বিএসএনএল-এর সুপরিকল্পিত সঙ্কট এবং একটি অফিসেফেরত লোকাল ট্রেন

ঋতম ঘোষাল

 

রাত দশটার হাওড়া ব্যান্ডেল লোকাল। আমি নামব ভদ্রেশ্বর, অমিত নামবে মানকুন্ডু। কামরা ম ম করছে ঘেমো মোজা আর পোড়া বিড়ির গন্ধে। তবে এতটাও তীব্র নয় যে মাসের সাতাশ তারিখে পোস্তার লাখোটিয়া গ্রুপ অফ কোম্পানিজের অফিসফেরতা কনিষ্ঠ কেরানি গন্ধ বিলাসিতা দেখাতে পারবে। ব্যাজার মুখে মোবাইল বের করে স্কুলের বন্ধুর হোয়াটসাপে পাঠানো চুটকি পড়ছিলাম, হঠাৎ পিঠে টোকা পড়ল। তাকিয়ে দেখি কার্তিকদা। কার্তিক পাল, আমাদের যতীন দাশ হাইস্কুলের ফুটবল ক্যাপ্টেন কার্তিক পাল, ক্লাস সেভেনের আমির চোখে পাশের স্কুল টিমকে জোড়া গোল করে হিরো হয়ে যাওয়া কার্তিকদা।

ওজন বেড়েছে কিছুটা, চোখের তলায় অভিজ্ঞতার কালি-ও বেড়েছে কিছুটা। কমেছে কেবল মাথার চুল।

–কেমন আছিস রে আশু?
–চলে যাচ্ছে কার্তিকদা। তুমি বলো। অনেকদিন পরে দেখলাম। বালিতে বাড়ি করেছ শুনেছিলাম।
–বালিহল্টে। বাড়ি করিনি ভাইটি, ভাড়াবাড়ি।
–তারপর বলো, কেমন চলছে দিনকাল?

হোয়াটসাপের মজা আমাকে ডাকছিল। কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছিল না। কে না জানে “তারপর বলো”-র চেয়ে ভাল কনভারসেশন কিলার আর নেই।

–আছে একরকম। তোর বৌদির অফিসে একটু গোলমাল চলছে আর কী।

এবারে সোজা হয়ে বসলাম। বৌদি তো যদ্দূর জানতাম বিএসএনএল টেলিফোন ভবনে চাকরি করে। সরকারি চাকরি। হাজারো সুবিধে। সেখানে আবার গোলমাল কিসের।

প্রশ্ন করতেই কার্তিকদা কাষ্ঠহাসি হাসল।

–খবর রাখিস না কিছু বোঝাই যাচ্ছে। চালাবে কী করে বিএসএনএল? ঐ যে ফোনটায় মেসেজ করছিস, চুটকি পাঠাচ্ছিস একে ওকে, ইস্কুলের গ্রুপে রসালো আলোচনা করছিস, তা’ সিম ভরেছিস কোন কোম্পানির শুনি?

ফটাকসে বললাম কোম্পানির নাম। লাস্ট তিন বছর এটাই ইউজ করছি। আগে অন্য একটা করতাম, মাইগ্রেট করে নিয়েছি, এরা অনেক সস্তায় দিচ্ছিল। তারপর দেশ জুড়ে সব কাগজে মন্ত্রীর ছবি দিয়ে অ্যাড দেয় এরাই। হু হু করে বিক্রি হয়েছে। মেক ইন ইন্ডিয়া জিনিসটা ভাল চলছে আজকাল।

–ঘ্যামা প্ল্যান দিচ্ছে কার্তিকদা। দেড়শো টাকায় আনলিমিটেড কল, ডেলি দেড় জিবি নেট। চরম স্পিড।

কার্তিকদা হেসে ফেলল। ঐটিই তো যত কাণ্ডের মূলে ভাইটি। ঐ কোম্পানির সিম বাজারে আসার পরে থেকেই বিএসএনএলের গণেশ উল্টাল।

এবারে রেগে গেলাম। সরকারি চাকুরেগুলো মোটে কাজ করে না, কুঁড়ের বাদশা সব, আঠেরো মাসে বছর। সরকারি ব্যাঙ্ক বলো, রাইটার্স বলো, টেলিফোন অফিস, ইলেকট্রিক অফিস, বিএলআরও— সব জায়গায় এক অবস্থা। দিয়েছে ব্যাটাদের বাঁশ।

কার্তিকদা দেখি উলটো বলে। “ঠিক জানিস তুই? সরকারি চাকুরেরা কাজ করে না? আচ্ছা বেশ, ধর এই যে আমি ব্যাঙ্কে আছি, সরকার অধিগৃহীত ব্যাঙ্ক। মানে তোরা যাদের উপর রেগে থাকিস সবসময়, আর বিদেশি বেসরকারি ব্যাঙ্কের গুণগান করিস। তা বল তো ভাইটি, আমি এই রাত সাড়ে নটা অবধি অফিসে পড়ে ছিলাম কেন?”

“সে আমি কী জানি কার্তিকদা। যখনই ব্যাঙ্কে যাই, শুনি পরে আসুন। এভাবে হয় নাকি? শুনেছি কিছুদিন পরে নাকি সব কিছু কাজ করবে রোবটরা। মানুষের আর দরকার হবেই না। একদিক দিয়ে ভাল, রোবট অন্তত টিফিন ব্রেক নেবে না।”

–শোন ভাই, এভাবে হয় না। যখন কম্পিউটার এল, তখন কী হয়েছিল মনে আছে?

নেই আবার? কার্তিকদার বাবা, আমার ছোটকাকা ছিল পাঁড় মাকু।শুনেছি, তখনকার সিপিএমের লোকজন রাস্তায় গড়াগড়ি দিয়েছিল কম্পিউটার আটকাবে বলে। দেখিনি অবশ্য। কিন্তু পারল কি? ঘরে ঘরে ল্যাপটপ। সব অফিসে রিসেপশনিস্ট অবধি কম্পিউটারে খুটখাট করে। ঐদিকে দলটাই…,। যাকগে সেসব তো আর বলা যায় না।

পড়ুন — ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০১৯

বললাম— “কম্পিউটার কি আটকানো যায় দাদা? হাতে হাতে স্মার্টফোন, ঘরে ঘরে কম্পিউটার। কী করতে পেরেছে ওরা? যারা আটকাতে চেয়েছিল।”

–ওটাই তো বলছি রে ব্যাটা। কম্পিউটার আনার পক্ষে যুক্তি ছিল কম্পিউটার একাই পাঁচটা লোকের কাজ করবে। তাই ঐ পাঁচটা লোকের কাজের চাপ কমবে। বাড়ির লোকের সাথে সময় কাটাবে বেশি। বদলে কী দেখলি? পাঁচটা লোকের কাজ কমল না, কমল লোকের সংখ্যা। আগে যে কাজ করত দশজন, এখন সেটা করতে হয় চারজনকে, কাজের চাপ-ও বেড়েছে অনেক। অফিস আওয়ারের বাপমা নেই, আট দশ, বারো ঘণ্টা চলছে। কম্পিউটার, অটোমেশনের জুজু দেখিয়ে লোকজনের চাকরি গেল প্রাইভেট ব্যাঙ্কে…
–কেন চাকরি গেল কেন? আর কার্তিকদা, একটা জিনিস তো মানবে, যেকোনও জিনিসের কনজিউমার বেড়েছে। আগে মনে করে দেখো, আমাদের সুভাষ পল্লীতে কটা লোকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল? পাড়ার কজন লোক ব্রাঞ্চে টাকা রাখত? আর এখন দেখো, ঐটুকু ব্রাঞ্চ গমগম করে। এত এত লোক।
–এগজ্যাক্টলি, আশু। কম্পিউটার দিয়ে এই এত এত বেশি কনজিউমারের চাপ সামলানো যেত না? কী মনে হয় তোর? বদলে কি করল, না কম্পিউটারের অজুহাত দেখিয়ে দশটা লোককে কমিয়ে দিল। নেই হয়ে গেল লোকগুলো পরের দিন থেকে। শুধু ব্যাঙ্ক নয় রে, যেকোনও সংস্থারই একই গল্প। প্লেন বানানোর, ঘড়ি বানানোর কোম্পানি থেকে তোর বউদির অফিস বিএসএনএল। সবারই গল্প মোটামুটি এক। প্রথম ওষুধটাই দেওয়া হয় কর্মী সঙ্কোচন। বড় বড় অর্থনীতিবিশারদেরা আসেন, ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞরাও আসেন। ঘটাপটা করে কমিটি গঠন হয়, কাগজে নাম ওঠে, মুমূর্ষু পেশেন্টকে বাঁচাতে ডাক্তারদের টিম বানানো হয়। দাওয়াই অবশ্য সবাই জানে প্রথম থেকেই। কর্মী ছাঁটাই।

কথা খুঁজে পেলাম না। আমি নিজে বেসরকারি অফিসে কলম পিষি। মালিক প্রায়ই ভয় দেখায় ছাঁটাই-এর। কাজ সারতে সারতে সাড়ে নটা দশটা বাজে। কর্মী ছাঁটাই-এর তিতো দাওয়াই আমার অজানা নয়। কার্তিকদা বলে চলল–

–এই রিলায়েন্স, তারপর জিও মোবাইল সার্ভিসের বাজারে আসার পর থেকেই বিএসএনএল-এর অবস্থা পড়তে থাকে। সরকার কর্ণপাত-ও করেনি। বরং নতুন কোম্পানির হয়ে পরোক্ষে প্রচার করেছে। আর এখন তো সে রাখঢাকও গেছে! বিএসএনএল কয়েক বছরের মধ্যে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখ দেখে…
…একদম চেনা প্লট। তুই কোম্পানি ছেড়ে স্কুল, হাসপাতাল এসব ভাব। সরকারি জায়গাগুলোতে বরাদ্দ কমিয়ে, পরিকাঠামো না দিয়ে এমন অবস্থা করে দেওয়া হবে তুই আপসে আপ বেসরকারি জায়গায় দৌড়বি। কেউ বললে ভিলেন হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে টিচারদের, ডাক্তারদের। এই তুই যেমন বললি কর্মীরা কাজ করে না! নিখুঁত সিস্টেম! ঢাকঢোল পিটিয়ে বেসরকারিকরণ করতেও হল না। কিন্তু কার্যত বেসরকারিকরণ হয়েও গেল নিঃশব্দে…
…বিএসএনএল-কে সরকারি মহল থেকে একটা প্রোপোজাল দেওয়া হয়, তার থেকে তিনটে মেনে নিয়েছে বোর্ড। রিটায়ারমেন্টের বয়স ৬০ থেকে কমিয়ে ৫৮তে নিয়ে আসা, ভিআরএস চালু করা আর ফোর জি চালু করা। এই প্রস্তাব দিয়েছিল তিনজন ম্যানেজমেন্ট প্রফেসরের একটা কমিটি…
সেই মতো প্রায় ৫৪০০০ কর্মচারীর চাকরি পরোয়ানা জারি হয়ে গেছে ধরা যায়। বিএসএনএলের মোট কর্মী সংখ্যা এখন ১ লাখ ৭৪ হাজার। মানে প্রায় ৩১ পার্সেন্ট লোক কমবে…

–এতে লাভ হবে?
–এক্সপার্টরা তো তাই বলছেন। বিএসএনএল আগামী ৬ বছরে ১৩৮৯৫ কোটি টাকা খরচ কমাতে পারবে এর ফলে।
–তা এসব হবে কবে?
–ওইখানেও গল্প আছে ভাইটি। ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকমিউনিকেশন এই অবসরের বয়সসীমা বা ভিআরএস নিয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য ২০১৯ সালের লোকসভা ভোট অবধি অপেক্ষার কথা জানিয়েছে, কারণ ভোটের আগে এইরকম ডিসিশন নাকি ভোটের রেজাল্টে প্রভাব ফেলতে পারে!
–বাঃ! এ তো নির্ভেজাল শয়তানি!
–শুধু তাই নয়, ক্যাবিনেটে এই প্রস্তাব তোলার আগে ইলেকশন কমিশনের কাছে সুপারিশ-ও করা হয়ে গেছে। ভোটের পরেই যেন কর্মী সঙ্কোচন শুরু হয়। গণতন্ত্রের মোচ্ছব বলে কথা! যাকগে উঠি রে…

বালি স্টেশন আসছে, কার্তিকদা এগিয়ে গেল গেটের দিকে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...