দু কোটি চাকরি না দু কোটি বেকার

চাকরি

নির্মাল্য সেনগুপ্ত

 

‘রং দে বাসন্তী’র একটি দৃশ্য। মাতাল ডিজে (আমির খান) তার বৃটিশ বান্ধবী সু’কে জানাচ্ছে যে সে কেন কলেজ ছেড়ে বেরোতে চায় না। কারণস্বরূপ বলছে যে “কলেজের গেটের ভিতরে আমরা জীবনের সঙ্গে খেলা করি, কলেজের গেট পেরোলে জীবন একই কাজ করে আমাদের নিয়ে।” এই জন্যই সে চায় না কলেজ ছেড়ে বেরোতে৷

সিনেমাটা যখন দেখি তখনও আমি কলেজে ঢুকিনি৷ সামনেই আসন্ন উচ্চমাধ্যমিক, তারপরেই বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই সময় যার জন্য প্রায় সমস্ত টিনেজার অপেক্ষা করে থাকে। তা হল কলেজ। মানুষ স্কুলের পরাধীনতা থেকে বেরিয়ে নিজের ইচ্ছেমত পড়াশুনা করতে পারে যা তার বাকি জীবনের জীবিকা নির্ধারণ করতে কাজে আসবে। তার জন্য উত্তেজনাও প্রচুর৷ আমাদের সেই সময় আইটি জগতের ভাল ডিমান্ড ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লে আর যাই হোক, চাকরি নিয়ে ভাবতে হবে না। ‘বেকারত্ব’ নামক জুজু’র কথা ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছি। যে যে আত্মীয় এই রোগে আক্রান্ত, তাঁদের নিয়ে বাকিদের তাচ্ছিল্য, সে কতটা নিষ্কর্মা এবং হোপলেস— এই আলোচনাও তো শুনতে শুনতেই বেড়ে ওঠা। আমাদের বড়দের সবারই এই বক্তব্য ছিল যে চেষ্টা করলে ঠিক চাকরি পাওয়া যায়। আর আমার পিতৃদেবের মতে ইঞ্জিনিয়ারিং হল সবথেকে কম চেষ্টায় চাকরি পাওয়ার পড়াশুনা।

কিন্তু আমি বুঝিনি কলেজের গেটের ওপারে কী রয়েছে। তিনলাখি কোর্স করার পর জীবন আমাকে কেমনভাবে নাচাবে।

আমরা সকলেই জানি ইঞ্জিনিয়ারিং-এ একটি বিশেষ জিনিস আছে যা অন্য কিছুতে নেই৷ সেটা হল ক্যাম্পাসিং৷ বিভিন্ন কম্পানির ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট কলেজে আসে, ইন্টারভিউ হয় এবং পড়াশুনা শেষের আগেই চাকরি পেয়ে যায় ছাত্রছাত্রীরা৷ আমিও অপেক্ষায় ছিলাম সেই দেবদূতের, যে নিজে এসে চাকরি দিয়ে যাবে।

আসেনি কিন্তু কেউ। না, কেউ আসেনি বললে ভুল হবে, এসেছিল৷ কল সেন্টার কম্পানি। আর কিছু ছোট কম্পানি, যারা সেই মাইনে দেবে যা দিয়ে কলকাতাতে একটা ফ্ল্যাটও ভাড়া পাওয়া যায় না।

আমাদের প্রত্যেকের থেকে কড়কড়ে তিন লাখ টাকা করে গুণে নেওয়া কলেজ কিন্তু সেই সমস্ত কম্পানির নাম নিজেদের বিজ্ঞাপনে লিখল যার পিওনও আমাদের কলেজে আসেনি৷

বুঝলাম, শুরু হয়ে গিয়েছে খেলা।

এবার জীবনে এল ‘কর্মক্ষেত্র’, বিভিন্ন খবরের কাগজের চাকরির কলাম। সবেতেই চায় অভিজ্ঞতা, নয়ত এমন একটি অঙ্কের মাইনে যা যোগ্যতা তো দূর, যাতায়াত আর টিফিনের খরচ তুলতেও অপারগ৷

তবু আমরা, ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্ররা এই ছোট চাকরির সুযোগ পাচ্ছিলাম। যারা জেনারেল লাইন? তাদের কপালে শুধুই সেলসম্যান, কল সেন্টার আর ডেটা এন্ট্রি৷ এদিকে তারাও কেউ অঙ্কে স্নাতক, কেউ মাইক্রোবাওলজি বা কেমিস্ট্রি৷ চাকরি নেই। বেকারত্ব ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলছিল তুমুলভাবে।

কিন্তু বসে থাকাও যায় না। সিনিয়রদের থেকে জেনেছি বেকারত্বের ছাপ একবার গায়ে লেগে গেলে কোনওদিনই চাকরিতে ঢোকা যায় না। ছোট চাকরি করতেই হয়, অভিজ্ঞতা লাভ করে তবে বড় কোথাও সুযোগ মেলে কাজের।

ছোট চাকরিতে ঢোকারও প্রচুর প্রার্থী। তাদের ডিমান্ডও অনেক। বহু প্রশিক্ষণ থাকলে তবে পাওয়া যাবে চাকরি। নিজেকে সেই মতো তৈরি করলাম৷

তবে বুঝলাম, এই ছোট চাকরিতে একটা সুবিধে রয়েছে, তা হল কাজ শেখা যায় এবং ইন্ডাস্ট্রি সম্বন্ধে জ্ঞান পাওয়া যায়। যে অভিজ্ঞতা চায় বড় কম্পানি।

এরপর কেটে গেছে কয়েক বছর৷ ছোট কম্পানির সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করে মোটামুটি থিতু হয়েছি। এর মধ্যে বদলে গেছে কেন্দ্রীয় সরকার৷ ইউপিএ সরকারের বদলে মসনদে বসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি৷ নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদি কথা দিয়েছিলেন দু কোটি চাকরি পাবে ভারতীয়রা৷ আচ্ছে দিন আসবে।

আমি জানি আমাদের কী বলে। শাইনিং। আমাদের এই শাইনিং সত্তা বিজেপির সমস্ত বর্বর মধ্যযুগীয় মতাদর্শগত ভিত্তিভূমি থেকে তাকে পৃথক করে তার এইসব সোকলড উন্নয়নের চোখধাঁধানো গল্পে মোহাবিষ্ট হতে শেখায়। আমরা ভাবি, বর্তমান ভারতশাসকের পোশাকে যতই মুসলিমদের রক্তের ছিটে লেগে থাকুক না কেন, এটা তো সত্যি তাঁর আমলে গুজরাট কী উন্নতিটাই না করেছে!

কিন্তু, আজ এই পাঁচ বছর প্রায় পার করে, সেই দু কোটি চাকরির গল্পটা কীরকম? ঠিক তাঁর “প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা ঢোকার” মতোই না?

আসলে এইসব এত নিজের গল্প শোনানোর কারণ হচ্ছে নজরে পড়া একটা রিপোর্ট। রিপোর্টটি তৈরি করেছে সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই)। যে রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৯-এর ফেব্রুয়ারিতে ভারতে বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ৭.২%। অর্থাৎ প্রতি ১০০০ জনে ৭২ জন বেকার। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পর থেকে বেকারত্বের হার কখনও এতটা বাড়েনি৷ গত বছর ফেব্রুয়ারিতে এই হার ছিল ৫.৯%[1]

ভাবলাম, বেসরকারি সংস্থা, হয়তো বিজেপি-বিরোধী, হয়তো উন্নয়ন-বিরোধী, হয়তো দেশদ্রোহী, তাই আরও কিছু তত্ত্বতালাশ চালালাম। তা করতে গিয়ে পেলাম ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অফিস (এনএসএসও)-এর পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে বলছে বেকারত্বের হার ৬.১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা নাকি ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

৪৫ বছর! তার মানে শুরুতে গুরুজনদের যে সব গল্পকথার কথা বলছিলাম, তারও ঢের আগে!!

মজা বলুন, বা শয়তানি বলুন, সেটা হল এনএসএসও-র রিপোর্টটা কিন্তু সরকার এখনও চেপে রেখেছে, প্রকাশ হতে দেয়নি। কিন্তু খবরটি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে ফাঁস হয়ে গিয়েছিল[2]। এই চেপে রাখার প্রতিবাদে ভারতের ন্যাশনাল স্ট্যাটাসিটিকাল কমিশন (এনএসসি)-এর দুজন সদস্য গত ২৮শে জানুয়ারি পদত্যাগও করেছেন[3]

এই হচ্ছে অবস্থা। যাহাকে আচ্ছে দিন বলা হয়!

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে নোটবন্দি ছোট কম্পানিগুলোর উপর ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে যা এই ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের অন্যতম কারণ। সরকার অফিশিয়ালি যে পরিসংখ্যান দেখিয়েছে তা বহু পুরনো এবং নতুন যে পরিসংখ্যান তার সত্যতা নিয়ে প্রভূত সন্দেহ রয়েছে। একের পর এক মিথ্যে প্রতিশ্রুতিতে ঝুলি ভরে চলেছে বিজেপি সরকার। জিএসটি এবং প্রায় সমস্ত দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি চাপ বাড়িয়েছে মধ্যবিত্ত সংসারে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার কোমর ভেঙে দিয়েছে নোটবন্দি। কালো টাকা বাজেয়াপ্তর খুড়োর কল আদপে কেড়ে নিয়েছে সাধারণ মানুষের রুজিরুটি। এরই মধ্যে বিজয় মালিয়া এবং নীরব মোদিরা সর্বমোট ২৩ হাজার কোটি টাকা চুরি করে দেশছাড়া।…

নোটবন্দির ফলে প্রায় দশ কোটি সংখ্যক মানুষ চাকরি খুইয়েছেন৷ যদিও সরকার জানিয়েছে যে নোটবন্দির ফলে বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ার কোনও পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই!

যাকগে, এসব তত্ত্বকথায় আর যাব না। কারণ, এখন, নাচাচ্ছে জীবন কলেজের গেটের বাইরে, এই ‘আচ্ছে দিন’-এর অশ্লীল রসিকতার মধ্যে, আরও বেশি করে৷

 

[1] https://thewire.in/labour/india-unemployment-jobs-cmie

[2] https://www.business-standard.com/article/economy-policy/unemployment-rate-at-five-decade-high-of-6-1-in-2017-18-nsso-survey-119013100053_1.html

[3] https://thewire.in/labour/labour-bureau-unemployment-data-nsso

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...