প্রসঙ্গ রাফাল : চুক্তির দেরাজে আর কত কঙ্কাল লুকোতে চাইছে সরকার

অমিত দাশগুপ্ত

 

দুর্নীতির বিরুদ্ধে চৌকিদার — চুক্তিতে দুর্নীতিবিরোধী ধারা বাদ

যে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে মূল মন্ত্র করেছে, যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিজেকে চৌকিদার ঘোষণা করার পরে সম্প্রতি তার অনুগামী সমস্ত সৎ-অসৎ, ধনী-নির্ধন, চোর-সাধু, ঋণখেলাপি পলাতক মেহুল-নীরব-ললিত-মালিয়া, সাঙাত পুঁজিপতি-জিএসটির ভারে ন্যুব্জ ছোট ব্যবসায়ী সকলকে চৌকিদার ঘোষণা করেছেন, তারাই রাফাল যুদ্ধবিমান ক্রয় চুক্তি থেকে দুর্নীতিবিরোধী ধারাকে বাদ দিয়ে দিলেন। ভারতীয় প্রতিরক্ষা ক্রয়পদ্ধতি অনুসারে, এই সব চুক্তিতে অনাকাঙ্খিত প্রভাব বিস্তারের জন্য জরিমানা, দালালের কমিশন বা দালাল সংক্রান্ত নিষেধ ইত্যাদি যে সমস্ত দুর্নীতিবিরোধী ধারা থাকে সেগুলিকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। অফসেট চুক্তির ধারাগুলিকে পরিবর্তন বা সংশোধন করা হয়েছে, আরবিট্রেশনের বিষয়টিকেও পাল্টানো হয়েছে। যোগান প্রকরণে পরিবর্তন ঘটিয়ে ওই সব ধারাগুলিকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

 

যুদ্ধবিমান ক্রয়ের পূর্বতন টেন্ডার প্রত্যাহারের কথা গোপন রাখা

মনে রাখা দরকার, রাফাল কেনার জন্য দাসো কোম্পানির সঙ্গে যে দর কষাকষি ও আলোচনা পূর্বতন ইউপিএ-১ সরকারের আমল থেকে সেই ২০০৭ সালে বিজ্ঞাপিত আরএফপি (টেন্ডার) প্রকাশের পর শুরু হয়েছিল সেই টেন্ডার বা আরএফপিকে ২০১৫ সালের জুন মাসে, প্রধানমন্ত্রী ফরাসি দেশ সফরে গিয়ে এপ্রিলের ১০ তারিখে আন্তর্সরকার চুক্তির কথা ঘোষণা করার দুমাস পরে, প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। ওই সময় যুদ্ধবিমান ক্রয় করার ব্যবস্থা হচ্ছিল আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করে। সেক্ষেত্রে ৬টি কোম্পানি দরপত্র পেশ করেছিল, রাফালের দর সব থেকে কম বলে বিবেচিত হচ্ছিল। কিন্তু পূর্বতন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে এ্যান্টনি কর্তৃক নিযুক্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের একটি টিম রাফাল সংক্রান্ত দরকষাকষিকে খতিয়ে দেখে যে রিপোর্ট দেয় তার উপসংহার নিম্নরূপ (এই তথ্য সিএজি রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত আছে):

  1. টেকনিক্যাল মূল্যায়নের সময়ে দাসো (রাফাল প্রস্তুতকারক কোম্পানি) আরএফপির এএসকিউআর (বায়ুসেনার গুণগত প্রয়োজনীয়তা), ওয়ারান্টি ও অপশন ধারাগুলির ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক ছিল। সেই স্তরেই দাসো-র প্রস্তাব বাতিল হওয়া উচিৎ ছিল।
  2. দরপত্র পেশ করার সময় শেষ হওয়ার পরে অতিরিক্ত বাণিজ্যিক প্রস্তাব গ্রহণ (যা দাসো-র কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছিল) অভুতপূর্ব ও সমস্ত ধরনের আর্থিক বিধি লঙ্ঘনকারী।
  3. দাসো-র দর অসমঞ্জস, কারণ এটি অসম্পূর্ণ ও নির্ধারিত ফর্মাটে নয়।
  4. এল-১ (সর্বনিম্ন দর) সাব কমিটি অসম্পূর্ণ ক্ষেত্রগুলিকে অন্যত্র প্রদত্ত তথ্য থেকে অনুমান করে ভরাট করেছে। সেটি করার সময় বিভিন্ন ধারণা করেছে। অসম্পূর্ণ বাণিজ্যিক প্রস্তাব ও ধারণার ভিত্তিতে নির্ধারিত এল-১ ভুল ও তদর্থে এল-১ ত্রুটিযুক্ত এবং নির্ধারিত পদ্ধতি মেনে করা হয়নি।
  5. দাসো এল-১ নয়, সুতরাং তাদের সঙ্গে চুক্তি করা যায় না।
  6. ইএডিএস (ইউরোফাইটারের যোগানদার)-এর প্রস্তাবও আরএফপির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সুতরাং কমিটি সুপারিশ করে যে এমএমআরসিএ (মিডিয়াম মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট বা মাঝারি স্তরের বহুবিধ ভূমিকাযুক্ত যুদ্ধবিমান)-র ক্রয়ের আরএফপি প্রত্যাহার করা হোক।

এই রিপোর্ট পেশ করার পরে বর্তমান সরকার কখনও রিপোর্টটির পর্যবেক্ষণ ও সময়কাল প্রকাশ করেনি। ২০১৯ সালের জানুয়ারির সিএজি রিপোর্টেই কেবল এ বিষয়ে জানা গেছে। কেন এমনটা করা হল?

খেয়াল করুন, এই রিপোর্ট পেশের ঠিক দু সপ্তাহ বাদে ২০১৫ সালের ১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগের এমএমআরসিএ প্রস্তাবের থেকে ‘সুবিধাজনক’ শর্তে জরুরি ভিত্তিতে ৩৬টি রাফাল কেনার অনুরোধের কথা ঘোষণা করেন। জুন, ২০১৫ সালে এমএমারসিএ টেন্ডার প্রত্যাহারের দু মাস আগে এই ঘোষণা করা হয়।

কয়েকটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হল,

  1. যদি ২৭ মার্চের রিপোর্টটিকে জনসমক্ষে আনা হত তাহলে কি সরকার ৩৬টি রাফাল ক্রয়ের প্রক্রিয়া চালাতে পারতেন?
  2. ওই ৩৬টি রাফাল ক্রয়ের কথা কি আগে থেকেই বিবেচনা করা হচ্ছিল নাকি ২৭ মার্চের পরে ১৪ দিনের মধ্যেই তা ভাবা হয়েছিল?
  3. বায়ুসেনা বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রককে কি ৩৬টি রাফাল কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে ২৭ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল এই ১৪ দিনের মধ্যে ওযাকিবহাল করা হয়েছিল?

ওই ২৭ মার্চের রিপোর্টের অংশ বিশেষ জনসমক্ষে আসার পরেও সরকার তা চেপে রেখেছিল কারণ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কর্তাদের নিজস্ব রিপোর্টে রাফাল সর্বনিম্ন দর সম্পন্ন নয় বলে ঘোষিত হওযার মাত্র দু সপ্তাহের মধ্যে ৩৬টি রাফাল কেনার কথা ঘোষণা করা যেত না। বরং ৩৬টি রাফাল কেনার বরাতের বৈধতাকে মান্যতা দেওয়ার জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাফালকে সর্বনিম্ন ব্যয়সম্পন্ন বলে দাবি করেছিলেন, যখন তারই মন্ত্রকের রিপোর্ট রাফালকে এল-১ বলতে অস্বীকার করেছে। সরকার ২৭ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল ওই দু সপ্তাহের মধ্যে ওই টেন্ডারকেও প্রত্যাহার করেনি কারণ তা জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করতে হত যা ৩৬টি রাফাল বিমান কেনার ঘোষণায় বাধা সৃষ্টি করত।

 

ফরাসি সরকারের মাধ্যমে দাসো-র প্রভাব বিস্তার

যখন ফরাসি কোম্পানি বিভিন্ন চাল চেলেও নিজেদের যুদ্ধবিমান বিক্রি করতে পারল না, তখন তারা ফরাসি সরকারের সহায়তা নিয়ে আন্তর্সরকার চুক্তি (আইজিএ)র রাস্তা ধরেছিল। দেউলিয়া সাঙাত পুঁজির মালিককে উদ্ধার করার জন্য (অন্যতর উদ্দেশ্যপূরণের জন্যও) ভারতের প্রধানমন্ত্রী পূর্বে বাতিল হওয়া কোম্পানির কাছ থেকে তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী বিমান কিনতে রাজি হলেন। ফলে চুক্তিতে দাসো-র অভিপ্রায় অনুযায়ী পরিবর্তন পরিমার্জন করা হল। স্বভাবতই একটি প্রতিষ্ঠিত ঋণখেলাপি, প্রতিরক্ষা ব্যবসায়ে কোনও অভিজ্ঞতাহীন কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাসো ভারতের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধে আদায় করবেই। তা তারা করেছেও।

 

রাফাল বিমানের মূল্য সব হিসেবেই আগের মূল্যের থেকে অন্তত ২০% বেশি

একদিকে আন্তর্সরকার চুক্তির কথা বলা অন্যদিকে সেই ছদ্মবেশে একটি বাণিজ্যিক যোগানদারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করাকে সমালোচনা করে ভারতীয় দরকষাকষি (আইএনটি) দলের তিন জন বিস্তৃত নোট দেন, যেটি হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, যা এখন শীর্ষ আদালত পর্যন্ত পৌঁছেছে। ওই নোটে এই উপসংহারে পৌঁছানো যায় যে, বর্তমান চুক্তিতে রাফালে বিমানের দাম কিছুতেই পূর্বতন চুক্তির বিমান পিছু দামের কম নয়। যদিও সিএজি রিপোর্ট অনুসারে রাফাল বিমানের বিমানপিছু দাম পূর্বতন বাতিল চুক্তির বিমান পিছু দামের তুলনায় ২.৮৬% কম বলা হয়েছে, কিন্তু সেই রিপোর্ট আগের বাতিল চুক্তিতে থাকা ব্যাঙ্ক গ্যারান্টির ব্যয়কে অন্তর্ভুক্ত না করেই নূতন চুক্তির বিমানপিছু দাম হিসেব করেছে। ফলে ব্যাঙ্ক গ্যারান্টির ব্যয় হিসেবে দাসো কোম্পানি ৫৭.৪ কোটি ইউরো (আইএনটির ৩ জনের নোট অনুসারে) ছাড় পেয়েছে। সিএজির হিসেব কষা হয়েছে (রিপোর্টে নেই) পূর্বতন চুক্তির মূল্যকে ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি সমেত ধরে, এবং বর্তমান চুক্তির মূল্যকে ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি ছাড়া ধরে। যদি উভয় চুক্তিকেই ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি ব্যতিরেকে দেখা হয়, তাহলে পূর্বতন বাতিল চুক্তির তুলনায় বর্তমান চুক্তির মূল্য কেবল ব্যাঙ্ক গ্যারান্টির জন্য ৫.৩% বেশি হবে বলে মন্তব্য করা হয়েছে ওই নোটে যাতে স্বাক্ষর করেছেন মি. এস পি সিং (উপদেষ্টা-ব্যয়), মি. এ আর সুলে (ফিন্যান্স ম্যানেজার (এয়ার) ও মি. রাজীব ভার্মা, (জেএস ও এএম, এয়ার)। ওনারা তিনজন এই বিষয়গুলি উপস্থাপিত করলেও ভারতীয় দরকষাকষি দলের বাকি চারজনের সম্মতিতে চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়।

রাফাল সংক্রান্ত যেসব আলোচনা চলছে তা থেকে এটি পরিষ্কার যে ওই যুদ্ধবিমানের দাম নির্ধারণের বিষয়টি এতটাই জটিল ও অপরিচ্ছন্ন ছিল, অন্তত পূর্বের ১২৬টি বিমান ক্রয়ের ক্ষেত্রে যে, সেই দরপত্র থেকে কোনও একটি বিমানের দাম নির্ধারণ বহু অপরিমাপযোগ্য ধারণার উপরে ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। ফলে সিএজি রিপোর্টের ভিত্তিতে হিসেব করা ৩৬টি বিমান ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিমানপিছু মূল্য ১২৬টি বিমান ক্রয়ের বিমানপিছু মূল্যের থেকে ২.৮৬% কম বলা হলেও তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সম্প্রতি হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত রাফাল ক্রয় সংক্রান্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের যে সমস্ত তথ্য ও দস্তাবেজ সামনে এসেছে তা থেকে ওই বিমান ক্রয়ের ক্ষেত্রে যে সরকারি স্তরে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে তা ধারণা করা যায়।

কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবি শঙ্কর প্রসাদ বিজেপি দফতরে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই বলেন যে, ২০০৭ সালে রাফালের দর দেওয়া হয়েছিল প্রতিটি (অস্ত্র ছাড়া, কেবল বিমান) ৭.৯৩ কোটি ইউরো, ২০১১তে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০.০৮৫ কোটি ইউরো। সেটাকে ৯% কমিয়ে ৯.১৭৫ কোটিতে নামানো হয়েছে। লক্ষণীয় সিএজি রিপোর্টে বলা ২.৮৬% কমের হিসেবের সঙ্গে শ্রী প্রসাদের তথ্য মিলছে না।

ভারতে নির্দিষ্ট পরিবর্ধনের (আইএসই) জন্য দাসো অপুনঃপৌনিক ব্যয় হিসেবে ১৩০ কোটি ইউরো চেয়েছে। ফলে প্রতিটি বিমানের দর, ১২৬টি বিমান কিনলে বাড়ত ১.০৩২ কোটি ইউরো। কিন্তু ৩৬টির ক্ষেত্রে ওই বৃদ্ধি হবে বিমানপিছু ৩.৬১১ কোটি ইউরো। ফলে আইএসই ব্যয় সমেত প্রতিটি বিমানের দাম আগের ১১.১১৭ কোটি ইউরো থেকে বেড়ে ১২.৭৮৬ কোটি ইউরোতে দাঁড়াবে। ফলে কেবল আইএসইর জন্য বিমানপিছু দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ। সুতরাং ব্যাঙ্ক গ্যারান্টির জন্য ব্যয়যুক্ত করে বিমানপিছু দামের তফাৎ ২০%-এর বেশি। ৩৬টি বিমানে মোট বৃদ্ধির পরিমাণ ১৩২ কোটি ইউরো, টাকার অঙ্কে প্রায় ১০.৩৫০ কোটি টাকা। কেবল তাই নয় ১২৬টি বিমানের ক্ষেত্রে যে আরও ৫০% অর্থাৎ ৬৩টি বিমান তৈরির অবকাশ ছিল সেটি ধরলে আইএসইর অপুনঃপৌনিক ব্যয় আরও কমত, ফলে চুক্তিটি অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হত (তফাৎ হত ১৪৫ কোটি ইউরো বা, ১১৩৪০ কোটি টাকা, যা ২২.৫% বেশি)।

 

প্রধানমন্ত্রীর দফতরের অতি সক্রিয়তা কেন?

প্রধানমন্ত্রী চটজলদি ফরাসি রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে ৩৬টি রাফাল কেনা নিয়ে আন্তর্সরকার চুক্তি করার পরেও সেই বিমানগুলির দরকষাকষি প্রধানমন্ত্রীর দফতরের বিষয় ছিল না। তবুও দরকষাকষির স্তরে যাতে চুক্তিটি বাতিল না হয়ে যায় তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দফতর আইএনটির উপরে নির্ভর না করে ফরাসি সরকারের আমলাদের সঙ্গে সমান্তরাল কথাবার্তা চালাতে থাকে। যার ফলে ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ডেপুটি সেক্রেটারি একটি নোটে লেখেন, “অনুরূপ সমান্তরাল কথাবার্তা প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের আলোচনার শক্তিকে দুর্বল করছে। যদি প্রধানমন্ত্রীর দফতর প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের আলোচনার ফলাফলের উপর আস্থা রাখতে না পারেন তাহলে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নেতৃত্বে আলাোচনার একটি সংশোধিত প্রকরণ গ্রহণ করা যেতে পারে।”

যোগান প্রকরণে পরিবর্তন আনা ও বর্তমান রাফাল চুক্তিকে কেন্দ্র করে নিয়োজিত আইএনটির মধ্যে যথেষ্ট বিরোধ ছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখে হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত সাংবাদিক এন রামের নিবন্ধের সঙ্গে দলিল হিসেবে যে ৮ পাতার নোট প্রকাশিত হয়েছে তার ছত্রে ছত্রে সেই বিরোধগুলি ফুটে উঠেছে।

 

ফরাসি কোম্পানি দাসো-র লম্বা হাত — ২০০০ সাল থেকে ২০১৯ — সেই ট্রাডিশন চলছে

কেবল যে বর্তমান চুক্তি মাফিক ৩৬টি রাফাল কেনার ক্ষেত্রেই ফরাসি কোম্পানি এরূপ প্রভাব বিস্তার করছে বা করেছে তা নয়। ২০০০ সাল থেকে শুরু করে ২০১৯ পর্যন্ত কেন্দ্রের সব ধরনের সরকারকে বশ করে যুদ্ধবিমানের বরাত হাসিল করেই ছেড়েছে ওই কোম্পানিটি। রাফাল বিমান সংক্রান্ত সিএজি প্রতিবেদনকে খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, কীভাবে যুদ্ধবিমান ক্রয়প্রক্রিয়াকে প্রত্যেক স্তরে প্রভাবিত করা হযেছে এবং সরকারি ব্যবস্থা কীভাবে কেবল একটি কোম্পানির সুবিধে দেওযার বন্দোবস্ত করেছে সেই ২০০০ সাল থেকে। প্রায় দু দশক ধরে তিন তিনটি প্রধানমন্ত্রী ও চারজন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সময়কাল জুড়ে সেই প্রভাব বজায় থেকেছে।

 

২০০০ সাল থেকে মিরাজ বিক্রির চেষ্টা

সিএজি প্রতিবেদন অনুসারে:

২০০০ সালের আগস্ট মাসে বায়ুসেনা (আইএএফ) ১২৬টি মিরাজ-২০০০-৫ বিমান কেনার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটি ছিল যে, ২ স্কোয়াড্রন বা ৩৬টি বিমান সরাসরি কেনা হবে, বাকিগুলি হিন্দুস্তান এয়ারোনটিকস লিমিটেড বা হ্যাল-এ তৈরি হবে। কিন্তু টেন্ডার না ডেকে তা করা যাবে না বলে বিষয়টি বাতিল হয়। আইএএফ আবার ২০০১ সালের মার্চে ব্যয় ও সুবিধের তুলনামূলক আলোচনা করে মিরাজের কথাই বলে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, “রাফাল, ইউরোফাইটার, এফ-৩৫ ইত্যাদি মিরাজ ২০০০-৫-এর থেকে প্রযুক্তিগতভাবে উৎকৃষ্ট হলেও, ওই সব বিমানের অতিরিক্ত লড়াই-এর ক্ষমতা অব্যবহৃত থাকবে কারণ বায়ুসেনার স্বল্প দূরত্বের অভিযানের জন্য তুলনামূলকভাবে কম শক্তির বিমান দরকার। উল্লেখিত অন্যান্য বিমানগুলির অধিক মূল্যের সাপেক্ষে মিরাজ ২০০০-৫ অধিক কার্যকরী।” প্রতিরক্ষা মন্ত্রক আবার প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডারের কথা বলে ২০০১ সালের জুন মাসে।

আইএএফ পুনরায় মিরাজের দরবার করে ডিসেম্বর, ২০০১ সালে এই যুক্তিতে যে, “এই বিমানক্রয়কে পূর্বতন মিরাজ ২০০০ বিমানের পুনর্বার ক্রয় হিসেবে দেখা হোক।” আইএএফ-এর অনুরোধ অনুসারে এপ্রিল, ২০০২ থেকে সেপ্টেম্বর, ২০০২ পর্যন্ত বিমানটির কর্মক্ষমতা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা চলে। আইএএফ বলে যে কর্মক্ষমতার দিক থেকে মিরাজ ২০০০-৫ রাফাল, ইউরোফাইটার বা গ্রিপেন প্রভৃতির সমান এবং ওইগুলির তুলনায় কম দামি। দ্বিতীয়ত, এফ-১৬ বা এফ-১৮ মিরাজ ২০০০-৫-এর সমক্ষমতাসম্পন্ন হলেও আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা জারি করলে ওগুলো পেতে অসুবিধে হতে পারে। তৃতীয়ত, রাফাল বা ইউরোফাইটার প্রযুক্তিগতভাবে উৎকৃষ্ট হলেও মিরাজ ২০০০-৫-এ রাফালের মত উন্নত অস্ত্রশস্ত্র যুক্ত করা সম্ভব। কিন্তু প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এই যুক্তি গ্রাহ্য করে না, ও ২০০২ সালের প্রতিরক্ষা ক্রয়পদ্ধতিকে অনুসরণ করে টেন্ডার ডাকতে বলে ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে।

 

এমএমআরসিএ টেন্ডার ও দাসোর ভূমিকা

এর পরে ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে বিমান সংক্রান্ত তথ্য জানার অনুরোধ (আরএফআই) বিজ্ঞাপিত হয়, এবং ২০০৭-এর আগস্ট মাসে টেন্ডার বা আরএফপি বিজ্ঞাপিত হয়। ফরাসি কোম্পানি দাসো এবার মিরাজ নয় রাফাল বিমানের জন্য দরপত্র দেয়। আরএফপির প্রথম স্তর হল কাগজপত্রের মূল্যায়ন যেখানে দরে উল্লেখিত বৈশিষ্ট সমূহ যাচাই করে দেখা হয় যে, সেগুলি বায়ুসেনার গুনগত প্রয়োজনীয়তা (এএসকিউআর) পূরণ করছে কিনা। এক্ষেত্রেও রাফালকে তিনবার বাতিল করা হয়। ২০০৮ সালের মে মাসে “রাফাল বিমান আরএফপিতে উল্লেখিত ৯টি এএসকিউআর মেটাতে পারেনি। এছাড়া, উৎপাদকের যন্ত্রাংশের তালিকা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্যাকজের তথ্যও দিতে পারেনি”— সিএজির প্রতিবেদন অনুসারে, “ফলে রাফাল বাতিল হয়ে যায়।” এএসকিউআর-এর সঙ্গে অসঙ্গতি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক কিছু প্রশ্ন তুলে বিভিন্ন বিমানকে পুনর্বিবেচনার জন্য মূল্যায়ন কমিটির কাছে পাঠায়। বিক্রেতাদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা গ্রহণ করে কমিটি ২০০৯ সালের মার্চ মাসে নিজেদের মূল্যায়নকেই সমর্থন করে, ফলে রাফাল আবার বাতিল হয়ে যায়। ওই মাসের ১২ তারিখে দরপত্রের ওয়ারান্টি এবং অপশন ধারা সম্পর্কে ব্যখ্যা নেওয়ার পরে কমিটি ২৫ মার্চ আবার রাফালকে বাতিল করে।

পড়ুন — ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০১৯

সিএজি প্রতিবেদন বলছে যে, “যে ৯টি এএসকিউআর-এর ভিত্তিতে রাফাল বাতিল হয়েছিল পরবর্তী ব্যাখ্যায় তার মধ্যে ৬টি বিষয়ে রাফাল এএসকিউআর মেটানোর জন্য সংশোধন করতে রাজি হয়। ও অতিরিক্ত বাণিজ্যিক প্রস্তাব দিতে চায়। কিন্তু তিনটি এএসকিউআর মেটাতে পারেনি। এছাড়া, ওযারান্টি ও অপশন ধারাগুলিকেও মেটাতে পারেনি। ফলে দাসো-র দর অগ্রাহ্য করা হয়, ও অন্য চারটি বিক্রেতার দরে কয়েকটি এএসকিউআর-এর ঘাটতিকে ছাড় দেওয়ার জন্য রক্ষামন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করা হয়।” তখন দাসো প্রতিরক্ষা মন্ত্রককে বলে যে তারা উচিৎ পরিমাণ মূল্যের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় সমস্ত পরিবর্তন করে দেবে। ১৩ মে ২০০৯ তারিখে মূল্যায়ন কমিটি মন্ত্রকের কাছে রিপোর্ট পাঠায় যে, “দাসো-র প্রস্তাব আরএফপির সমস্ত প্রযোজনকেই মেটাতে পারছে। তাছাড়া, পরীক্ষামূলক উড়ানের সময়ে ওই সমস্ত বিষয় যাচাই করা যাবে। দাসো=র কাছ থেকে অতিরিক্ত বাণিজ্যিক প্রস্তাব গ্রহণ করা যেতে পারে।” ২০০৬ সালের প্রতিরক্ষা ক্রয়পদ্ধতি অনুসারে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া যায়। কিন্তু সিএজির প্রতিবেদন অনুসারে, যেক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কোনও অধিকার নেই সেই ক্ষেত্রেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। দাসোকে দর পাল্টে দেওয়া হয়েছে, বাণিজ্যিক দরও, দরপত্র পেশ করার দিন বহু আগে অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও। সিএজি বলেছে যে “টেকনিক্যাল অফার বড়সড়ভাবে পাল্টানো যায় না।” মূল বাণিজ্যিক দরও নির্দিষ্ট ও স্থির হওয়া প্রয়োজন। অডিট রিপোর্ট বলে যে, দাসোকে এই বদল ঘটাতে দেওয়া প্রতিরক্ষা ক্রয়পদ্ধতির লঙ্ঘন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কথায়, এটা করেছে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা, প্রতিরক্ষা ক্রয় কাউন্সিল। সিএজির কথায় সেই সর্বোচ্চ সংস্থারও নিয়ম ভাঙার কোনও ক্ষমতা নেই। দাসোকে ১৪টি বিষয়ে পরিবর্ধনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাকে তারা ভারত-নির্দিষ্ট পরিবর্ধন (আইএসই) বলছে, যার ফলে অনেক টাকার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ও বায়ুসেনা নিজেদের বিধি ভেঙে দাসোকে সুবিধে দিয়েছে। সিএজি এও বলেছে যে, যে সমস্ত পরিবর্ধনকে দাসো ভারত-নির্দিষ্ট বলছে তার অনেকগুলিই অন্য বিমানগুলিতে ছিল।

এরপরে ২০১১ সালের ২৭ এপ্রিল দাসো ও ইউরোফাইটার বাদে অন্য চারটি বিমানকে এএসকিউআর-এর উন্নতি ক্ষমতা (গ্রোথ পোটেনশিয়াল) ও নকশার পরিণতমনস্কতা (ডিজাইন ম্যাচুরিটি) মেটাতে না পারার জন্য বাতিল করা হয়। সিএজির নোট অনুযায়ী, “ওই বিষয়গুলিকে যাচাই-এর কোনও বস্তুগত ও পরিমাপযোগ্য সূচক ছিল না।” প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ব্যখ্যা দিলেও তা সিএজির কাছে সন্তোষজনক হয়নি। এর ফলে রাফালের তুলনায় উন্নত ও কম দামের বিমানগুলি প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যায়। কেবল ইউরোফাইটার দাম যাচাই-এর জন্য থেকে যায়।

 

রাফালের দাম নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার ও হিসেবে কারচুপি

কিন্তু সেই দামকেও এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে রাফাল ইউরোফাইটারের থেকে কম ব্যয়সম্পন্ন হয়ে ওঠে। আরএফপি অনুযায়ী যুদ্ধবিমানের দর একটি নির্ধারিত বিস্তৃত ফরম্যাটে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে পেশ করতে হবে  যাতে প্রতিটি দরের প্রত্যেকটি বিভাগের ব্যয়কে তুলনা করা সম্ভব হয়। দরগুলিকে তাদের জীবৎকালীন ব্যয় হিসেবে তুলনা করে সবথেকে সস্তাকে চিহ্নিত করা হবে ও তাকে এল-১ বলা হবে। ব্যয়গুলিকে ৭ ভাগে ভাগ করা হয়েছিল।

দাসো নির্দিষ্ট তালিকায় দর দেয়নি। সিএজি প্রতিবেদন অনুযায়ী, “দাসো আরএফপি নির্ধারিত ৭টি ব্যয়ভাগে বিভাজিত বিস্তৃত দর দেয়নি, যেটি ব্যয় তুলনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।” ফলে এই স্তরেই দাসো-র দর বাতিল করা উচিৎ ছিল। “ইএডিএস (ইউরোফাইটার) নির্ধারিত পদ্ধতি মেনেই দর দেয়। ফলে দরের তুলনা করতে অসুবিধে হয়।” সিএজি অবশ্য এও দেখে যে চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি ও এল-১ উপকমিটি দাসোকে কীভাবে সুবিধে দিয়েছে। “বিস্তৃত দর না থাকায় দরপত্রে প্রাপ্ত তথ্যের উপর দাঁড়িয়েই বিভিন্ন ভাগের ব্যয় এল-১ উপ কমিটি অনুমান করেছিল। যা করা সম্ভব ছিল না।”

যখন দুটি বিমানের যথাক্রমিক ব্যয়গুলির তুলনা করা হয়েছিল তখন যে ব্যখ্যা করা হয়েছিল সেখানেও কারচুপি দেখা গিয়েছে। ব্যয় বিশ্লেষণ ব্যাখ্যায় রাফালের দরকে কমিয়ে ও ইউরোফাইটারের দরকে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল।

সিএজি রিপোর্ট বলছে, “এল-১ সাবকমিটি ইউরোফাইটারের কিট ও অন্যান্য দ্রব্যের ব্যয় ‘কক’ শত ইউরো ধরেছে, যেখানে ইউরো ফাইটারের দরে রয়েছে ‘খখ’ শত কোটি ইউরো। এই ভুলের ফলে ইউরো ফাইটারের দাম ‘গগ’ শত কোটি ইউরো বাড়তি দেখানো হয়েছে। এটি ঘটেছে কারণ সাব কমিটি বিভিন্ন অংশকে প্রথমে ইউরো থেকে টাকায়, পরে আবার টাকা থেকে ইউরোতে পরিবর্তন করেছে। এর কোনও প্রয়োজন ছিল না কারণ উভয় বিক্রেতাই ইউরোতে দরপত্র দিয়েছিল।”

“দাসো ভারতে উৎপাদনের অনুজ্ঞা সংক্রান্ত কোনও মূলধনী ব্যয় দেখায়নি। বলেছে যে সেটি তারা পরে দেখাবে। এল-১ সাবকমিটি দরের তুলনার সময় ওই ব্যয়কে শূন্য ধরেছে। কিন্তু ইএডিএস (ইউরোফাইটারের) দরে মূলধনী ব্যয় ধরা হয়েছিল।” প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ব্যখ্যা দিতে চেয়েছিল যে অপুনঃপৌনিক ব্যয়ে ওই মূলধনী ব্যয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু সিএজি না মেনে বলেছে “অডিট বলছে যে অপুনঃপৌনিক ব্যয় ও মূলধনী ব্যয় দুটো আলাদা।”

তৃতীয়ত, রাফালের দরে ভারত নির্দিষ্ট পরিবর্ধনের জন্য বাণিজ্যিক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাকে সিএজি অন্যত্র বেনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তা বাদেও, “অতিরিক্ত বাণিজ্যিক ব্যয় দর পেশ করার সময়েও দাসো ওই ১৪টি আইএসইর জন্য মূলধনী ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করেনি।”

চতুর্থত, “দর মূল্যায়নের সময়ে দেখা যায় যে, দাসো প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত দরে এসকেডি, সিকেডি ও আইএম কিটসের ওয়ারান্টির ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করেছে। কিন্তু ইএডিএস কেবল এসকেডি কিটসের ওয়ারান্টি ধরেছে। সাব কমিটি তাই এসকেডি কিটসের ওয়ারান্টির ব্যয়কে অন্য দুটির ওয়ারান্টির ব্যয় নির্ধারণের জন্য ব্যবহার করে। কিন্তু এর ফলে ব্যয় বেড়ে যায়। উচিৎ ছিল, ওয়ারান্টি ব্যয় বাদ দিয়ে দরের তুলনা করা।”

 

প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যয় নির্ধারণে কারচুপি

এল-১ সাব কমিটি আর একটি চূড়ান্ত বদান্যতা দেখিয়েছে রাফালের দরকে এল-১ করার জন্য। এই বদান্যতা এতটাই প্রবল যে এর ফলে বরাতটাই বাতিল হয়ে যায়।

সিএজির অডিট নোট অনুযায়ী, “ভারতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে হ্যালে উৎপাদন করার জন্য আরএফপিতে প্রয়োজনীয় মানব-ঘণ্টা উল্লেখ করার কথা ছিল। ইএডিএস ২.৫৫ কোটি মানব ঘণ্টা উল্লেখ করে দর দেয়। দাসো উল্লেখ করে ৩.১২ কোটি মানব ঘণ্টা। কিন্তু দাসো-র ভাষ্য অনুযায়ী এই মানব ঘণ্টা ফরাসি শিল্প মান অনুযায়ী। কিন্তু আরএফপি অনুসারে এটি ভারতীয় মান অনুসারে হওয়া উচিৎ ছিল। হ্যাল জানায় যে ফরাসি মানব ঘণ্টাকে ২.৭ দিয়ে গুণ করে ভারতীয় মানব ঘণ্টা পাওয়া যাবে। কিন্তু চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি এটিকে অগ্রাহ্য করে মূল্য নির্ধারণ করে ও দাসো এল-১ হয়। কিন্তু পরে দাসো-র সঙ্গে দরকষাকষির সময়ে ২.৭ দিয়ে ওই মানব ঘণ্টাকে গুণ করলে রাফাল আর এল-১ থাকে না। সিএজি প্রতিবেদন বলে যে, অডিট অনুযায়ী ওই বিষয়টি ধরলে বেতন ও মজুরি ২.৭ x ৩.১২ কোটি দাঁড়াবে ফলে দাসো-র দর ‘চচ’ শত কোটি ইউরো বৃদ্ধি পাবে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এক অদ্ভুত যুক্তি দেয়। বলে যে, হ্যাল কর্তৃক উল্লেখিত মানব ঘণ্টার কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু অডিট রিপোর্ট বলে যে, মন্ত্রক ব্যখ্যা দিতে পারেনি কীভাবে ওই মানব ঘণ্টা ব্যয় হিসেব করা হল কারণ দরপত্রটি ফরাসি শিল্পের অবস্থা অনুযায়ী পেশ করা হয়েছিল। এই বিষয়টি দরকষাকষিতে অচলাবস্থা তৈরি করে যা কখনও সমাধান করা যায়নি। সিএজি এটাও বলে যে, “আরএফপি অনুসারে উৎপাদন ক্রেতার দেশেই হোক বা উৎপাদকের কারখানাতেই হোক, বিক্রেতা সব ক্ষেত্রেই নকশার বৈশিষ্ট অনুযায়ী কাজ করার নিশ্চয়তা দেবে।”

 

দাসো-র ভারতে প্রযুক্তি হস্তান্তরে টালবাহানা ও যুদ্ধবিমান ক্রয়প্রক্রিয়াটিকে অন্তর্ঘাত

“কিন্তু চুক্তি পর্যালোচনার সময়ে দাসো তাদের কারখানায় তৈরি ১৮টি বিমান সম্পর্কে নিশ্চয়তা দিতে রাজি হয়, প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে হ্যালের কারখানায় তৈরি হওয়া বাকি ১০৮টি সম্পর্কে দায় নিতে অস্বীকার করে।”

২০১৫-র মার্চ মাসে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এক অদ্ভুত অবস্থায় উপনীত হল, হয় সিএজির উল্লেখিত এই সমস্ত অভিযোগ যা দুর্নীতি তাকে মেনে নিতে হয়, বা টেন্ডারটি প্রত্যাহার করতে হয়। ফলে শেষেরটিই ঘটে, টেন্ডারটি প্রত্যাহৃত হয়। যা আগেই উল্লেখিত হয়েছে।

ফরাসি কোম্পানিটি কখনওই ভারতে রাফাল তৈরিতে রাজি ছিল না। মনে হয় তারা এল-১ হওয়ার জন্য সমস্ত ধরনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করে ও পুরো প্রক্রিয়াটিকে ধ্বংস করে। দাসো এইভাবে ১১ বছর সময় নষ্ট করেছে। যে অন্তর্নিহিত ব্যয় এর মধ্য দিয়ে ব্যয়িত হয়েছে তা পরিমাপ করা অসম্ভব। এছাড়া ভারতীয় বায়ুসেনার সুরক্ষা ও দক্ষতায় যে বাধা সৃষ্টি করেছে তাও অভাবনীয়। দাসো-র এই ‘অন্তর্ঘাত’-এর জন্য ওই কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করা উচিৎ ছিল। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাক্রম দেখাল যে, দাসো প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠেছে।

 

নরেন্দ্র মোদির বদান্যতা ও উদ্দেশ্য পূরণ

এভাবে হ্যালকে প্রযুক্তি হস্তান্তর সর্বৈব অস্বীকার করার পরেও ফরাসি কোম্পানি দাসো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বদান্যতায় ৩৬টি রাফাল বিক্রির বরাত পেল। যার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য সাধন করলেন:

  1. রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি হ্যালকে আর্থিক দিক দিয়ে দুর্বল করলেন।
  2. ভারতের মাটিতে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দাসো-র সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রকে ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণের পথে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করলেন।
  3. নিজের রাজনৈতিক দলের জন্য রাজনৈতিক সহায়তা বন্ডের মাধ্যমে প্রভূত অর্থের বন্দোবস্ত করলেন।
  4. সাঙাত পুঁজির দেউলিয়া মালিককে অর্থ সরবরাহের বন্দোবস্ত করলেন।
  5. প্রমাণ করলেন যে, ভারতীয় প্রতিরক্ষায় অস্ত্রশস্ত্র ক্রয়ের প্রথা প্রকরণ বোফর্সের সময় থেকে পাল্টায়নি, এখনও প্রভাব বিস্তার করেই অস্ত্র বা যুদ্ধবিমান বিক্রি করে বিদেশি কোম্পানি, এমনকি বিভিন্ন গরমিলের জন্য প্রস্তাব বাতিল হওয়ার পরেও। যদিও বোফর্সের মত কমিশন খাওয়ার ব্যাপারটি এখনও জানা যায়নি, কিন্তু ভবিষ্যতে তা প্রকাশিত হবে বলে আন্দাজ করা যায়।

 

তথ্যসূত্র: ১. দ্য হিন্দু ২. রাফালে স্ক্যাম — সৌরভ যোশি

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1371 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...