এসএসসি কর্মপ্রার্থীদের আন্দোলন কেন সমর্থন করি

সৈয়দ কওসর জামাল

অনশনের ২৬ দিন পেরিয়ে গেল। এসএসসি-র কর্মপ্রার্থীদের সমর্থনে আজ প্রথম শহরের মানুষকে দেখলাম এপিডিআর-এর ডাকে রাজপথে মিছিল করতে। এতদিন যে তাদের প্রতি কেউ সহানুভূতি দেখিয়ে পাশে দাঁড়াননি তা নয়। রাজনীতির মানুষ এসেছেন, ব্যক্তিগতভাবে কোনও লেখক কবি এসেছেন, সাধারণ মানুষ এসেছেন তাঁদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন, তাঁদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থনও জানিয়েছেন। আজ রাস্তায় নেমে যে সব মানুষ কর্মপ্রার্থীদের দাবির প্রতি স্পষ্ট সমর্থন জানালেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবে আন্দোলনকারীদের মনোবল অনেকখানি বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু আরও আগেই কি কলকাতা শহরের মানুষের কাছে এই সচেতনতা প্রত্যাশিত ছিল না? বিশ্বাস করি না আমাদের গণমাধ্যমের সবাই সরকারের কাছে নিজেদের বিবেককে গচ্ছিত রেখেছেন। অথচ তাঁরাও কর্মপ্রার্থীদের আন্দোলনকে গুরুত্ব দিতে দেরি করে ফেললেন। আমরা কি ভাবছিলাম দেখি পরিস্থিতি কতদূর যায়, কতদূর যেতে পারেন কর্মপ্রার্থীরা?

পড়ুন — ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০১৯

হ্যাঁ, ওঁরা কিন্তু দেখিয়ে দিয়েছেন ওঁরা কতদূর যেতে পারেন। অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, শারীরিক ক্ষতি মেনে নিয়েছেন, এক মা তাঁর গর্ভস্থ শিশুকে হারিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের মনোবলে একটুকুও চিড় ধরতে দেননি। গতকাল যে সামান্য প্লাস্টিকের আচ্ছাদন ওঁদের মাথার ওপর ছিল, আজ তাও পুলিস খুলে দিয়েছে, সুযোগ পেলে ওঁদের বিতাড়িত করার পরিকল্পনাও আছে। এঁদের একটাই অপরাধ, এঁরা পড়াশুনা করে ডিগ্রি অর্জন করে রীতিমত এসএসসি-র পরীক্ষায় সফল হয়ে শিক্ষক হতে চেয়েছিল। অপরাধ ? আসলে তাঁদের অপরাধ ছিল এই স্বপ্ন দেখা, তাঁদের জানা উচিত ছিল পরিবর্তনের রাজ্যে তাদের স্বপ্নকে নির্মমভাবে পদদলিত করার ব্যবস্থা স্থায়ী হয়েছে। কিন্তু ওঁরা তো নতুন প্রজন্ম, ওঁরা কেন মেনে নেবেন শিক্ষকনিয়োগের বিভ্রান্তি, তাই এই প্রতিবাদ, আর এই প্রতিবাদের ভাষা অনশন। তাঁরা মিছিল করেননি, হিংসাত্মক পথে হাঁটেননি। নীরব ফেস্টুন তুলে ধরেছেন সমাজের দিকে, দাবি করেছেন এসএসসির কাজে স্বচ্ছতা। প্রশ্ন করেছেন, কেন একজন প্রার্থী জানতে পারবেন না ঘোষিত ভ্যাকান্সির কতটা পূর্ণ হয়েছে, তাঁর র‍্যাঙ্ক কী, কতজন প্যানেলভুক্ত থাকলেন। তাঁরা প্রশ্ন করেছেন, কেন ঘনঘন বদলে যায় মেরিট লিস্ট? এসএসসির এত গোপনতা কেন? অথচ বাতাসে ভাসে দুর্নীতির কাহিনি, কোর্টে মামলা জমে যায়, তার মধ্যে দিয়ে শুনি নাকি নেতার কোটা ভর্তি হয়ে যায়, নেতার মেয়ে সবাইকে টপকে চাকরি পেয়ে যায়।

এতসব অভিযোগের মধ্যেও নির্বিকার এসএসসি। নির্বিকার শিক্ষাদপ্তর ও রাজ্য সরকার। যেন সব ঠিকঠাক চলছে। শুধুমাত্র আদালতই সব সমস্যার সমাধান করবে? রাজ্য সরকারের কোনও দায়িত্ব নেই? এসএসসি ও সরকার অভিযোগের জবাব না দিয়ে কর্মপ্রার্থীদের অভিযোগকে বাস্তব করে তুলছেন।

৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের শতেক দোষ। রাজ্যবাসী সেই কারণে তাঁদের ক্ষমতাচ্যুত করেছেন। কিন্তু তাঁদের কঠোর সমালোচকও স্বীকার করেন যে স্কুল সার্ভিস কমিশন তৈরি করে বিদ্যালয়ে নিয়োগে দুর্নীতির মূলে আঘাত করেছিলেন তাঁরা। নিয়োগের এই ব্যবস্থা ক্রমশ কর্মপ্রার্থীদের আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এগারো বার শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা হয়েছে আর স্বচ্ছতার অভাবের প্রশ্ন কখনও কেউ তুলেছেন বলে শুনিনি। সেই সময়ের মধ্যে প্রায় দেড়লক্ষেরও বেশি শিক্ষক, কয়েক হাজার করে প্রধান শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী নিযুক্ত হয়েছেন। এই বিপুল সংখ্যক নিয়োগের জন্য বিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থা এতদিন ভেঙে পড়েনি, যা এখন হচ্ছে। কারণ নতুন সরকার মাত্র দুবার নিয়োগের জন্য এসএসসির পরীক্ষা নিয়েছে। আর তাতেই এত অস্বচ্ছতা, এত দুর্নীতির অভিযোগ।

পড়ুন — যে যেখানে লড়ে যায়

এ কারণে এসএসসির ৪০০ কর্মপ্রার্থীর অনশন আন্দোলনকে আমি শুধু ৪০০ জনের চাকরির আন্দোলন বলে মনে করি না। এই আন্দোলন বিদ্যালয়শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা দাবির আন্দোলন, আগামী দিনের লক্ষ লক্ষ এসএসসি পরীক্ষার্থীর হিতের জন্য আন্দোলন, আমাদের বিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল রাখার জন্য আন্দোলন। এই আন্দোলনকে সমর্থন করা তাই প্রতিটি শিক্ষাসচেতন নাগরিকের কর্তব্য বলে মনে করি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1430 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*