তিনটি অণুগল্প

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

 

জাতিস্মর

ডাক্তারবাবু বললেন..

মনে করো একটা তিরিশ ফুট সিঁড়ি দিয়ে তুমি নেমে যাচ্ছ জলের তলায়। গুনতে শুরু করলেন ধীরে ধীরে…

তিরিশ, ঊনতিরিশ, আঠাশ, সাতাশ…

অপালা চোখ বুঁজে প্রাণপণে যেন স্মৃতির অকুস্থল হাতড়ে বের করতে লাগল শব্দকণা।

ডাক্তারবাবু বললেন উজ্জ্বল এই আলো তোমার চোখের পাতা ক্রমশ ভারী করে দিচ্ছে, তাই না?

স্মৃতির সরণী বেয়ে হাঁটতে গিয়ে জ্ঞান হারায় অপালা। স্মৃতির মিছিলে ভীড় করে কত কিছু। চোখ বুঁজে চেষ্টা করে চলে। প্রাণপনে চেষ্টা করেও ভুলতে পারে না অতীতটাকে। বর্তমান আর অতীতের টানাপোড়েনে মেয়েটা জর্জরিত।

অন্ধকার ঘরে একফোঁটা আলোর রশ্মি এসে পড়ছিল ছোট্ট এক ছিদ্র দিয়ে। সামনে মিষ্টি চেহারার কিশোরী, অপালা। বড় হয়েই যেন তার মুশকিল হল। বড্ড বিপদসঙ্কুল খানাখন্দ পেরোতে পেরোতে স্কুলের পড়াশুনোর চাপ। বেশ ছিল ছেলেবেলাটা। কনভেন্ট স্কুলে এলোকিউশান টেস্টে পাশ না করলে প্রোমোশান পেতে অনেক বেগ। ঋতুমতী হবার পরপর নাকি একশো জনের মধ্যে একজনের হয় এই স্ট্যামারিং সিনড্রোম।

আলোর শক্তি বাড়াতে লাগলেন ডাঃ বসু। তারপরেই মূর্ছা। আবার জ্ঞান ফিরতেই সে বলে—

মনে পড়ছে …

তোতলামি একটুও নেই।

ভীমবেটকার গুহা দেখতে গেছি।  গুহাচিত্র, রক-আর্ট, অতি প্রাচীন শৈলাশ্রয়… অজানা কোন রঙে তুলি ডুবিয়ে আঁকা সব ছবি ভীমবেটকার এই দেওয়ালে। পশুপাখি, নারী, পুরুষ ও শিশু। পশুর সঙ্গে মানুষের যুদ্ধ, পশুর পিঠে মানুষ, ঘোড়ায় চড়া রাজার মাথায় ছাতা। খয়েরের মত গাঢ় রং। ছবি আঁকতাম তাই মন দিয়ে দেখতে ব্যস্ত ছিলাম। মা, বাবা থকে গিয়ে কোথাও একটা বিশ্রাম নিচ্ছিল পাশের গুহায়।

গাইডের কথাগুলি ভেসে আসছিল কানে। পঞ্চপাণ্ডবেরা অজ্ঞাতবাসের সময় এইখানে বাস করেছিলেন। ভীম বেটা কা… তাই এমন নাম।

হাতির পাল, ছুটন্ত হরিণের সার আমার চোখে। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন আমাকে জাপটে ধরল। হোটেলে ফিরেছিলাম বেহুঁশ হয়ে, আমার বুকে বিড়ির ছ্যাঁকা দিয়েছিল। খুব ব্যথা, ফোসকায় ভরে গেছিল। জঘন্য, বিশ্রী এক অভিজ্ঞতা।

অপালার স্নায়ুগুলো শিথিল হয়ে এল।

আরেকটু হলেই লোকটা আমাকে রেপ করত। মা বলেছিল বারো বছরের পর রেপড হলেই বাচ্চা পেটে এসে যায়। তাইতো ছুটে পালিয়েছিলাম। গুহার গোলকধাঁধায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমার চিত্কারে সেই বদমায়েস লোকটা পালিয়েছিল। তারপর পড়ে গিয়েছিলাম একটা পাথরে ধাক্কা খেয়ে।

ছেলেদের থেকে দূরে থাকতে বলেছে মা। ঘেন্না হয় ওই ছেলেগুলোর ওপর। সকলে ওরা দুষ্টু, পাজি, বদমায়েস।

ডাক্তারবাবু বাইরে এসে অপালার মায়ের সঙ্গে একটু কথা বললেন।

আমি তাহলে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গটা একটু মনে মনে আওড়ে নিই? তুমি মায়ের সঙ্গে কথা বলে চলে এসো শিগ্‌গিরি, ডক্টর আঙ্কল। অপালা বলল।

অপালার মা’কে গিয়ে তিনি বললেন “অযথা পুরুষ ভীতি দেখাবেন না মেয়েকে। পরবর্তী জীবনে ক্ষতি হতে পারে। চোখে চোখে রাখবেন। ভয় থেকেই কিন্তু এই তোতলামি। আপনার কন্যাটির কিন্তু এই পুরুষ ভীতির জন্য‌ই কথা বলায় জড়তা। তাই মুখস্থ কবিতাগুলো বলতেও ওর আটকে যায়।”

চেম্বারের সেই ঘরে তখন অপালা মন দিয়ে চোখ মেলে চেয়ে বলে চলেছে একনাগাড়ে …

“আজি এ প্রভাতে রবির কর, কেমনে পশিল প্রাণের পর…” দূর থেকে ডাঃ বসু শুনতে লাগলেন।

 

হঠাৎ জল

টুপ-টাপ-টুপটুপ-টাপ..অ্যাটাচড বাথরুম থেকে পর্যায়ক্রমে জল পড়ার শব্দ কানে এল তৃণার। ফ্ল্যাটে একাই থাকে তৃণা। গোয়েন্দা গল্পে মনোনিবেশে কিছুটা হলেও ভাটা পড়ল। উঠে বাথরুমে গিয়ে জল পড়ার কারণটাও অনুধাবন করতে মন চাইল না। সারাদিন স্কুলের ছাত্র ঠ্যাঙানোর পর কিছুটা আলসেমি, কিছুটা অনিচ্ছা। আবারও টুপ-টাপ-টুপটুপটাপ..বিরক্তিকর শব্দ। নিরিবিলিতে আরও প্রকট সে আওয়াজ।

এদিকে গল্পের গোয়েন্দা হিরো তখন ক্লাইম্যাক্সে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও, অ্যাড্রিনালিনের টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত তৃণা ব‌ইয়ের পাতায় মোবাইলটা রেখে বাথরুমে হাজির হল। কোনও শব্দ নেই তখন। আবারও বিস্তর রাগ নিয়ে ফিরে এল খাটে। ব‌ইয়ের পাতায় মোবাইল বেজে উঠল। মিসড কল… ড্রাইভার জানান দিচ্ছে, ম্যাডাম না বেরুলে তাকে ছুটি দিক্‌! যত্তসব! নিকুচি করেছে, মনে মনে রাগ বাড়ল তৃণার। ফোনটা নিয়ে ড্রাইভারকে জানাবে তার আগেই বিপ্‌ বিপ্‌ শব্দ করে ফোন জানাল তার ব্যাটারিহীনতার তুচ্ছ অথচ জরুরি বার্তা। ফোনটাকে চার্জারে কানেক্ট করতে আবারও উঠতে হল তৃণাকে। পা’টা বেদম মচকে গেল সেই ফাঁকে। তারপর ফ্রিজ থেকে বরফ, ব্যথার মলম পর্ব সেরে আবারও সেই গল্পে মন। যেই পাতা ওল্টানো অমনি আবার সেই শব্দ।

টুপ-টাপ-টুপটুপটাপ.. এবার তৃণা আরও রেগে গেল। খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাথরুমে গিয়ে বেসিনের কল, শাওয়ারের কল সব নিজের হাতে বন্ধ করে এল। মনে মনে বলল, দেখি এবার কিসের এত জল পড়ার শব্দ হয়! ভাবতে লাগল জলের শব্দের কথা। অলৌকিক কাণ্ড! বাথরুম শুকনো খটখটে, নিজের চোখে পরখ করে এসেছে সে। এবার গোয়েন্দা গল্পের ইতি টেনে নিজেই ব্যস্ত হল গোয়েন্দাগিরিতে। বাইরে আকাশ খটখটে। হেমন্তের হিমঝরা সন্ধ্যেবেলায় বৃষ্টির কোনও চিহ্ন নেই। তবুও জলের ফোঁটা… টুপ-টাপ-টুপটুপ-টাপ

এদিকে খিদেও পেয়েছে খুব। ডিনার সেরে নিয়েই সেই জল রহস্যের কিনারা করবে সে। রাতের খাবার খেতে যাবে তৃণা একা একা। রোজ যেমন যায়। নিজের একার জীবনে সে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। টেবিলে বসে ক্যাসারোল থেকে রুটি ছিঁড়ে তরকারির ঝোলে ডোবাতে যাবার ঠিক আগেই মনে পড়ল, আজ পয়লা নভেম্বর না? মায়ের মৃত্যুদিন! সেই কোন্‌ ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছিল। তারপর বড় হয়ে সকালে ঐ দিনটায় মায়ের ছবিতে মালা দিয়ে তবেই তৃণা জল স্পর্শ করে! দীর্ঘ তিরিশটা বছরে কোনওদিনও তার ভুল হয়নি মালা দিতে। টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ল তৃণা। রুটি শুকনো হতে থাকল। চটি পরেই দরজা লক করে নেমে গেল নীচে। সঙ্গে পয়সার ব্যাগ। কাছেই ফুলের দোকান, মনে মনে ভাবল, এত রাতে কি আর মালা পাবে সে? ড্রাইভারটাও ছিল সন্ধে অবধি। তাকে দিয়েও আনাতে পারত। ফুলের দোকান যেতে যেতে ভাবতে লাগল তৃণা… চিন্তার পরতগুলো খুলে যাচ্ছিল তখন। তার মা তাকে ছেড়ে চলে গেছিল সেই তারিখে, তলিয়ে গেছিল গঙ্গার জলে। কারণটা সে ঠিক জানে না। আবারও সেই শব্দ মনের আনাচেকানাচে। মহানগরের ব্যস্ত রাস্তার মানুষজনের কোলাহল, গাড়ির হর্ন ছাপিয়ে সেই জলের শব্দ, টুপ-টাপ-টুপটুপ-টাপ্….

 

প্যালিনড্রম

ঘুম ভাঙতেই শিউলির মনে পড়ল। সহজেই মনে রাখা যায় অত বড় টেন ডিজিটের নম্বর। তাই একবার শুনেই মনে গেঁথে গিয়েছিল। অঙ্কের ভাষায় প্যালিনড্রম। শুরু থেকে শেষ, উল্টে লিখলেও এক‌ই থাকবে। ৯৮৩১০০১৩৮৯। এক অচেনা কবির সেলফোন নম্বর। অর্থাৎ সংখ্যাটির মাঝখান দিয়ে কাটলে দুটো অবিকল এক অংশ দুপাশে। সেই নামের মতো। ছোটবেলায় শিউলির বাবা বলেছিলেন “রমাকান্ত কামার” কিম্বা “সুবল বসু” উল্টে দ্যাখো, পাল্টায়নি। এক‌ই নাম, সোজা-উল্টো দুয়েতেই, এক‌ই নাম।

শিউলি কবি। স্কুলে পড়াকালীন কবিতায় পেয়ে বসত তাকে। এখনও তার কবিতার সঙ্গে অহোরাত্র ওঠাবসা।

গতকাল বিকেলে এক কবি সম্মেলনে গিয়ে অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। অত ভিড়ে কত কবি বন্ধুদের নম্বর নিয়েছে শিউলি। কোনওটা সেভ করেছে, কোনওটা ভুলে গেছে সেভ করতে।

সাহিত্যপ্রেমী মানুষ জড়ো হয়েছিলেন এক ছাদের তলায়, কবিতাপাঠের আসরে। কিন্তু যে মানুষটি শিউলিকে তার নাম্বারটি মুখে মুখে বলে দিলেন তাঁর নামটা মনে করতে পারল না শিউলি। বয়সে প্রবীণ, পক্বকেশ। ভীষণ প্লিজিং পার্সোনালিটি মহিলার। কথাবার্তায় সম্মোহনী যাদু আছে। তাঁকে হুইলচেয়ারে করে আসরে আনা হয়েছিল। উনি বোধহয় পক্ষাঘাতে চলচ্ছক্তি হারিয়েছেন। জিজ্ঞেস করতেও কুণ্ঠিত বোধ করেছিল শিউলি এবং অন্যান্যরা। প্রবীণা লেখেন “ফুলকলি” ছদ্মনামে। বহু নামীদামী পত্রিকায় তাঁর প্রকাশিত কবিতা শিউলি পড়েছে। তবে এই প্রবীণাই যে ফুলকলি সেটা শিউলি জানত না। ফুলকলির কবিতায় বেশ অন্যরকমের ভালোলাগা। কিছুক্ষণের আলাপেই শিউলির মনে দাগ কেটেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর আসল নাম? জিগ্যেস করাটাও সমীচীন নয়। মানে লাগতে পারে। সেদিন ভেবেছিল কবিতার স্টাইল নিয়ে আলোচনা করবে কিন্তু ফিরে এসে আসন গ্রহণ করতে গিয়ে আর তাঁর দেখা মেলেনি শিউলির।

হঠাৎ মনে পড়ল সেই আশ্চর্য ফোন নাম্বারটির কথা। সযত্নে সেভ করেছে শিউলি “ফুলকলি” নামে। আচ্ছা সেটি একবার ডায়াল করলে হয় না? কিন্তু বিফল মনোরথ। “ইয়ে নাম্বার মজুত নেহি হ্যায়”।

তবে কি ভুল করল শিউলি? নাম্বারটা তো বারেবারে ভেরিফাই করেছিল সে। অবিশ্যি ভুল হতেই পারে। যা ভিড় হয়েছিল ওই কবি সম্মেলনে! যে নাম্বার ভুয়ো তাকে ফোনে স্টোর করে লাভ কী? অতএব সেলফোনের ডিলিট বাটনটিতে চাপ দিয়েই ফেলল শিউলি। ফোন বেশ কড়া সুরে ফর্মালিটি করল,

“আর ইউ সিওর টু ডিলিট দিস নাম্বার?”

দোনামোনা করতে করতে ফুলকলি নামে সেভ করা নম্বরটি শিউলি অবশেষে ডিলিট করেই ফেলল আঙুলের আলতো চাপে।

কবিতাপাঠ অনুষ্ঠানটির আয়োজকরা বললেন, সেদিন তো কেউ হুইলচেয়ারে করে এসেছিলেন বলে তাঁদের জানা নেই। এমন মুশকিলে কখনও পড়েনি শিউলি। তার স্পষ্ট মনে আছে ঐ প্রবীণা কবি তার নাম জিগেস করলেন, ফোন নাম্বার দিলেন। তিনি আরও বললেন, “লেখা ছেড়ো না, কবিতাকে সত্যি ভালোবেসে থাকলে কবিতা চর্চা করে যাও।”

ক্রমশ শিউলির জেদ চেপে গেল। খুঁজে বের করতেই হবে এই কবিকে। জানতে হবে ওঁর আসল নাম, পরিচয়। আরও ভাল কবিতা লিখতেই হবে শিউলিকে। রপ্ত করতে হবে ওঁর কবিতা লেখার অদ্ভুত স্টাইল।

সেদিন সকাল থেকেই শিউলির খবরের কাগজটা পড়ে ছিল পর্দার আড়ালে। দেখবার সময় পায়নি সে। পাতা উল্টিয়ে কাগজের নীচের দিকে ছোট্ট একটা খবরে তার চোখ আটকে গেল। আরে! এই তো সেই প্রবীণা কবির ছবি! গত পরশুদিন দেখা হল সেই কবি সম্মেলনে। উনি নেই? শিরোনামে “প্রয়াত কবি কুসুমিকা দেবী” তাও এত আড়ালে, আবডালে? খবরটা পড়ে চমকে উঠল শিউলি। গতপরশু যে সময় ওনার সঙ্গে দেখা হল ঠিক তখনই তিনি ইহলোক ছেড়ে চলে গেছেন? না, না এ হতেই পারে না। মৃত্যুর সময় সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টা … তিনি তখন তো ওখানেই ছিলেন। মানে ওই কবি সম্মেলন অনুষ্ঠানে। তখন আমি তো কথা বলেছিলাম ওনার সঙ্গে। কেন এমন হল?

সব ওলটপালট।

তাঁর সঙ্গে আলাপ হবার সৌভাগ্য? আর সেই ফোন নাম্বার? ৯৮৩১০০১৩৮৯। প্যালিন্ড্রোম। ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না সহজে।

খবরের কাগজের অফিসের নাম্বারে ফোন ঘোরাল শিউলি।

কাগজে একটি খবর পড়লাম। কবি কুসুমিকা দেবীর মৃত্যুসংবাদ। আমি ওনার বাড়িতে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে চাই। আমাকে যদি ওনার নাম্বারটা কাইন্ডলি…

ওপাশ থেকে কেউ একজন কল ওয়েটিং-এ দিয়ে বাজনা শোনাল আর কিছুপরেই  জানাল…

-প্রয়াত কবি কুসুমিকা দেবীর মেয়ের নাম্বারটি লিখুন… ৯৮৩১০০১৩৮৯। জানেন তো? ইনি ফুলকলি এই ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1755 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...