ভিক্ষে থেকে আলোর রাস্তায় – এক স্বপ্নসফর

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

দিল্লি। একটা নবছরের শিশু। ভিখারি। আলাপ। আর আলাপের ওদিকে ড্যান ব্লক ব্রেক্স ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেডের প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার। উচ্চতায় তফাৎ অনেকটাই। কিন্তু, সহমর্মিতায়? বোধে? খুব বেশি নেই হয়ত। সেই আলাপ। শুরুতে দিল্লি ঘুরে ঘুরে ন’টি শিশুকে ভিক্ষে, অনুগ্রহের ফাঁদ থেকে বের করলেন। স্কুলে ভর্তি করলেন। বাকিটা ইতিহাস। একটা স্বপ্ন। ভাবনা। কেন এই অবস্থা? কোথায় সমস্যা? গভীরে গেলেন আশিস। সমাধান ভাবলেন। একটা সময়ে চাকরি ছাড়লেন। ২০১৭-র ২২ আগস্ট। শুরু হল ‘উন্মুক্ত ইন্ডিয়া’। ১৭০০০ কিলোমিটারের যাত্রা। না, শখের দেশ-ভ্রমণ না। ভিখিরি শিশুদের মূল স্রোতে ফেরানো। ২৯ বছরের আশিস। হতেই পারত কেরিয়ার, আধুনিকতা, ফ্যাশন কিংবা নিউ ইন্ডিয়ার শাইনিং বিজ্ঞাপনের কোনও মুখ। তার বদলে? সুমনের কথা মনে পড়ছে। অন্য ছবিও আঁকো। কাঁধে একটা রুকস্যাক। হাতে তেরঙা। হাঁটা, হাঁটা আর হাঁটা। কী করলেন এই সময়টা? নতুন শহর, গ্রাম, বন্দর। কী ছিল আশিসের সিলেবাসে? স্কুল, কলেজ, মেট্রোর কামরা, চায়ের দোকান। আশিসের ক্যাম্পেনিং। শিশু ভিখারির ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি এবং ভয়ঙ্করতা বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা। বোঝানো। কিছু মানুষ তো বুঝবেন। সব কথাই বিফলে যাবে? আশিস আশা হারাননি। শুরুর দিকে সমস্যা ছিল। কেমন হবে জার্নি? আদৌ কতটা আলো সামনে? আশিস জানতেন না। দুজন বন্ধু অর্থসাহায্য করলেন। আশিসের নিজেরও অনেক কিছু ত্যাগ মিলে শুরু হল স্বপ্নের সাম্পান। গোটা জার্নিতে একেবারেই আড়ম্বরহীনতা, সাধারণ খাবার, তরল খাবারের ওপর নির্ভর করে তাঁর এই শিক্ষা সফর। একটু অসুস্থতা মানেই বিরতি। টার্গেট থেকে বিচ্যুতি। সে লাক্সারি কোথায়? তবু, অন্ধকার থাকে। ভীষণভাবেই। গৌহাটি। জন্ডিসের প্রকোপে পড়লেন আশিস। আরও তিন জায়গায়। জন্ডিস তাঁকে ছাড়তে চাইছিল না। তবু, এ ছেলের জেদের কাছে হার অসুস্থতার। অথবা আশ্রয়হীনতা। বেশ কয়েকবার রাস্তায় শুয়ে কাটিয়েছিলেন। বলতে পারেননি বাবা মাকে। সন্তানের মাথায় ছাদ নেই। কীভাবে নেবেন বাবা মা? অথবা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু। আশিসের জব্বলপুর মনে পড়ে। মানুষের ভেতর অসাধু মানুষের বাস। একজন ভণ্ড সাধু। আপাত শান্তিবাক্যের ভেতর চূড়ান্ত কপটতা। আশিসকে দেখেই চোখ চকচক করল। মানুষের জন্য হাঁটা? ধুর। এই ছেলেকে চাই। ধর্মের বিষ, নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য চাই। আশিসকে অপহরণ করে নিজের আশ্রমে লুকিয়ে রাখলেন। কাকে দমাবেন? ২৯ বছরের টগবগে তরুণ আশিস শর্মাকে। সম্ভব? বাথরুম যাওয়ার নাম করে দেওয়াল টপকে পালালেন। ভয় পেলেন না। থামলেন না। একই অভিসার চলতে থাকল আশিসের।

কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘দোয়ায়ে ফাউন্ডেশন’ একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করতে চলেছে। কারণ আশিস জানেন, ওয়ান ম্যান টিম শেষমেশ জেতে না। কিছুদূর এগোতে পারে মাত্র। এই অ্যাপ হবে সেই রাস্তা। জেতানোর। সাধারণ মানুষ, সংস্থা কোথাও কোনও শিশু ভিখিরি দেখলেই জানাতে পারবে তাঁদের। টিম আশিস ব্যবস্থা নেবে। এই লড়াইয়ে পাশে পাবেন না সরকারকে? আশিস চেষ্টায় আছেন। রেলমন্ত্রক, নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সাধ্যমত আশ্বাসও পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ পরের ধাপ। দেশের ৩২ লাখ এনজিও-র সঙ্গে ডিজিটাল কমিউনিকেশন। তাও সম্ভব। আশিস নিজের জ্ঞান ও পড়াশুনো দিয়ে জানেন, এসব কোনও কিছুই আজ অসম্ভব না। পথে ভালোবাসা, সাহচর্য পেয়েছেন অনেকের। মনে পড়ছে কমল হাসানের মতো অভিনেতার ভালোবাসা। অথবা রজনীকান্ত এবং তাঁর স্ত্রী লতা। শিশু অধিকার রক্ষায় তাঁদের ‘শ্রী দয়া ফাউন্ডেশন’ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আশিসের। লড়াই, আশা, স্বপ্ন— এগুলো যে এক।

লড়াইয়ের কোনও শেষ নেই। তবু, একটা ধাপ থাকে। যাত্রা শেষে দিল্লিতে ফিরলেন আশিস। ২৪ মার্চ। দিনটাও মনে আছে। বেগমপুর চক থেকে করলের দিকে ১০০০০-১৫০০০ জনের এক শুভেচ্ছা যাত্রা। আশিস চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। কে ছিলেন না? কুস্তিগীর যোগেশ্বর দত্ত। বক্সার দীনেশ কুমার। সহযোদ্ধা।

শেষ বলে কিছু নেই। ১৪ জুন দিনটাকে পাখির চোখ বাছছেন আশিস। দশ লক্ষ মানুষকে নিয়ে এক ম্যারাথনের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। নাম হবে ‘উন্মুক্ত দিবস’। লক্ষ্য, শিশু ভিখারী মুক্ত ভারতবর্ষ। পারবেন। পারতেই হবে আশিসকে। তিনি যে একা নন। উন্মুক্ত দিবসের মোটো।

‘ইউ আর নট অ্যালোন ইন দিস জার্নি।’

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1320 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...