হায়রোগ্লিফের দেশে

হায়রোগ্লিফের দেশে

নিশান চট্টোপাধ্যায়

 

সুদীর্ঘ তেরো বছর পর আবার কলকাতা বইমেলা আসা হল আমার। অনেকেই বলছেন মেলা ছোট হয়ে গেছে, আমার তো বোঝার উপায়ও নেই। অনেক অনেক দোকান, অনেক অনেক বই। অনেক অনেক নাম না জানা লেখকের নাম না জানা বই এবং এ যুগে সবাই বলেন তাঁর বইটিই সে বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা হল, মধ্যবিত্ত বাঙালির পকেটে রেস্ত-র পরিমিতি। সব বই কেনা সম্ভব না, যা যা কিনলাম তার সব পড়াও বিস্তর কঠিন কাজ।

‘বইপোকা’ এবং ‘বইয়ের হাট’ নাম দুটি ফেসবুক মহলে দিব্য সুপরিচিত। সেখান থেকেই জানতে পারলাম “হায়রোগ্লিফের দেশে” বলে একটি বই আসছে। হায়রোগ্লিফ সম্বন্ধে আকর্ষণ আজকের না। ছোটবেলায় কাকাবাবু থেকে টিনটিন সর্বত্রই হায়রোগ্লিফ দেখেছি বারকয়েক। তাতে টিনটিনে সার্কোফেগাসের ভেতর আটকা পড়া ইত্যাদি দেখার সবিশেষ সুযোগ ঘটেছিল। ঠিক করে ফেললাম, বইটা কিনবই।

প্রথমে ‘বইচই’-তে গিয়ে হানা দিলাম। সেখানে শেষ। ‘খোয়াবনামা’-র স্টলে গেলাম, সেখানেও শেষ। পরের দিন আরেকবার ‘খোয়াবনামা’ গেলাম, দেখলাম জনতা হুমড়ে পড়েছেন ঐ বই কিনতে। বাইরেই লেখক দাঁড়িয়ে, জিজ্ঞাসা করলাম বইটা পাওয়া যাবে নাকি? লেখক জানালেন ঘণ্টাখানেক বাদে আরেক লট আসবে। এই খেপে আর হাতছাড়া হতে দিইনি সুযোগ। গেলাম এবং প্রবল গুঁতোগুঁতির মধ্যে কিনে ফেললাম বইখানা।

অবশেষে আমার হাতে এল অনির্বাণ ঘোষের লেখা, ‘খোয়াবনামা’ থেকে প্রকাশিত “হায়রোগ্লিফের দেশে”।

মিশর নিয়ে জ্ঞান সামান্যই। প্রাচীন ইতিহাস নিয়েই আমাদের জ্ঞান সীমিত। তাতে মিশর। কলকাতার জাদুঘরে ছোটবেলায় মমি দেখেছিলাম একবার। নিউ ইয়র্কের মেট মিউজিয়ামে ঈজিপশিয়ান গ্যালারি দেখেছিলাম বার কয়েক। তাদের চুলের বুরুশ, মাজনের কৌটো, খড়কে কাঠি এসব দেখতে দেখতে মনে হয়, কত-কত দিন আগে মানুষের হাতে ছিল এই জিনিস। সে মানুষ নেই, তার পুত্র, কন্যা, পৌত্র, দৌহিত্র, প্রপৌত্র কেউ কোত্থাও নেই আর। হয়তো জীবন সেদিনও আজকের মত ম্যাড়মেড়ে ছিল, হয়তো ছিল না, কেউ কিছু জানে না আর। নলিনী দলগত সলিলং তরলম্… আজ শুধু কয়েকটা জিনিস পড়ে আছে। আর সেই জিনিসগুলো যেন ধরে রেখেছে সেসব বিদেহী আত্মাকে, যেন গিয়েও চলে যায়নি তারা, শুধু বাতাসের ছদ্মবেশে আমাদেরই আশেপাশে ফিসফিস করে ঘুরে চলেছে।

এছাড়া আর কতটুকু জানি? আর্থার কোনান ডয়েলের থোথের আঙটি জানি, তুতানখামেনের অভিশাপের কথা জানি, ফারাওয়ের চুরুট জানি, ‘মমি’ সিনেমা জানি আর ‘মিশর রহস্য’ উপন্যাসটা (সিনেমাটা আরও ভয়াবহ)। বাঙালির মিশরযাত্রা এখানেই শেষ মোটামুটি। কিছু বাঙালি জানেন বৈকি! কিন্তু জ্ঞান সঞ্চয় করলে সুদে বাড়ে না, লোককে জানানোও উচিৎ, এবং সেই কাজটি অনির্বাণ ঘোষ করেছেন।

বাংলা ভাষায় মিশর নিয়ে তথ্যানুগ বই নেই বললেই চলে, বা থাকলেও আমি জানি না। বইয়ের পেছনে থাকা লেখক পরিচিতি থেকে জানা যায় অনির্বাণ পেশায় চিকিৎসক এবং তাঁর মিশর নিয়ে অসীম আগ্রহ। সেখান থেকেই তিনি জেনেছেন এবং সবচেয়ে বড় কথা লিখেছেন বইখানি।

হায়রোগ্লিফের দেশে

হায়রোগ্লিফের দেশে, অনির্বাণ ঘোষ, খোয়াবনামা, ৩৫০ টাকা

প্রথমেই চোখে পড়ে বইটির প্রচ্ছদ। কালোর উপর একটিমাত্র ছবিতেই প্রচ্ছদকার কাজ সেরেছেন। বাহুল্য ব্যতিরেকে ভালো আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ যে করা যায় তার উদাহরণ হতে পারে প্রচ্ছদ। দ্বিতীয়ত ছবি। লেখকের নিজের তোলা অজস্র ছবি, তাও রঙিন, বইটির অন্যতম সম্পদ, সাথে আছে কিছু হাতে আঁকা ছবি আর অন্যান্য সূত্রে প্রাপ্ত কিছু রঙিন ছবি। সবকটিই অনন্যসাধারণ। প্রাচীন চৈনিক প্রবাদ বলে ছবি নাকি হাজারটা কথা বলে, সে প্রবাদের ব্যত্যয় এখানেও হয়নি বলা চলে।

বইয়ের শুরুতেই মিশরীয় ইতিহাসের সময়পঞ্জি চোখে পড়ে, আমরা অবহিত হই যে ফারাও আর মমি বাদেও অনেক কাহিনী, অনেক ঝড়ঝাপটা বয়ে গেছে ভূখণ্ডের উপর দিয়ে। তারপরে মিশরের ম্যাপ, এবং তারপরেই, আমার জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় জিনিস। মিশরের দেবদেবীর চিত্র সহ পঞ্জীকরণ। মানুষের নির্নিমেষ কৌতুহল এবং কল্পনা যে কী বিচিত্র রূপ ধারণ করতে পারে তার অন্যতম উদাহরণ মিশরের দেবদেবীরা। আছেন স্রষ্টা আতুম (আদমের সঙ্গে নামের বড়ই মিল), আছেন তেফনুত, আছেন রা, আছেন আনুবিস, আমুন, গেব, বেস, বাস্তেত, আইসিস, হাপি, সেথ, ওসাইরিস এবং মিশরীয় কল্পনার একেশ্বর পরমব্রহ্ম আতেন। প্রতিটি ছবির সাথেই দেবতাদের ঈষৎ বর্ণনা দেওয়া রয়েছে। রহস্যময় জগতের মুখেই যেন ইস্তেহার একটি। এরপরেই শুরু হচ্ছে আসল বই।

এখন, ইতিহাস নানাভাবে লেখা যায়। নাইন টেনে ইতিহাস পড়তে আমার প্রাণে রীতিমত শঙ্কা সঞ্চার হত। নিতান্ত নীরস, মোটা মোটা বই, সাথে নয় নাম্বারের প্রশ্নের ভয়। এ বইতে কিন্তু ইতিহাস পড়তে দিব্যি লাগে। লেখক গল্পের মধ্যে গল্পের সূত্রে ইতিহাস বলেছেন। আমরা মিশর দেখেছি ভবেশদার চোখ দিয়ে।

ব্যক্তিগত মত বলতে গেলে, আজন্ম দেখে এসেছি বাঙালি রেস্ত কম থাকলেও জানার চেষ্টাটা করে। ছোটদের বিশ্বকোষে আচার্য সুরেন্দ্রনাথের বই পড়ে লন্ডন জানার গল্প অব্দি শুনেছি। বাঙালির হাজার দোষ থাকলেও কয়েকজন এখনও তাক লাগিয়ে দেবার মতো জিনিস জানেন। হাজার সামন্ততান্ত্রিক ধারণাকে হয়তো নস্যাৎ করে দিতে পারেন একজন পড়ুয়া সাধারণ কেরানি। ভবেশবাবুকে সেরকমই লাগল, আরও ভালো লাগল ডাক্তারির ছাত্র দুজনের জানার আগ্রহটুকু, এবং গুরু নির্বাচনটি। তবে প্রসঙ্গত, এখানে লেখক জয়েন্টে ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং দুটোয় ভালো করার ইঙ্গিতটুকু না করলেই ভালো করতেন হয়তো।

ভবেশদার চোখ দিয়ে মিশরকে দেখা যায় চেনা যায়। আমরা মমি বলতে আর ফারাও বলতে জানতাম ঐ তুতানখামেন, বাকিদের নামটাম মনে রাখার দরকার ছিল না বিশেষ। তার উপর ইউরোপীয় প্রাচীন শিক্ষার ধরন আমাদের শিখিয়েছিল মিশরে নির্ঘাত দাস ছিল কারও। সাদা লোকে সভ্যতা সৃষ্টি করেনি মানেই হয় তারা দাস, নাহলে, আজকালকার অদ্ভুত থিয়োরি আর কী, তারা এলিয়েন বা ভিনগ্রহের মানুষ।

এই বইতে আমরা দেখতে পাই সেসময়ের মিশরের স্থপতিদের চিন্তার কথা। মানুষ কীভাবে পাথরের ওপর পাথর গেঁথে অবিস্মরণীয় সৃষ্টি করতে পারে, কেমন ভাবে সব প্রতিকূলতাকে কাটাতে পারে বুদ্ধির জোরে তার অনন্য স্বাক্ষর বইয়ের ভেতর। আমরা জানতে পারি ইমহোটেপের কথা, যিনি বানিয়েছিলেন স্টেপ পিরামিড। যিনি সুশ্রুত-চরকেরও আগে বুঝতে পেরেছিলেন রোগব্যাধি নিতান্ত পার্থিব জিনিস আর তার চিকিৎসা সম্ভব।

আমরা দেখতে পাই মিশরের সাধারণ লোকেদের, তাদের জীবন, তাদের পরিধান, তাদের ভাষা। তাদের লেখা সম্বন্ধেও বইটিতে বিশদ বিবরণ রয়েছে। হায়রোগ্লিফ পৃথিবীর লেখার ইতিহাসের শেষপ্রান্তে বসে আছে। অথচ অত্যন্ত সহজে, অনায়াসে ভবেশদা জানাচ্ছেন সেই লেখার কথা।

মিশরের এই ধর্মাচরণের মাঝেও যে একেশ্বরবাদের চর্চা হয়েছিল সেটার উল্লেখও রয়েছে, এবং হাল্কা ছোঁয়া আছে ধর্ম আর রাজনীতির অশুভ আঁতাতের। কালের সুদূর পার পেরিয়েও মানুষের চরিত্র যে প্রায় একই আছে ভাবলে পুলকিত হই।

যাই হোক, বইটি লোকজন পড়বেন এমন আশা রাখি বলে, বিশদে না গিয়ে বলি, গল্পের ভেতর গল্পের ছলে লেখা আগেই বলেছিলাম, ভিতরেরটা মূলত গল্পের ছলে বলা, ছবি সমৃদ্ধ, ইতিহাস। বাইরের ভবেশদার গল্পটি ঈষৎ রহস্যজনক। সে ভালো, তবে একদম শেষের পাতায় বইয়ের বিষয় ঘুরে যাচ্ছে রহস্যের দিকেই। ‘মিশর রহস্য’ পড়ার পর আতঙ্কে ভুগি, অতএব আশঙ্কা অল্প থেকেই যাচ্ছে। সমস্যা হল রহস্যের শুরুই হচ্ছে শেষের পাতায়, আমরা বুঝছি লেখকের উদ্দেশ্য আছে আরও বই লেখার, সম্ভবত আর ইতিহাস না, গোয়েন্দা ধরনের। সবই বোঝা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে মোটা করে “অপেক্ষার এবার শুরু”, এবং আবারও হাল্কা করে আধপাতা জোড়া হরফে “অপেক্ষার এবার শুরু” না লিখলেই বোধ করি ভালো হত। মুদ্রণ প্রমাদগুণে কিছু কিছু জায়গায় শব্দ কেটে গেছে, বাক্যও, সে বিষয়েও পরবর্তী ক্ষেত্রে নজর দেবেন আশা করি।

বাংলায় এই সেদিনও কত কত কিশোর সাহিত্য বেরোত। বাংলা ভাষা কেমন একটা শুকিয়ে যাচ্ছে। যে ভাষায় শিশু, কিশোরকে টানার মতো বই থাকে না সেই ভাষা বুড়িয়ে যেতে থাকে, ভারে ন্যুব্জ হয় ক্রমশ। অনেকদিন বাদে এই বইটা কিন্তু সেই জায়গাটা ধরতে পারবে আমার বিশ্বাস। একটা দীর্ঘ সময়কালকে ধরা আছে, সেখানে মমির গল্প আছে, স্ফিংসের কথা আছে, খুফু-আখনাতেন-তুতানখামেন আছেন, শেষ হচ্ছে গ্রিক রোমান পেরিয়ে ক্লিওপেট্রায়। লেখার প্রসাদগুণে ঐতিহাসিক স্বপ্নের চরিত্ররা কল্পনায় ধরা দেয়। বাইরের গল্পটাও নিজের ছন্দে এগিয়েছে, যদিও তথ্যের বাহুল্যে সেই ঘটনা খুব বেশিদূর এগোয়নি। যদিও যেটুকুই এগিয়েছে, টানটান করে ধরা আছে। লেখক এবং লেখকের বন্ধুর সাথে পরিচয়ের শুরুতে ভবেশদার মধ্যে ঈষৎ টেনিদাসুলভ ভাব দেখা গেলেও চরিত্র বেশ খানিকটা পরিণত হয়েছে। বেশ কিছু মোড় আছে, চমক আছে। কিশোরদের কথা উল্লেখ্য এইজন্যই, কারণ এই বয়সে মানুষ টায়ারের ভেলা চেপে সমুদ্র পাড়ি দেবার স্বপ্ন দেখতে পারে। সেই বয়সে মিশরের রহস্যময় দরজা, পরতের পর পরত দেখতে পেলে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি হয়। মিশরকে ঘিরেই বাইরের রহস্যটিও। কোথাও গল্পের চ্যুতি ঘটেনি, কোথাও ভবেশদা ক্যারাটের প্যাঁচ মারেননি, কোথাও ছাত্রদের হাতে রিভলভার দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষ, সাধারণ ছাত্রের জীবন, যেখানে দৈনন্দিনের মাঝ থেকে হঠাৎ কিছু ঘটে যেতে পারে। লেখকের লেখা ঝরঝরে, যদিও, ব্যক্তিগতভাবে বাংলার মাঝে ইংরাজি শব্দ একটু চোখে লাগে। চরিত্রগুলি সাবলীল। তথ্যসূত্র আছে, আগ্রহী পাঠক যাতে আরও জানতে পারেন এ বিষয়ে। তবে বইটা শুধুই কিশোর না, বড়দেরও টানবে। অনেক দিন বাদে একটা বই একটানে শেষ পর্যন্ত পড়া যায়।

দ্রুতবেগে কেনার পর সামান্য ভয় ছিল বটে, কিন্তু দ্রুতবেগে শেষ করার পর এটুকু বলতে পারি, কিনে দেখতে পারেন, খুব ঠকবেন না।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1253 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...