দেশজ বীজ সংরক্ষণ ও আমাদের অন্নপূর্ণারা

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

জীববৈচিত্র্য যে দ্রুত কমে যাচ্ছে সেটা সবচেয়ে স্পষ্ট বোঝা যায় জিভ দিয়ে। যারা পরিবেশ বদল নিয়ে বিন্দুমাত্রও মাথা ঘামান না তারাও জানেন যে বাজারে সবজি আর মাছের যে রকমারি ছিল তা দিন দিন কমে আসছে। কোথায় সেই কিশোরীর আঙুলের মত কচি ঢেঁড়স যা সেদ্ধ করে নুন ছুঁইয়ে শুধু বোঁটাটুকু দাঁতে কেটে সোজা পেটসই করে দেওয়া যেত? এখন বাজারে যেসব এক ফুটিয়া ঢেঁড়স পাওয়া যায় কচি অবস্থাতেও তাদের সারা শরীরে বীজেরা সিক্সপ্যাকসম ফুটে থাকে। আর স্বাদ? রাম কহো! একইরকমভাবে হারিয়ে গেছে অথবা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে নৈনিতাল আলু, উচ্ছে আর পটল, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেঁটে শশা, লঙ্কা এবং, সর্বোপরি বিভিন্ন দানাশস্যের স্থানীয় ভ্যারাইটি। হারিয়ে যাচ্ছে, কারণ বহুদিন হল চাষিরা আর ফসলের বীজ জমিয়ে রেখে পরের বছর ব্যবহার করার কথা ভাবেন না। বদলে বহুজাতিক কোম্পানি থেকে উচ্চফলনশীল বীজ কেনেন প্রতিবার। ষাটের দশকে শুরু হওয়া সবুজ বিপ্লব দেশের খাদ্য সমস্যা নিরসনে অনেক সাহায্য করলেও একই সঙ্গে বীজের জন্য চাষিদের করে তুলেছে পরমুখাপেক্ষী। আর সেই কারণেই দ্রুত লোপাট হয়ে যাচ্ছে নানা স্থানীয় শস্য। মজার কথা হল এইসব হারিয়ে যেতে বসা শস্যের বেশিরভাগই উচ্চফলনশীল ভ্যারাইটির তুলনায় অনেক ভালোভাবে স্থানীয় জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, আর এদের চাষে সার বা বিষও লাগে তাই অনেক কম।

যুভাল নোয়াহ হারারি তাঁর বিখ্যাত বই ‘স্যাপিয়েন্স : আ ব্রিফ হিস্টোরি অফ ম্যানকাইন্ড’-এ বলেছেন যে হান্টিং-গ্যাদারিং (মূলত গ্যাদারিং) থেকে কৃষিতে তথাকথিত উত্তরণের ফলে প্রজাতি হিসেবে মানুষের সংখ্যাবিস্তারের সুবিধা যেমন হল, তেমন একইসঙ্গে কমে গেল তার খাদ্যবৈচিত্র‍্য ও জীবনের মান। হাতে গোনা কিছু শস্য আর সবজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ফলে খরা-বন্যার মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আরও অসহায় হয়ে পড়ল মানুষ। স্পষ্টতই পঞ্চাশ ষাটের দশকে শুরু হওয়া সবুজ বিপ্লব একইরকম প্রভাব তৈরি করে মানবপ্রজাতির ইতিহাসে। প্রথম প্রথম এটা এত স্পষ্ট না হলেও যত সময় কেটেছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ সম্পর্কে সচেতনতাও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। আশির দশক থেকেই মানুষ চেষ্টা শুরু করেছে বীজ সংরক্ষণের। প্রতি বছর আরও, আরও বেশি খাদ্য উৎপাদনের বাধ্যবাধকতায় যাতে খাদ্যবৈচিত্র হারিয়ে না যায় তা সুনিশ্চিত করতে পৃথিবীর নানা প্রান্তে গড়ে উঠেছে সিড ভল্ট, যেখানে আগামী কয়েক দশক, এমনকি শতকের জন্যও সুরক্ষিত থাকতে পারবে প্রকৃতি থেকে উধাও হতে বসা নানা শস্যের বীজ। এই সমস্ত ভল্টের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত অবশ্যই নরওয়ের Svalbard Global Seed Vault, যা ডুমসডে ভল্ট নামেও পরিচিত। পঁয়তাল্লিশ লক্ষ রকমের বীজ সংরক্ষণের সুবিধাযুক্ত এই ভল্টে এই মুহূর্তে সংরক্ষিত আছে প্রায় দশ লাখ প্রজাতির বীজ। চেষ্টা চলছে একইরকম আর একটি ডুমসডে ভল্ট তৈরির, যাতে অজানা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মানুষ সামলে নিতে পারে।

কিন্তু শুধু বাইবেলের নোয়াহ-র মত ভবিষ্যতের নৌকোয় জিনভাণ্ডার লাদাই করা যথেষ্ট নয়। একইসঙ্গে প্রয়োজন উচ্চফলনশীল সঙ্কর এবং জিএম ভ্যারাইটির পাশাপাশি যুগ যুগ ধরে চাষ হয়ে আসা, এবং বর্তমানে অবহেলিত, স্থানীয় প্রজাতিগুলির বিস্তার এবং বীজের সংরক্ষণ। গড়ে তোলা যাতে পারে স্থানীয় স্তরে বীজব্যাঙ্ক। এর থেকে দুভাবে উপকৃত হতে পারে চাষিরা। প্রথমত, বীজ বাবদ খরচ কমবে, পরনির্ভরতাও। দ্বিতীয়ত, সার আর বিষ বাবদও খরচ কমবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, উৎপন্ন ফসল হবে অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।

ভালো খবরটা হল এই যে আমাদের দেশে এইধরনের প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন ধরে। সরকারি আর বেসরকারি নানা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরাসরি চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষদের নিজস্ব চেষ্টা। আরও ভালো খবর, দ্বিতীয় শ্রেণিতে অগ্রণী ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে মহিলাদের। প্রথাগত শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও সমাজের প্রান্তবাসী এই মহিলারা কৌম জ্ঞানভাণ্ডারকে ব্যবহার করছেন সফলভাবে। এমনই দুজন হলেন মহারাষ্ট্রের রাহিবাই সোমা পোপরে এবং ওড়িশার কমলা পূজারী। সিএসআইআর-এর প্রাক্তন ডাইরেক্টর রঘুনাথ মাশেলকরের কথায় ৮ই মার্চ রাষ্ট্রপতির হাত থেকে নারীশক্তি পুরস্কার পাওয়া রাহিবাই সোমা পোপরে হলেন ‘বীজ-মাতা’। বছর পঞ্চান্নর সফল চাষী সোমা দীর্ঘদিন ধরে বীজ সংরক্ষণের কাজ করে আসছেন মহিলাদের সঙ্গে নিয়ে। ধান, ডাল, আর তৈলবীজের সতেরোটি প্রজাতির প্রায় পঞ্চাশ রকম ভ্যারাইটির চাষ ছড়িয়ে দেওয়া ও বীজ সংরক্ষণের বিরল কৃতিত্বের অধিকারী সোমা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে থাকেন তাঁর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভাণ্ডার।

জলের জন্য মাটির তলায় না তাকিয়ে সোমা পারম্পরিক জলকুণ্ডের ব্যবহার করে বদলে দিতে পারেন পড়ে থাকা ডাঙা জমি।

ওড়িশার কমলা পূজারীও সম্প্রতি তাঁর কাজের স্বীকৃতি পেলেন রাষ্ট্রপতির হাত থেকে, সোমার আট দিন পরই। ষোলোই মার্চ পদ্মশ্রী পেলেন কোরাপুট জেলার পত্রপুট গ্রামের বাসিন্দা কমলা। এম এস স্বামীনাথন রিসার্চ ফাউন্ডেশন থেকে ট্রেনিং পাওয়ার পর জৈবিক চাষ ছড়িয়ে দেবার জন্য বহু বছর ধরে খেটে চলেছেন তিনি। বাড়ি বাড়ি ঘুরে, বছরের পর বছর নিরলসভাবে বাকিদের বুঝিয়েসুঝিয়ে জৈবিক চাষের পথে নিয়ে আসাই তাঁর ব্রত। এখনও পর্যন্ত নাকি ধানের প্রায় একশো রকম স্থানীয় ভ্যারাইটির চাষ ও বীজ সংরক্ষণ করেছেন তিনি! ভাবতে ভালো লাগে যে ওড়িশা সরকার তাঁকে রাজ্য প্ল্যানিং বোর্ডের সদস্য মনোনীত করেছেন।

কোনও রাজনৈতিক দলের ভোট জেতার জন্য বানানো গিমিক না, রাহিবাই সোমা পোপরে আর কমলা পূজারীর মতো মানুষের হাত ধরেই গড়ে উঠতে পারে নতুন ভারত। আশা করা যাক যে দিশাহীন এই সময়ে এঁদের দৃষ্টান্ত আমাদের পথ দেখাবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1438 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*