মধ্যে যুবরাজের অভ্যর্থনার জন্য প্রস্তুত হতে হবে তাঁকে। আপ্যায়নে কোনও ত্রুটি তিনি রাখতে চান না। তা সুন্দর ব্যবস্থাই করেছিলেন জগদানন্দ।

অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ভারতে পা দেওয়ার ঠিক বিশদিন পর, ৩ জানুয়ারি ১৮৭৬ সনে যুবরাজকে নিয়ে এক জমকালো শোভাযাত্রা পৌঁছাল জগদানন্দের বাসগৃহের সামনে। সাহেব-মেমসাহেবদের নিয়ে সে এক বিরাট দল।

এই প্রথম কোন বিধর্মীপুরুষের পা পড়ল হিন্দু-অন্তঃপুরে। আর সেই বিধর্মী যে সে ব্যক্তি নন — তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভাবী সম্রাট, পরে যিনি বিখ্যাত হবেন সপ্তম এডওয়ার্ড নামে। বাংলা দেশের পর্দা ভাঙার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লেখা হল।

তা শর্ত অনুযায়ী সঙ্গীদের বাইরে রেখে যুবরাজ একাই প্রবেশ করেন জেনানা মহলে। অন্তঃপুরের মেয়েরা প্রাচ্য ধরনে যুবরাজকে স্বাগত জানালেন। জগদানন্দের স্ত্রী আর বাড়ির অন্যান্য মেয়েরা এগিয়ে এসে দেশীয় প্রথায় শঙ্খ আর উলুধ্বনি দিয়ে প্রিন্স অফ ওয়েলস্‌কে বরণ করলেন। যুবরাজ মেয়েদের এই আচার-অনুষ্ঠান দেখে খুব খুশি।

তবে বিরক্ত হয়েছিলেন বড়লাট নর্থব্রুক সাহেব। ব্রিটিশরা আদব-কায়দায় দুরস্ত। মেয়েদের সম্মানের জন্য তাঁরা প্রাণ দিতে পারে। শোনা যায় যুবরাজের সঙ্গী মেমসাহেবদের বারমহলে রেখে একা অন্তঃপুরে প্রবেশ করায় লাটসাহেব পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন।

নর্থব্রুক শেষমেশ ১৮৭৬ সালেই ভারত ছাড়েন, যদিও তাঁর দেশে ফেরার পিছনে কারণ এটাই ছিল কি না জানা যায়নি! সন্দেহ হয়, বার্টির এ হেন বেয়াড়া আবদারের পরে ভারতীয় মেয়েদের পর্দাভঙ্গ ও লজ্জাশীলতা নিয়ে নর্থব্রুক যতটা না চিন্তিত হয়েছিলেন, তার থেকে বেশি চিন্তিত হয়েছিলেন বার্টির নারীঘটিত সুনাম মাথায় রেখে। মহারানি ভিক্টোরিয়ার দুঃস্বপ্ন সফল করে যুবরাজ যদি সত্যিই মই বেয়ে জেনানা মহলে ঢুকে (বা এক্ষেত্রে, রীতিমত লাল কার্পেটে হেঁটে সসম্মানে জেনানা মহলে ঢুকে) যদি কোনও কেলেঙ্কারি বাঁধান, তার দায় কেনই বা নিতে চাইবেন বেচারা ভাইসরয়?

কলকাতার অভিজাত বর্ণ হিন্দু সমাজে এ হেন কুরুক্ষেত্রটি বাঁধিয়ে দিয়ে বার্টি খোশমেজাজে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ডি.এল’ (ডক্টর ইন ল) খেতাব নিয়ে শহর ছাড়লেন। জেনানা জয়ের পর সে বিষয়ে নেটিভরা কী ভেবেছিল, এরকম কিছু জানবার ইচ্ছা যদি বার্টির কোন সময় হয়েও থাকে, তার খোঁজ ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায় না।

যুবরাজ ও বঙ্গললনা

ভারতীয়দের যুবরাজ অভ্যর্থনা; বসন্তক

*****

যুবরাজ-ঘটিত কুরুক্ষেত্র ও তৎকালীন কলরবের মাঝেও বসন্তক পত্রিকার আঁকায়-লেখায় ক্ষুরধার ব্যঙ্গ বিশেষ আলোচনার দাবি করে।

হাটখোলার দত্তবাড়ির প্রাণনাথ দত্ত-সম্পাদিত বসন্তক পত্রিকা প্রকাশ হয়েছিল মাত্র বছর আড়াই (১৮৭৪-১৮৭৬), তবে এই স্বল্প সময়েই বসন্তক-এর ব্যঙ্গ ও গিরীন্দ্রকুমার দত্তের অনবদ্য ইলাসট্রেশন এই পত্রিকাকে যথেষ্ট জনপ্রিয় করে তোলে। গিরীন্দ্রকুমার স্কুল ফর ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্টে মিস্টার রিগো নামক জনৈক শিক্ষকের কাছে কাঠখোদাই, স্কেচিং ও লিথোগ্রাফি শিখেছিলেন। এ ছাড়াও প্রাণনাথ ও গিরীন্দ্রকুমার দুজনেই নিয়মিত লেখালিখি করতেন। চিৎপুর থেকে প্রকাশিত (পত্রিকার পাতায় ঠিকানা পাওয়া যায় ‘চিৎপুর রাস্তার ৩৩৬ নং ভবন’, মুদ্রিত হত গরাণহাটা ৩৩৬ সুচারু যন্ত্রে) বসন্তক-এর পাতায় পাতায় সে সময়ের দলাদলির ছাপ সুস্পষ্ট। আগেই বলেছি, সে সময়ে ভারতীয়দের পক্ষে খুব উঁচু পদ পাওয়া সম্ভব ছিল না, তাই যতটুকু পাওয়া যেত, তাই নিয়েও কাড়াকাড়ি পরে যেত। যেমন, ডেপুটি কালেক্টরের পদ, অথবা জাস্টিস অফ পিস পদে মনোনীত হয়ে পুরসভা পরিচালনার কাজে যুক্ত হওয়া— সেই নিয়েই তুমুল প্রতিযোগিতা চলত দলগুলোর মধ্যে। প্রাণনাথ রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্রের স্নেহধন্য ছিলেন। রাজা রাজেন্দ্রলাল কলকাতা পৌরসভার জাস্টিস অফ পিস পদে ১৮৬৩ থেকে ১৮৭৬ অবধি ছিলেন, এবং ১৮৭৬ সালে তিনি পৌরসভার একজিকিউটিভ কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। রাজেন্দ্রলাল-বিরোধীদের (যেমন হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্টদাস পাল) প্রাণনাথ ছেড়ে কথা বলতেন না, রাজেন্দ্রলালের অনেক মতামত (যেমন নেটিভ করদাতাদের পৌরসভার ভোটে অংশগ্রহণ করতে দেওয়ার দাবি) বসন্তক-এর সম্পাদক সমর্থন করতেন। বসন্তক-এর ভাষা যে সর্বদা মার্জিত ছিল তা নয়, ব্যক্তি আক্রমণ করতেও দ্বিধা করতেন না সম্পাদক প্রাণনাথ! সম্ভবত এই কারণেই সুকুমার সেন বলেছিলেন “[বসন্তক] কলকাতার কায়েতদের গালাগালি আর খিস্তি-খেউরের কাগজ।”

এ হেন “গালাগালি আর খিস্তি-খেউরের কাগজ” যে মহামান্য যুবরাজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে ব্যস্ত হয়ে পড়বে না, এ আর আশ্চর্য কী। বার্টির ভারতযাত্রা ও আনুষঙ্গিক জাঁকজমক প্রসঙ্গে বসন্তকের কলম তাই ক্ষুরধার, নির্মম। ভারতীয় রাজাদের বার্টিকে সংবর্ধনা ও উপহার দেওয়ার হিরিক নিয়ে বসন্তক-এর পাতায় পাতায় ব্যঙ্গ, নিস্তার পাননি যুবরাজ স্বয়ং। উদাহরণ স্বরূপ, বম্বের বন্দরে নামবার পর যুবরাজের সংবর্ধনার বর্ণনার একটি অংশ, ‘বসন্তক’ নামক সূত্রধর চরিত্রটির জবানিতে:

যুবরাজ ত্বরায় পকেট-বুক বাহির করিয়া লিখিলেন — “উদয়পুরের মহারাণাদের চক্ষু অতি বৃহৎ ও কটমোটে, দেখিলে ভয় হয়, ঠিক যেন রোঘো ডাকাত। এমত লোকেদের এত নিকটে থাকিতে দেওয়ার তাৎপর্য কি? নর্থব্রূককে জিজ্ঞাসা করিব, অতি অন্যায়।”

এমন সময় নিজামের প্রতিনিধি সার সালার জংকে লাট সাহেব (ইন্ট্রডিউস) পরিচিত করিয়া দিলেন।

যুবরাজ অগ্রসর হইয়া করমর্দন করিলেন। দুএকটা মিষ্টালাপ করিয়া ফিরিয়া চাহিলেন।

পুনর্বার নোট-বুক বাহির করিয়া লিখিলেন, “নর্থব্রূককে জিজ্ঞাসার আবশ্যক নেই, এপ্রদেশের সমস্ত রাজারি চক্ষু কটমোটে।”

নোট-বুক পকেটে পূরিতে যাইতেছেন, এমত সময়ে একদম মহিলা তাহাঁর সমক্ষে পুষ্পবৃষ্টি করিতেছে দৃষ্টিগোচর হইল, দেখিয়া মনে বড় আনন্দের উদয় হইল, গদ্‌গদ্‌ ভাবে লিখিলেন, হিন্দু মহিলাচয় অতীব সুন্দরী, বেশ বিন্যাস অতি মনোহারী। আমি জানিতাম যে, হিন্দুমহিলাচয় সর্বসমক্ষে বাহির হয়না, তাহা মিথ্যা কথা, ১৫। ১৬ বৎসরের মহিলা অবধি আমার সমক্ষে বাহির হইয়াছিল।

ফ্‌য়ার সাহেব পিছন হইতে দেখিতেছিলেন, হাসিয়া কহিলেন, আবার ভুল, এরা হিন্দু নহে, পার্সী-মহিলা।

যুবরাজ বিরক্ত হইয়া কহিলেন, আঃ! কি উৎপাত! আমি যেমন শাদা নোট-বুক এনেছি, তেমতি শাদা নিয়ে ঘরে ফিরে যাবো নাকি, রাজবধূকে আমিই বা কি শুনাইব, তিনি বা কি মনে করিবেন। রাগ ভরে গাড়ীতে গিয়া উঠিলেন।

যুবরাজ সহ সমস্ত ইংরেজ পদাধিকারী এবং ভারতীয় ক্ষমতাশালীদের প্রতি বিদ্রুপ বসন্তক-এর ছত্রে ছত্রে। যুবরাজের উদ্দেশ্যে হালকা বিদ্রুপ করতে অমৃতবাজার পত্রিকাও ছাড়েনি, কিন্তু বসন্তক-এর ক্ষুরধার বিদ্রূপে যা হয়তো সব থেকে উল্লেখযোগ্য তা রমণীমোহন যুবরাজের বর্ণময় জীবনযাত্রার প্রসঙ্গ একেবারে এড়িয়ে না যাওয়া।

এ কথা ভাবার কোনও কারণ নেই যে নারী শিক্ষা বা নারী মুক্তি নিয়ে বসন্তক-এর মতামত সেই যুগের প্রগতিশীলতার উদাহরণ। বরং বসন্তক-এর ব্যঙ্গ অনেক ক্ষেত্রেই রক্ষণশীল— সমাজ সংস্কার বিষয়ে তৎকালীন বর্ণহিন্দু সমাজের বহু উদ্বেগ ধরা পড়ে বসন্তক-এর পাতায়। চতুর্থ সংখ্যার দ্বিতীয় পর্বে যেমন বাসন্তিকার উদ্দেশ্যে একটি রচনায় সূত্রধার বসন্তক নারী মুক্তির পক্ষে বহুচর্চিত কিছু যুক্তিকে একে একে নস্যাৎ করে দিয়ে জানায়, “ইহাতে কেবল অস্মদ্দেশস্থ মহিলাগণের মনে চাঞ্চল্য হয় মাত্র এবং তাহার পরিবর্তে কি অন্য উপদেশ কিছুই নাই? স্মভাবিত প্রস্তাবই গ্রাহ্য। একেবারে বিবী হওয়া দুঃসাধ্য।”

যুবরাজ ও বঙ্গললনা

যুবরাজ ও মহারাণী যমনাবাই; বসন্তক

হয়তো এই রক্ষণশীলতার কারণেই স্বয়ং যুবরাজের নারীসঙ্গ প্রীতি ও তাঁর বিবাহ-বহির্ভূত নানা সম্পর্কের সর্বজনবিদিত ইতিহাস— যা প্রায় আর কোনও সমসাময়িক ভারতীয় পত্রিকা বা সংবাদপত্রে আলোচিত নয়, সম্ভবত গ্যাগিং অ্যাক্ট প্রয়োগ হওয়ার আশঙ্কায়— প্রসঙ্গে ভারতীয় মতামত কিছুটা বসন্তক-এর পাতাতেই পাওয়া সম্ভব, যদিও বেশিরভাগটাই আকারে ইঙ্গিতে। অতএব বম্বের বন্দরে সম্বর্ধনাকারিণীদের দেখে যুবরাজ যেমন উল্লসিত হচ্ছেন, সিংহল যাত্রায় যুবরাজ আবার নোট-বুকে লিখছেন, “স্ত্রীলোকগুলি বড় মন্দ নয়, ইহারা বিদেশীয় দেখিলে ঘোমটা টানে না, এমত কি, এদের ঘোমটা নাই। এতক্ষণে হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলাম, এতক্ষণে এদেশীয় লোকের মুখ দেখিলাম। স্ত্রীলোকের মুখশ্রী অত্যন্ত সুন্দর, আর চোকচোকী হইলে অত্যন্ত সুমিষ্ট মুচকে হাসে। রসেলকে বলিব যে, যেন একটি উৎকৃষ্ট বর্ণনার কবিতা লেখে।” মাদ্রাজে পৌঁছে যুবরাজকে ১৪,০০০ বালকের গাওয়া “ঈশ্বর যুবরাজের ভালো করুন” গান বুঝতে দোভাষীর সাহায্য নিতে হচ্ছে, কিন্তু “…পথে এক দল সুন্দরী বালিকা সংগ্রহ করিয়া রাখা হইয়াছিল। যুবরাজ এদের বিনা ইন্টারপ্রেটরে বুঝিতে পারিয়াছিলেন।” এরই মধ্যে পাতায় পাতায় যুবরাজের নানা ক্যারিকেচার, কোথাও গিরীন্দ্রকুমারের তুলির টানে যুবরাজ বার্টি বরদার মহারানী যমনাবাইকে ব্রেসলেট পরিয়ে দিচ্ছেন, মুখে তাঁর বিখ্যাত রমণীমোহন হাসি, কোথাও আবার তিনি রমণীপরিবেষ্টিত, তাঁদের হাতে বরণডালা ও বরমাল্য। শেষোক্ত ছবিটি অবশ্যই জগদানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ভবানীপুরের বাড়িতে যুবরাজের আগমনের কল্পচিত্র, ক্যাপশনে লেখা ‘বর বরণ না কোনে বরণ?’

যুবরাজ ও বঙ্গললনা, ভবানীপুর; বসন্তক

যুবরাজের চরিত্রের খোলামেলা সমালোচনা করার ঝুঁকি অবশ্য বসন্তক-এর সম্পাদকও নেওয়ার চেষ্টা করেননি — আকারে-ইঙ্গিতে সেই প্রসঙ্গ তুলে তারপর আলোচনার অভিমুখ ঘুরে যায় কলকাতার গণমান্য ব্যক্তিদের দিকে। বসন্তক-এর ছদ্ম-ইতিহাসে তাই যুবরাজ কলকাতায় পদার্পণ করলে সূত্রধর কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে (যদিও তিনি তখনও জীবিত!) প্ল্যানচেট করে ডেকে আনে। মাইকেল এসেই “চিমনীর ধুঁয়ার মতন গল্‌গলিয়ে” অমিত্রাক্ষর ছন্দে কবিতা পাঠ করেন,

ইংরেজ ঔরসজাত কলিকাতা দেখ,
যৌবন গরবে আছে বুকফুলাইয়া।
ভাতিছে হৃদয়ে তার ফোর্টউইলিয়ম;
মাধবের বুকে যেন কৌস্তুভ রতন,
কিম্বা দৈবকীর বক্ষে কংসদত্ত শিলা।
যে বেশ প’রেছে কন্যা কলিকাতা তব,
রাজা মহারাজা দেখে অবাক হইয়া।
পার্শ্বে তার কল্লোলিনী গঙ্গা কিবা ভাবে
হয়েছে বন্দী লৌহ-নিগড়-বন্ধনে।
দেব দেব মহাদেব ভীমজটা হ’তে
বলধরে লেস্‌লির কৌশল ভীম পাশ!
আপনি সাজিছ যবে এহেন সাজনে
কেন না সাজিবে কন্যাগণ শত সাজে,
তবে কেন সাজিবে না বিলাতী ভূষণে?
কলিকাতাবতী তার নবীন বয়সে,
কেন বা না হাসিবে সে বিজাতি হাসনে,
কেন বা সে বিজাতীয় পতি পেয়ে বক্ষে
পূরাবে না চিরআশা ছিল যত মনে?

যে পরাধীন জাতির বর্ণশঙ্কর শহর নিজেই সেজে উঠেছে যুবরাজের আগমনের অপেক্ষায়, সেই জাতির মেয়েরাও যে শেষমেশ “বিজাতীয়”দের প্রতি আকৃষ্ট হবে, এ আর আশ্চর্য কী, অন্তত বসন্তক-এর রক্ষণশীল জগতে? আগেও বলেছি, সে সময়ের বাংলা সাহিত্যের পরিচিত ট্রোপ ‘পবিত্র’ বর্ণহিন্দু নারী ও হিন্দু অন্দরমহল— বাইরের পরাধীন জগত ও তার সমস্ত ম্লেচ্ছ অপবিত্রতার থেকে দূরে থাকা অন্দরমহলের সাথে সে সময়ের লেখার বহু রোমাঞ্চ জড়িয়ে। পরাজিত, পরাধীন বর্ণহিন্দু সমাজের শেষ রক্ষাকবচ অন্দরমহল বিজাতীয় যুবরাজ দ্বারা কলুষিত হলে কারণ তো খুঁজতে হবেই!

বসন্তক-এর সবথেকে ঝাঁঝালো ব্যঙ্গ তাই কলকাতার সম্ভ্রান্ত ও ক্ষমতাশালীদের যুবরাজ-আপ্যায়নের জন্য সংরক্ষিত। সূত্রধর বসন্তক ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনের সেক্রেটারীকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে দ্বারকানাথ ঠাকুরের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে তারকাখচিত যুবরাজ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের একটি টিকিট আদায় করে। সেখানে রাজাগজা ও বাবুদের কাণ্ড-কারখানা দেখে সে লেখে,

বেলগেছের বাগানেতে যে খানা গিয়েছে।
দেখে শুনে এ গরীব তাক হয়ে গেছে ।।
যতেক হিন্দুর সুত, সুত নয় ভূত।
যে কান্ড করিল তথা ন ভাবি ন ভূত।।
খানা লয়ে টানাটানি হানাহানি করে।
জথা শকুনের দল ভাগাড় উপরে।।
হিন্দুদের কথা আমি কহিব কি ক’রে।
ইংরেজেরা দেখে শুনে লজ্জা পেয়ে সরে।।

জগদানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ভবানীপুরের বাড়িতে ঘটে যাওয়া ‘অঘটনের’ বিষয়ে বসন্তকের মতামত প্রকাশিত হয় একটি বিশাল ব্যঙ্গাত্মক কবিতায়, যার শুরুর অংশটুকু এরকম,

বেঁচে থাকো মুখুজ্যের পো খেল্লে ভালো চোটে।
তোমার খেলায় রাংরূপা হয়ে গোবরে শালুক ফোটে।।
ফিব্রুদানে এক তাড়াতে কল্লে বাজি মাৎ।
মাছ কাতুরে ভেকো হল কেয়াবাৎ কেয়াবাৎ।।
সাবাস ভবানীপুর সাবাস তোমায়।
দেখালে অদ্ভুত কীর্ত্তি বকুল তলায়।।
পুণ্য দিন বিশে পৌষ বাঙ্গলার মাঝে।
পর্দ্দা খুলে কুলবালা সম্ভাসে ইংরাজে।।
কোথায় কৈশবদল, বিদ্যাসাগর কোথা।
মুখুজ্যের কারচুপিতে মুখ হৈল ভোঁতা।।
হরেন্দ্র নরেন্দ্র গোষ্ঠী ঠাকুর পিরালি।
ঠকায়ে বাঁকুড়াবাসী কৈল ঠাকুরালি।।

ইঙ্গিত এখানে খুব স্পষ্ট— যুবরাজকে জেনানা মহলের ‘পীপ শো’ দেখিয়ে সরকারের কাছে প্রিয় হওয়া ও ক্ষমতাশালী মহলে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার জন্যই এ হেন অভিনব ঘটনা দায়িত্ব নিয়ে ঘটিয়েছেন জগদানন্দ মুখোপাধ্যায়। “বেলগেছের খানা” দিতে গিয়ে “খেটে খুন্‌” দ্বারকানাথ ঠাকুর আর “পুথি ঘেঁটে ঘেঁটে” “কাল্‌কাটানো” রাজেন্দ্রলাল রায়, দু জনকেই উল্লেখ করে ধিক্কার জানায় বসন্তক। তাঁদের যুবরাজ-আপ্যায়নে এত পরিশ্রমে লাভ কী হল যদি ফাঁকতালে অন্য কেউ এরকম কাণ্ড ঘটিয়ে মান-সম্মান মাটিতে মিটিয়ে ফেলেন? বসন্তক বলে, “ধন্য যে মুখুজ্যে ভায়া বলিহারি যাই/বড় সাপ্টা দরে সাৎ করিলে খেতাব “সি,এস্‌,আই”।

জগদানন্দ মুখোপাধ্যায় অবশ্য অর্ডার অফ দা স্টার অফ ইন্ডিয়াতে নাইটহুড (সি,এস,আই) পাননি— বরং রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র যুবরাজ বার্টির সাথে একই সমাগমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.এল খেতাব পান— তবে এর অর্থ এই নয় যে সামাজিক ঝড়-ঝাপটা সামলে যুবরাজের আবদার মেটাতে সক্ষম হওয়ার জন্য জগদানন্দ কিছুই পুরস্কার পাননি। খবরের কাগজ ও পত্রিকার পাতা থেকে যখন সমালোচনা প্রকাশ্য মঞ্চে গিয়ে ওঠে, তখন পরিত্রাতা হিসেবে মাঠে নামলেন ইংরেজ সরকার। জয়িতা দাস বলেছেন, “…যাঁর মাথার উপর যুবরাজের আশীর্বাদ বর্ষিত হচ্ছে, তাঁকে সামাজিকভাবে হেনস্থা করাটা সহজ কাজ নয়। রাজশক্তি জগদানন্দের পাশেই ছিল। একান্ত ভক্তের এই হেনস্থায় তাঁরা নড়ে চড়ে বসলেন।”

যুবরাজ ও বঙ্গললনা

রাজভক্তির দাম; বসন্তক

*****

কী ছিল সেই হেনস্থা? জয়িতা দাসের জবানিতেই বলা যাক,

তাঁকে [জগদানন্দকে] বিদ্রূপ করে লেখা হল এক প্রহসন — ‘গজদানন্দ ও যুবরাজ’। অনেকে বলেন প্রহসনটির লেখক উপেন্দ্রনাথ দাস। এ নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে। তবে প্রহসনটির গানগুলি যে গিরিশ ঘোষের রচনা এ নিয়ে কারও মনে কোনও সন্দেহ নেই।

১৮৭৬-এর ১৯ ফেব্রুয়ারি গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘সরোজিনী’ নাটকের সঙ্গে এই কৌতুক নকশাটি অভিনীত হয়। প্রথম দিনেই নাটক হিট। ২৩ ফেব্রুয়ারি ‘সতী কি কলঙ্কিনী’ নাটকের সাথে আবার অভিনীত হল প্রহসনটি।

সরকার বাহাদুর রেগেমেগে প্রহসনটি নিষিদ্ধ করে দিলেন। তা বলে এমন হিট প্রহসন ছাড়া যায়? গ্রেট ন্যাশনালের কর্তৃপক্ষ এইবার প্রহসনটির নাম দিলেন ‘হনুমান চরিত্র’, সেই নামে আবার প্রহসনটি ২৬শে ফেব্রুয়ারি ‘কর্ণাটকুমার’ নাটকের সাথে অভিনীত হল, অভিনয়ের শেষে উপেন্দ্রনাথ দাস ইংরেজিতে বক্তৃতাও দিয়ে ফেললেন! নিষিদ্ধ হল সেই প্রহসনও। আবার নাম বদলাল— এইবারে পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট ল্যাম্ব ও কমিশনার স্যার স্টুয়ার্ট হগকে (হগ মার্কেট যাঁর নামে আজও নামাঙ্কিত) সরাসরি ব্যঙ্গ করে তার নাম দেওয়া হল ‘The Police of Pig and Sheep’! সেই নাটক অভিনীত হল ১লা মার্চ।

নর্থব্রুক সাহেব যুবরাজের সফরে অনেক কিছুই সহ্য করেছিলেন— নেটিভ নাট্যকার-অভিনেতাদের এ হেন আস্পর্ধা সহ্য কেনই বা করবেন? ২৯শে ফেব্রুয়ারি তিনি একটি অর্ডিন্যান্স জারি করলেন, যার ফলস্বরূপ যে কোনও ধরনের ‘scandalous, defamatory, seditious, obscene or otherwise prejudicial to the public interest’ নাটক বন্ধ করবার আইন সরকারের হাতে আসল। ঝামেলা দেখে ন্যাশনাল থিয়েটারের কর্তৃপক্ষ এ ধরনের প্রহসন বাদ দিলেন বটে, কিন্তু তাতে সরকার বাহাদুরের রাগ মেটেনি। দিন তিনেক পরে, ‘সতী ও কলঙ্কিনী’ নাটক অভিনয়ের সময় পুলিশ এসে উপেন্দ্রনাথ দাস, অমৃতলাল বোস, এবং আরও বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার বললেন। বলা হল, ‘সুরেন্দ্র-বিনোদিনী’ নামক নাটকটি অশ্লীল হওয়া সত্ত্বেও অভিনয় হয়েছে, অতএব শাস্তি পেতেই হবে!

সেই কেস আদালতে ওঠায় নাট্যকর্মীদের হয়ে ম্যজিস্ট্রেট ডিকেন্স সাহেবের এজলাসে সাক্ষ্য দিতে গেলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ অনেকে, সবাই একবাক্যে বললেন যে এ অভিযোগ অন্যায়, ‘সুরেন্দ্র-বিনোদিনী’ নাটক আদৌ অশ্লীল নয়। সবাই ছাড়া পেলেন, তবে উপেন্দ্রনাথ দাস আর অমৃতলাল বোসের এক মাস জেল হল। এইবার তাঁদের হয়ে হাইকোর্টে গেলেন দুঁদে আইনজীবী ডাবলু.সি. বনার্জি, যিনি পরবর্তীকালে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি হয়েছিলেন। কেস লড়লেন মনোমোহন ঘোষ, টি. পালিত আর ব্রানসন। উপেন্দ্রনাথ ও অমৃতলাল ছাড়াও পেলেন, কিন্তু সরকার এই সুযোগে নিয়ে আসলেন একটি নতুন আইন— ১৮৭৬ সালের ‘অভিনয় নিয়ন্ত্রণ বিল’ (Dramatic Performances Control Bill, যা পাশ হয়ে হল Dramatic Performances Act)।

এমন কী ছিল ‘গজদানন্দ ও যুবরাজ’ প্রহসনে যে লাটসাহেব শেষমেশ গোটা নাট্যজগতেই রাশ টানবার ব্যবস্থা করলেন? বাবু জগদানন্দের সামাজিক হেনস্থার উত্তরে লর্ড নর্থব্রুক এমনই একটা আইন তৈরি করে ফেললেন যা পরাধীন ভারতে নাট্যজগতের ইতিহাস বদলে দিল— রাজভক্তের প্রতি এতটাই ভালবাসা? জাতপাতের সমস্যা সামলাবেন না বলে যারা এককালে আলাদা জাতিমালা কাছারি খুলে দিয়েছিলেন, তাঁদের দলাদলির টানাপোড়েন নিয়ে এত উৎসাহ, এও কি সম্ভব? এর কোনও সরাসরি উত্তর নেই, কারণ বিতর্কিত প্রহসনটির কোন কপি আজকে পাওয়া যায় না। তবে সে সময়ের অমৃতবাজার পত্রিকার পাতায় আমরা এর একটা মোটামুটি চিত্র পাই, যা থেকে বোঝা যায় যে হয়তো শুধুই জগদানন্দের মান বাঁচানো নর্থব্রুকের উদ্দেশ্য ছিল না। ৬ এপ্রিল ১৮৭৬এর একটি ইস্যুতে অমৃতবাজারের সম্পাদক সানডে মিরর কাগজের সমালোচনা করে বলছেন,

আমাদের সহযোগীর [মিররের সম্পাদক] জানা উচিত ছিল যে যেই নাটকটিকে কেন্দ্র করে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছিল, যার জন্য ম্যানেজারদের জেলে যেতে হয়েছিল, সেই নাটকটি আদৌ অশ্লীল ছিল না — পুলিশের কাজকর্ম বা তথাকথিত অপরাধীদের শাস্তির সাথে অশ্লীলতার কোন সম্পর্কই ছিল না — বাবু জগদানন্দের হেনস্থা বা মঞ্চে অশ্লীলতার সাথেও সরকারি অর্ডিন্যান্সের কোন সম্পর্ক ছিল না। মঞ্চে যদি যুবরাজকে আনা না হত, যদি প্রকাশ্য মঞ্চে বহু দর্শকের সামনে নির্দেশক পুলিশকে গালিগালাজ না করতেন, তাহলে হয়তো সরকার আর পুলিশের এত কড়াকড়ি আমরা আদৌ দেখতাম না।

Our contemporary ought to have known that there was no obscenity whatsoever in the production which was condemned and for which the managers were imprisoned — that obscenity had nothing to do with the late movements of the Police or the punishment of the so-called offenders — that the insult to Babu Jagadananda or obscene representations had nothing to do with the origin of the Ordinance. If the Prince had not been brought on the stage, if the Police had not been abused by the director before a large audience, we might have never seen the late arbitrary proceedings of the Government and the Police.

অমৃতবাজার-এর মতামত খুব পরিষ্কার— সমস্যা জগদানন্দের অপমান নয়, সমস্যা স্বয়ং যুবরাজের অপমান। যে প্রহসনের নামই ‘গজদানন্দ ও যুবরাজ’, সেই প্রহসনে বার্টির চরিত্র যে মূল চরিত্রদের মধ্যেই ছিল, এটা আমরা অনুমান করতেই পারি। অনুমান এটাও করতে পারি যে গিরিশ ঘোষ বা অমৃতলাল বোসের মতন অসামান্য হাস্যরসের অভিনেতা যেই নাটকের দলে ছিলেন, সেখানে বার্টির চরিত্র অভিনয় করবার লোকের অভাব ছিল না, যদিও অমৃতলাল ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন ছাড়াও মঞ্চে কোন পার্ট করেছিলেন, এ কথা আমাদের জানা নেই। এক মাস জেল যেহেতু তাঁর হয়েছিল, তাই মনে সন্দেহ কিছুটা থেকে যায় অবশ্য!

যুবরাজ ও বঙ্গললনা

মিনার্ভা থিয়েটার, যেখানে এককালে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার ছিল

অমৃতবাজার-এর সম্পাদক লিখছেন— কিছুটা আপসের সুরে— যে এখানে একটা মস্ত ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। হিন্দুরা দেব-দেবীদের নিয়ে হাসাহাসি করেই থাকে, তাই রাজারাজড়াদের নিয়েও হাসাহাসি করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু ইংরেজরা তা বুঝবেন কেন? তাঁদের কাছে যুবরাজ কারও বাড়িতে নিজে যাওয়ার অর্থ বিশাল সম্মান! সেই সম্মান না বুঝে নেটিভরা মঞ্চে হাসাহাসি করলে তাঁদের কী মনোভাব হতে পারে? অমৃতবাজার তাই লিখছে,

এরকম অবস্থায় ভবানীপুর কাণ্ডকে প্রকাশ্য মঞ্চে আনা ইংরেজ সমাজের ভাবাবেগে আঘাত করে, কারণ এতে শুধু তাঁদের হেনস্থার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারই বা কী করবে? অভিনেতাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অপরাধমূলক চার্জ আনা খুবই খারাপ ব্যাপার হত। প্রথমত, এই ধরণের চার্জ হয়তো হাই কোর্টে নাও টিকতে পারে, কারণ হাই কোর্ট ঠিক ততটা আজ্ঞাবহ নয় যতটা সরকার চায়। এ ছাড়াও ক্রিমিনাল চার্জ আনলে যুবরাজ ও তাঁর সহযোগীদের হয়তো কোর্টে আসতে হতে পারে, অথবা যেই হিন্দু রমণীরা তাঁর অভ্যর্থনা করেছিলেন, তাঁদের ডাক পড়তে পরে। এরকম ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটলে তো যুবরাজের সফরটাই মাটি হয়ে যেতে পারে। এতে যুবরাজের বিরুদ্ধে জনমতও চলে যেতে পারে, যা একেবারেই অবাঞ্ছনীয়।

When such was the state of affairs, the exhibition of the Bhowanee poor affair on the stage sorely hurt the feelings of the English community as it constantly reminded them of their mortification. But what was the Government to do? To bring a criminal charge against the actors would be impolitic in the highest degree. Firstly the charge might not be sustained in High Court which is not as obedient as many a man in office would like it to be. Then a criminal charge might necessitate the presence of His Royal Highness himself and his suite, or the Hindoo ladies who assembled to receive him in the law courts. Such a vigorous course would at least defeat the object of the Royal visit. It would make the Prince unnecessarily and intensely unpopular.

অতএব, ঘোরপথে অশ্লীলতার দায় দেখিয়ে এরকম আইন আনতে বাধ্য হলেন সরকার বাহাদুর, অমৃতবাজার-এর এরকমই মত, যদিও তাঁরা পুলিশি বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে সরব। সমস্যা অশ্লীলতা আদৌ ছিল না— সমস্যা রাজদ্রোহ, অথবা সেডিশন!

অবশ্য এ হেন অসম্মান নিয়ে যে বার্টি বিশেষ চিন্তিত ছিলেন, সেরকম কোন তথ্য আমরা পাইনি— তিনি সম্ভবত বাঘ মেরে-প্রমোদভ্রমণ করে-উপহার পেয়ে সময় কাটানোর ফাঁকে কলকাতার নেটিভদের নিয়ে বিশেষ চিন্তিত ছিলেন না। মহারানী ভিক্টোরিয়া অবধি এ সংবাদ গিয়েছিল কি না, সেটাও ইতিহাসের পাতায় লেখা নেই।

*****

রবার্ট দার্তোঁর কাজের সুবাদে আমরা জানি যে বিংশ শতাব্দীর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আগে ভারতীয় পত্র-পত্রিকা সেন্সর করবার সেরকম প্রচেষ্টা করেনি ইংরেজ সরকার, যদিও সেখানে যথেষ্ট রাজদ্রোহী লেখাপত্র হত— বসন্তক পত্রিকার ক্ষুরধার ব্যঙ্গ হয়তো সেই কারণেই সরকার বাহাদুরের চোখে পড়েনি। হয়তো মঞ্চের ক্ষেত্রেও তাই হত, কিন্তু বাদ সাধলেন যুবরাজ বার্টি!

স্বদেশি আন্দোলন ও তার পরবর্তী সময় এই সকল আইন ব্যবহার করে ভারতীয় লেখক-নাট্যকার-শিল্পীদের উপর বার বার আঘাত হানা হত, এ কথা তো আমাদের সকলেরই জানা। ড্রামাটিক পারফরম্যান্স অ্যাক্টে যাত্রার কথা না থাকায় স্বদেশি যাত্রাকার মুকুন্দদাসের বিরুদ্ধে প্রাথমিক ভাবে ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছিল এ কথাও আমাদের জানা। ভারতবর্ষের ইতিহাসে সে এক অন্য অধ্যায়, সে কথা এখন থাক। আপাতত আমাদের যুবরাজ ও বঙ্গললনার কাহিনী এখানেই সমাপ্ত হোক।

 

সমাপ্ত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...