ভোটের লাইনে ভারত : দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বাদশতম যাত্রা

স্টেশন মাস্টার

 

...কিন্তু সমাজের সর্বস্তরে ঘৃণা ও হিংসার বিষবৃক্ষ নির্মাণে শাসকদল ও তাহার সাঙ্গপাঙ্গদিগের যে আশ্চর্য দক্ষতা সরকারের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে গত কয়েক বৎসরে পল্লবিত ও ফুল্লকুসুমিত হইয়া উঠিয়াছে, তেমনটি আগে কখনও দেখা যায় নাই। তদপেক্ষা উদ্বেগের বিষয়, এই ঘৃণা ও হিংসার ভিত্তিটি ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার, এবং প্রকৃতিগতভাবে সাম্প্রদায়িক।... এই হিংসার সংস্কৃতি, এই অপরায়নের ঐতিহ্য, এই সর্বব্যাপী ঘৃণার বাতাবরণ আমাদিগের নয় – কদাচ ছিল না। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের অনন্যতা ও অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য কী, তাহার উত্তরে এই ঘৃণার কথাই সর্বাগ্রে উল্লেখ করিতে হয়।

লোকসভা নির্বাচনের দিকে লক্ষ রাখিয়া আমরা গত কয়েক মাস ধরিয়া বেশ কিছু লেখা নিয়মিত প্রকাশ করিয়া আসিতেছি। তথাচ আমাদিগের মনে হইয়াছে, দেশের এই মুহূর্তের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষিৎটি, হিংসা-ক্লেদ-কালিমা-ক্লিন্নতায় কীর্ণ তাহার বহুস্তর বাস্তবতা-সমেত, সানুপূর্ব নথিবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। সেই মর্মেই এই সংখ্যার মূল ভাবনা, ‘ভোটের লাইনে ভারত’-এর অবতারণা।...

 

নানা কারণেই এবারের লোকসভা নির্বাচনটি অভিনবত্বের দাবি রাখে। গত বেশ কয়েক মাস ধরিয়াই ভোটের পারদ চড়িতেছিল, নির্বাচনী বৈতরণী পার হইবার জন্য হাতের কাছে জুতসই ইস্যু বিশেষ না-থাকায় শাসকদল বাঁকা আঙুলে ঘি তুলিবার প্রয়াস করিতে পারে, আভাসে-ইঙ্গিতে এমত সম্ভাবনার কথাও শুনা যাইতেছিল। বস্তুত ভোটের বাজারে বাঁকা আঙুলে ঘি তুলিবার চেষ্টা – কী এ-দেশে, কী বিদেশেও – নূতন কিছু নহে, এমনও নহে যে এই ২০১৯-এই ভারতবর্ষে প্রথম সেই প্রয়াস দেখা গেল। গত তিন-চার দশক ধরিয়া যাঁহারা গণতন্ত্রের এই মহোৎসবটি দেখিয়া আসিতেছেন ও তাহাতে অংশগ্রহণ করিয়া আসিতেছেন, তাঁহারা বিলক্ষণ জানেন, ভোটের আগে প্রতিশ্রুতির বন্যা বহাইয়া দেওয়া ও বিরোধী শিবিরের প্রতি বিষোদ্গার, ভোটের পরে বুথদখল তথা রিগিং-এর অভিযোগ এবং ঘোড়া কেনাবেচা করিয়া যেনতেন সংখ্যায় পৌঁছানো নির্বাচনী রণনীতির অতি পরিচিত কৌশলগুলির মধ্যেই পড়ে। আমি ক্ষমতায় নাই বলিয়া (ও আমার বিরোধী শিবির ক্ষমতায় আছেন বলিয়া) দেশের কী-কী অধঃপতন ঘটিল, পক্ষান্তরে আমি ক্ষমতায় আসিলে সেই অলাতচক্র হইতে কী-কী উপায়ে দেশকে উদ্ধার করিতে পারিতাম, ইত্যাদি শুনিতে যৎপরোনাস্তি অভ্যস্ত দেশবাসীরা সেসবে বিশেষ কান দেন বলিয়া মনে হয় না, তাঁহারা আপনাপন বিচার-অনুসারে পছন্দের দল বা প্রার্থীকেই ভোট দিয়া থাকেন।

তাহা হইলে এবারের ভোটটি অন্যান্যবারের তুলনায় পৃথক হইল কিসে? তাহার একাধিক কারণ হাতের কাছেই মজুত। মানিতেই হইবে, এমন সর্বব্যাপী অসহিষ্ণুতা ও ঘৃণার বাতাবরণে কেন্দ্রীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইতে দেশবাসী এর আগে কখনও দেখেন নাই। বিরোধী প্রার্থী ও দলের প্রতি নিন্দামন্দ বরাবরই ছিল, কিন্তু ‘দেশভক্তি’ ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ কদাচ এমন প্রবল ও সর্বগ্রাসী হইয়া উঠে নাই। গত পাঁচ বছরে বুক বাজাইয়া বলিবার মতো একটিও কৃতিত্ব শাসকদল অর্জন করিতে পারে নাই। দেশবাসীকে যে ‘অচ্ছে দিন’-এর স্বপ্ন দেখাইয়া শ্রী নরেন্দ্র মোদী দিল্লির তখ্‌তে বসিয়াছিলেন, সে স্বপ্ন পাঁচ বছরে ক্রমে নির্মূল হইয়াছে – একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করিতে সরকার সমূহ ব্যর্থ হইয়াছে, তেমনই অন্যদিকে বিমুদ্রাকরণের অবিমৃষ্যকারী সিদ্ধান্তে অর্থনীতির স্বাভাবিক বৃদ্ধি জবরদস্ত ধাক্কা খাইয়াছে। এরই সঙ্গে যুক্ত হইয়াছে পাহাড়প্রমাণ আর্থিক দুর্নীতি – সরকারের নাকের ডগা দিয়া একের পর এক ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীরা বিদেশে পলাইয়া গিয়াছেন, বিদেশ হইতে যুদ্ধবিমানের খরিদারির নামে তাহার দাম বাড়াইয়া দেখাইয়া ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীকে ঘুরপথে বিপুল টাকা লুটিবার বন্দোবস্ত করিয়া দেওয়া হইয়াছে বলিয়া প্রধানমন্ত্রীর দফতরের বিরুদ্ধে ঘোরতর অভিযোগ উঠিয়াছে, শিক্ষাক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা না-থাকা বণিকগোষ্ঠীর প্রস্তাবিত শিক্ষাকেন্দ্রের শিলান্যাস হইবার আগেই সেটিকে ‘ইন্সটিটিউট অব এক্সেলেন্স’-এর শিরোপা দেওয়া হইয়াছে, বিমুদ্রাকরণ-পরবর্তী কালো টাকা সাদা করিবার খেলায় শাসকদলের শীর্ষস্থানীয় নেতার নাম জড়াইয়াছে, অর্থনীতির যাবতীয় সম্ভাব্যতার তত্ত্বকে উড়াইয়া দিয়া নেতার পুত্রের ব্যাঙ্ক ব্যালান্স রকেটগতিতে বাড়িয়াছে। একইসঙ্গে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, সিবিআই প্রভৃতি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতায় বারংবার হস্তক্ষেপ করিয়া সেগুলিকে কার্যত দলীয় অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের যন্ত্রে পরিণত করা হইয়াছে। এমনকী নীতি আয়োগের কর্তাব্যক্তিদের দিয়া ভোটের মুখে বিজেপি-সরকারের গুণগান তথা কংগ্রেসের প্রস্তাবিত ন্যায় কর্মসূচির অসারত্ব প্রমাণের চেষ্টা চলিয়াছে।

এরই পাশাপাশি, সামাজিক উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারি ঔদাসীন্য ও অকর্মণ্যতার চিহ্ন সুপরিষ্ফুট। কৃষিঋণের মর্মান্তিক ফাঁস ও সরকারের তরফে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বাঁধিয়া না-দেওয়ার ফলে কৃষকদের আত্মহত্যার মিছিল অব্যাহত। বনবাসী জনজাতির স্বাভাবিক অধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইয়া দেশের অরণ্যসম্পদ সরকারের স্নেহভাজন খনিমাফিয়া ও জমিহাঙ্গর কর্পোরেটবর্গের হস্তে তুলিয়া দেওয়ার কাজও চলিয়াছে পরিকল্পনামাফিক।

কিন্তু সমাজের সর্বস্তরে ঘৃণা ও হিংসার বিষবৃক্ষ নির্মাণে শাসকদল ও তাহার সাঙ্গপাঙ্গদিগের যে আশ্চর্য দক্ষতা সরকারের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে গত কয়েক বৎসরে পল্লবিত ও ফুল্লকুসুমিত হইয়া উঠিয়াছে, তেমনটি আগে কখনও দেখা যায় নাই। তদপেক্ষা উদ্বেগের বিষয়, এই ঘৃণা ও হিংসার ভিত্তিটি ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার, এবং প্রকৃতিগতভাবে সাম্প্রদায়িক। ভারতীয় বহুত্ববাদী সমাজে এমন একটি ভাষ্য রচনার পালা চলিয়াছে যা বলে, “তুমি যদি আমার সমর্থক না-হও তবে তুমি দেশদ্রোহী অতএব তুমি পত্রপাঠ পাকিস্তানে চলিয়া যাও; তুমি যদি আমার শ্রেষ্ঠত্ব শিরোধার্য না-করিয়া লও তবে তেমন অবাধ্য শিরটি ঘাড়ের উপর বসাইয়া রাখিবার কী কারণ, উহা আমাদিগকে দাও।” স্মরণে থাকিবে, শাসকদলের পক্ষে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলিবার অপরাধে গত কয় বৎসরে প্রাণ গিয়াছে দাভোলকর-পানসারে-কালবুর্গির। কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ে পৃথক হইবার অপরাধে প্রাণ গিয়াছে আখলাক, পহলু খান-সহ আরও অনেকের। আমাদের এই সংখ্যাটির কাজ যখন চলিতেছে তখনও খবর আসিতেছে, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রচারসভা আলো করিয়া বসিয়া আছেন গণপিটুনির হোতৃবৃন্দ। এই হিংসার সংস্কৃতি, এই অপরায়নের ঐতিহ্য, এই সর্বব্যাপী ঘৃণার বাতাবরণ আমাদিগের নয় – কদাচ ছিল না। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের অনন্যতা ও অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য কী, তাহার উত্তরে এই ঘৃণার কথাই সর্বাগ্রে উল্লেখ করিতে হয়।

লোকসভা নির্বাচনের দিকে লক্ষ রাখিয়া আমরা গত কয়েক মাস ধরিয়া বেশ কিছু লেখা নিয়মিত প্রকাশ করিয়া আসিতেছি। তথাচ আমাদিগের মনে হইয়াছে, দেশের এই মুহূর্তের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষিৎটি, হিংসা-ক্লেদ-কালিমা-ক্লিন্নতায় কীর্ণ তাহার বহুস্তর বাস্তবতা-সমেত, সানুপূর্ব নথিবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। সেই মর্মেই এই সংখ্যার মূল ভাবনা, ‘ভোটের লাইনে ভারত’-এর অবতারণা। আসন্ন গ্রীষ্মে প্রখর রৌদ্রের নীচে আমাদিগের এই কর্কটক্রান্তির দেশ যখন ভোটের লাইনে দাঁড়াইতে চলিয়াছে, তখন তাহার দেহে ও মনে পরিব্যাপ্ত অসুস্থতার লক্ষণগুলি ঠিক কী-কী, কেহ অন্তত বাণিজ্যিক লাভ-লোকসানের দিকে দৃক্‌পাত না-করিয়া তাহা লিপিবদ্ধ করিয়া রাখুক।

এই সংখ্যার মূল ভাবনা বিভাগে লিখিলেন প্রশান্ত ভট্টাচার্য, উদয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজদীপ্ত রায়, অমিত দাশগুপ্ত, সফিউল, ব্রতীন্দ্র ভট্টাচার্য, সুশোভন ধর, সৌভিক ঘোষাল এবং সোমেন বসু। প্রাসঙ্গিক-বিধায় ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী সমাজকর্মী দয়ামণি বারলাকে লইয়া গৌরী লঙ্কেশের একটি রচনা আমরা সেই সঙ্গে স্টিম ইঞ্জিন বিভাগে পুনঃপ্রকাশ করিলাম।

এ-ছাড়া রহিল গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ ও অন্যান্য নিয়মিত বিভাগসমূহ।

ভাল থাকুন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...