প্রাণ ভরিয়ে

সলিল বিশ্বাস

 

কোন আকাশ এটা? চেনা যাবে না। এখানে চেনা সূর্য নেই, এখানে জানা নক্ষত্রমণ্ডলী নেই, এখানে চিরপরিচিত চাঁদ নেই। এখানে আছে শুধু নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। সেখানে খুব অল্পদিনের জন্য কোনও কোনও সময়ে কয়েক ছিটে তারা ফুটে ওঠে। সেটাও খুব সামান্য সময়ের জন্য। এখানকার পায়ের নিচের যে মাটি সেটাও কিন্তু মাটি নয়। খুব দ্রুত পায়ের নিচে সেটা ঘুরতে থাকে। সেই ঘোরার হিসেবটা কিন্তু দিন-রাত দিয়ে বিচার করা যায় না। পরিচিত যে গ্রহের ঘূর্ণন তার সঙ্গে এই ঘোরার কোনও মিল নেই। এটা যেন ঘোরে দমকে দমকে। ঠিক যেন কোনও ছটফটে শিশু দুপা এগোচ্ছে, দুপা পেছোচ্ছে। এই গ্রহের যে নক্ষত্র-মা, তার দূরত্ব এত বেশি যে এক বিন্দুও আলো এসে পৌঁছয় না এখানে। চিরন্তন অন্ধকারে থেকে থেকে এই গ্রহের মাটিতে না ফুটেছে কোনও ফুল, না হয়েছে কোনও গাছপালা, না এসেছে ঘাস। এ গ্রহের চিরন্তন অন্ধকারের মধ্যে প্রাণের সারা জাগেইনি। প্রাণশূণ্য বুক নিয়ে চিরন্তন আঁধারে ডুবে থাকা এ গ্রহের চলন। এই “সৌর”জগতের বুকে এই গ্রহের সঙ্গীদের চোখেই পড়ে না। তারা এত দূরবাসী। কেবল চলার পথে যখন সে এক একবার থমকায়, তার শরীরের উপরিভাগে এক একটা বিন্দুর মতো জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটে আর সেখান থেকে কিছু একটা ছুটে বেরিয়ে চলে যায় সেই অনন্ত অন্ধকারের দিকে।

এটা কোনও বাগান নয়। আগাছা দুটো একটা, একটা নাম-না-জানা ফুলের গাছ, একটা ভাঙাচোরা তুলসীমঞ্চ, তার পাশে একটা কুয়ো, তারও পাড়গুলো ভাঙা ভাঙা। সেইখানে সকালবেলা দুপুরবেলা আর বিকেলবেলা এসে বসে চন্দ্রিমা। তারও আকাশ নেই, মাটি নেই, সবুজ নেই, কোনও দিক নেই, কোনও সূর্য নেই, কোনও চাঁদ নেই রাত্তিরে। এর অন্য পাশের ছোট্ট কুঁড়েঘরটাতে চন্দ্রিমা থাকে তার মায়ের সঙ্গে। বাবা দিনমজুরের কাজ করেন। অনেক দূর দূর দেশে তাঁকে যেতে হয় কাজের খোঁজে। হয়তো সাত-আট-দশ দিন পরে পরে তিনি একবার বাড়িতে আসেন। মেয়েকে যেদিন যা জোটে খাইয়ে চন্দ্রিমার মা সকালবেলা বেরিয়ে যান। ফিরতে ফিরতে তাঁরও সন্ধে হয়ে যায় বেশিরভাগ দিন। সারাটা দিন চন্দ্রিমার একা একা কেটে যায় ওই কুয়োতলায় ওই গাছপালাগুলোর আশেপাশে। এতেই চন্দ্রিমা অভ্যস্ত।

চন্দ্রিমা দেখতে পায় না। তার জন্মের আগে থেকেই কী করে কে জানে তার দৃষ্টিস্নায়ুতন্তুগুলো মরে গিয়েছিল। মাটির মেঝেতে, মায়ের অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে, পাশের গ্রামের দাইবুড়ির নোংরা হাতে ছোট্ট যে শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছিল তার চোখে যে দৃষ্টি নেই সে কথা বুঝতে বুঝতে অনেকদিন কেটে গিয়েছিল মায়ের আর বাবার। যখন তাঁরা বুঝেছিলেন তখন কপাল চাপড়ে কাঁদা ছাড়া কীইবা করার ছিল তাঁদের। সেই থেকে মায়ের শুকনো বুকের নিরন্ন দুধ  আর মাঝে মাঝে একটুখানি ভাতের ফ্যান খেয়ে বড় হয়েছিল চন্দ্রিমা। যে রাত্রে সেই দৃষ্টিহীন শিশুটি প্রথম মায়ের কোলে শুয়ে হাত-পা নেড়েছিল, প্রথম কোলে উঠেছিল বাবা‌র, আকাশে ছিল ঝকঝকে জ্যোৎস্নার পূর্ণ চাঁদ। সেই দেখে অত কষ্ট আর দুশ্চিন্তার মধ্যেও বাবা ভীষণ খুশি হয়ে তার নাম রেখেছিলেন চন্দ্রিমা।

অনাহারে মৃত্যুর আশঙ্কা আর রোগজীর্ণ প্রাত্যহিকতার মধ্যেও শীর্ণকায় শিশুটি আস্তে আস্তে অপুষ্ট শৈশবের পথে হামা দিয়েছিল। রোদ্দুর বৃষ্টি ঠান্ডা ভিজে মাটি পাতার ছোঁয়া ঘাসের শিরশিরানি কুয়োর জলের আওয়াজ মায়ের হাতের ছোঁয়া বুকের গন্ধ বাবার খরখরে গাল মায়ের উল্টো কেমন একটা কটু গন্ধ বাবার শক্ত কোল মায়ের মাথায় লম্বা কোনও কিছুর স্পর্শ মায়ের হাতের খিদে জাগানো গন্ধ মায়ের মিষ্টি গলায় কথা আর আদর আর গান বাবার হাত থেকে উপরের দিকে বাতাসে উড়ে যাবার অনুভূতি শুকনো একটা উচ্চতা থেকে অল্প নিচে পড়ে যাওয়া কখনও কখনও কোনও কিছুতে আঘাত পাওয়া কোনও একটা বিচিত্র মন ভালো করা গন্ধ কোনও একদিন সারা গায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে কী যেন ঘুরে বেড়ায় হাত দিয়ে সরাতে গিয়ে হাতের পাতায় হাতে আর পায়ে তীক্ষ্ণ ব্যথার অনুভূতি কখনও ক্লান্ত হয়ে মায়ের কোলের কাছে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়া একটা সময় ঝাকুনি লেগে ঘুম ভাঙা কোনও কোনও দিন শুয়ে শুয়ে সমস্ত গা ভিজে যাওয়া কোনও কোনও দিন সেই ভিজে গায়ে আরাম লাগা কীসের খুব মৃদু হাত বোলানো কোনও কোনও সময় ঠান্ডা থেকে হঠাৎ গায়ে যেন ছ্যাঁকা লাগা কোনও কোনও সময়ে মাথার উপর থেকে কী যেন নেমে এসে শরীরটাকে ভিজিয়ে যায় কোনও সময়ে ঘুম থেকে মায়ের হাতে টান মেরে উঠে মাথায় একটুখানি ঠান্ডা কিছুর ছোঁয়া জোর করে মুখের ভেতর কিছু একটা দিয়ে দেওয়া যার স্বাদ কখনও ভালো লাগা কখনও কিছুই না লাগা কখনও জ্বালা ধরানো একসময় একটা শক্ত কোনও কিছুর পাশে অল্প নরম কোনও কিছুর উপরে মার কোল থেকে ঢপ করে পড়া গালের উপরে মায়ের চকিত আদর তারপর শব্দহীনতা। অনেক কেঁদেও মাকে না পাওয়া। তারপর সব চুপ।

এমন করেই বড় হতে থাকে সেই ছোট্ট কুটিরের ছোট্ট শিশু। খাবার জোটে সামান্যই। তার মধ্যে তেমন পুষ্টিকর কিছু থাকে না, তবু প্রাণের নিয়মে বাড়তে থাকে চন্দ্রিমা। এমনি করে কেটে গেছে চারটি বছর। দেখতে না পাওয়ার কোনও দুঃখ মনে নেই চার বছরের চন্দ্রিমার। সে তো জানেই না দেখতে পাওয়া বা দেখতে না পাওয়া মানে কী। তার আছে শুধু ঠান্ডা-গরমের অনুভূতি ভালোলাগা-মন্দলাগা গন্ধের অনুভূতি, আছে আঘাত-লাগা আর না-লাগার অনুভূতি, আছে স্পর্শের অনুভূতি, বাতাসে সমস্ত রকম অনুরণন আর সামান্যতম পরিবর্তনের চিহ্নগুলিকে খুব সূক্ষ্ম টের পাওয়া। তার কাছে সকাল মানে ত্বকের উপরে তাপের পরিবর্তন, সকাল মানে আশপাশে কিছু সুরেলা অথবা কর্কশ ধ্বনির শুরু, সকাল মানে আশেপাশে কোনও এক রকমের জীবিত অস্তিত্বের চনমনে হয়ে ওঠা। হাতের পাতায় ঘাসের ডগা থেকে গড়িয়ে পড়া শিশির বিন্দু। আর মায়ের ব্যস্ততা, মাথায় ঠান্ডা কোনও জিনিস ঢেলে দেওয়া, নরম অথচ খরখরে কোনও একটা বস্তুর সারা শরীরে ঘোরাফেরা, মুখের মধ্যে কোনও সুস্বাদু বস্তুর প্রবেশ। এক চিমটে আদর। মাটিতে মায়ের চলে যাবার মৃদু কম্পন। তারপর শুরু হয় ঘুরেফিরে কুটিরের চারপাশ অনুভব করা। মায়ের কাছে শোনা কতগুলো নামের পরখ। ঘাস, ফুল, পাতা, জল, ধুলো, কাদা। আরেক রকম নাম-শুনে-জানা অস্তিত্ব পাখির দল। তারা কেউ কেউ পাশে এসে বসে, কেউ কেউ উড়ে বেড়ায়, কেউ কেউ উঠে আসে কোলের উপরে, কাঁধের উপরে। কোনও কোনও সময়ে অচেনা কেউ কেউ যেন চারপাশে ঘোরাফেরা করে। দু’তিন রকম গন্ধ তাদের পরিচয় বহন করে। তাদের কেউ কেউ আবার কেমন একটা ফোঁস ফোঁস শব্দ করে চন্দ্রিমাকে প্রদক্ষিণ করে। তাদের কেউই কক্ষনও চন্দ্রিমার কোনও ক্ষতি করেনি। তাদের কেউ কেউ ঘুরেফিরে অনেকবার এসেছে। একটা সময় গায়ে একটু একটু করে গরম লাগতে থাকে বেশি। চন্দ্রিমা হয়তো ঘুমিয়ে পড়ে। আবার হয়তোবা একটু হাতড়ে, শিশু কুটিরের ভিতরে ঢুকে যায়। পরিচিত নানান রকম স্পর্শ আর গন্ধ দিয়ে সে খুঁজে বার করে কোনও একটা পাত্র যার মুখটা আটকানো, যেটা খুললে পরে হাতে আসে মুচমুচে একটা জিনিস যাকে মা আর বাবা বলেন মুড়ি। যেটা খেয়ে নিতে হয়। তার পরে তার পাশের আরেকটা পাত্র থেকে মুখে নিতে হয় জল। নামগুলো শুনে শেখা। জিনিসগুলোকে খেয়ে বা পান করে শেখা, কোনটার কী প্রয়োজন। কেমন দেখতে এগুলো? এই ভাবনাটাও চন্দ্রিমার মনে কখনও আসে না। ‘দেখা’ শব্দটা তো শুনে শেখা। যার কোনও সরাসরি অর্থ শিশু জানে না। এটুকু সে হয়তো কখনও কখনও ভাবে, কোনও একটা কিছুর অভাব আছে তার মধ্যে, যা নিয়ে বাবা-মায়ের আলোচনার মধ্যে একটা দুঃখের অনুভূতি তার অপরিণত মনটাকে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। তাও কয়েক মুহূর্তের জন্য।

তারপরে গায়ে গরমের অনুভূতিটা ক্রমশ কমতে থাকে। পাখিদের ডাক এক সময়ে ঘনীভূত হয়, তারপর থেমে যায়। তখন বাতাসের মধ্যে দিয়ে হুস করে চলে যায় অন্য কোনও রকমের উড়ে যাওয়া জীব। চন্দ্রিমার খেলার জিনিস ধুলো পাতা টুকরো-পাথর তখনকার মতো আর ভালো লাগে না। মনটা কেমন করতে থাকে মা কখন ফিরে আসবে সেই কথা ভেবে। তার পরে একসময়ে হুম হুম ঝিঁ ঝিঁ হুউউউ শব্দগুলি আড়াল করে ঘরে ফিরে আসে মা সারা শরীরে ক্লান্তির গন্ধ নিয়ে। খানিকটা সময় মা শুয়ে থাকে। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিথর হয়। চন্দ্রিমা বোঝে এই সময়টা মাকে ডাকতে নেই। মা যখন উঠবে তখন সারাদিনের ভালো-লাগা খারাপ-লাগা ব্যথা-বেদনা সব অস্ফুট কথায় মাকে বলে শিশু। খানিক বাদে ঘরের এক কোনায় উষ্ণতা বাড়ে, ভয় পাবার জিনিস আগুন আসে সেই কোনায়, কোনও একটা পাত্রের মধ্যে জল ফুটতে থাকে, যার মধ্যে থেকে বেরোতে থাকে নতুন একটা চেনা গন্ধ। চন্দ্রিমা আর তার মা ভাগ করে খেয়ে নেয় সামান্য যেটুকু জুটেছে সেদিন। তারপরে মায়ের শরীরের সোঁদা মিষ্টি শান্ত গন্ধ নিতে নিতে চন্দ্রিমা আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

গ্রহ একবার থমকায় আবার এগোয়। অনেকটা সময় পরে পরে। যখন থমকায় তখন তার ঘূর্ণন এবং চলনের ফলে তৈরি হওয়া শক্তি এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা পায়। গুলতির মত ঝট করে খানিকটা শক্তি গ্রহের বাকি অংশের চাইতে দ্রুত এগোয়, তার ঠেলায় একেক জায়গায় গ্রহের অভ্যন্তরে ছিটকে ওঠে একটা টুকরো। প্রচণ্ড জোরে সেই টুকরোটা গ্রহের উপরিতল ভেদ করে বেরিয়ে আসে বাইরের পরিমণ্ডলে। এই গ্রহের ঘূর্ণন বেশ খানিকটা খামখেয়ালি। এই গ্রহের অভ্যন্তর অনেকটাই কম ভরযুক্ত। এর মাধ্যাকর্ষণ যথেষ্ট কম শক্তিশালী। ফলে ওই টুকরোটা সহজেই তার জন্মস্থানের টান অতিক্রম করে বাইরের মহাকাশে ছুটে যায়।

সেই রকম এক বিচিত্র মুহূর্তে ছিটকে এসেছিল টুকরোটা। সেই ছিটকে আসার পিছনে ছিল প্রাণের ছড়িয়ে পড়ার ততোধিক বিচিত্র এক পদ্ধতি। ওই টুকরোটার মাঝখানে ঘুমিয়ে ছিল একটা ছোট্ট  বীজ।

চির অন্ধকারে ঢাকা আবহাওয়া-বলয়শুন্য গ্রহটির মাটি অথচ মাটি নয় বুকে প্রাণ কখনও জন্মাতেই পারেনি। কিন্তু পিতা-মাতার বুকে ইচ্ছে হয়ে ঘুমিয়ে থাকা শিশুর মত এই গ্রহ-পৃষ্ঠের অল্প নিচে কোনও এক ফলপ্রসূ অন্তরে বহু বহু যুগ ধরে নীরবে লালিত হয়ে এসেছে প্রাণের বীজ। যদি কখনও সময় আসে সে রূপ নেবে এক বৃক্ষের। তার জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করে থাকতে তৈরি সেই বীজ। কিন্তু অঙ্কুরিত হয়ে চারা গাছ থেকে পূর্ণবয়স্ক বৃক্ষের রূপ পেতে সে কবে পারবে তা জানা নেই। অসীম মহাশূন্যের দোলায় দুলতে দুলতে তাকে পৌঁছতে হবে সেই মায়ের কাছে যে তাকে সাদরে গ্রহণ করবে নিজের কোলে। কোথায় সেই মা? বীজ তা জানে না। সে শুধু অপেক্ষা করতে জানে। তার অপেক্ষার আগে গ্রহটিকে হঠাৎ থমকাতে হবে, বিস্ফোরিত হতে হবে, ছুঁড়ে দিতে হবে নিজের বুকের একটা টুকরো, যার কাজ হবে সযত্নে বীজকে বুকের মধ্যে ধরে কে-জানে-কতদূর ছুটে চলা মহাশূন্যের হিসাবহীন পথ ধরে। বীজ সে কথা জানে না। জানার কোনও তাগিদও তার নেই। শুধু ঘুমিয়ে থাকে সে। তার অস্তিত্বের মধ্যেই নিহিত আছে অপেক্ষা।

সেদিন সবেমাত্র চন্দ্রিমার ত্বকে আলোর স্পর্শ মৃদু হতে শুরু করেছে। পাখির ডাক অলস হয়ে এসেছে অনেকটা। গাছপালাগুলো অনেকটাই আনত হয়ে এসেছে। দু’একটা চড়াই পাখি এখন ঘোরাফেরা করছে চন্দ্রিমার হাতের পাশে। একটু আগে ঘুম ভেঙেছে ছোট্ট মেয়েটির। এই সময়টা চন্দ্রিমার খুব প্রিয়, কেন তা না জেনেই। যদিও পৃথিবীটা তার কাছে চোখের সামনে ঘন কালো কিছু, তবুও, অথবা হয়ত সেই জন্যই, তার শরীরের অন্য চারটি ইন্দ্রিয় অনেক বেশি সজাগ। তাই সে স্বচ্ছন্দে অনুভব করে সূর্যের পশ্চিম দিকে চলে যাওয়ার ছন্দ। তাই তার কাছে দিন ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে, আলোর প্রাবল্য কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে, বাতাসের আর্দ্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, প্রতিটি গাছের পাতার প্রতিটি ঘাসের ডগার মাটির প্রতিটি ধূলিকণার নিজের মধ্যে আবৃত হওয়া, বহন করে নিয়ে আসে কোনও এক দৈনিক পরিবর্তনের সূচনা। অন্ধকার সে কোনওদিন দেখেনি তাই আলো তার কাছে অর্থহীন। কিন্তু সন্ধ্যা এবং রাত্রি তাকে এক আশ্চর্য শীতলতা অনুভব করায় যা কোনও চক্ষুষ্মান মানুষের কাছে চিরদিন থেকে যাবে অসম্ভব এক প্রাপ্তি। মায়ের উপস্থিতি তার চারদিকের বাতাসকে কীভাবে অনুরণিত করে তোলে, তা সে জানে। অনেকদিন পরে পরে যখন বাবা বাড়ি ফেরেন, তখনও তার ঘ্রাণেন্দ্রিয় তাকে জানিয়ে দেয় বাবা আসছে। রাত যত বাড়তে থাকে বাড়ির কাছের পুকুরে মাছেদের সাঁতারের অস্ফুট শব্দ তার কানে আসে। আশেপাশের কোনও ঝোপে-ঝাড়ে কোনও প্রাণীর হিসেবি এগোনো-পেছোনো, আর অন্য কোনও ক্ষুদ্রতর প্রাণীর সন্ত্রস্ত বাঁচার প্রচেষ্টা সে টের পায়। যেমন করে দুপুরবেলা মাটির বুকে পাখিদের পায়ের শব্দ আর বাতাসে তাদের পাখার সঞ্চালন তাকে বুঝতে দেয় এখন দিনের কোন মুহূর্ত। প্রবল গ্রীষ্মের গন্ধ তাকে যেমন সংকুচিত করে, রোদ্দুরের তেজ যেমন সে অনুভব করে, আকাশে মেঘের জমা হওয়া তেমনি তার কাছে বৃষ্টি আসার সংকেত পাঠিয়ে দেয় বাতাসের সূক্ষ্ম অদল-বদলের মধ্য দিয়ে। আর শীতকাল তাকে তো শোনায় অজস্র স্বাদ আর আরামের কথকতা।

তাই এই বিকেলে আকাশের অনেক অনেক উপরে কোনও এক দ্রুততার আগমন চন্দ্রিমাকে কেমন যেন সচকিত করছিল। বাতাস-বাহিত হয়ে চন্দ্রিমার কানে আসছিল কোনও একটা ঘর্ষণের শব্দ। অনুভব করতে পারছিল সে অন্যদিনের থেকে একেবারে স্বতন্ত্র প্রকৃতির একটা নামা-ওঠা বাতাসের ঢেউয়ে ঢেউয়ে।

কত শত বছর পরে সাড়া মিলছে। যদিও তার চোখ নেই যদিও তার কোনও ইন্দ্রিয় নেই, তবুও বহু বহু দূর থেকেও জড় অথচ সক্রিয় অনুভূতিতে চিহ্ন মেলে কোন এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডের, যার প্রাণদায়ী উত্তাপের নাগালের মধ্যে হয়তো আছে এমন কোনও ক্ষেত্র যেখানে তার বহুযুগের লালন করা বীজটিকে রোপন করা যাবে। এত যুগের প্রতীক্ষার হয়তো অবসান ঘটবে। পথে অনেক বিপদ সামনে এসেছে। নক্ষত্রের প্রবল আকর্ষণ, সামনে এসে পথ আটকানো গ্রহের বেড়া, লক্ষ লক্ষ গ্রহাণুর বৃষ্টির মতো আক্রমণ, মহাকাশের ধুলোয় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, প্রবল শৈত্যে জমাট বেঁধে প্রাণের অবলুপ্তির সম্ভাবনা। সমস্ত বিপত্তি পার হয়ে এসে পৌঁছনো গেছে বেঁচে থাকার জেগে ওঠার সম্ভাবনার কাছে। ক্রমশ আকারে বাড়তে থাকে অগ্নিময় নক্ষত্র। তার প্রবল টান নিয়ে আসে আরেক বিপদ। কিন্তু না। সেই মৃত্যুর আকর্ষণ কমে আসে। দুরন্ত গতিতে, কোনও অজানা নিশ্চয়তার পথপ্রদর্শনে নিজের দুই মেরুর মাঝে ডিগবাজি খাওয়ার মত ঘুরতে ঘুরতে চলার পথে তার অনন্ত-নির্দেশিত লক্ষ্য কী করে যেন হয়ে যায় তৃতীয় গ্রহটি, যার আধা-অস্বচ্ছ আবহাওয়া মণ্ডলের দিকে ছুটে নামতে থাকে সেই অজানা আকাশের অজানা গ্রহের অন্তর থেকে বেরিয়ে আসা পদার্থ-পিণ্ডটি। আবহাওয়া মণ্ডলের উপরিতলের স্পর্শে খানিকটা পিছলে যায় সে। তারপরেই বাতাসের হালকা পর্দা ভেদ করে ঢুকে যায় সে গাঢ় এক অপরিচিত স্তরের মধ্যে। নিমেষে তার সর্বাঙ্গ জ্বলে ওঠে। উল্কাপিণ্ড হয়ে সে ছুটে চলে পৃথিবীর মাটির দিকে। তার প্রজ্জ্বলন্ত দেহ বাতাসের মধ্যে এক গভীর সুড়ঙ্গের সৃষ্টি করে, শব্দের চেয়ে দ্রুত তার গতি বাতাসে বিস্ফোরণ ঘটায়, তার কম্পন অসাধারণ অস্থিরতা সৃষ্টি করে বায়ুমণ্ডলে। সঙ্গে সঙ্গে আগুনের প্রকোপে তার অন্যতর পদার্থময় দেহ ক্রমশ বিলীন হয়ে যেতে থাকে এই ভিনগ্রহী বাতাবরণের মধ্যে। যখন ভূপৃষ্ঠ আধা-দৃশ্যমান, তখন পেঁজা তুলোর মত ওই মেঘের বিছানায় এসে লুটিয়ে পড়ে ওই পদার্থ-পিণ্ডের অভ্যন্তরে মাতৃজঠরের মত এক আস্তরণের মধ্যে শুয়ে থাকা সেই বীজটি। এবারে নিজে থেকেই খুলে গেল উল্টো-ছাতার মত অবতরণছত্র। হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে বীজটি চলল তার ধাত্রীমায়ের দিকে।  কোনও এক আশ্চর্য রসায়ন তাকে বহন করে নিয়ে চলল এমন কোনও গন্তব্যের দিকে যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে কোনও স্নেহের আশ্রয়।

পৃথিবীর বুকে ওই চির-সবুজ অথচ দরিদ্র গ্রামে ততোধিক দরিদ্র ওই কুটিরের আঙিনায় মায়ের বাড়ি ফেরার আশায় দীপ্যমান অন্ধ শিশুটি তখন তার গভীরতম সরলতা-মাখা বুকের মধ্যে অসীম শক্তিশালী হয়ে ওঠা তার অন্য ইন্দ্রিয়গুলির সান্নিধ্যে অনুভব করেছে সেই বীজের আগমনী। কোনও এক আশ্চর্য রসায়নে তার অর্ধাহার-ক্লিষ্ট অপুষ্ট শরীরে প্রবাহিত হয়েছে তখনও সম্যক না-জেগে-ওঠা আর একটি শৈশবের জীবন-চক্রের আসন্ন প্রারম্ভের অনুরণন। মুখ তোলে চন্দ্রিমা আকাশের দিকে। পড়ন্ত বেলার মৃদু সূর্যালোক তার মুখের উপর স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেয়। চির-দৃষ্টিহীন দুটি চোখ যেন চেয়ে থাকে ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে নেমে আসা নবতম অতিথির পথের দিকে। নিজের অজান্তেই দুই হাত পাতে সেই মেয়ে।

কোনও এক মহাজাগতিক মন্ত্রবলে বীজটি সোজা নামতে শুরু করল চন্দ্রিমার দিকে। ঠিক মনে হল সেই সুদূর গ্রহ থেকে এতখানি পথ পেরিয়ে বীজ এসেছে চন্দ্রিমার খোঁজেই। ওই বীজের হৃদয়ে তো বেঁচে থাকার আদি-প্রাণিক ইচ্ছে ছাড়া আর কিছুই নেই। চন্দ্রিমারও তো তাই। বীজটি কিছু দেখতে পায় না। চন্দ্রিমাও তাই।

পক্ষময় অনুভব-তন্তুগুলি সচল হয়েছে অবতরণছত্রের সর্ব অঙ্গে। অনেক উপর থেকেই অনুভূত হয়েছে, আতিথেয়তার আহ্বান। দু’হাত পেতে থাকা অজানা গ্রহের নির্মল-হৃদয় শিশুটিই যে উষ্ণ অভ্যর্থনার ভরকেন্দ্র তা নিরূপণ করে দিয়েছে বীজ আর তার বাহকের আদিমতম অন্তঃস্থলে প্রোথিত সৃষ্টি-সংকেত। চন্দ্রিমার অঞ্জলিবদ্ধ করপুটে আসন নেয় ফুলের পাপড়ির মত হালকা আর নরম সেই অতিক্ষুদ্র বীজ, যার আয়তন তার শক্তি আর অন্তর্নিহিত উদ্যমকে বুঝতে দেয় না।

কোনও এক বিচিত্র লালন-স্পৃহা চন্দ্রিমাকে নিয়ে গেল কুয়োতলায়। পাশের ভিজে মাটির উপর অতি যত্নে বীজ ও তার বাহককে শুইয়ে দিল শিশু। মাটির ছোঁয়া পেয়েই সক্রিয় হল বাহকের তলদেশের অগুন্তি সূক্ষ্ম প্রায়-অদৃশ্য রোম-আঁকশি। অতি ধীরে মাটির নিচে যাত্রা শুরু করল বীজ। যখন মাটির নিচে তার প্রবেশ সম্পন্ন হল, তখন চন্দ্রিমার চুলের উপর থেকেও মুছে গেছে সূর্যের শেষ আভা।

চন্দ্রিমা হাঁটু পেতে বসল তার পরিচিত কুয়োতলায়। ভিজের মাটির উপর একবার হাত বুলিয়ে নিল মেয়ে। যখন সে উঠে দাঁড়াল, তার মুখে ফুটে উঠল এক অনির্বচনীয় হাসি। সে জানলও না, যখন সেই বীজ মহীরুহ হয়ে উঠবে, তখন তার চিহ্নও থাকবে না এই পৃথিবীতে, কোথায় চলে যাবে ভাঙা তুলসীমঞ্চ, কুয়োতলা, আর কুটির, আর এই গ্রাম। কিন্তু জ্যোতিষ্কলোকের পথে অক্ষয় হয়ে থাকবে প্রাণের রেখাচিত্র।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1378 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. প্রাণের জয়যাত্রায় মুখর এই লেখা মুগ্ধ করল।

আপনার মতামত...