দয়ামণি বারলার মর্মবেদনা

গৌরী লঙ্কেশ

 

লেখাটি গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে-তে ২৯শে নভেম্বর, ২০১২তে প্রকাশিত। মূল কন্নড় থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন এস. বাগ্রেশ্রী এবং ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন সোমনাথ গুহ। গৌরী লঙ্কেশের এমনই ক'টি গুরুত্বপূর্ণ লেখা বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেছেন 'মাতৃভাষা' প্রকাশন, শ্রী সজল রায়চৌধুরীর সম্পাদনায়। দেশ জুড়ে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে গুরুত্ব এবং প্রাসঙ্গিকতা অনুধাবন করে সেই পুস্তিকা থেকেই বর্তমান লেখাটি আমরা পুনঃপ্রকাশ করছি।

 

এক আদিবাসী সাংবাদিক এবং তার চায়ের দোকান
বহুজাতিক সংস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল

 

বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী জগদীশ শেত্তার সম্প্রতি কুদিতিনি, বেল্লারির ২৬০০ একর জমি বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইস্পাতের কোম্পানি আরসেলর মিত্তালকে হস্তান্তর করেছেন। এর অর্থ হচ্ছে এক ইস্পাত দানব কর্ণাটকে প্রবেশ করেছে এবং এর প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে। অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না যদি পস্কো এবং অন্যান্য ইস্পাত কোম্পানি শীঘ্রই দৃষ্টান্তটি অনুসরণ করে। দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারগুলোর সাহায্য নিয়ে এই ধরনের কোম্পানিগুলো কৃষকদের নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন জমিগুলো আত্মসাৎ করে। শুধু তাই নয়, এরা মানুষদের উচ্ছেদ করে, ধাতু খুঁড়ে বার করে এবং পরিবেশ ধ্বংস করে। সাধারণ মানুষ যখন দারিদ্র্যে নিমজ্জিত হয়, কোম্পানির লাভ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। বিশ্বজুড়ে এই ঘটনা বারবার ঘটতে দেখা গেছে।

দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার এবং শোষনকারী কোম্পানিগুলোর এই জালিয়াতি আমরা কী করে বন্ধ করতে পারি? রাষ্ট্র-বিরোধী এই ধরনের কার্যকলাপ আমরা কী করে ফাঁস করতে পারি? যখন আমরা এই ধরনের কোম্পানিগুলোকে সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছি তখন আমরা কী করে নিজেদের জমিতে মানুষের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারবার বন্ধ করতে পারি? খাঁটি গণতন্ত্রে এই ধরনের প্রশ্নের কোনও অবকাশ থাকা উচিত নয়। কিন্তু আমাদের মতো দেশে যেখানে ভণ্ড গণতন্ত্র চালু আছে সেখানে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয়রা আজকে একটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। তারা বুঝে উঠতে পারছে না একটা সরকার এমন সব নীতি প্রণয়ন করছে যা চূড়ান্তভাবে জনস্বার্থ বিরোধী। সেটাকে তারা কীভাবে প্রতিহত করে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করবে? সাম্প্রতিক কালে আমাদের দেশে এরকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে জনগণের পক্ষ নেওয়ার জন্য নানা ব্যক্তিদের সরকারের রোষে পড়তে হয়েছে। বিনায়ক সেন দিয়ে শুরু করা যেতে পারে, যাকে বেআইনিভাবে জেলে পাঠানো হয়েছে। তিস্তা শেতলওয়াড় আছে, যাকে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করার কারণে কয়েকশো মিথ্যে মামলার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এছাড়াও বহু এইরকম সক্রিয় কর্মী আছেন। তেরো বছর হয়ে গেছে যখন ইরম শর্মিলা অনশন শুরু করেছিলেন। এই তালিকায় আরেকটা নাম সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে – দয়ামণি বারলা, এক আদিবাসী মহিলা। আদিবাসীদের অধিকারের দাবিতে সরব হওয়ার কারণে তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে।

ঝাড়খন্ডের এক গরিব আদিবাসী পরিবারে দয়ামণির জন্ম। তাঁর বাবা হিসাবনিকাশের ব্যাপারে অত সড়গড় ছিলেন না। মহাজনদের কাছে তিনি তাঁর ছোট এক টুকরো জমি হারান। এরপরে তিনি কাছেই একটা শহরে কাজ পান আর তাঁর মা অন্য একটা শহরে গৃহপরিচারিকার কাজে যোগ দেন। দয়ামণি পড়াশুনো করতে চেয়েছিল, নিজের গ্রামেই সে ক্লাস সেভেন অবধি পড়াশুনো চালিয়ে যায় এবং একই সঙ্গে অন্যের জমিতে কাজ করে। সে রাঁচিতে চলে যায় এবং উচ্চ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। সে অন্যের বাড়িতে কাজ করে, তাঁদের এঁটোকাঁটা খায় এবং গোয়ালঘরে শোয়। সেখানেই শেষ নয়, সে স্নাতকও হয়। টাইপ করে তার নিজের শিক্ষার খরচ সে জোগাড় করে।

ততদিনে কোয়েল-কারো প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই প্রকল্পের ফলে ৬৬০০০ একর জমি প্লাবিত হওয়ার কথা ছিল। প্রাকৃতিক সম্পদ ও জঙ্গল নষ্ট হওয়াও ছিল অবধারিত, যার ফলে ১,৩৫,০০০ আদিবাসী গৃহহীন হয়ে যাবে। দয়ামণি এই প্রতিবাদগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং উপলব্ধি করে যে যদি তাঁর সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে হয় তাহলে তাঁদের জঙ্গল, জমি আর নদীগুলোও রক্ষা করতে হবে। সে আরও দেখল আদিবাসীদের সমস্যা আর প্রতিবাদগুলো মূল ধারার মিডিয়ায় প্রচারিত হচ্ছে না। আদিবাসী কথা প্রচার ও রক্ষা করার জন্য সে ব্যাঙ্ক থেকে ২৫,০০০ টাকা ঋণ করল এবং ‘জন হক’ নামে এক সংবাদপত্র চালু করল। পত্রিকাটা বেশিদিন চলেনি। কিন্তু দয়ামণির উদ্বেগ এবং তাঁর সোজা-সাপটা এবং স্মৃতিকাতর লেখার ধরণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘প্রভাত খবর’ নামক বিশিষ্ট হিন্দি পত্রিকা তাঁকে কলাম লেখার প্রস্তাব দেয়। একই সময়ে দয়ামণি ‘আদিবাসী মূলবাসী অস্তিত্ব রক্ষা সমিতি’ নামক একটা সংগঠন গঠন করে এবং সমাজ জীবনে তাঁর সক্রিয়তা বজায় রাখে। তার দায়বদ্ধতার আরও একটি উদাহরণ হল সে একটা চায়ের দোকান চালু করে, যাতে সে অবিরামভাবে মানুষের সংস্পর্শে থাকতে পারে। এটা তাঁর রুটিরুজির সংস্থান জোগায়। এছাড়াও মানুষের সংস্পর্শে থাকার সুযোগ করে দেয়। যারা এখানে জড়ো হয়, তারা তাদের জীবনের সুখদুঃখ আদানপ্রদান করে।

জনসাধারণের প্রবল প্রতিরোধের কারণে সরকারকে কোয়েল-কারো প্রকল্প পরিত্যাগ করতে হয়। এতেই আদিবাসীদের সমস্যার শেষ হয় না। কয়েক বছরের মধ্যে লক্ষ্মীমিত্তাল নামে এক নতুন সুযোগসন্ধানী সেখানে গিয়ে হাজির হয়। একটা ইস্পাত কারখানা শুরু করার জন্য তিনি ঝাড়খণ্ড সরকারের কাছে আরসেলর-মিত্তালকে ১২০০০ একর জমি দান করার জন্য আবেদন করেন। সরকার জমি দিতে প্রস্তুত হয় যেন তারা কত ভাগ্যবান যে উনি অনুরূপ একটা আবেদন করেছেন। শুধু তাই নয়। পঁয়তাল্লিশটা গ্রামকে ধূলিসাৎ করা এবং সেখান থেকে ৭০০০০ আদিবাসীকে উচ্ছেদ করার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। আদিবাসীদের সাথে দৃঢ়ভাবে থেকেছিল তখন যে নারী সে হচ্ছে দয়ামণি। ‘যে জীবনযাপন আমরা এই জমিতে গড়ে তুলেছি তা তোমাদের মামুলি ক্ষতিপূরণের চেয়ে বেশি দামি’, সে বলে এবং একটা আন্দোলন শুরু করে দেয়। এই আন্দোলন এত বিপুল সমর্থন পায় যে আজ অবধি মিত্তালের কোম্পানি এক একরও জমি নিতে পারেনি।

সম্প্রতি দয়ামণি আরেকটা আন্দোলন শুরু করেছে। ঝাড়খন্ডের রাঁচি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নাগরি নামক একটা গ্রামে সরকার ২২৭ একর উর্বর জমি বিতরণ করেছে। সেখানে একটা আই আই টি এবং ন্যাশনাল ল স্কুল গড়ে তোলা হবে। এর ফলে কয়েক প্রজন্ম ধরে কৃষির ওপর নির্ভরশীল ৫০০ আদিবাসী পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে। দয়ামণি তাদের নিয়ে একটা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে দেয়। মানুষ ধৈর্য হারায়নি যখন পুলিশ তাদের পাকা ফসল ধ্বংস করে দেয়। তারা কোনও রাগ দেখায়নি যখন চারটে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনীর মধ্যে তিনটেকে সরকার নাগরির মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। তারা তাদের স্থৈর্য হারায়নি, যখন গ্রামের মানুষদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়। একই সাথে এইসব উৎপীড়ন তাদের একটা প্রশ্ন করাও আটকাতে পারেনি। আদিবাসীদের থেকে জমি ছিনিয়ে নিয়ে আই আই টি এবং ন্যাশনাল ল স্কুলের মতো শৌখিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কী যৌক্তিকতা আছে যেখানে সেই রাজ্যের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী আদিবাসীদের মৌলিক সুযোগসুবিধা এবং প্রাথমিক শিক্ষাও উপলব্ধ নয়? স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্ন সরকারকে কুণ্ঠিত করে।

দয়ামণি কোনও রাজনৈতিক দল বা নেতার সাথে কখনও আপোস করেনি। নিঃস্বার্থ এবং ক্লান্তিহীনভাবে সংগ্রাম করার কারণে সে এত জনপ্রিয় হয়েছে যে সরকার এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলোর কাছে সে শিরঃপীড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণে সরকার তাঁকে বেকায়দায় ফেলার জন্য অপেক্ষা করছিল।

আপনারা বিশ্বাস করতে পারবেন না কোন ঘটনা তাদের সুযোগ করে দিল। ছ’বছর আগে সরকারের বহুল প্রচারিত চাকরি সংরক্ষণ পরিকল্পনায় জালিয়াতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে দয়ামণি অংশগ্রহণ করেছিল। তারা শুধুমাত্র যোগ্য প্রার্থীদের জবকার্ড দেওয়ার দাবি করেছিল। তখন সরকারি চাকুরেকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার জন্য তাঁর নাম লিপিবদ্ধ হয়েছিল। এখন সরকার সেই অভিযোগ পুনরুজ্জীবিত করেছে এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। যুক্তি হচ্ছে যে জমির অধিকারের জন্য প্রতিবাদের কারণে যদি তাঁকে গ্রেপ্তার করা হত তাহলে আদিবাসীদের বিদ্রোহ হয়ে যেত। সুতরাং জবকার্ড-এর অজুহাতটা বিচক্ষণতার পরিচয়।

যে দয়ামণি মিত্তলের মতো খলনায়ককে রুখে দিতে পারে, তাঁকে জামিন পাওয়া সত্ত্বেও জেলে আটকে রাখা হয়েছে। সারা ভারত জুড়ে কর্মীরা সরব হয়েছে তাঁর মুক্তির জন্য। কিন্তু রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়েই পুরোপুরি নিরুত্তাপ। একই সময়ে কর্ণাটকের বিজেপি সরকার মিত্তালের কোম্পানিকে জমি দিয়েছে এবং তাঁদেরকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছে। আমি আগে যে রকমটা উল্লেখ করেছি- আসন্ন লুটের লক্ষ্যে এটা একটা ছোট পদক্ষেপ।

আমার আশা দয়ামণি বারলার মতো সাহসী কর্মীরা আমার রাজ্যে উঠে আসবে এবং রুখে দেবে।

[গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে। ২৯ নভেম্বর, ২০১২]

 

টীকা:

দয়ামণি বারলা ‘আদিবাসী মূলবাদী অস্তিত্ব রক্ষা মঞ্চ’-এর সংযোজক। সাংবাদিকতা এবং আদিবাসীদের অধিকার সংক্রান্ত কাজের জন্য উনি বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনে উনি খুন্তি (ঝাড়খণ্ড) কেন্দ্র থেকে আপ-এর প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1320 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...