ওঁরা চাকুরিপ্রার্থী, ভিক্ষুক নন

মন্দাক্রান্তা সেন

 

রাত দশটা। এখানে পুরোটাই অন্ধকার এখন। কালবৈশাখী। তার সঙ্গে মাথার ওপর কিছু নেই। শুয়ে পড়ছি। আজ তেইশ তারিখ রাতে এই লেখা যখন প্রকাশিত হবে, তখন চব্বিশ দিনে পড়ল অনশন। আর আজই রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি তৈরি করে বললেন বিষয়টি দেখবেন। যদিও কীভাবে এবং কতদিনের মধ্যে বিষয়টি দেখা হবে, মতামত মেলেনি। আশ্বাসও। শিক্ষামন্ত্রীর কথায়, ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে হবে, কী কী দাবি। তারপর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবশ্য এসবই মৌখিক। আদৌ কতটা আশ্বাস সন্দেহ থেকে যায়।

আজ এখান এসে যোগ দিলাম। সঙ্গে আছেন শমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভ্রা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মানুষ। খেয়াল করে দেখবেন, নির্বাচন বা অন্যান্য ‘জরুরি’ বিষয় বাংলা সংবাদপত্রগুলিতে যতটা জায়গা করে নিয়েছে, স্কুল সার্ভিসের বেনিয়মে চাকরি না পাওয়া যোগ্য প্রার্থীদের আন্দোলন তার সিকিভাগও পায়নি। কেন? কারণ এখানে অর্থ নেই। চাকচিক্য নেই। আছে হতাশা। যা ভোটের বাজারে বিকোবে না। মানুষ নেবে না। আর আজ, যখন আমরা এলাম, তখন বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমকে আসতে দেখলাম। জানি না, এটা আদৌ কোনও জয় কিনা, বরং হয়ত কিছুটা দুঃখজনকও। আন্দোলনকে খবরে রূপ দিতে দরকার হচ্ছে একটি বা কয়েকটি সুপরিচিত মুখ। ওদের আন্দোলন, ওদের প্রয়োজন শেষমেশ বিকিয়ে যাচ্ছে শহুরে জনপ্রিয়তায়। তবু, এসবের মাঝেও, এসব জেনেও পাশে থাকাটা দরকার।

বৃষ্টি। ঝড়। মাথায় ছাউনি নেই। পুলিশ বলছে আর্মি এলাকা। ছাউনি দেওয়া যাবে না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলা হল। তাঁরা রাজি নন। ছাউনি দেওয়ার অর্থ, স্থায়ী আশ্রয় দেওয়া। সেনাবাহিনী এই ঝুঁকি নিতে রাজি নন। তাহলে? উপায় নেই। অস্থায়ী কিছু ছোট ছোট ত্রিপল টেনে কোনওমতে এর-ওর মাথায় দেওয়া। অসম্ভব বৃষ্টি আর ঝড়ে সে সব থাকে! যত রাত বাড়ছে, অন্ধকারও। ওদের ভবিষ্যতের মতো। দিশা নেই। আমরা ঠাহর করতে পারছি না অন্ধকারে। বুঝতে পারছি না কোথায় হাঁটব। আমাদের মেয়েদের জন্য কাছাকাছি টয়লেটের অভাব। যথেষ্ট জলের যোগান নেই। তবু, আমরা, আন্দোলনে আছি। যতদিন সুরাহা না হয়।

আমরা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চাই না। ন্যূনতম কোনও মানবিক হস্তক্ষেপ কি করা যেত না? পরীক্ষা দিয়ে যোগ্য প্রার্থীরা কেন এভাবে ব্রাত্য বলে গণ্য হবেন? ভিখিরিদের মতো অবস্থা। নেই, নেই, কিছু নেই। ২০১২-র পর কোনও রিক্রুটমেন্ট নেই। প্রকৃত শূন্যপদ ঘোষণায় টালবাহানা। এমপ্যানেল্ড লিস্টে অসঙ্গতি। ওয়েটিং লিস্ট তৈরির মধ্যেও বিস্তর সমস্যা। এতসব খাঁটি প্রমাদ হাতেকলমে দেখিয়ে দিয়ে যাঁরা দিনের পর দিন অনশন করছেন, তাঁদের কি এই ব্যবহারই প্রাপ্য? তাঁরা তো কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রচারে আসেননি। তাঁরা চেয়েছেন, প্রকৃত যোগ্যতায় চাকরি পেতে। সরকার থেকে অন্তত মৌখিক আশ্বাসটুকুও মেলেনি। লিখিত আশ্বাসের কথা ছেড়ে দিলাম। আজ যখন বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী, তার আগে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেছে। অন্তঃসত্তার ভ্রূণ নষ্ট হয়েছে। চারশর ওপর মানুষের ভেতর আটাত্তরের ওপর মানুষ অসুস্থ। আজ একটি মেয়েকে সাসপেক্টেড ডেঙ্গু কেসে অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হল। অবস্থা একেবারেই ভালো না। বমি করছে। প্রচণ্ড জ্বর। মাথা, গা হাত পা ব্যথা। এর আগে হাসপাতালে ভর্তি ছেলেমেয়েগুলো চিকিৎসা আর কিছুটা বাধ্যতামূলক খাওয়াদাওয়ার পর আবার চলে আসছে অনশন মঞ্চে। অনেকগুলো হাত। একটা বৃত্ত। যেটা ক্রমশ বড় হচ্ছে।

মেডিকেল কলেজ বা সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত কিছু উদ্যোগ দেখছি। ডক্টর সুমিত দাস, কুশল সেন, অনির্বাণ দত্তরা এসেছেন। প্রয়োজনে চিকিৎসা করছেন। প্রার্থীদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিচ্ছেন। যা চাই, তার থেকে বেশি সাহায্য পাচ্ছি তাঁদের থেকে। অভিযোগের তো প্রশ্নই নেই, বরং একরাশ ভালোবাসা আর ধন্যবাদ দেওয়ার আছে। তাঁরা প্রকৃত চিকিৎসকের কাজটুকু করছেন।

পড়ুন — ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০১৯

মহম্মদ সেলিমের মতো মানুষ পাশে এসেছেন। কথা বলেছেন। শুনছেন সমস্যাগুলো। কিন্তু সমস্যা হল প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে কাজগুলো হওয়া দরকার। সরকার থেকে মানবিক কিছু পদক্ষেপ বড় জরুরি। মানুষ হিসেবে এঁদের সঙ্গে যোগাযোগের বড় প্রয়োজন। এখনও বহু মানুষ শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। হ্যাঁ, তেইশ দিনের অনশনের পরও। তাঁরাও কতদিন পারবেন? শরীর কতদিন নেবে? মনের জোরেই চলছেন।

এ লড়াই চলবে…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1320 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...