নতুন করে কিছু বলার নেই

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী

 

ওয়েল, স্মার্টকিডস। বাজার রাউন্ডে আমার পরের প্রশ্ন। হাবড়া হাসপাতাল, বারাসাত হাসপাতাল, এনআরএস, এসএসকেএম, শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল, বি সি রায় শিশু হাসপাতাল, আর জি কর হাসপাতাল— এগুলোর মধ্যে মিল কোথায়? আই মিন, সিমিলারিটি।

সব কটাই সরকারি হাসপাতাল।

রং অ্যান্সার। নট দ্যট সিম্পল। পাসিং টু নেক্সট হু প্রেসড্ দ্য বাজার।

সব কটা হাসপাতাল রিসেন্টলি একটা বাচ্চা মেয়েকে, বার্নট মেয়েকে ইনিশিয়ালি রিজেক্ট, অর রেফার করে দেয়। মেয়েটার নাম, আই রিমেমবার, দিয়া দাস।

এক্সেলেন্ট। ফিফটি পয়েন্টস।

ইয়েসস। এক হাতের মুঠি ঘুষি মারে অন্য হাতের তালুতে।

আর কিছু দিন পরে শহরের কোনও স্টুডিওয়, কোনও রিয়েলিটি শো-তে এই প্রশ্নটা করা হলে একদম অবাক হবেন না। তিন-চারটে হাসপাতালে রিজেকশন তো ঘটছে রোজ। দিয়া দাস সম্ভবত সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। একেবারে সাত। সাতটা বেড়ে আট হত। কিংবা হয়তো নয়। ছটা হাসপাতাল ঘুরে এসে আর জি করে ভাগ্যিস বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে দিয়েছিলেন দিয়ার বাবা-মা। তাঁদের আর্জি শুনেছিলেন হাসপাতাল কর্তারা। এ বাজারে বলা যায়, দয়াই করেছিলেন।

রোগী ‘নাকচনামা’ নামের এই চিরায়ত ধারাবাহিক উপন্যাসের প্রথম দিকের কয়েকটি পর্ব (আপনার খুশিমতো) যাঁরা মিস করে গিয়েছেন, তাঁদের জন্য ধরতাই। গত ৮ই মার্চ মছলন্দপুরের দিয়া বাড়িতে গৃহপ্রবেশের পুজোয় ব্যবহার করা মোমবাতি থেকে অগ্নিদগ্ধ হয়। তড়িঘড়ি দিয়াকে নিয়ে যাওয়া হয় হাবড়া হাসপাতালে। চিকিৎসা নয়, শুরু হয় রেফারযজ্ঞ। হাবড়া হাসপাতাল রেফার করে দেয় বারাসাত হাসপাতালে। ঠাঁই মেলে শুধু সেই রাতটুকুর জন্য। শনিবার সকাল হতে না হতেই এ বার দিয়াকে রেফার করা হয় নীলরতন সরকার মেডিক্যাল হাসপাতালে। পঁচানব্বই শতাংশ পুড়ে যাওয়া শিশুকে বারাসাত থেকে এনআরএসে নিয়ে আসার পরেও দু ঘণ্টা ফেলে রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সেখান থেকে রেফার করা হয় এসএসকেএম হাসপাতালে। এসএসকেএম-এ জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু করার পর দিয়াকে নিয়ে যেতে বলা হয় শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। ওই হাসপাতাল থেকে আবার জানানো হয়, আগুনে পুড়ে যাওয়া রোগীকে রাখার মতো পরিকাঠামো নাকি তাদের নেই। উপদেশ দেওয়া হয়, নিয়ে যাওয়া হোক নারকেলডাঙার বিধান চন্দ্র রায় শিশু হাসপাতালে। হাত উঠিয়ে দেয় বি সি রায় হাসপাতালও। দিয়াকে এ বারে রেফার করা হয় আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে।

মছলন্দপুর থেকে আর জি কর, সব কটা ‘স্টপ’ অ্যাড করে যদি গুগল ম্যাপে ডিরেকশান দেখতে চাইতেন দিয়ার বাবা, তাহলে দেখতে পেতেন, স্ক্রিনের মধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছে এক চক্রব্যূহ। শহরের রাজপথে সাড়ে পাঁচ বছরের একরত্তি মেয়েকে নিয়ে তিনি সত্যিই সাপলুডো খেললেন, বিধাতার সঙ্গে, সরকারের সঙ্গে, সরকারি পরিষেবার সঙ্গে। বি সি রায় শিশু হাসপাতাল থেকে শনিবার দুপুরবেলা আর জি করে পৌঁছলেন যখন, বলা হল শয্যা নেই। রাষ্ট্রের মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় গলাটা অনেকটা চিরে যাওয়ার পরে হয়তো আর্তনাদ করে উঠেছিলেন, করে উঠতে বাধ্য হয়েছিলেন দিয়ার বাবা রঞ্জিত। আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পরেও আর জি কর ভর্তি না নেওয়ায় বিক্ষোভ দেখানো শুরু করলেন। কর্তৃপক্ষের টনক নড়েছিল। দিয়ার ঠাঁই হল আইসিইউ-তে।

৯ মার্চ, শনিবার বিকেল থেকে ১৪ই মার্চ, বৃহস্পতিবার সকাল অবধি বেঁচেছিল দিয়া। নিভে গিয়েছে।

মেয়ের মৃত্যুর পর দিয়ার মা চায়না বলেছেন, ‘চিকিৎসা শুরু হতে এতটা দেরি না হলে মেয়েটা হয়তো প্রাণে বেঁচে যেত আমার।’ দিয়ার অবস্থা জেনে স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা প্রদীপ মিত্র গত শনিবার (৯ মার্চ) বলেছিলেন, ‘এমন তো কতই ঘটছে। এ ক্ষেত্রে কী হয়েছে, খোঁজ নিয়ে দেখব।’ কী খোঁজ নিয়েছিলেন, কতটা খোঁজ নিয়েছিলেন, তা অবশ্য প্রদীপবাবুই জানেন। আর মেয়েটির মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরে ওঁর বয়ান হল, ‘নতুন করে কিছু বলার নেই।’ বিশ্ব-বাংলার অন্য এক স্বাস্থ্য অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তীর উপলব্ধি হল, বিনামূল্যের পরিষেবা নিতে অনেকে সরকারি হাসপাতালে একসঙ্গে আসেন বলে রোগীর পরিবারকেও ধৈর্য রাখতে হবে। দিয়ার পরিবারের কান্নাভেজা দাবি, আর কতটা ধৈর্য ধরলে ধৈর্য ‘রাখা’ হয়?

রাষ্ট্রকে রুখতে প্রাণ দেন যাঁরা, তাঁদের জন্য কয়েক কোটি মোমবাতি জ্বলে। আর রাষ্ট্রের, রাজ্যের অপদার্থতার জন্য প্রাণ যায় যাদের, তাদের জন্য একটা দেশলাই কাঠিও জ্বালানো হয় না কোথাও। আগুন জ্বাললে মানুষ ফিরে আসে না, সম্মানটুকু দেখানো হয় অন্তত। বিষ মদ খেয়ে মারা গেলে সরকারি বদান্যতায় মোটা ক্ষতিপূরণ ঢোকে পকেটে। আর বিষের মতো পরিষেবা পেলে? যতটা পুড়ে গিয়েছিল দিয়া, তাতে তার বাঁচার সম্ভাবনা হয়তো সত্যিই কম ছিল। পঁচানব্বই শতাংশ পুড়ে গেলে শরীরের আর কতটুকুই বা অক্ষত থাকে? কিন্তু সঠিক সময়ে যদি চিকিৎসাটা শুরু করা যেত প্রথম হাসপাতাল থেকেই, তাহলে মেয়েটাকে হয়ত এত তাড়াতাড়ি নিভে যেতে হত না। চিকিৎসা না পেয়ে মেয়েটা চলে গেল— এমন ধারণা আমৃত্যু বইতে হত না দিয়ার বাবা-মাকেও।

পড়ুন — ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০১৯

আইন বলে আপৎকালীন পরিষেবা দেওয়া থেকে হাত উঠিয়ে নিতে পারে না কোনও হাসপাতাল। অথচ সেই নির্দেশিকাকে সম্মিলিত বুড়ো আঙুল দেখানো হয় প্রতিদিন। এমন ঘটনা ঘটলে মাঝে মাঝে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, হাসপাতালের খালি শয্যার সংখ্যা কত, সেটা জানার আগাম অধিকার কেন থাকবে না আম-জনতার? আজকের জমানায় মাত্র কয়েকটা ক্লিকে জেনে যাওয়া যায় আমার বাস কোথায়। স্ক্রিনে আঙুল নিয়ে খেলা করতে করতে আনানো যায় দশ কিলোমিটার দূরের কোনও প্রিয় দোকানের পছন্দের চাউমিন, এক পলকে দেখে নেওয়া যায় কোন হোটেলে কটা ঘর পাওয়া যেতে পারে আগামীকাল। সরকারি হোটেলের ঘরের তথ্য যদি আপডেট করা হয় প্রতিদিন পোর্টালে, হাসপাতালের তথ্য কেন নয়? হোটেল থেকে পয়সা আসে বলে? নাকি জরুরি পরিষেবাটুকু দিতে এক অনীহার গান কোরাসে গাওয়াই রীতি? হাসপাতাল চত্বরে কুকুর-বেড়াল, আয়ার বাড়তি পয়সা দাবি করা, সামান্য স্ট্রেচারের জন্যও রোগীর পরিবারের হয়রানি, কিছু বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের লোলুপ দৃষ্টি-সহ সরকারি হাসপাতালের চত্বরেই সাম্রাজ্য চালানো, অপরিচ্ছন্নতা— তালিকা বানাতে বসলে তা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। তা সত্ত্বেও মানুষ সেখানে যায়, যেতে বাধ্য হয়। কারণ পরিষেবার জন্য পয়সা লাগে না। তবে পয়সা না নিলেই যে কোনও রোগীর জীবনের মূল্য লঘু হয়ে যায় না— এই সত্যিটা হাসপাতালের সুপার-কিপার-দারোয়ানরা বুঝবেন কবে? দুম করে আপৎকালীন চিকিৎসার দরকার হলে কোনও রোগীর পরিবার যদি সহজেই আগাম দেখে নিতে পারে আমার পাশের হাসপাতালটায় শয্যা খালি আছে কি না, তা হলে তো চিকিৎসা পরিষেবার দাতা ও গ্রহীতা, দুপক্ষেরই সুবিধা। রোগীর পরিবারকে ভুল দরজায় কড়া নাড়তে হয় না। হাসপাতালকেও রেফার করার প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকতে হয় না আবার।

ছোট মুখে বড় কথা হয়ে যাবে হয়তো। হোক। স্বাস্থ্য দফতরের অধিকর্তারা যাঁরা আছেন, তাঁরা এবার দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলান। প্রদীপবাবু যেমন বলেছেন অবলীলায়, ‘এমন তো কতই ঘটছে।’ সবিনয়ে, আপনার সামনে নতজানু হয়ে, আমার হাতের কালো আঙুল দিয়ে আপনার দুপায়ের দশটি সোনার আঙুল স্পর্শ করে বলতে চাই, আপনার নিজের পরিজনকে, নিকটাত্মীয়কে যদি রেফারের এমন নাগরদোলায় ঘুরতে দেখতেন কখনও, একই কথা বলতেন তো? যদি না বলতেন, তাহলে নিজেকে, নিজেদেরকে বদলান। বদলানোটা জরুরি। দিয়া দাসদের মতো এমন ঘটনা, ঘটনার পর ঘটনা, খবর হয়ে বেরোয় যখন দৈনিক পত্রিকার পাতায়, নিজেদের মুখ দিয়ে বলা এমন উক্তিগুলো পড়তে আত্মসুখ হয় তো? নাকি সংবাদ মাধ্যমের ফোন অল্প কথায় কেটে দিলে নিজেদের ব্যস্ততাটা জাহির করা যায় আরও একটু বেশি? তাই তো ‘নতুন করে কিছু বলার’ থাকে না।

দিয়া দাস তার ভাগ্যের ফেরে রেকর্ড গড়েছে সম্প্রতি। তবে এসব নিয়ে বেশি ভেবে কাজ নেই। এমন ধরনের খবর চলতা-ফিরতা টাইপের। আসবে যাবে। যাবে আসবে। খবর একই থাকবে। নামগুলো বদলে যাবে শুধু।

বরং এর থেকে অনেক বেশি জরুরি এটা ভাবা যে নুসরত-মিমি ফিল্ম সামলে পলিটিক্স ম্যানেজ করবেন কী করে।

সবাই তো তাই ভাবছে। আপনি কোথাকার রাম্মোহন রায়?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...