বৈবাহিক ধর্ষণ : কিছু চিরচেনা ‘গুপ্ত’ কথা

শতাব্দী দাশ

 

ব্যাঙ্গালোরে KLE Society-র আইনি কলেজে বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন প্রাক্তন চিফ জাস্টিস দীপক মিশ্র৷ বৈবাহিক ধর্ষণের প্রসঙ্গ উঠলে তিনি বলেছেন, তিনি মনে করেন না বৈবাহিক ধর্ষণ ভারতীয় প্রেক্ষিতে অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে। কারণ তা হলে পরিবারে অরাজকতা সৃষ্টি হবে, যে ‘পরিবার’ ও পারিবারিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে ভারতবর্ষ টিকে আছে। বৈবাহিক ধর্ষণ নামক ওপেন সিক্রেটটি নিয়ে চাপানউতোর আরেকবার সংবাদপত্রে জায়গা পেয়েছে তাঁর এই বক্তব্যের ফলে।

দীপক মিশ্র হলেন সুপ্রিম কোর্টের সেই প্রধান বিচারপতি, যিনি ৩৭৭ ধারার পরিমার্জনা করে সমকামকে অপরাধমুক্ত করেছেন। শবরীমালাকে খাতায় কলমে নারীদের জন্য উন্মুক্ত করেছেন৷ অবশ্য নিন্দুকেরা বলেছিলেন, জেন্ডার সংক্রান্ত আইনগুলির সংস্কারসাধন করে সুপ্রিম কোর্ট (সরকারের সহমতিতে) আসলে শহুরে লিবারেল মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিচ্ছেন দেশজুড়ে বুদ্ধিজীবীদের ধরপাকড়ের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা থেকে। কিন্তু সন্দিগ্ধ হলেও আমরা খুশি ছিলাম। চিফ জাস্টিস দীপক মিশ্রর বেঞ্চ আরও এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিল। ‘পরকীয়া’ সংক্রান্ত আইন নস্যাৎ করে বলেছিল, নারীশরীর তার স্বামীর ‘সম্পত্তি’ নয় যে ‘সম্পত্তি’ বেহাত হলে অধিগ্রহণকারী (অর্থাৎ স্ত্রীর প্রেমিক) শাস্তি পাবে। নারীর ওই তথাকথিত ‘পরকীয়া’-য় সম্মতি ছিল কিনা, সেটাই আসল কথা।

এবার এক মিনিটের বিরতি নিয়ে ভাবা যাক, এই রায় প্রধান বিচারপতি থাকাকালীন দীপক মিশ্রই দিয়েছিলেন যে ‘নারীশরীর পুরুষের সম্পত্তি নয়’….আবার তিনিই এখন বলছেন বৈবাহিক ধর্ষণ অবান্তর। প্যারাডক্স, নয় কি?

আসলে সে ক্ষেত্রে ভার্ডিক্ট দেওয়া হচ্ছিল কোনও না কোনও পুরুষকে রক্ষা করতে (পরকীয়ায় স্বামী-স্ত্রী ব্যতীত তৃতীয় যে জন)। আর এক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে বৈবাহিক সম্পর্কে ধর্ষিত নারীদের। তাই রাষ্ট্র (যার বয়ানেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে দীপক মিশ্রর মুখে) এ ব্যাপারে টালবাহানা করতেই পারে।

‘ম্যারিটাল রেপ’ কী? যখন বিবাহিত সম্পর্কে স্বামী জোর করে বা ভয় দেখিয়ে স্ত্রীয়ের অসম্মতিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন, সেটাই বৈবাহিক ধর্ষণ, যা গৃহহিংসারই অঙ্গ। দেখা যাক এরকম কয়েকটি ঘটনা।

ঘটনা এক:

পিউ জানতই না, তার প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা আসলে ধর্ষণ। সম্বন্ধ করে বিয়ে। বিয়ের আগে আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের মতোই তার পিতৃ-পরিবারে যৌনতা বিষয়ক আলোচনা গর্হিত ছিল। কিন্তু বিয়ে যে একটা চিরস্থায়ী পবিত্র বন্ধন, সেইটা মাথায় ঢুকে গিয়েছিল ভালোভাবে। তাছাড়া বিয়ে হলে বাচ্চা হয়, তা কে না জানে! বাচ্চা হয় মানে যৌনতাও হয় নিশ্চয়৷ এইটুকু ধারণা সম্বল করে বিয়েটা হয়ে গেল৷ প্রথম রাতে, আলাপ-পরিচয় ঘটার আগেই, নারীশরীরের সদ্য মালিকানা পাওয়া লোকটি তার পাওনাগণ্ডা বুঝে নিল৷ প্রতিরোধ করেছিল পিউ। সেইটাই কাল হল। কিল-চড়-ঘুষির দরকার পড়ল, যদিও সেসবের ইচ্ছে ছিল না তার বরের, বিশেষত ফুলসজ্জার রাতে। পিউ এত কিছুর পরেও জানত না, ওটা ধর্ষণই৷ ‘ধর্ষক’ আর ‘স্বামী’ কখনও এক লোক হতে পারে নাকি? ধর্ষক তো বাইরের লোক, যারা রাস্তায়-ঘাটে-বস্তিতে-গ্রামে থাকে৷ স্বামীর অধিকার আছে তাকে ভোগ করার এবং স্বামীকে যৌনভাবে তৃপ্ত করা তারই দায়িত্ব– এমনটাই ভেবেছিল সে। কিন্তু সেই সময় থেকে ডিপ্রেশনও শুরু হয়েছিল পিউর। আজ বারো বছর হয়ে গেল পিউ ছেলেমেয়ে নিয়ে আলাদা থাকে৷ ডিভোর্সটা শেষপর্যন্ত হয়েছিল। দিদিদের বলতে পেরেছিল পিউ৷ দিদিদের থেকে কথা মায়ের কানে উঠেছিল৷ মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন৷ কিন্তু তখনই কিছু করে উঠতে পারেননি। তারপর একবার হল কী, বাপের বাড়িতে একটা বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। রাতে যে যেখানে পারছে শুয়ে পড়ছে৷ সে রাতেও পিউর বরের দাবি, বউকে চাই, আলাদা ঘর চাই। পিউ সেদিন আত্মীয়স্বজন পাশে পেয়ে ক্ষেপে উঠল৷ চিৎকার করে ‘না’ বলল, যে ‘না’ সে আগেও বহুবার বলেছে, মৃদুস্বরে। চেঁচায়নি, পাশে বাচ্চা জেগে যাবে বলে। যে ‘না’ সে নিশ্চুপে হাত-পা ছুঁড়ে প্রতিরোধের মাধ্যমে বলেছে৷ যে ‘না’ শুনেই তার বরের জেদ বেড়েছে, প্রতিরাতেই ‘না’-কে অগ্রাহ্য করার জেদ৷

পিউ আজ মনে করে, ‘না’ শুনতে না হলে, প্রতি রাতে মড়ার মতো প্রতিরোধহীন শরীর মেলে দিলে, হয়ত লোকটা অত নিষ্ঠুর আচরণ করত না৷ যাই হোক, সে রাতে অশান্তি চরমে উঠলে বাড়িভর্তি লোকের সামনেই লোকটা পিউর গায়ে হাত তোলে, আবারও। এরপর পিউর মায়ের টনক নড়েছিল৷ বাবাকেও বোঝানো গেছিল। তারপর এক যুগ কেটে গেছে। আজও ডিপ্রেশনের ওষুধ খেতে হয় পিউকে।

ঘটনা দুই:

জুহির বরের দাবি ছিল সামান্যই। পর্ন দেখতে হবে সঙ্গে বসে। তারপর সেই মতো যৌনাচার। যৌনতায় জুহির আপত্তি ছিল না। আপত্তি ছিল পর্ন দেখায় এবং অনুরূপ কয়েকটি যৌনভঙ্গিতে। সেসব তাঁর স্বামীর কাছে উপভোগ্য হলেও তাঁর কাছে ছিল অত্যাচার৷ পর্ন দেখা ভালো কী খারাপ, বিকৃতি না স্বাধীনতা– সেইসব নিয়ে ওঁদের তর্কটা হত না৷ জুহি জানত তাঁর অনেক মেয়ে বন্ধুও পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত৷ এই নিয়ে কোনও নৈতিক বাধাটাধাও তাঁর ছিল না৷ বিষয়টা ছিল ব্যক্তিগত অনিচ্ছা ও অনীহার। বিষয়টা ছিল অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করার। প্রতিবার তাঁর অসম্মতিতে তাঁর অপছন্দের পশ্চারে মিলিত হতে গিয়ে তাঁর মনে হত, ধর্ষিত হচ্ছে সে।

ঘটনা তিন:

সুমনা বিয়ের পর দুবার গর্ভবতী হয়ে গেল কয়েক বছরের মধ্যেই৷ তাঁর বর কন্ডোম ব্যবহার করতে চাইত না। এদিকে গর্ভনিরোধক খেলে সুমনার নানা শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এই যে বর কন্ডোম ব্যবহার করতে নারাজ, একে সুমনা তাঁর বরের ‘প্রেফারেন্স’ হিসেবে দেখেছে। বারবার গর্ভবতী হওয়ার ফলে তাঁর স্বাস্থ্য বিপন্ন হওয়া যে এই ‘প্রেফারেন্সে’র চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা সে ভাবেনি। মা-শাশুড়ি বলেছে, ‘আহা হোক না সন্তান! বাবার তো টাকা আছে অনেক। দু-চারটে বাচ্চা সামলে নিতে পারবে৷’ যাই হোক, দ্বিতীয়টির পর যখন তৃতীয়টিও পেটে এল, তখন স্বামী-দেবতা আর সন্তান চাইল না৷ বারবার এত দীর্ঘ যৌনবিরতি পোষায় না৷ সুতরাং গর্ভপাত। গর্ভপাতকালে অখ্যাত নার্সিং-হোমে আরও কিছু একটা অপারেশন হল সুমনার। বরকে বিশ্বাস করে সে যেখানে যেখানে প্রয়োজন, সইসাবুদ করে দিয়েছিল। পরে জানতে পারল, তাঁর চিরস্থায়ী গর্ভনিবারক ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে, খাতায় কলমে তাঁর জ্ঞাতসারে, কিন্তু বাস্তবে তার অজ্ঞাতে।

‘একবার আমাকে জানালেও না?’

উত্তরে বর বলেছিল, ‘কেন? কেমন সারাবছর সেক্স করতে পারব আমরা এবার! মাসিকের ঝামেলাও নেই৷ নিজের বরের সঙ্গে শুতে ভালো লাগে না? তাহলে কি পরের সঙ্গে শুতে ভালো লাগে?’

এইসব কেস স্টাডিতে নাম যে পরিবর্তিত তা তো বলাই বাহুল্য। এঁরা বা এঁদের মতো আরও যাঁরা, তাঁরা কেউ কেউ বিচ্ছেদ নিয়েছিলেন স্বামীর থেকে, বেশিরভাগই সম্পর্কে থেকে গেছেন৷ লেডিজ কম্পার্টমেন্টের সবজিওয়ালি আয়েষা যেমন৷ নির্দ্বিধায় বলেন, ‘সকালে ঝির মতো খাটো, রাতে বেশ্যার মতো শোও।’ কিন্তু ‘নিয়তি’কে তিনি মেনে নিয়েছেন।

অত্যাচারিত হওয়া সত্ত্বেও একজন মহিলার বিচ্ছেদ না নেওয়ার হাজারটা সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু এঁরা যে অনেকে প্রাথমিকভাবে জানতেনই না যে এঁদের ধর্ষণ করা হয়, এইটা ভাবার মতো বিষয়৷ জুহির মতো কেউ কেউ তা আঁচ করলেও, বাকিরা স্রেফ ঘটনাগুলোকে তাঁদের ‘আপত্তি অগ্রাহ্য’ করা হিসেবেই চিহ্নিত করেন। বাড়ির কর্তা তো স্ত্রীর কত কথাই অগ্রাহ্য করেন! তেমনভাবে যৌনতায় তাঁর প্রেফারেন্স বা অনীহাকে অগ্রাহ্য করাকেও তাঁরা ‘আপত্তি অগ্রাহ্য’ করা হিসেবেই ভাবেন, ধর্ষণ-টর্ষণ নয়৷ যৌন অত্যাচারের সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্য ধরনের নির্যাতনও থাকে৷ যেমন, শারীরিক বা মানসিক বা অর্থনৈতিক নির্যাতন৷ ডিভোর্স যদি বা হয়, ডিভোর্সের কেস যখন সাজানো হয়, তখন উকিল মহাশয়কে সব খুলে বললে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনিও যৌন নির্যাতনের অংশটি বাদ দিতে বলেন৷ ভালো চেয়েই বলেন তিনি, এমনকি তিনি নিজে যদি বৈবাহিক ধর্ষণের ধারণায় বিশ্বাসী হন, তাহলেও। ‘মিছিমিছি এই নিয়ে কোর্টে অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠবে। অথচ দেখুন, লাভও তো কিছু হবে না। বৈবাহিক ধর্ষণ বলে তো ভারতীয় আইনে কিছু নেই।’

১৮৬০ সালের ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী, কোনও পুরুষ তাঁর নিজের স্ত্রীর সঙ্গে জোর করে সঙ্গম করলেও তা ধর্ষণ ছিল না। তারও আগে, ১৭৩২ সালে ইংল্যান্ডের চিফ জাস্টিস স্যার ম্যাথিউ হেল বলেছিলেন, “কোনও স্বামী তাঁর আইনত বিয়ে করা স্ত্রীকে ধর্ষণ করার অপরাধে অপরাধী হতে পারেন না। কারণ তাঁদের পারস্পরিক বৈবাহিক চুক্তি অনুযায়ী, একজন স্ত্রী নিজেকে বস্তু হিসাবে নিজের স্বামীকে দান করেছেন, এবং কোনওমতেই তিনি এই চুক্তি থেকে সরে যেতে পারেন না।” ভারতীয় আইনবিধি ঔপনিবেশিক প্রভুর আইনবিধিকেই অনুসরণ করেছিল।

‘এজ অফ কনসেন্ট’ নিয়েও ঐতিহাসিক ভাবে ছিল টানাপোড়েন। যৌনতায় মেয়েদের এজ অফ কনসেন্ট ১২ বছর করা হয়েছিল উনবিংশ শতকে, ফুলমণি নামে এক দশমবর্ষীয়া বালিকা-বধূর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর৷ সেই বয়স এখন বেড়ে বেড়ে আঠারোয় দাঁড়িয়েছে৷ কিন্তু বিবাহিত মেয়ের ক্ষেত্রে? বয়সটা বাড়িয়ে বারো থেকে পনেরো হয়েছিল৷ অবশ্য ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বলা হল, ১৫-১৮ বছর বয়সী বালিকা-বধূর সঙ্গে বলপূর্বক মিলনও ধর্ষণ বলে গণ্য হবে৷ কিন্তু আঠারোর উপরে? আর কোনও সুরক্ষা কবচ নেই৷

ধর্ষণ আইন, ৩৭৫ ধারার, সাম্প্রতিকতম সংস্করণটি দেখা যাক৷ ২০১২ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে দিল্লিতে প্যারামেডিক্যাল ছাত্রী জ্যোতি সিং গণধর্ষিত হলেন। রাজধানী তথা দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হল। ধর্ষণ আইন সংস্কারের দাবি উঠল। ২৩ ডিসেম্বর ২০১২ সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি জে সি বর্মার নেতৃত্বে তৈরি হল তিন সদস্যের বর্মা কমিটি। পরের বছর ২৩ জানুয়ারি এই কমিটি যে রিপোর্ট পেশ করল তাতে ধর্ষণের সংজ্ঞা সম্প্রসারণ ও আরও নানা সংস্কার করার প্রস্তাব ছাড়া, আরও প্রস্তাব ছিল, বৈবাহিক ধর্ষণকে সামগ্রিকভাবে যৌন অত্যাচার বা সেক্সুয়াল অ্যাসল্টের আওতায় নিয়ে আসা হোক। কিন্তু তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেয়। তখনও বলা হয়েছিল, ‘যদি বৈবাহিক ধর্ষণকে আইনের আওতায় আনা হয় তা হলে পরিবারপ্রথা গভীর সমস্যায় পড়বে।’ সুতরাং ধারা ৩৭৫, যেটি ধর্ষণ সম্পর্কিত ধারা, সেখানে বলা আছে, ‘নিজের স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক, যদি সেই স্ত্রীর বয়স ১৫-র ঊর্ধ্বে হয়, ধর্ষণ নয়।’ ধর্ষণকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ঠিকই। এখন শুধুমাত্র পিনো-ভ্যাজাইনাল কার্য নয়, পায়ুমৈথুন, বাধ্যতামূলক মুখমেহন, যৌনাঙ্গে অনুমতি ছাড়া ফরেন অবজেক্ট ঢোকানো সবই পড়ছে ধর্ষণের আওতায়। কিন্তু ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে বলা হয়েছে ‘এই সবই ধর্ষণ, যদি অভিযোগকারিনী স্ত্রী না হন।’ অর্থাৎ ভারতীয় আইনের পরিভাষায় যৌনভাবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে অসুরক্ষিত হল বিবাহিত নারী।

পরবর্তী বিজেপি সরকারও একই সুরে কথা বলেছে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হরিভাই পার্থিভাই চৌধুরি রাজ্যসভায় লিখিত বিবৃতিতে বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে বৈবাহিক ধর্ষণের যে ধারণা, ভারতীয় প্রেক্ষাপটে তার যথোপযুক্ত প্রয়োগ সম্ভব নয়।’ ২০১৬ সালে সংসদে একটি লিখিত আবেদনের জবাব দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী মানেকা গাঁধী বলেন, ‘পৃথিবীর বহু দেশ এই সমস্যা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিয়েছে, কিন্তু ভারতের প্রেক্ষাপটে এই ভাবনা যথোপযুক্ত নয়। বিভিন্ন পর্যায়ে এ দেশে শিক্ষা, নিরক্ষরতা, দারিদ্র, অগুনতি সামাজিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধ, ধর্মীয় ভাবনা, মানসিকতা বিয়েকে পবিত্র একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভাবনার সঙ্গে ধর্মীয় সংস্কার এতটাই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে যে বৈবাহিক ধর্ষণের ধারণাটাই এ দেশে অলীক কল্পনা।’ অথচ, ২০১৫-র জুনে এক সাক্ষাৎকারে মানেকা গান্ধি ঠিক এর উল্টো কথাই বলেছিলেন।

বৈবাহিক ধর্ষণকে ভারতবর্ষে প্রথম আলোচনায় আনার চেষ্টা করে ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (তৃতীয়)। এই সার্ভে হয়েছিল পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশাতে ১৮-৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের নিয়ে। ৮০ হাজার মহিলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, এঁদের মধ্যে ৯ শতাংশ মহিলা পরিবারে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন (প্রতি ১২ জনের মধ্যে এক জন)! তার মধ্যে ৯৩%-র ধর্ষক তাঁদের স্বামী। ওই পরিসংখ্যান এবং ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর পরিসংখ্যানকে পাশাপাশি রেখে ২০১৪ সালে প্রকাশিত আশিস গুপ্তর গবেষণাপত্র জানায়, বৈবাহিক ধর্ষণের ক্ষেত্রে ১ শতাংশেরও কম মহিলা রিপোর্ট করে থাকেন।

বৈবাহিক ধর্ষণ সংক্রান্ত আইন যেখানে নেই, সেখানে আর কী কী আইন কাজে লাগতে পারে? যখন আক্রান্ত অভিযোগ আনেন যৌনাঙ্গে অন্য বস্তু ঢোকানো, পায়ুদ্বার দিয়ে যৌনক্রিয়া বা মুখমেহনে বাধ্য করা ইত্যাদির তখন ধারা ৩৭৭ প্রযোজ্য। সেখানেও আছে বিপত্তি। কেস দেওয়া হলেও বিচারপতি গুরুত্ব না দিতে পারেন। হরিয়ানার এক লোয়ার কোর্ট একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন হরিয়ানা হাইকোর্টকে, অনুরূপ একটি কেসে এরকম এরকম বলপূর্বক পায়ুমৈথুনের বিষয়কে গুরুত্ব দেবেন কিনা। কারণ বিচারপতির মনে হয়েছিল, মেয়েরা সহজেই এর অপব্যবহার করতে পারে; প্রথমে পায়ুমৈথুনে রাজী হয়ে, পরে স্বামীকে ফাঁসিয়ে দিতে পারে।

হিন্দু বিবাহ আইনে স্ত্রী বেশ কিছু ঘটনার ভিত্তিতে বিবাহ-বিচ্ছেদ মামলা দায়ের করতে পারেন। ‘নিষ্ঠুরতা’ এর মধ্যে একটি। যৌন নিষ্ঠুরতাও এর মধ্যে পড়া উচিত। আবার ৪৯৮/এ-তেও ‘ক্রুয়েলটি ইন ম্যারেজ’-এর উপশম খুঁজতে পারেন কেউ। কিন্তু কোথাও স্পষ্ট করে যৌন নির্যাতনের উল্লেখ করা হয়নি৷

স্ত্রীর উপর যৌন হিংসা গৃহহিংসারই আরেক রূপ হলেও তার জন্য আলাদা আইন দরকার। সুরক্ষা মজবুত করতে তো বটেই, ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’-এর সত্যতা যাতে রাষ্ট্র মেনে নেয়, সেই স্বীকৃতিটুকুর জন্যও আইন দরকার৷ আবার ‘Protection of Woman against Domestic Violence Act (2005)-এও কিন্তু ‘যৌন নির্যাতন’-এর উল্লেখ আছে৷ সাধারণত বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা PWDVA (2005)-এর মাধ্যমেই অত্যাচারিতদের কেস লড়তে পরামর্শ দেয়। PWDVA সবরকম অত্যাচার(শারীরিক, মানসিক ও যৌন)-এর বিরুদ্ধেই কার্যকরী। তা কেস-চলাকালীন নারীর আশ্রয় ও ভরণপোষণেরও সুরক্ষাও দেয়৷ কিন্তু এটি একটি সিভিল আইন, ক্রিমিনাল আইন নয়। তুলনায়, ৪৯৮/এ-তে দোষী সাজা পেলেও তা দীর্ঘসূত্রী আইন৷ তা হলে, ধরে নেওয়া যায়, স্বামীর হাতে যৌন নির্যাতন হলে, নালিশ যদি বা করা যায়, তা করতে হবে সিভিল আইনে। অপরাধীর শাস্তির আশা ছেড়ে দিতে হবে।

পৃথিবীর নানা দেশে কিন্তু আজ বৈবাহিক ধর্ষণ নিষিদ্ধ। সোভিয়েত ইউনিয়নে বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়েছিল ১৯২২ সালে। তার পর বিংশ শতাব্দী জুড়ে বিশ্বের প্রায় একশ দেশে বৈবাহিক ধর্ষণকে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৯৩-এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি স্টেটেই বৈবাহিক ধর্ষণ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হয়। ২০০৫-এ তুরস্কে, ২০০৭-এ মালয়েশিয়ায়, ২০১৩-তে বলিভিয়ায় বৈবাহিক ধর্ষণ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিবেশী নেপালে বৈবাহিক ধর্ষণ দণ্ডনীয় হয়েছে ২০০৬ সালে।

২০০৯ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিবের রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘অন্তত ১০৪টি দেশে বৈবাহিক ধর্ষণ শাস্তিযোগ্য। এর মধ্যে ৩২টি দেশে (২০১১ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ৫২ হয়) বৈবাহিক ধর্ষণকে সুনির্দিষ্টভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ বলা হয়েছে। বাকি ৭৪টি দেশে সাধারণ ধর্ষণের আইনেই বৈবাহিক ধর্ষণের বিচার হয়। অন্তত ৫৩টি দেশে বৈবাহিক ধর্ষণ কোনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়।’ এই শেষ তালিকায় আছে ভারত, চিন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, সৌদি আরবের মতো দেশ।

ভারতীয় সমাজমানসে কোথাও এখনও এই ধারণা বদ্ধমূল যে, বিয়ে করা মানেই সম্মতি নিয়ে যৌন সম্পর্কের আর প্রয়োজন নেই। বিয়ে একটি চিরস্থায়ী যৌন চুক্তি। বলা ভালো, ভারতীয় সমাজে এখনও যৌনতায় সামাজিক স্বীকৃতির ছাপ্পা লাগানোর অনুষ্ঠানই হল বিয়ে। একদিকে পুরুষ সামাজিক মস্তিষ্কপ্রক্ষালনের ফলে নিজেকে স্ত্রীর শরীরের মালিক ভাবে, অন্যদিকে সেই একই সামাজিক প্রশিক্ষণের ফলে মেয়েরাও এর প্রতিবাদ করেন না, মেনে নেন। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে মেয়েরা শারীরিক সম্পর্কের আগে প্রস্তুতির সময়টুকুও পান না। লভ ম্যারেজেও সমস্যা আসতে পারে, তবে সেখানে বৈবাহিক ধর্ষণ মূলত যৌনতা-অভিলাষী নয়, তা অন্য রাগের বহিঃপ্রকাশ।

বৈবাহিক ধর্ষণকে স্বীকৃতি না দেওয়ার যুক্তিগুলি তো আগেই বলা হয়েছে। সংক্ষেপে–

  1. ‘তা ভারতীয় সংস্কৃতিতে অলীক।’ এই যুক্তিটি বোঝা অসম্ভব৷ তবে সমকামিতা সম্পর্কেও এককালে একই কথা শোনা গেছিল৷ ভারতীয় সংস্কৃতিতে তা নাকি অনুপস্থিত৷
  2. ‘পরিবার বিলুপ্ত হবে।’ সেক্ষেত্রে এটা প্রকারান্তরে মেনেই নেওয়া হচ্ছে যে পরিবার নারীর জন্য নিষ্পেশন-যন্ত্র৷ নারীর নানা আত্মবিসর্জনের বিনিময়েই পরিবারপ্রথা টিকে আছে৷ অন্যদিকে, পিতৃতান্ত্রিক পরিবার নারীকে যৌন ও অন্যান্য সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ।
  3. ‘বিবাহপ্রথা প্রশ্নচিহ্নের সামনে পড়বে৷’ এখানেও প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেওয়া হল, বিবাহ প্রথাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যক্তি-নারীদের বিসর্জন দেওয়াই যায়।
  4. ‘এই আইনের অপপ্রয়োগ মেয়েরা করবে।’ এই এক দৃঢ় প্রত্যয় দেখা যায় আইন-প্রণেতা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যে, মহিলারা অবশ্যই মহিলা-সুরক্ষায় নিয়োজিত সব আইনের অপপ্রয়োগ করবেন। সুতরাং দাবি হল, অপপ্রয়োগের ভয়ে আইন-প্রণয়নই আটকে দেওয়া। অথচ অপপ্রয়োগ হবে বলে দেশে অন্যান্য আইনের প্রণয়ন কিন্তু আটকে থাকে না৷

প্রাক্তন চিফ জাস্টিসের বক্তব্য তাই আরেকবার আমাদের প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করায়। ‘বিবাহ’ ও ‘পরিবার প্রথা’-র বিলুপ্তি না ঘটলে নারীর মুক্তি নেই-এই নারীবাদী চিন্তনই কি তবে যুক্তিযুক্ত? ‘বিবাহ’ বা ‘পরিবার’ নামক প্রতিষ্ঠানদুটি কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে আধুনিক নারীর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ধারণা অনুযায়ী নিজেকে অভিযোজিত করতে৷ সেই অভিযোজন সম্ভব হলেই বরং বিবাহপ্রথায় বিলোপে আরও কিছু দেরি হলেও হতে পারত। এরপর বিবাহপ্রথায় নারীর বিতৃষ্ণা জন্মানোটাই স্বাভাবিক নয় কি? অভিযোজনের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকলে প্রাণী বা প্রথা– যেকোনও কিছুরই বিলোপ অবশ্যম্ভাবী। বিবাহপ্রথার ক্ষেত্রেও সেই ভবিষ্যৎই অপেক্ষা করছে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1249 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...